
এমনই আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ড তাদের সদ্য প্রকাশিত annual ground water report 2025 ‘এ। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই নড়েচড়ে বসেছেন সকলে। সমীক্ষায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এমন কিছু তথ্য যা আমার আপনার সকলেরই ঘুম কেড়ে নেবে। সমগ্র দেশ জুড়ে মাটির নিচের জলের গুণগত মানের পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে পাঞ্জাব, হরিয়ানার ঠিক পরেই রয়েছে দিল্লি জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের নাম। অর্থাৎ দিল্লির ভৌম জলের মধ্যে বিপদজ্জনক মাত্রায় ইউরেনিয়াম সহ অন্যান্য ক্ষতিকারক উপাদানের সন্ধান পাওয়া গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে যে দিল্লিতে যতসংখ্যক এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে তারমধ্যে ১৩– ১৫ % নমুনায় সহনীয় ৩০ ppb’র তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে ইউরেনিয়াম উপস্থিত রয়েছে যা দিল্লিবাসী মানুষদের পানীয় জলের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
কী বলছে সাম্প্রতিক সমীক্ষা রিপোর্ট?
সদ্য প্রকাশিত এই রিপোর্ট থেকে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার যে দিল্লির ভৌমজলে ইউরেনিয়ামের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি খুব আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, বরং এইটি জলের গুণগত মানের ধারাবাহিক অবনমনের ফল। পূর্ববর্তী ২০২০ সালের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল যে মোট সংগৃহীত নমুনার ১১.৭% ক্ষেত্রে উপস্থিত ইউরেনিয়ামের মাত্রা সহনমাত্রার অনেকটাই ওপরে ছিল। এদের মধ্যে উত্তর পশ্চিম জেলায় টিউবয়েলের জলে ইউরেনিয়ামের উপস্থিত ছিল ৮৯. ৪ ppb (পার্টস পার বিলিয়ন )। দিল্লির ছটি জেলায় যথা– উত্তর, উত্তর – পশ্চিম, দক্ষিণ, দক্ষিণ – পূর্ব, দক্ষিণ – পশ্চিম এবং পশ্চিম , ভূগর্ভস্থ জলে দ্রবীভূত ইউরেনিয়ামের মাত্রা নির্ধারিত সহন মাত্রার অনেকটাই ওপরে ছিল যা মহানগরীর ১০.৭% গড় মানের বেশি।
এই দাবি পেশ করার সঙ্গে সঙ্গে সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে দিল্লিতে অধিবাসীদের কাছে ৫৫০০ টিউবয়েল থেকে ৪৫০ mld ভৌম জল তুলে পরিস্রুত বা আধা পরিস্রুত অবস্থায় সরবরাহ করা হয়। এই জল কতটা নিরাপদ তার কোনো স্পষ্ট আভাস এই রিপোর্ট থেকে পাওয়া যায়নি। ফলে সংস্থার দাবির যৌক্তিকতা অস্বীকার করার উপায় নেই ।
দেশের কী হাল?
