প্রথমে আমাদের উপমহাদেশের দক্ষিণে ভারত সংলগ্ন ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার কথা বলি। মূলতঃ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্র হলেও হিংসা এখানে কম ঘটেনি। মার্কসবাদী ট্রটস্কিপন্থী ‘ জনথা ভিমুক্তি পেরামুনা (JVP) ‘ – র নেতৃত্বে ১৯৭১ ও ১৯৮৭ – ‘৮৯ তে দুটি সশস্ত্র উত্থান হয় যেগুলিকে শ্রীলঙ্কা সরকার সেনা বাহিনী এবং ভারত সহ মিত্র রাষ্ট্রগুলির সাহায্যে নির্মমভাবে দমন করে। রোহানা ওয়াজিউইরা সহ JVP নেতা কর্মীদের এক বড় অংশ কে হত্যা করা হয়। ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ অবধি চলা LTTE এর সঙ্গে শ্রীলঙ্কা সরকারের ভয়ঙ্কর যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এতদসত্ত্বেও শ্রীলঙ্কার শিক্ষার হার ৯২.৩% এবং Human Development Index ০.৭৭৬ যা ১৯৩ টি দেশের মধ্যে ৭৮ তম এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে।
সেই শ্রীলঙ্কায় ২০২২ এ এক গণউত্থান ঘটে স্বৈরাচারী দুর্নীতিগ্রস্ত পারিবারিক রাজাপাক্ষে শাসনের অবসান হল। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল ২০১৯ এ গড়ে ওঠা ‘ জাথিকা জন বালায়েগায়া (National People’s Power বা NPP) ‘। ততদিনে গণ আন্দোলন ও সংসদীয় রাজনীতিতে পরিবর্তিত JVP সহযোগী ২১ টি সংগঠনকে নিয়ে NPP তৈরি করে ফেলেছে। এর পর ২০২৪ এর ২১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হল। ৩৯ জন প্রার্থী যাদের মধ্যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি রনিল বিক্রমসিংঘে, প্রাক্তন দুই প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি র পুত্র সাজিথ প্রেমাদাসা ও নামাল রাজাপাক্ষে প্রমুখ সব হেভিওয়েট প্রার্থীরা ছিলেন। তাদের সবাইকে হারিয়ে প্রথমবার ৪২% ও দ্বিতীয়বার ৫৬% ভোট পেয়ে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন ৫৭ বছর বয়সী NPP ও JVP নেতা অনুরা কুমারা দিশানায়কা।
৭৯.৪৬% ভোট পড়ল এবং একদম শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। ঐ বছরেই ১৪ নভেম্বর সংসদ নির্বাচন হল শান্তিপূর্ণভাবে। ভোটের হার ৬৮.৯৩%। ২২৫ টি আসনের মধ্যে দিশানায়কার নেতৃত্বে NPP ৬১.৫৬% ভোট পেয়ে ১৫৯ টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গড়ল। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন ৫৬ বছর বয়সী হরিণী আমারাসুরিয়া। নির্বাচনগুলি ছিল সর্বজনীন (Universal)।
এবার বাংলাদেশের কথায় আসি। ২০২৪ এর আগস্ট অনুষ্ঠিত জুলাই বিপ্লবের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূস এবং জামাত, হেফাজতে প্রমুখ ইসলামি মৌলবাদী সন্ত্রাসবাদীদের প্ররোচনায় কি সাংঘাতিক হিংসা, নৈরাজ্য, অরাজকতা চলছিল সেখানে সকলে জানেন। আওয়ামী লীগ সহ বিরোধী রাজনৈতিক দল, প্রতিবাদী, হিন্দু, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান, জনজাতি, বাউল – ফকির, শিল্পী, সাংবাদিক, নারীর উপর যা অবর্ণনীয় অত্যাচার হয়েছে তা ১৯৭১ এর মুক্তি যুদ্ধের সময়কার খান সেনা – জামাত – রাজাকার দের নারকীয় অত্যাচারের কথা মনে করায়। ধর্ষণ, খুন করে উল্টোদিক করে ঝুলিয়ে দেওয়া, পুলিশকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, জেল ভাঙ্গা, লুঠপাট কি না ঘটেছে! তার সঙ্গে তীব্র ভারত বিরোধিতা। ইউনুস বারবার নির্বাচন পিছিয়ে দিয়েছেন।
অবশেষে অনেক ঘটনার পর প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল সেখানে কিছু বিক্ষিপ্ত হিংসা ছাড়া শান্তি বজায় ছিল এবং সাধারণ মানুষ বেশিরভাগ কেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন। ভোট ছিল সর্বজনীন এবং ভোটের হার ৫৯.৪৪%। জাতীয় সংসদের ৩৫০ টি আসনের মধ্যে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পুত্র ৫৬ বছর বয়সী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘ বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (BNP) ‘ জোট ২১২ টি আসনে জয়লাভ করল। এর মধ্যে BNP একাই ২০৯ টি আসনে জয়ী এবং প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৯.৯৭ %। তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন।
