মার্চ ১৩, ২০২৬
সারা ভারতবর্ষের মানুষ জানেন যে বিহার-সহ দেশের মোট ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকার যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা Special Intensive Revision (SIR) করা হচ্ছে গত জুন, ২০২৫ থেকে, তার মধ্যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশ ছাড়া বাকি ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ঘোষণা হয়েছে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল হয়েছে বাকি সবার থেকে আলাদা। বাকি প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই পশ্চিমবঙ্গের থেকে বেশী হারে মৃত, স্থানান্তরিত, নিখোঁজ বাদ হয়ে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনের বয়ান অনুযায়ী এরপরে এই ১১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পশ্চিমবঙ্গের মতই Unmapped বা Logical Discrepancy ধরে শুনানির আয়োজনও করা হয়েছে। দেখা গেছে এর মধ্যে গোয়া ছাড়া সব রাজ্যেই চূড়ান্ত তালিকায় খসড়া তালিকার তুলনায় ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ নথিতে সন্তুষ্ট না হওয়ার কারণে অতি সামান্য নাম বাদ গেছে এবং তার চেয়ে অনেক বেশী সংখ্যায় ভোটার ফর্ম-৬ জমা করে নিজের নাম নতুন করে যুক্ত করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারির প্রাথমিক হিসেবেই ৫.৪৬ লক্ষ মানুষের নাম শুনানির এবং মূলতঃ বিজেপির অভিযোগের মাধ্যমে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর তুলনায় মাত্র ১.৮২ লক্ষ নাগরিক নতুন করে যুক্ত হয়েছেন, অর্থাৎ ভোটার সংখ্যা প্রাথমিকভাবেই কমে গেছে ৩.৬৪ লক্ষ, যা অভূতপূর্ব। এছাড়াও গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৬০ লক্ষাধিক ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের নথি যাচাই করাই হয়ে ওঠেনি জেনে সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার উভয়ের প্রতিই অনাস্থা প্রকাশ করেছেন, এবং এই নথি যাচাইয়ের কাজ নজিরবিহীনভাবে বিচারব্যবস্থার কাঁধে তুলে দিয়েছেন, এবং এই ৬০ লক্ষ অনিশ্চিত ভোটারকে বর্তমানে দেখানো আছে এক সম্পূর্ণ নতুন ‘বিচারাধীন’ (Under Adjudication) ক্যাটেগরিতে যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। বলাই বাহুল্য সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত একইসাথে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্বপালনে ব্যর্থতা এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ত্রুটিমুক্ত ভোটারতালিকা তৈরি ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করার যোগ্যতা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়, উপরন্তু সমস্ত দায়িত্ব ও বিশ্বাস অভাবনীয়ভাবে একমাত্র বিচারবিভাগের হাতেই ন্যস্ত করে। আরও একবার খেয়াল করা প্রয়োজন যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই এইরকম নজিরবিহীনভাবে ৫.৪৬ লক্ষ ‘অযোগ্য, বাতিল’ ভোটার এবং ৬০ লক্ষাধিক ‘বিচারাধীন’-সহ সাড়ে ৬৫ লক্ষ জীবিত, সুস্থ, এবং ঠিকানায় উপস্থিত ভোটার (খসড়া তালিকার ৯%) অস্তিত্বর সঙ্কটে পড়ে রয়েছেন, যা একমাত্র বিজেপি-আর এস এসের বহুকালের ‘ঘুসপেটিয়া’তত্ত্বকে মান্যতা দেওয়ার কাজটিই করে মাত্র।
এই অবস্থায় গত ১০ই মার্চ, কলকাতা উচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছেন যে ৯ই মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১০.