জ্যেষ্ঠভ্রাতার শেষকৃত্যের অব্যবহিত পরেই কুমার হর্ষবর্ধন ভগিনীকে উদ্ধারার্থ বিন্ধ্যাচলের জঙ্গলাকীর্ণ পার্বত্য প্রদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিলেন, স্বীয় রাজ্যাভিষেকের জন্য অপেক্ষা করিলেন না।
যাত্রার পূর্বে গভীর রাত্রে সমবেত রাজন্যবর্গের মধ্যে এক সংক্ষিপ্ত মন্ত্রণাসভায় স্থির হইল, হর্ষের অনুপস্থিতিতে তাত মাধবগুপ্ত রাজ্য এবং রাজধানীর পরিচালনার কার্য্যভার গ্রহণ করিবেন।
মাধবগুপ্তের অভিলাষ ছিল হর্ষবর্ধনের সহিত অন্তত পাঁচশত সশস্ত্র অশ্বারোহী প্রেরণ করিবেন, কিন্তু হর্ষ অসম্মত হইলেন।
”যে কার্যোপলক্ষে যাইতেছি, তাহাতে অধিক সৈন্যের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয় নহে। গূঢ়কার্য পণ্ড হইবার সম্ভাবনা” — তাহার পরে তিনি সেনাপতি ভণ্ডীকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন — “আপনি সুনির্বাচিত দশজন উত্তম ধানুকীকে আমার সঙ্গ লইতে নির্দেশ দিন। আরও পঞ্চাশজন অশ্বারোহী সৈনিক ধানুকীদিগকে অনুসরণ করিবে। মালবাধিপতির মৃত্যুর পরে সম্পূর্ণ বিন্ধ্যাঞ্চল নৃপতিহীন, অরক্ষিত পড়িয়া রহিয়াছে — সুসংগঠিত সম্মুখসমরের আশঙ্কা আমি করি না।”
তথাপি ভণ্ডী অনিশ্চিত স্বরে কহিলেন — “কিন্তু যুবরাজ, শশাঙ্কের উপস্থিতি সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত নহি –“
হর্ষ মৃদু হাসিলেন। রাজ্যবর্ধনের শোচনীয় হত্যার মেঘনাদ যে গৌড়েশ্বর শশাঙ্কদেব, ইহা তিনি ভ্রাতার মৃত্যুসংবাদ প্রাপ্তির ক্ষণেই অনুমান করিয়াছিলেন। পরবর্তীতে গুপ্তচরের প্রেরিত লিপি তাঁহার অনুমান অভ্রান্ত বলিয়া প্রমাণ করিয়াছে। যুবরাজ শান্তকণ্ঠে কহিলেন –“পররাজ্যের মহাবলী রাজাকে হীন কৌশলে হত্যা করাইয়া গৌড়াধিপতি কোনও অপ্রকাশ্য স্থানে আত্মগোপন করিয়াছেন। তিনি বিজ্ঞ নৃপতি, এই কাপুরুষোচিত কার্যের পরে বর্তমান পরিস্থিতিতে যে অন্তরালে লুক্কায়িত থাকাই বিধেয়, তাহা তিনি নিশ্চিতরূপে অবগত আছেন।”
ভণ্ডী আশ্বস্ত হইতে পারিতেছেন না দেখিয়া হর্ষ এক্ষণে তাঁহার কণ্ঠে অপ্রত্যাশিত কাঠিন্য আনিয়া বলিলেন — ”সেনাপতি, আপনি স্বয়ং দশসহস্র বীর পুষ্যভূতি সৈন্য লইয়া আমার সঙ্গী ঐ পঞ্চাশজন অশ্বারোহীর পশ্চাতে থাকিবেন — গৌড়-বাহিনী আক্রমণ করিলে, যুদ্ধান্তে তাহাদের আর স্বদেশে প্রত্যাগমনের ক্ষমতা থাকিবে না।”
ভবিষ্যৎ রাজার এইরূপ দৃঢ় বচন শ্রবণ করিয়া ভণ্ডীর মুখের অন্ধকার কথঞ্চিৎ দূরীভূত হইল।