বহুদিন ধরেই দেশের পানীয় জলের জোগান ও শুদ্ধতা বিষয়ে নানা মহলেই গম্ভীর আলোচনা চলছে। আমাদের কর্মকাণ্ডের ফলে পৃষ্ঠীয় জলের উৎসগুলো বিষাক্ত, অব্যবহার্য হয়ে পড়েছে অনেকদিন।রেহাই পায়নি মাটির নিচে থাকা ভৌমজলও। সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ড ২০২৪ সালে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ৩,৩৫৪ টি নমুনা সংগ্রহ করেছে দুটি আলাদা আলাদা সময়ে – বর্ষার প্রাক্কালে এবং বর্ষার ঠিক পরে । তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে প্রাক্ বর্ষার ৬.৭১% নমুনায় এবং বর্ষার পরবর্তী ৭.৯১% নমুনায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি ইউরেনিয়াম উপস্থিত রয়েছে। পাঞ্জাবের স্থান এই তালিকার সবার ওপরে ঠাঁই পায়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে হরিয়ানা ও দিল্লি। দিল্লির বিভিন্ন এলাকার মধ্যে দুটি এলাকা – আউচান্ডি ( ৪২ ppb ) কাঞ্ঝাওয়ালার নিজামপুর ( ৪৬.৫ ppb ) সবাইকে ছাপিয়ে গেছে জল দূষণের বিচারে।
এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে ভৌম জলের দূষণের বিষয়টি কেবলমাত্র এই তিন রাজ্যেই থমকে আছে। বরং ঠিক তার উল্টো। রোগ যেমন গোড়ায় শরীরের একটা অংশে প্রকাশ পেলেও পড়ে অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এখানেও ঠিক তাই ঘটেছে। পূর্ববর্তী একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে দেশের ১৮ টি রাজ্যের ১৫১ টি জেলার মাটিতে এবং ভৌমজলে ইউরেনিয়ামের মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে উপস্থিত রয়েছে। এই রাজ্যগুলোর তালিকায় রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ছত্তিশগড়, হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, ঝাড়খণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, কর্ণাটক,কেরালা, পাঞ্জাব, দিল্লি, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের নাম। ভৌমজলের বিষ এভাবেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের একটা বড়ো অংশে। কেন এমন পরিণতি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এমনটি হবার পেছনে রয়েছে মূলত তিনটি প্রধান কারণ –
কৃষির উৎপাদন বাড়াতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় ফসফেট ফার্টিলাইজার বা উর্বরক। এই সারের মধ্যে মিশে আছে ইউরেনিয়াম। বৃষ্টির জলের সঙ্গে ধুয়ে গিয়ে এই রাসায়নিক পদার্থটি গিয়ে মিশেছে মাটিতে এবং অবশ্যম্ভাবী রূপে ভৌমজলে– জল দূষিত হচ্ছে এভাবেই।
শিল্পের বর্জ্য পদার্থ থেকেও এই বিষাক্ত রাসায়নিক মাটি এবং জলে মিশে যেতে পারে।
ভূতাত্ত্বিক উৎস থেকেও এই বিষাক্ত পদার্থ জলে মিশে যেতে পারে।
উৎস যাই হোক না কেন পানীয় জলের সঙ্গে মিশে এই বিষ বিণা বাধায় নিঃশব্দে গিয়ে জমা হচ্ছে আমাদের শরীরে এবং এর ফলে বিপন্ন হচ্ছে আমজনতা।
স্বাস্থ্য প্রতিক্রিয়া
জলই জীবন। তবে তা কখনোই দূষিত জল নয়। নয়া রিপোর্টে এই বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে দীর্ঘদিন ধরে পানীয় জলের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম, আর্সেনিক এবং সীসার মতো অত্যন্ত ক্ষতিকারক পদার্থ শরীরের ভেতরে প্রবেশ করলে আমাদের শরীরে অনিবার্যভাবে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন এই জল থেকে মানব শরীরে কিডনির সমস্যা, স্নায়ুতন্ত্রের জটিল সমস্যা, দেহ কাঠামোর অসঙ্গতির সাথে সাথে ক্যান্সারের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। জলের সঙ্গে মিশে থাকা আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজ শিশু ও ছোটদের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে। ভৌমজলের মানের এই অবচয় পানীয় জল হিসেবে ভৌমজলের ব্যবহারকে সীমিত করে । একইভাবে কৃষির ওপর তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ায় ফসলের গুণমানের ওপরেই কেবল তার প্রভাব পড়েনা,একইভাবে উৎপন্ন ফসলের মধ্যে এইসব ক্ষতিকর পদার্থ থাকায় তা ঘুরপথে আবার আমাদের শরীরেই এসে হাজির হয়।কি ভয়ঙ্কর পরিণতি! ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে বসলে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। এসব নিয়ে ভাবতে বসলে মাথা ঘুরতে থাকে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। এসব নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাওয়া। দিল্লির জল ক্রমশই লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। এই সমস্যাটি কেবল পাঞ্জাব, হরিয়ানা বা দিল্লির নয়, গোটা দেশের। ভৌম জলের যথেচ্ছ উত্তোলন একদিকে যেমন এই ভাণ্ডারকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, অন্যদিকে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় তা আর ব্যবহার্য্য নয়। এক গভীর সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা নির্বিকার চিত্তে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে গিয়ে আমরা নির্বিচারে সবকিছুকে গুলিয়ে দিচ্ছি প্রতিনিয়ত। মাঝেমাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, পুরাণ কথিত সমুদ্র মন্থনের সময় কি এর থেকে বেশি বিষ উঠে এসেছিল? আমরা জানি ইউরেনিয়াম এক দিকে হেভি মেটাল ও পাশাপাশি রেডিও অ্যাক্টিভ উপাদান। পানীয় জলের সঙ্গে মিশে থাকা ইউরেনিয়াম আমাদের রাসায়নিক দূষণে আক্রান্ত করছে নিয়ত। এখন নিয়তির ওপর ভরসা করা ছাড়া আমাদের আর বোধহয় কোনো উপায় নেই!
