আরও একটা পরিবেশ দিবস পার হয়ে গেল। এমন দিনগুলোর আসা যাওয়ার মাঝখানের সময়টাই হলো আমাদের সক্রিয়তার সময় অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা পরিবেশ নিয়ে কতটা কাজ করে উঠতে পারলাম তারই হিসেবনিকেশ করার কাল। এই মূহুর্তে আমাদের পরিবেশ ভাবনার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে প্লাস্টিক, হ্যাঁ কেবলই প্লাস্টিক। এ বছরের পরিবেশ দিবসের থিম ছিল – বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণের সমাপ্তি। এটা ছিল বিশ্ববাসীর কাছে এক আন্তরিক আহ্বান। দুনিয়া জুড়েই প্রয়াস চলছে যাতে করে এই সমস্যার নাগপাশ থেকে পৃথিবীকে বিমুক্ত করা যায়, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো সদর্থক বা ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে হয়না। হলেও তা নগণ্য। তবে চেষ্টা চলছে নিরন্তর। মনে রাখতে হবে যে প্রকৃতি প্লাস্টিক উৎপাদন করেনা । প্লাস্টিক মানুষের দ্বারা, মানুষের জন্য একান্তই মানুষী উপাদান।গোড়ার দিকে বোঝা যায়নি যে রাতারাতি এইটি এমন আগ্রাসী হয়ে উঠবে। প্লাস্টিক চুপিসারে আমাদের অন্দরমহলে এসে ঠাঁই নিল। আর তারপর! সে কথা তো কারোরই অজানা নয়। আমরা একরকম নিঃশব্দে প্লাস্টিকের প্রভুত্ব মেনে নিলাম।আজ আমরা সবাই যখন প্লাস্টিক থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজছি তখনই এক গপ্পো নজরে এলো আদিত্য কাকোদকর সাহেবের কলম থেকে। আসুন শুনে নিই সেই গপ্পো।
এই কাহিনির পটভূমি গোয়া। গোয়ার গপ্পো আগেও আপনাদের শুনিয়েছিলাম। আজ নতুন এক কিস্তি। এই মুহূর্তে দক্ষিণ বঙ্গের মানুষজন যখন গুমোট গরমে জেরবার, তখন দক্ষিণ গোয়ার দরজায় মৌসুমী বাতাস এসে ঠকঠকানি সবে শুরু করেছে। এমন ভরা বর্ষায় নেহাত দায়ে না পড়লে কেউই ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ওপারে যায়না, বাসুদেবও যায়নি।সে তাঁর নারকেল পাতায় ছাওয়া ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে , বহু বছরের পুরনো কিন্তু বিশ্বস্ত এক চেয়ারে বসে বসে বাইরের জল পড়ার দৃশ্য দেখছে। এই ভাঙাচোরা সাবেকি আস্তানার প্রতি তাঁর বড্ডো মায়া। এই ঘরের ছোট্ট চৌহদ্দিতে বসেই তাঁর পূর্ব পুরুষেরা বাবা, ঠাকুর বাবা, তার বাবা কত কত জাল বুনেছে। এখন বাসুদেবও সেই পরম্পরা মেনে জাল বুনছে। একমনে জাল বুনতে বুনতে ঘাড় উঁচিয়ে এক নজর বাইরে তাকায় সে। মনটা বেশ দমে যায় বাসুদেবের। সামনের নদীর জল এখনই কুল ছাপিয়ে উপচে পড়ার জোগাড়। বৃষ্টি না ধরলে আর খানিকক্ষণ পরেই হয়তো কাদাগোলা ঘোলা জল এসে হামলে পড়বে তাঁর উঠোনে।
আরও একটা দৃশ্য তাঁকে বড়ই বিচলিত করে – তাঁর পোষা ভোঁদড়ের ছোট্ট ছানাটা একটা ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের কাপ নিয়ে খেলা করছে । জলে ভেজা কালো লোমশ শরীরটা চকচক করছে ভেলভেটের মতো। মা ভোঁদড়টা আর কি করে? ইতিউতি ছোটাছুটি করে খুঁজে ফেরে কিছু খাবার। বাসুদেব জানে বৃষ্টির জলে ফুলেফেঁপে ওঠা ঐ নদীর উজানে পথ বেয়ে গড়িয়ে আসা জলে সমানে ভেসে আসবে কত শত প্লাস্টিকের উপকরণ! বাসুদেব জানে এই প্লাস্টিক ভর্তি নদী থেকে যথেষ্ট মাছ ধরা রীতিমতো কঠিন হয়ে পড়বে। দিন দিন বেড়েই চলেছে এই সমস্যা। পৃথিবী জুড়ে প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখন প্রবল হৈচৈ পড়ে গেছে তখন বাসুদেবদের গ্রামের ছোট্ট শাল নদী ভরে উঠছে কেবলই প্লাস্টিকের নানান উপকরণে। বাসুদেবের মতো মেছুয়ারা আজ নদী জলে ভেসে আসা প্লাস্টিকের কারণে ঘোর অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। নদীটা বুঝি খতম হয়ে যাচ্ছে!