পরদিন ঊষাকালে হর্ষ স্থানীশ্বর হইতে দক্ষিণদিকে বিন্ধ্য পর্বতের সানুদেশে মালবরাজ্যের সীমানা বরাবর আপন অশ্ব ছুটাইয়া দিলেন। দশজন অব্যর্থ শরক্ষেপণকারী সৈনিক ও পঞ্চাশজন অশ্বারূঢ় সেনানী তাঁহার অনুগামী হইল।
পুষ্যভূতির যে জয়স্কন্ধাবারে রাজ্যবর্ধনের শোচনীয় নিধন সংঘটিত হইয়াছিল, হর্ষ সেই স্থান হইতে আপন অনুসন্ধানকার্য আরম্ভ করিবেন বলিয়া মনস্থ করিয়াছিলেন।
অশ্বপৃষ্ঠে স্থানীশ্বর হইতে মালবের পর্বতসঙ্কুল বনাঞ্চলে পৌঁছিতে হর্ষের তিনটি পূর্ণ দিবস ব্যয় হইয়া গেল।
এই স্থলে লোকালয়ের অস্তিত্ব নাই বলিলেই চলে। বনমধ্যে ইতস্তত কিছু নিষাদ পরিবারের বাস — পুনঃপুনঃ জিজ্ঞাসাবাদের পরেও তাহারা দেবী রাজ্যশ্রীর অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনও আলোকপাত করিতে অপারগ হইল।
হতাশ হইয়া হর্ষ আপনার ক্ষুদ্র বাহিনীকে পশ্চিমাস্য চালনা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।
পরদিনও নিরাশ অনুসন্ধানে রিক্তহস্তে কাটিয়া গেল। বেলা তৃতীয় প্রহরে ক্ষুৎপিপাসায় ক্লান্ত সৈন্যদল যখন একটি জলাশয় ও কিঞ্চিৎ শ্যামল তরুচ্ছায়ার সন্ধান করিয়া ফিরিতেছে, দূরে দিগন্তরেখার নিকটে একটি একাকী বৃক্ষের তলে কোনও লোহিতবর্ণের বস্তু বাহিনীর অগ্রবর্তী দলপতি হর্ষবর্ধনের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। রক্তিম বস্তুটি কি কোনও বস্ত্রখণ্ড? তাহা কি রাজ্যশ্রীর? ঐ স্থানেই কি তাঁহার প্রিয় ভগিনী পড়িয়া আছেন? আবেগের তাড়নায় হর্ষবর্ধন দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া উক্ত তরুতল লক্ষ্য করিয়া দ্রুত ধাবিত হইলেন।
ইতোমধ্যে বর্ণময় বস্তুটি সকলেরই দৃষ্টিগোচর হইয়াছিল। ফলে সঙ্গীরাও নূতন উদ্যমে তাঁহাকে অনুসরণ করিল।
অকুস্থলে পৌঁছাইয়া হর্ষ দেখিলেন, তাঁহার ভ্রম হয় নাই, বৃক্ষতলে শায়িতা এক নারীই বটে — রক্তবর্ণের পরিধেয়টি তাহারই। কিন্তু এ কে? এ তো তাঁহার ভগিনী রাজ্যশ্রী নহে। অনাহারে শীর্ণ দেহ, কোটরগত চক্ষু, মুমূর্ষু, বয়স্কা এই নারী তাঁহার অপরিচিতা। তথাপি হর্ষ অশ্ব হইতে অবতরণপূর্বক তাহার নিকটে গেলেন। কয়েকজন অশ্বারোহীও তাঁহার সঙ্গী হইল।
একসঙ্গে বহু অশ্বক্ষুরধ্বনি কর্ণগোচর হইবার ফলে মুমূর্ষু রমণী অতি আয়াসে চক্ষু উন্মীলন করিল।
হর্ষ সাগ্রহে তাহার মুখের নিকট মুখ লইয়া গিয়া প্রশ্ন করিলেন — ”তুমি কে? এইখানে কেমন করিয়া আসিলে?”
