★
নিয়ম করে স্থানান্তরে যারা যায় তাদেরকে পরিযায়ী বলে। সেই হিসেবে ধরলে আমি যে এই দূরদেশ সেন্ট পিটার্সবার্গে হাজির হয়েছি বটে কিন্তু আমি মোটেই পরিযায়ী নই। কিন্তু কী আশ্চর্য, আমাকে তবুও এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন কাউন্টার পেরোতে হবে। আর ইমিগ্রেশনের বাংলা হল পরিযান। সেই মত আমিও পরিযায়ী রূপ পরিগ্রহ করেছি।
এটা কোনও রুটি রোজগার বা খাদ্য অনুসন্ধানের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা নয়। রবিঠাকুরের দেখা হে হংস বলাকার কেস নয়। সেই যুগ যুগান্তের পরিযান। আড়াইশ গ্রাম মাংসের লোভে ছররা বিঁধে, ঘুড়িতে ওড়া বড়শিতে বিঁধিয়ে যে পরিযান স্তব্ধ করে দিচ্ছে অপরিণামদর্শী জানোয়ারেরা।
আমি মোটেই সেই পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিক নই যাকে পশুর মত পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে মুখ লুকিয়ে। নইলে অন্য রাষ্ট্রে বস্তাবন্দি করে ঠেলে দেবে রাষ্ট্রীয় পশুরা।
সারা জীবনে অন্য দিকে তাকাবার ফুরসত পাইনি। দেখব এবার জগৎটাকে, এই বাসনা যখন সত্যিই হল তখন আমার দেহযন্ত্রগুলো একে একে জবাব দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবু নেহাৎই বেড়াতে এলাম। সেন্ট পিটার্সবার্গ নামের এক শহরে। Pradip Mahapatraর হাত ধরে।
এবং এই এয়ারপোর্টে নেমেই প্রথম ঠোক্করটা খেলাম। এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। সেখানের কাউন্টার বালিকা আমার পাসপোর্টটাকে বিশেষ রকম স্নেহের চোখে উলটে পালটে দেখল। একটা পেন্সিলের মত বস্তু দিয়ে তার পাতাগুলো ঘষাঘষি করল। অতঃপর পুরোনো ঘড়ি মেকানিকেরা যেরকম একটা লেন্স লাগানো যন্ত্র একচোখে লাগিয়ে ঘড়ির মেশিনপত্র দেখতেন হুবহু সেই রকম একটা কিছু চোখে লাগিয়ে পাসপোর্টের সব কটা পাতা চেক করল। অবশেষে মিনিট দশেক বাদে, ইঙ্গিতে বলল লাইন ক্লিয়ার। ভেতরে যাও।
আমার ঠিক পরেই লাইনে ছিল নব আর নবর বউ। ওরা রেহাই পেল না। তার পরেই আমরা দ্রুত বুঝে গেলাম, কত ধানে কত চাল।
আমাদের গ্রুপে মোট ষোলো জন। তার মধ্যে ইমিগ্রেশনে ছাড়া পেলাম মাত্রই সাতজন। বাকি নয়জনের চেহারায় নিশ্চয়ই দুষ্কৃতিছাপ ছিল। নিশ্চয় কিছু বেশিই ছিল। তাদের পাসপোর্ট এরকম কেড়ে নেওয়া হল।
শুধু আমার সহযাত্রীরাই না। এই রকমের দুর্গতি হল আরও চব্বিশ পঁচিশ জনের।
বাইরে আমরা প্রবল উৎকণ্ঠায় বসে। ঠিক চুপচাপ বসে তা নয়। ভেতরের বন্দীরা সমেত আমাদের সবারই লাগেজগুলো মুখ শুকনো করে ঘুরে চলেছে বেল্টের ওপর। আমাদেরগুলোকে চিনে নিয়ে টেনে টেনে নামানো হল।
বসে আছি… বসেই আছি। এক ঘণ্টা পেরোলো, দু আর তিনও গেল। ঘণ্টা চারেকের মাথায় মুক্তি পেল সহযাত্রীরা। ওরা বারবার জানতে চেয়েছে কেন আটকে রাখা হল। জবাব মেলেনি। দুস্তর ভাষা-ব্যবধান পেরিয়ে যা উত্তর বোঝা গেল, ডাবল চেকিংএর জন্য আটকানো হয়েছে। সেই ডাবল চেকিং ব্যাপারটা খায় না মাথায় দেয় বুঝিয়ে বলেনি।
পাসপোর্টগুলো টেবিলে অবহেলা মেখে ছড়িয়ে আছে। বিদেশি বাবু আর বিবিরা কাজ করছেন। নিজেদের মধ্যে গল্পগাছাও করছেন। পরপর আসা এরোপ্লেনের যাত্রীরা একে একে গেট পেরোচ্ছে। শুকনো মুখে শুধু বসে আমাদের সেই কজন। অন্য যাদের আটকেছে তাদের ক্লান্ত শুকনো মুখ শিশুসন্তানেরা ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকে।
কেউ কিছু চেক করছে না। অফিসের কারও কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না সে ব্যাপারে।
এর মধ্যে Dhrubaকে একটা পর্যায়ে ডেকে নিয়ে গেল একটা উঁচু পোস্টের আইনরক্ষকের ঘরে। সেখানে হাস্যকর কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। অমুক জায়গা থেকে তমুক জায়গায় যাবে। দূরত্ব কত জায়গা দুটোর? যেন এই সমস্ত মুখস্থ রাখার কথা ওর।
ব্যাগে কত রুবল রয়েছে?
ধ্রুব বলল, দুশো রুবল।
হাঃ হাঃ হাঃ, মোটে এই টাকায় রাশিয়ার মত একটা মহান দেশে বেড়াবেন।
তাকে বোঝানোই যাচ্ছে না ট্র্যাভেল এজেন্সি পুরোটা ম্যানেজ করছে। ভিসা, টিকিট, হোটেল, বুকিং গাইড সবই।
প্রবল সেই অবিশ্বাসী অফিসার ধরেই নিয়েছে পঁয়ষট্টি পেরোনো ধ্রুব হয় ইউক্রেনিয়ান সন্ত্রাসী নইলে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি, নিদেনপক্ষে নিজের দেশে খাবার সংস্থান না থাকায় এই বয়সে রাশিয়ায় এসে কাজটাজ জুটিয়ে আবার ইনিংস শুরু করতে চায় লুকিয়ে।
অবশেষে ক্লান্ত শরীরে আর ধ্বস্ত মানসিকতায় ষোলোজন পরিযায়ী সবাই মুক্ত হলাম ইমিগ্রেশন নামের ভয়াবহ অত্যাচার থেকে। একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, কাজ নেই আর নতুন দেশ দেখে। ফেরৎ যাই।
এবং পরিযায়ীদের ইতিহাস এটাই। যুগে যুগে, কালে কালে তাদের যাত্রাপথে ব্যারিকেড বসাবে কৌশলী মানুষ আর রাষ্ট্র। কখনও ছরড়া বন্দুক হাতে, কখনও রাষ্ট্রীয় এজেন্সি… পুলিশ প্রশাসন, কখনও বা ইমিগ্রেশন অফিসের অফিসার সেজে।
★