এরপর নেপাল। সেখানে প্রচলিত শাসন প্রণালী এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাদের প্রতি ক্ষোভ Gen Z এর আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ফেটে পড়েছিল। সেই অশান্ত নেপালে ৫ মার্চ ২০২৬ এ শান্তিপূর্ণভাবে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। সর্বজনীন নির্বাচনে ভোট দানের হার ৫৯.৪৪ %। ২৭৫ টি আসনের মধ্যে ২০২২ এ রবি লামিছানে প্রতিষ্ঠিত ‘ রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (RSP) ‘ Nepali Congress, CPN UML, NCP প্রমুখ প্রাতিষ্ঠানিক দলগুলিকে অনেক পিছনে ফেলে ১৮২ টি আসনে বিজয়ী হল। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন ৩৫ বছর বয়সী কাঠমাণ্ডুর মেয়র বলেন্দ্র শাহ।
আর আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহার যার নির্বাচনে হিংসা নিয়ে প্রচণ্ড দুর্নাম ছিল নীতিশ কুমারের আগমনের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচন সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য কৃতিত্ব অর্জন করেছে। সেখানকার আইন শৃঙ্খলারও যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে। সেইসঙ্গে ঘটেছে পরিকাঠামোর উন্নতি। ‘ এস আই আর ‘ নিয়ে চাপানউতোরের মধ্যেও সেখানে গত বছর নির্বিঘ্নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল।
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগা পশ্চিমবঙ্গ! এখানে নির্বাচনে ধারাবাহিক হিংসা, অশান্তি, মারামারি, খুন, গুলি – বোমাবাজি, বিরোধীদের উপর তাণ্ডব, ভোট লুঠ, রিগিং এর বিরাম নেই। দুটি ক্ষণস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার বাদ দিয়ে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ অবধি পশ্চিমবঙ্গবাসী ৩০ বছরের কংগ্রেসের শাসন দেখেছে। দেখেছে বন্দুকের নল উচিয়ে ১৯৭২ এর নির্বাচন ও ছাপ্পা ভোট। ব্যাপক গণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ১৯৭৭ এ বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গবাসী আশ্চর্য হয়ে দেখে যান ২০১১ অবধি ৩৪ বছরে প্রতিটি নির্বাচনে একদিকে সায়েন্টিফিক রিগিং, অন্যদিকে হাড় হিম করা সন্ত্রাসের সমন্বয়। ব্যাপক গণসমর্থনের মধ্যে দিয়ে ২০১১ তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে। তারপর থেকে একটিও নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গবাসীর দেখার সৌভাগ্য হল না যেখানে লাগামহীন সন্ত্রাস অনুপস্থিত। তার উপর বিজেপি নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ‘ এস আই আর ‘ এর নামে সংযোজন ঘটিয়েছে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার হরণ।
‘ এস আই আর ‘ এর অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে, চলুক। কিন্তু নির্বাচন কেন শান্তিতে হবে না? কেন প্রতিটি নাগরিক নির্বিঘ্নে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না? কেন নির্বাচনে বোমা পড়বে, গুলি চলবে, খুন হবে, বিরোধীদের ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হবে? বিরোধী দলের এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দিয়ে পুলিশ আর কেন্দ্র বাহিনীর সামনে ছাপ্পা ভোটের উৎসব হবে? কেন ভোট বাক্স পাল্টে দেওয়া হবে? কেন গণনায় কারচুপি হবে? কেন বাইক বাহিনী ও সশস্ত্র সমাজবিরোধীরা এলাকায় দাপিয়ে বেড়াবে? কেন রাজনৈতিক দলগুলি জনতার রায় মেনে নেবে না?
প্রতিবেশীদের দেখে কি আমরা কিছুই শিখবো না? সন্ত্রাস ও হিংসার এই কদর্য পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে শাসক, বিরোধী সব দলকেই সৎ সাহস দেখাতে হবে। আর নাগরিক সমাজকে রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করে নির্বাচনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বাঙালি এই চ্যালেঞ্জটাই নিক।
১০.০৩.২০২৬










বাংলা ঐতিহাসিক ভাবে গন্ডগোলের জায়গা। সিপাহী বিদ্রোহ, তেভাগা, নকশালবাড়ি সব গন্ডগোলের সূত্রপাত এই বাংলায়। বিপ্লবী স্বাধীনতা আন্দোলনেও বাংলা অগ্রগামী থেকেছে।
তাই বাংলাকে নিয়ে দিল্লীর এত চাপ। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কোনো রাজ্যে কি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি হয়েছে? আমার জানা নেই। বাংলা ও বাঙালি যতদিন থাকবে গন্ডগোল ততদিন থাকবে।