কেমন একটা লালুভুলু প্রোটেক্টেড পরিবেশে বড় হয়েছিলাম। জীবনটা মনে হত রূপকথাই। গল্পের শেষে শয়তান মারা যাবে রাজপুত্রের হাতে। অরণ্যদেব সবাইকে ঢিসুম ঢিসুম করে শুইয়ে দিয়ে শেষ অবধি ডায়ানাকে নিয়ে কিলা উই এর স্বর্ণ বালুকায় গড়াগড়ি খাবে, শোলের লাস্ট সিনে ট্রেন কম্পার্টমেন্টে বিরুকে জড়িয়ে ধরবে কোনও বাসন্তী। ন্যায় বিচারে অটুট আস্থা নিয়েই বড় হচ্ছিলাম। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন এই খেলায় আছেন সব মহান রেফারি যারা একটু ফাউল দেখলেই ফুরর করে বাঁশি বাজাবেন। কারণ এরা সবাই সেই অদ্ভুৎ সর্বজ্ঞ সর্ব শক্তিমান পরম ন্যায়পরায়ন রাষ্ট্র নামক বস্তুটার শরিক।
এমন সময় হাতে এসে যায় “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” বইখানি। কিছুদূর এগোনোর পরে মনে হয় ধুত্তোর। এই টেকো ফ্রেঞ্চ কাট দাড়িওয়ালা রাশিয়ান রেভলিউশনারী লোকটা তো এবসলিউটলি বকোয়াস। বড় ভুলভাল বকে। আজে বাজে কথার সীমা থাকে। বলে কি লোকটা! পাগল না সিপিএম? লোকটার কথায়, “জুডিসিয়ারী, পুলিশ, মিলিটারি আমলা – সবই নাকি আসলে রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ যাদের একমাত্র কাজ হল শ্রেণীতে শ্রেণীতে লড়াইএ যাতে একপক্ষ জিততে না পারে তার জন্য চেষ্টা করা”। এদিকে দেখতে পাচ্ছি শ্যাম মানেকস হিরো হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পরে জানলাম টি এন সেশন এর নাম, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচারের প্রতিমূর্তি। সুধীন চ্যাটার্জি ইস্ট- মোহন খেলায় রেফারি থাকলে যতটা নিশ্চিন্ত বোধ করতাম তার চেয়েও নিশ্চিন্ত ভোটের সময় সেশন থাকলে। সে বড়ই সুখের সময় ছিল।
আস্তে আস্তে বয়েস বাড়তেই লাগলো। কত নতুন লোক। জীবনে যা দেখিনি সেসব দেখতে শুরু করলাম। মানেকশ এর জায়গায় বিজয় কুমার সিং। নিরপেক্ষতার শেষ দুর্গের ইট খসে পড়ছে। সেনানায়ক অবসরের পরে যোগ দিচ্ছেন রাজনৈতিক দলে। জীবনে যা কোনোদিন দেখিনি। নকল পরচুলা ব্যাগে শেষ বারের মত ভরে রেখে অবসরের পর বিচারপতি রঞ্জন গগৈকে একটা রাজনৈতিক দল পাঠাচ্ছে রাজ্যসভায়। মি লর্ড এখন কেবলই এম পি। সততা ইন্টিগ্রিটি ন্যায়বিচার আর নিরপেক্ষতা – শব্দগুলোকে মনে হয় উঁচুমানের প্রহসন, ব্যঙ্গ।
ন্যায়ালয়, পুলিশ, মিলিটারি নির্বাচন কমিশন – সবই কি তাহলে সেই জুরিখে নির্বাসনে বসে লেখা সেই বিপ্লবীর কথা অনুযায়ী “একটা শ্রেণীকে দাবিয়ে রাখার ইন্সট্রুমেন্ট ছাড়া আর কিছুই নয়”, যারা ইচ্ছে মত গুলি চালিয়ে রুরাল মাওবাদী নাম দিয়ে যে কাউকে খতম করে দিতে পারবে, সঙ্গে ফাউ হিসেবে কো ল্যাটারাল ড্যামেজ এর নামে দু দশ জন আদিবাসীকে, অথবা আরবান নকশাল নাম দিয়ে পঙ্গু অধ্যাপককে বিচার ছাড়াই দিনের পর দিন জেলে ভরে রাখতে পারবে। সেই “মহা নিরপেক্ষ” রেফারি কি একই সাথে সিলেক্টিভ অন্ধ, বধির ও নির্বাক?
বড় কেন হয়ে উঠলাম? ছেলেবেলার সেই দিনগুলো কি ভালো ছিল। মা যখন পড়ে শোনাতো গ্রীম ভাইদের সেই গল্প। গুটি শুটি মেরে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে জানতাম যে নীলকমল আর লালকমল যুদ্ধে জিতেই ঘরে ফিরবে। সত্যের জয় অনিবার্য। ন্যায় বিচার পাবে সবাই দিনের শেষে। কারণ পরম করুণাময় ন্যায়নিষ্ঠ ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসেবে রাষ্ট্র আমাদের মাথার ওপর আছে অভিভাবক হিসেবে। আমি আপনি ভুল করতে পারি, রাষ্ট্র পারে না। এগুলি কি কেবল রূপকথার বইতেই পাওয়া যাবে এবার থেকে? কেন বড় হতে গেলাম! চির শিশু থাকতে পারলে কী ভালই না হতো। রাষ্ট্রের অপার মহিমা এর কেত্তন গাইতে পারতাম সারা জীবন।











😍😍কি ভালো লিখেছো।🤭
কী দূর্দান্ত বাঁধুনী গো।
কলম আর সেইসঙ্গে প্রোটেকটেড্ কম বেশী সক্কলের ছোটবেলা থেকে আজকের প্রহসন।
ভীষণ কিউট লিখেছো এক টানে।ছবি আঁকে যেমন বা রঙ করে কোনো ব্রাশ বদল বা রঙ না থেমে সপাট গাড়ি চালালে ছেলেবেলা থেকে বড়োবেলার। ভালো থেকো সেনাপতি।