পুনশ্চ: লেখাটা শেষ করে সম্পাদক মশাইয়ের কাছে পাঠাতে যাব,এমন সময় বন্ধুবর সৌমেন রায় জানালেন বিহারে মাতৃদুগ্ধের ইউরেনিয়াম সংক্রমণের কথা। এর ফল সহজেই অনুমেয়। আগামী দিনের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের আর শেষ রইলো না। নিবন্ধটি যেন শেষ হয়েও হইলোনা শেষ।
ডিসেম্বর ০২. ২০২৫

















দিল্লির মানুষদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও উৎকন্ঠা রইলো। এ কোন্ পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা? ভাবলে শিউরে ওঠে শরীর ও মন।
মতামত পেয়ে ভালো লাগলো। ভারতের সমস্ত মহানগরীর হয়তো এমনটাই পরিণতি হতে চলেছে। সেচের জন্য জল তুলে নেবার আজ পাঞ্জাব হরিয়ানা দিল্লির এই হাল। এমন অবস্থা অন্যত্রও ঘটতে পারে। আর্সেনিক দূষণের কথা মনে আছে তো?
গভীর চিন্তার বিষয়। মাত্রাতিরিক্ত জল উত্তোলন অন্যতম কারণ। জলস্তর নেমে গেলে মাটিতে উপস্থিত মৌলগুলি যৌগ গঠনের সুযোগ পায়। ভৌম জল অনেকটি রাস্তা অতিক্রম করে লেয়ারে জমা হওয়ার সময় তাদের সঙ্গে নিয়ে যায়। পাঞ্জাব,হরিয়ানার সম্পন্ন চাষিরা বেশি জল লাগে এমন চাষ করে বেশি।তারা কোনভাবেই ক্রপ রোটেশন করবে না। সেই কারণে ঐ অঞ্চলে সমস্যা বেশি। তারপর শিল্প জনিত দূষণ তো আছেই।
লেখককে ধন্যবাদ।
এই কথাগুলো বলতে বলতে, লিখতে লিখতে হয়রান হয়ে গেলাম। সমান্তরাল কন্ঠে এই কথাগুলো ধ্বনিত হোক। রাজধানীর গরিমায় টান পড়ছে।
কি ভয়ানক ব্যাপার! দূষিত জলের এলাকার মানুষ ঘটি বাটি বেচে দিয়ে কি চলে যাবে অন্য কোথাও? এর ওষুধ কি? সরকার কি পদক্ষেপ নিয়েছে এ ব্যাপারে?
সরকারের কিছুই প্রায় করার নেই। সবদিক থেকেই আমরা আক্রান্ত। ওষুধ নাগরিকদের নিমগ্ন সচেতনতা। তার কোনো স্পষ্ট দিশা কই ?
Simple filters or chlorination are not sufficient to remove heavy metals. Reverse osmosis (RO) systems combined with activated carbon filtration are recommended as effective methods for removing uranium and other toxins.