বছর কয়েক আগে স্যামুয়েল আলফানসো শাল নদীর দূষণমাত্রা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তাতে তিনি দেখিয়েছেন যে নদীর দুপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হোটেলগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এসে পড়ে নদীতে যা দূষকের তালিকায় এক নম্বরে ( ২১%)। এরপরে আছে গৃহস্থালি বর্জ্য (১৬%), স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নিঃসৃত বর্জ্য ( ১৩% ) এবং প্রন হ্যাচারি থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ মিশে থাকা জল ( ৯% )। এখানেই শেষ নয়।এর পাশাপাশি রয়েছে নদীতে চলাচলকারী মোটরবোট থেকে মিশে যাওয়া বর্জ্য তেল ও খাবারের অবশিষ্টাংশ ( ৯%)
শিল্প বর্জ্য (৭% ), নদীর তীরের খোলা টয়লেটের বর্জ্য (৬%)। আলফানসোর তালিকায় আরও উৎসের উল্লেখ আছে। সেই তালিকা পড়ে মাথা ঘুরে যাবে বলে আ্য তাকে দীর্ঘতর করলাম না। নদীগর্ভ থেকে যথেচ্ছভাবে বালি তোলার ফলেও নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ ছন্দ হারিয়ে লুপ্ত হয়ে যায়। গোয়াতেও এমন ঘটনা ঘটছে। নদী নিজে নষ্ট হয়ে যায়না, আমরা তাকে নষ্ট করি নিজেদের অজ্ঞানতার কারণে। এই সমস্ত আবর্জনার কারণে নদীর জলও যে বিষাক্ত হয়ে গেছে তাই বলা বাহুল্য। তাই আজ বাসুদেবের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গ্রামীণস্তরে স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনার ভার পঞ্চায়েতগুলোর ওপর ন্যস্ত রয়েছে। রাজ্য সরকার গোটা বিষয়টির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই কাজটি ঠিকঠাক সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হয়না। গ্রাম স্তরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব থাকায় কঠিন ও তরল বর্জ্যের পৃথকীকরণের কাজ ঠিকমত করা হয়না। এমন সমস্যা সর্বত্র। স্থানীয় প্রশাসনের ওপর আরো ক্ষমতা প্রদানের কথা ভাবা হচ্ছে যাতে তারাই নিজেদের সুবিধা মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত পরিকাঠামোর গড়ে তুলতে পারে। অধিবাসীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সরকার তথা প্রশাসনের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হতে পারছেনা। বাসুদেব তবুও আশা করেন যে তাদের প্রিয় শাল নদীর জল আবার দূষণমুক্ত হবে। মাছেরা আগের মতো বেড়ে উঠবে তরতরিয়ে। নদীতে ভাসমান ট্রলার গুলো থেকে মিশে যায় বর্জ্য ডিজেল যা মাছ ও মানুষ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। এই বিষয়েও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কাজ অনেক সে কথা জানে বাসুদেব। সকলের সম্মিলিত সদিচ্ছা থাকলে আবার শাল নদী তাঁদের সমৃদ্ধ করবে এমনটাই বিশ্বাস তার এবং অন্যান্য মৎস্যজীবীদের। তাই পরিবেশ দিবসে বাসুদেব স্বপ্ন দেখে প্লাস্টিক মুক্ত নদী আর জাল ভরা মাছের। বাসুদেব কি জানেন যে এই স্বপ্ন আমাদেরও।
কৃতজ্ঞতা: ডাউন টু আর্থ পত্রিকা। গোমন্তক টাইমস্। উইকিপিডিয়া।
৮ জুন,২০২৫.
















লেখকের সঙ্গে আমাদেরও অনেক নতুন জায়গায় ঘোরা হচ্ছে,জানা হচ্ছে অনেক নতুন পরিবেশ সমস্যার কথা। পরিবেশ নিয়ে আমাদের সচেতন করতে লেখকের এই লাগাতার প্রয়াসকে কুর্ণিশ জানাই। এমন প্রচেষ্টা দীর্ঘজীবী হোক।
আমার এই সামান্য লেখালেখির সূত্রে আপনাদেরও মানস ভ্রমণের আনন্দ লাভ হচ্ছে জেনে খুশি হলাম। পাঠকের আগ্রহের ওপর লেখকের লড়াই নির্ভর করে। পরিবেশের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে দেখে ভালো লাগছে।
লেখক লাগাতার পরিবেশ রক্ষার বার্তা পৌঁছে আমাদের সচেতন করে চলেছেন।
এবার ধর্মঘটে যাবো।
ভয় লাগে। মাঝে মাঝে মনেহয় সভ্য মানুষ 5 জুন দিনটা পালন করবার যোগ্য নয়।
বাসুদেবের স্বপ্ন আমাদের ও স্বপ্ন। নদী গুলো দূষণ মুক্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাক,আর জেলেরা মনের আনন্দে জাল ভরা মাছ নিয়ে ঘরে ফিরুক।এই সুন্দর ভবিষ্যতের কল্পনা য় বেঁচে থাকতে চাই।