১৬ লক্ষ এমন ‘বিচারাধীন’ ভোটারের বিষয়ে ওরা সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছেন, কাজেই ৭০০ জন বিচারব্যবস্থার সাথে যুক্ত আধিকারিক আগামী কতদিনে বাকি প্রায় ৫০ লক্ষ ‘বিচারাধীন’-এর বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন সেই ভাবনা দুশ্চিন্তার উদ্রেক করে। যদি আগামী ৩১শে মার্চের মধ্যেও এই কাজ শেষ করতে হয় তাহলেও ৭০০ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের প্রত্যেককে প্রতিদিন ৩০০টির বেশী বিচারাধীন কেসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উপরন্তু ১০ই মার্চ আইনজীবী গোপালশঙ্কর নারায়ণন কোর্টে উল্লেখ করেছেন যে ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত করা ১০ লক্ষের মধ্যে ৪ লক্ষ বাতিল হয়েছে। যদি আইনজীবীদের এই বক্তব্য সত্য হয় সেক্ষেত্রে এই হারে মোট ৬০ লক্ষের মধ্যে আনুমানিক ২৪ লক্ষ ভোটার বাতিল হতে পারেন। এবার বাতিল হওয়া ভোটাধিকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিচারের আবেদনের জন্য সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে কোন প্রশাসনিক বা দায়িত্বনির্বাহী অফিসার নন, একমাত্র বিচারপতিদের (কলকাতা ও পড়শি রাজ্যের উচ্চ আদালতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতি) নিয়ে তৈরি ট্রাইব্যুনালই এই পুনর্বিচারের কাজ করবেন। এই সিদ্ধান্তটির অর্থ বোঝা দায়! জুডিশিয়াল অফিসারেরা বিচার করে নাম বাদ দিলে আবার নাম তোলার আবেদন উক্ত ট্রাইবুন্যাল কি করেই বা বিচার করবেন যেহেতু এই ট্রাইবুন্যাল কোনও উচ্চ আদালতও নয়। আর যে নথি না থাকার কারণে বিচারাধীনরা বাদ যাবেন, সেই নথি নতুন করে গ্রাম বাংলার প্রান্তিক মানুষের পক্ষে কীভাবেই বা জোগাড় করা সম্ভব? কাজেই নিশ্চিতভাবেই সংশয় হয় যে কিভাবে বাংলার গ্রামের প্রায় নিরক্ষর মানুষ ‘বাতিল’ প্রতিপন্ন হলে ট্রাইব্যুনালের কাছে পৌঁছবেন আর কত দ্রুততায় ট্রাইব্যুনাল এই সমস্যার সমাধান করবেন? ফলে এই প্রায় অসম্ভব কাজ অস্বাভাবিক দ্রুততায় সম্পূর্ণ করার ও ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত করার ‘তথাকথিত’ চেষ্টায় বহু নাগরিক তাদের সাংবিধানিক অধিকারই হারিয়ে ফেলবেন এটা এখন একটি বাস্তব সম্ভাবনা, এবং সেটা ঘটলে তা হবে সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের অবমাননা এবং নিতান্তই একটি ঘৃণ্য রাজনৈতিক চক্রান্ত। যে সমস্ত ভোটারেরা ‘পরীক্ষায় পাশ’ করেছেন তাদের তালিকা অজস্র ভুলে ভরা তা ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। এদিকে এই সংশয়ের সাথে যুক্ত হয় নতুন সংশয় – কেন এত সমস্যা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসকদল বিচারবিভাগের ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের দায়িত্ব একতরফা নিজেদের হাতে তুলে নেওয়াকে নিজেদের জয় বলে প্রচার করে প্রতিবাদ থেকে সরে আসছেন? যেমন গ্রামবাংলার অজস্র শঙ্কিত ‘বিচারাধীন’ ভোটারকে এখন ওরা বোঝাচ্ছেন যে সব ওরা দেখে নেবেন, তেমনভাবেই কি এই লক্ষ লক্ষ মানুষের ট্রাইব্যুনালের কাছে পৌঁছনো ও সময়ের মধ্যে বিচার পাওয়ার দায়িত্বও কি ওরাই নিজেদের কাঁধে নিচ্ছেন? প্রশ্ন ওঠা অবশ্যম্ভাবী।
ফলতঃ এত অনিশ্চয়তার আবহে সংগ্রামী গণমঞ্চ আবার কলকাতা উচ্চ আদালতের কাছে পেশ করা দাবিসনদ অনুযায়ী একই দাবি তুলছে অর্থাৎ এই সংশোধনের কাজ আগামী ভোটের আগে ত্রুটিমুক্তভাবে করা যেহেতু কার্যতঃ অসম্ভব এবং ফলতঃ বহু নাগরিক নিজেদের সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকার হারাতে পারেন, সেহেতু আগামী নির্বাচন গত ১৬ই ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া তালিকার ওপরেই করা হোক এবং খসড়া তালিকায় নাম থাকা প্রতি ভোটারের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় অন্যায্যভাবে বিজেপি-আর এস এসের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থে, এবং সরকার ও কমিশনের মিলিত ব্যর্থতা্ বাংলার অজস্র মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে একটি অনৈতিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কলঙ্ক এদেশের গণতন্ত্রের গায়ে লেগে যাবে। সংগ্রামী গণমঞ্চ তাই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এর বিরোধিতা করছে।









