দেখুন, অনেক হয়েছে। অনেকদিন হয়েছে। এবারে আন্দোলনের ধ্যাষ্টামো ছেড়ে উৎসবে ফিরুন।
রোজ রোজ মিছিল করলে – আন্দোলন করলে – মানুষের অসুবিধে হয়। এটুকুও বোঝেন না? হ্যাঁ, একসময় আমরা আন্দোলন করেছি – এক্সপ্রেসওয়ে আটকে রেখে, মানুষের এতটুকু অসুবিধে না করে, কীভাবে আন্দোলন করতে হয়, দেখিয়ে দিয়েছি। আপনাদের তো সেরকম ইয়ে নেই। আন্দোলন কীভাবে করতে হয়, বোঝেনই না।
আর আপনাদের ইয়ে আমার জানা আছে। চাকরি না পেয়ে কয়েকটা ছেলেমেয়ে যে এতদিন ধর্ণা দিয়ে বসে রইল – পাত্তা দিয়েছি? মিডিয়াকেও টিপে দিয়েছিলাম – কেউ ওদের দেখাতোই না, কেউ ওদের দেখতেই পেত না। দুদিন পেরোতে না পেরোতেই সবাই কেমন ভুলে গেল, মনে আছে? আজ আপনাদের মিটিং-মিছিল টিভিতে দেখাচ্ছে, তার মানেই আপনারা বিরাট হনু হয়ে গেছেন, এতটা ভাববেন না। গতকাল দেখিয়েছে, আজ দেখাচ্ছে, হয়ত আগামীকালও দেখাবে – কিন্তু পরশু? হুঁ হুঁ, শুভশ্রী গানটা দু’লাইন গাও তো… ওই গানটা… যতই ঘুড়ি ওড়াও রাতে, লাটাই তো আমার হাতে…
আরে ওই জায়গাটাও গেয়ে শোনাও… রাত পাহারা যতই থাকো/ বয়ে গেছে আমার তাতে/ সুযোগ বুঝে সিঁধ কেটে রোজ/ মাতবো রসের মৌতাতে/ যতই ঘুড়ি ওড়াও রাতে/ লাটাই তো…
হ্যাঁ হ্যাঁ, লাটাই যে আমার হাতে থাকবে, থাকবেই, সন্দেহ আছে তাতে? উনি বলেছিলেন, যিনি রাম তিনিই কৃষ্ণ, এযুগে তিনিই… যাকগে, শুনে রাখুন, এইযুগে আমি বলছি, যিনি অতিবিপ্লবী, যিনি মস্তান-চিটিংবাজ, এযুগে সবাই তৃণমূল! সাধারণ মানুষের অসুবিধে, ফ্যাসিবাদের মাথাচাড়া দেওয়া, আন্দোলনে বিজেপি-বিজেপি গন্ধ – এসব লাইনে অলরেডি প্রথম দলকে খেলতে নামিয়ে দিয়েছি। তাই দেখে দ্বিতীয় দল অলরেডি ছটফট করছে – ওদের চেন খুলে দিলে পারবেন সামলাতে?
বিচার? শুনুন ভাই, যা করি, বুক ফুলিয়ে বলি এবং করি। করে দেখাই। আমিই বলেছিলাম, পয়সা ঢাললেই আদালতে ইচ্ছেমতো রায় পাওয়া যায়। সেটা ঘুরপথ। কিন্তু পয়সা দিয়ে তিরিশটা বাঘা উকিল লাগালে যে সুবিধেমত রায় পাওয়া যায় – অন্তত তারিখের পর তারিখ পাওয়া যায় – সে নিয়ে সন্দেহ আছে? এই তো সরকারি কর্মচারীগুলো ডিএ-র জন্য ঘেউঘেউ করত – কোর্টকাছারি দৌড়াত – কী করতে পারল? তারিখ পে তারিখ-এর চক্কোরে এখন মিউমিউ করছে… তাহলে?