রমণীকে নিরুত্তর দেখিয়া তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন — “তোমার বস্ত্র দেখিয়া অনুমান করিতেছি তুমি বন্য ব্যাধ শ্রেণীর কেহ নহ — দয়া করিয়া আপন পরিচয় প্রদান করো। তোমার ভীত হইবার কোনও কারণ নাই। আমি পুষ্যভূতি রাজকুমার হর্ষবর্ধন — নিরুদ্দিষ্টা ভগিনীর সন্ধান করিয়া ফিরিতেছি। তুমি কি তাঁহাকে দেখিয়াছ? বলো ভদ্রে, তুমি কি দেবী রাজ্যশ্রীকে কোথাও দেখিয়াছ?” — অবরুদ্ধ আবেগে হর্ষের কণ্ঠস্বর কম্পমান হইল, নয়ন অশ্রুসজল হইয়া উঠিল, তিনি রমণীকে পুনর্বার প্রশ্ন করিতে উদ্যত হইলেন।
কিন্তু প্রশ্নের আর প্রয়োজন হইল না। রাজ্যশ্রীর নাম শ্রবণ করিয়া রমণীর চক্ষু উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, দেহে অপরিসীম বলসঞ্চারের অমানুষিক চেষ্টায় সে বৃক্ষমূলে শায়িত অবস্থা হইতে উপবেশনে প্রবৃত্ত হইল, কিন্তু সফল হইল না। হর্ষের ইঙ্গিতে এক সেনানী তাহাকে পানীয় জল আনিয়া দিলে সে চাতকের ন্যায় জলটুকু পান করিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিল — জল তাহার গণ্ড বাহিয়া পড়িয়া গেল, মুমূর্ষুর তৃষ্ণা নিবারণে সক্ষম হইল না। ক্লান্ত রমণী অবশেষে জড়িতস্বরে বলিল — “দেবী রাজ্যশ্রী? আহা, ঈশ্বর তাঁহার মঙ্গল করুন। আজ হইতে আনুমানিক এক সপ্তাহ পূর্বে আমি তাঁহাকে মালবরাজের কারাগার হইতে মুক্ত করিয়া বিন্ধ্য পর্বতের সানুদেশে পৌঁছাইয়া দিয়া আসিয়াছিলাম। মহাকালের আশীর্বাদধন্যা দেবী এতদিনে নিশ্চিত বিপদ জয় করিয়া নিজরাজ্যে প্রবেশ করিতে সমর্থ হইয়াছেন।” — মরণ নারীর শিয়রে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, কয়টি মাত্র বাক্যকথনেই অপরিসীম ক্লান্তি তাহাকে গ্রাস করিল, সে নীরব হইল।
হর্ষ ঋজুদেহে উঠিয়া দাঁড়াইলেন, তাঁহার মনে প্রবল আশার সঞ্চার হইল — প্রাণাধিক প্রিয় ভগিনী অবশ্যই জীবিত রহিয়াছেন, তাঁহার অবচেতন কহিতেছে অবিলম্বে তিনি সহোদরার সাক্ষাৎ পাইবেন।
তিনি শায়িতা রমণীকে নির্দেশ করিয়া আপন সৈন্যদিগের উদ্দেশ্যে বলিয়া উঠিলেন — “এই রমণী সত্য বলিতেছে বলিয়াই আমার বিশ্বাস। ইহার অর্থ জ্যেষ্ঠভ্রাতার হস্তে দেবগুপ্তের নিধনের পূর্বেই ইহার সাহায্যে রাজ্যশ্রী বন্দিদশা হইতে মুক্ত হইতে সক্ষম হইয়াছিলেন।”
রমণীর নিমীলিত চক্ষু সহসা খুলিয়া গেল, সে পূর্ণদৃষ্টিতে হর্ষের দিকে চাহিয়া অপেক্ষাকৃত স্পষ্টস্বরে কহিল — “কি বলিলেন? দেবগুপ্ত নিহত? মালবরাজ দেবগুপ্ত আর ইহলোকে নাই?”