তো শুনুন, বেশি ফড়ফড় করবেন না। ডাক্তারি পড়তে এসেছেন, পড়ার চাপ হাল্কা করে দিয়েছি, শান্তভাবে কোশ্চেন কিনুন ও পাস করুন। হ্যাঁ, কোশ্চেনের দাম যদি বেশি মনে হয়, তাহলে আসুন, নেগোশিয়েট করে দেব। আন্দোলনকারীদের প্রতি আমার সবসময়ই সহানুভূতি থাকে – নিডি পরিবারের জন্য আমার সবসময়ই স্পেশাল কনসিডারেশন থাকে – দামের জায়গায় কিছু ছাড়ের ব্যবস্থা করে দেব। প্রফেসরদের ট্রান্সফারের জন্য যে টাকাটা নেওয়া হয়, ওটা একটু বাড়িয়ে কোশ্চেনের দামে ভর্তুকি দিয়ে দেব, নইলে স্টুডেন্ট কার্ড বানিয়ে কোশ্চেন কেনার স্পেশাল প্যাকেজ করে দেব – কীভাবে করব, সেটা আমার ব্যাপার, কিন্তু আপনারা কাজ শুরু করুন, নেগোসিয়েশনে আসুন।
কলেজে কলেজে থ্রেট কালচার নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে – কিন্তু কী আশ্চর্য, এ নিয়ে এত কথার কী আছে!! আপনারা ঠিক কী চান? বীর্যবান তাজা ছেলেমেয়েরা কি তবে হাতে গোলাপফুল নিয়ে সখি ভালোবাসা কারে কয় গাইতে গাইতে কলেজ প্রদক্ষিণ করবে? কলেজ লেভেলে ঠিকঠাক ট্রেনিং না হলে পরের ধাপে এরা বাকি কাজ সুষ্ঠুভাবে করবে কী করে? পার্টিটা কি ভারত সেবাশ্রম, নাকি রাবীন্দ্রিক নৃত্যকলা শিক্ষাকেন্দ্র? আমাদের গণতান্ত্রিক দল। সবার সমান সুযোগ এখানে। অনুব্রত থেকে অভীক, শেখ শাজাহান থেকে বিরূপাক্ষ বিশ্বাস, ববি থেকে সুশান্ত রায়, জুন মালিয়া থেকে সুহৃতা পাল, কুণাল ঘোষ থেকে কৌস্তভ নায়েক – সবার সমান সম্মান। বিভিন্ন ভূমিকায় থাকলেও সবার একই লক্ষ্য, একই উদ্দেশ্য – সবাই মা-মাটি-মানুষের জন্য লড়াইয়ের বিশ্বস্ত সৈনিক।
তো দেখুন, অনেক ধৈর্য ধরেছি। এবারে বলছি – অনেক হয়েছে, আর না! সুড়সুড় করে কাজে ফিরুন। পুজো আসছে। পুজো নিয়ে কিন্তু নো কম্প্রোমাইজ। দু-চারটে পুজোয় অভয়া থিম বা তিলোত্তমার বিচার জাতীয় কিছু করুন – চন্দননগরের লাইটে খুন-ধর্ষণ রাখুন – কিছু মনে করব না। বিনীতকে বলেছি, ও পাস করিয়ে দেবে। কিন্তু পুজোয় ধূমধাম মাস্ট। আর সত্যি বলছি, একবার পুজোটা হয়ে যেতে দিন – দেখবেন, নিজেদেরই কতটা ভালো লাগছে, মনটা দেখবেন একেবারে ফুরফুরে হয়ে গেছে…
ওই যে বললাম, লাটাই তো আমার হাতে…
আর ওই মেয়েটার বাপ-মা? ধুর! ওটা আমার উপর ছেড়ে দিন। ও নিয়ে একদম ভাববেন না। সুদীপ্তকে মনে আছে? ছেলে মারা যাবার পর বাবাকে তিন-চারদিন টিভিতে খুব দেখাত। এখন মনে করতে পারেন? আর ওই ছেলেটা? আনিশ খান না কী যেন? ওর বাবার মুখ? পুজোটা হতে দিন – উৎসবের মাসটা যেতে দিন – তিলোত্তমার বাবা বা মায়ের মুখ ভুলতেও মাত্র দুটো সপ্তাহ লাগবে।
গতকাল তো বলেই দিয়েছি, বাবা-মায়ের অভিযোগ ভুয়ো। সরাসরি না বললেও বুঝিয়েই দিয়েছি, ওঁরা মিথ্যেবাদী।
দুর্গাপুজো শেষ হয়ে লক্ষ্মীপুজো পৌঁছাতে পৌঁছাতে, দেখবেন, বিশ্বাসই হবে না, যে, মেয়েটাকে সত্যিই ধর্ষণ করে খুন – বা খুন করে ধর্ষণ – করা হয়েছিল। কালীপুজো অব্দি পৌঁছে গেলে, দেখবেন, তিলোত্তমা বা অভয়া নামে কোনও মেয়েই ছিল না – মেয়েটির বাবা-মা বলে যাঁদের ভাবছেন, তাঁরা আদতে, আগাগোড়াই, ছিলেন নিঃসন্তান।
তো, অনুরোধ করছি, এখনও অব্দি ভালোবেসেই বলছি – উৎসবে ফিরুন। এক মাস ধরে ধৈর্য ধরে আছি, অনুরোধ কিন্তু ইয়ে-তে বদলে যেতে সময় লাগবে না।
মনে রাখবেন, ভালো মুখ করে বলা কথা না শুনলে আমি কিন্তু…
শেষমেশ আবারও বলি, যতই ঘুড়ি ওড়াও রাতে, লাটাই তো আমার হাতে… লাটাই ধরে টানাটানি করতে এলে কিন্তু শুধু ফোঁস করা নয়, একেবারে ছোবল বসিয়ে দেব। কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গাইয়ে-বাজিয়ে-অভিনেতা-নাট্যকার-পরিচালক-এনজিও-আমলা-অফিসার-পুলিশ-সিভিক-উপদেষ্টা-তোলাবাজ-গুণ্ডা-মস্তান-খুনী-চিটিংবাজ-ঘুষখোর – এবং আরও অনেক অনেএএক ইত্যাদি প্রভৃতি – এককথায় বিপুল বিশাল এই তৃণমূল পরিবার – স্রেফ সদিচ্ছে আর স্বপ্ন দিয়ে পারবেন আমাদের মোকাবিলা করতে?