হর্ষের উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই তাহার বক্ষ নিষ্পেষিত করিয়া একটি সুদীর্ঘ শ্বাস বাহির হইয়া আসিল, দিবাবসানে নতমুখী সূর্যমুখী পুষ্পদলের তুল্য হতভাগিনী লক্ষ্মীর নয়নপল্লব চিরতরে মুদিত হইয়া গেল।
হর্ষের আদেশে পাঁচজন সৈনিক সেই বৃক্ষতলে মালব-প্রতীহারিণী লক্ষ্মীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উদযোগে প্রবৃত্ত হইল। অবশিষ্ট অনুগামী লইয়া তিনি লক্ষ্মীর উল্লিখিত পর্বত সানুদেশের উদ্দেশ্যে নূতন মনোবল লইয়া যাত্রা করিলেন।
মালব ও পুষ্যভূতি রাজ্যের সীমানায় অবস্থিত খর্বাকৃতি রামা পর্বত হইতে দ্বাদশ ক্রোশ উত্তরে ময়ূরকূট বিহার নামাঙ্কিত একটি ক্ষুদ্র সঙ্ঘারাম অবস্থিত ছিল। আচার্য দিবাকরমিত্রের অধীনে কতিপয় শ্রমণ তাঁহার নিকট ধর্মশিক্ষা এবং বুদ্ধের অষ্টাঙ্গিক মার্গচর্চায় কালযাপন করিত।
এক প্রসন্ন প্রভাতে ময়ূরকূট সঙ্ঘারামের প্রাঙ্গণে একটি পীঠিকার উপরে উপবিষ্ট দিবাকরমিত্র তাঁহার ছাত্রদিগকে জাতককথা শুনাইতেছিলেন। এমন সময়ে একটি নবীন শ্রমণ ছুটিতে ছুটিতে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করিয়া দিবাকরমিত্রের সমীপে আসিয়া মূর্ছিতের ন্যায় তাঁহার পদতলে পতিত হইল। শশব্যস্ত আচার্য অন্যান্য সন্ন্যাসীগণের সহায়তায় তাহাকে হস্তধারণপূর্বক উত্তোলিত করিয়া জলপান করাইবার অবকাশে সে কথঞ্চিৎ সুস্থ বোধ করিল। ইহার পরে সেই নবীন শ্রমণ সর্বসমক্ষে এক আশ্চর্য ঘটনা বিবৃত করিল।
সে স্খলিত স্বরে অসংলগ্নভাবে বলিতে লাগিল — “আমি বনমধ্যে ইন্ধন সংগ্রহকালে তাঁহাকে দেখিলাম — তাঁহার চরণ যেন মৃত্তিকা স্পর্শ করিতেছে না — তাঁহার বস্ত্র ছিন্ন, অঙ্গ ক্লেদাক্ত, তথাপি তিনি যেন অপরূপ জ্যোতির আকর — আমার সম্মুখ দিয়া তিনি যেন ভাসিয়া চলিয়া গেলেন, সম্মুখে দণ্ডায়মান আমাকে তিনি দেখিতে পাইলেন না।
থের, আমি নিশ্চিত, তিনি কোনও বনদেবী হইবেন — বুদ্ধের কৃপায় আমি আজ তাঁহার দর্শন পাইলাম –” নবীন সন্ন্যাসীর বাক্যস্রোতে ছেদ পড়িল।
সঙ্ঘারাম-প্রাঙ্গণের অতি নিকটে সহসা বহু অস্ত্রের ঝনঝন ও অশ্বের হ্রেষাধ্বনি শ্রুতিগোচর হইল।
দিবাকরমিত্র চমকিত হইয়া দেখিলেন, বিহারের দ্বারপ্রান্তে এক নবীন রাজপুরুষ অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া প্রাঙ্গণভ্যন্তরে প্রবেশ করিতেছেন। তাঁহার নিকটস্থ হইয়া যুবাপুরুষ আপন উষ্ণীষ উন্মোচন করিয়া যুক্তকরে, অবনত মস্তকে আচার্যকে অভিবাদন করিয়া কহিলেন — “বন্দে”।
যুবককে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে লক্ষ্য করিতে করিতে দিবাকরমিত্রের মুখাবয়ব উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তিনি আগন্তুককে চিনিতে পারিয়া সহর্ষে বলিয়া উঠিলেন — “আরোগ্য। যুবরাজ হর্ষবর্ধন, ময়ূরকূট বিহারে আপনাকে স্বাগত! আশা করি, সকল সমাচার কুশল রহিয়াছে।”
স্থানীশ্বর হইতে এই ক্ষুদ্র সঙ্ঘারামটির দূরত্ব এবং দুর্গমতা হেতু রাজধানীর সকল সমাচার এই স্থানে পৌঁছিতে যথেষ্ট বিলম্ব হইত। প্রভাকরবর্ধন ও যশোমতীর প্রয়াণ এবং রাজ্যবর্ধনের নিধন সম্পর্কে কোনও সংবাদই ভিক্ষুগণের কর্ণগোচর হয় নাই।
দিবাকরমিত্রকে সকল ঘটনা বিবৃত করিতে করিতে হর্ষের মুখশ্রী পুনরায় বিষাদাচ্ছন্ন হইল।
সকল বিবরণ শুনিয়া দিবাকরমিত্র কোমলস্বরে কহিলেন — ”অধিক চিন্তান্বিত হইবার কারণ নাই কুমার। আমার বিশ্বাস দেবী রাজ্যশ্রী নিকটেই অবস্থান করিতেছেন।”
তিনি বনমধ্যে কাষ্ঠ আহরণকারী নবীন সন্ন্যাসীর অভিজ্ঞতা হর্ষকে শুনাইলেন। শুনিয়া হর্ষ অত্যধিক চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। নবীন শ্রমণের নিকট সেই অপরিচিতা ‘বনদেবী’র অবস্থানের দিকনির্দেশ গ্রহণ করিয়া তিনি সৈন্যসমভিব্যাহারে গভীর বনমধ্যে প্রবেশ করিলেন।
দূরাগত গুরুগুরু শব্দে চকিত হইয়া দিবাকরমিত্র ঊর্দ্ধে চাহিয়া দেখিলেন, অকস্মাৎ চতুর্দিক ঘোর অন্ধকার করিয়া গগন মেঘাচ্ছন্ন হইয়াছে। মেঘের কজ্জলবর্ণ অঞ্চলের প্রান্তে ক্ষণপ্রভার ক্ষণিক আলোকচ্ছটার বিচ্ছুরণ লক্ষিত হইতেছে। উন্মুক্ত প্রান্তরে বাতাসের ঘূর্ণি উঠিয়াছে। বনের বৃক্ষরাজির শাখা প্রবলবেগে আন্দোলিত হইতে আরম্ভ করিয়াছে। আচার্য শঙ্কিত হইলেন — যুবরাজ কি তাঁহার ভগিনীকে সুস্থ, অক্ষতদেহে ফিরিয়া পাইবেন? নীরব প্রার্থনায় তাঁহার ওষ্ঠাধর কম্পিত হইল। ‘তথাগত, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।’
নবীন শ্রমণ বর্ণিত পথে কিয়ৎকাল গমন করিয়া সহসা হর্ষ-বাহিনীর গতিরোধ হইল। নিবিড় বৃক্ষরাজির শাখা ও পল্লবের ব্যবধানে একটি অপেক্ষাকৃত অনাবৃত ভূমি তাঁহাদের দৃষ্টিগোচর হইল। সেই ভূমির মধ্যবর্তী স্থলে একটি অগ্নিকুণ্ড রচিত হইয়াছে। আকাশে আকস্মিক মেঘাড়ম্বরের ফলে জঙ্গলের অভ্যন্তর ঘোর হইয়া আসিয়াছে, হর্ষের চক্ষে অগ্নির লেলিহান শিখা তাই অধিক দীপ্তিময় বলিয়া প্রতিভাত হইল।
তিনি সভয়ে লক্ষ্য করিলেন, অগ্নিকুণ্ডের পার্শ্বে একটি তরুণী দণ্ডায়মান রহিয়াছে। তাহার অভিপ্রায় স্পষ্ট — সে ঐ প্রজ্বলিত বহ্নিশিখামধ্যে আপনাকে সমর্পণ করিয়া আত্মঘাতী হইবার উদ্যোগ করিতেছে। তরুণী অপর কেহ নহে, তাঁহারই প্রাণপুত্তলি সহোদরা, যশোমতীনন্দিনী রাজ্যশ্রী।
হর্ষ অস্ফুট চিৎকার করিয়া সেই অগ্নিকুণ্ডের পানে ধাবিত হইলেন।
রাজ্যশ্রীর আত্মাহুতির পূর্বমুহূর্তে কুমার ভগিনীর হস্তধারণ করিয়া ফেলিতে সক্ষম হইলেন। তাঁহাকে সবলে আপনার দিকে আকর্ষণ করিয়া হর্ষ আকুলস্বরে তাঁহাকে সম্বোধন করিলেন — ”রাজ্যশ্রী, ভগিনী আমার, তুমি কি আমাকে চিনিতে পারিতেছ না? আমি তোমার ভ্রাতা, হর্ষবর্ধন — তোমার অনুসন্ধান উদ্দেশ্যে স্থানীশ্বর হইতে বহু স্থান পরিক্রমণ করিয়া সৌভাগ্যক্রমে এইখানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি — তুমি এ কোন সর্বনাশা কর্মে প্রবৃত্ত হইবার উদযোগ করিতেছিলে রাজ্যশ্রী?”
বারম্বার একই প্রশ্নে রাজ্যশ্রীর বিহ্বলতা কিঞ্চিৎ অপসৃত হইল, তিনি যেন তাঁহার পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে সচেতন হইয়া লুপ্ত বাহ্যজ্ঞান ফিরিয়া পাইলেন। এক্ষণে তিনি তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান ভ্রাতার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্যকরূপে অবহিত হইলেন। রাজ্যশ্রীর প্রতীতি হইল, যে অপরূপ তরুণ তাঁহার হস্ত ধরিয়া ব্যাকুল নয়নে তাঁহার মুখপানে চাহিয়া রহিয়াছেন, তিনি সত্যই তাঁহার ভ্রাতা হর্ষ — ইহাতে কোনও ভ্রান্তির অবকাশ নাই। বিগত কয়েক দিবসের দুঃসহ মনোবেদনা, ক্লেশ, উৎকণ্ঠা সমস্ত কিছু অশ্রুবারিধারায় ভাসিয়া গেল।
নির্বাপিত অগ্নিকুণ্ডের সম্মুখে অনাথ, ভাগ্যপীড়িত ভ্রাতা-ভগিনী রোরুদ্যমান অবস্থায় দুইটি অসহায় বালক-বালিকার ন্যায় পরস্পরের গললগ্ন হইলেন।
বিন্ধ্যাঞ্চলের জনবিরল, দুর্গম অরণ্যে, বিদ্যুল্লেখার চকিত কটাক্ষের সহিত জলদগম্ভীর ডম্বরুনিনাদের সুচারু সঙ্গতে, প্রবল ধারাবর্ষণের আবহে সুজলা ধরণী তখন উৎসবমত্তা হইয়াছে।
(ক্রমশ)









