লোহিতবর্ণের প্রস্তরনির্মিত সুদৃশ্য প্রাসাদের দ্বিতীয় তলের একটি কক্ষে, গবাক্ষের সম্মুখে দাঁড়াইয়া যুবরাজ রাজ্যবর্ধন পশ্চিমদিকে চাহিয়া ছিলেন। সূর্যাস্তের বিলম্ব নাই। দিনমণির তেজোদীপ্ত গৈরিক রশ্মি ধীরে ধীরে অনুজ্জ্বল হইয়া আসিতেছে। রাজ্যবর্ধনের দৃষ্টি অন্যমনস্ক, ঈষৎ উন্মনা। সেই দৃষ্টি প্রাসাদের প্রাচীর-সীমানা ও বাহিরের রাজপথ অতিক্রম করিয়া স্থানীশ্বর নগরীর পূর্বপ্রান্তে ন্যস্ত হইল। ঐ দিকেই ভীষ্মকুণ্ড। কথিত আছে, মহাভারতীয় বীরশ্রেষ্ঠ দেবব্রত ভীষ্ম এই কুণ্ডের তীরে তাঁহার অন্তিম নিশ্বাস ত্যাগ করিয়াছিলেন।
পার্শ্বস্থিত কক্ষে একটি ক্ষীণ শ্লেষ্মাজড়িত রোগপীড়িত কণ্ঠ হইতে নির্গত প্রবল কাশের শব্দে যুবরাজ সচকিত হইলেন। তাঁহার মুখমণ্ডল বেদনায় পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল।
পিতা প্রবল ক্লেশ ভোগ করিতেছেন — ক্ষয়রোগে জর্জরিত শ্বাসযন্ত্র প্রায় বিকল হইতে বসিয়াছে — বৈদ্য-ভিষগগণ খল নুড়ি এবং নানা ওষধি-গুল্ম লইয়া রাজার প্রকোষ্ঠটিতে বিগত কয়েক পক্ষ যাবত প্রায় স্থায়ীভাবে অবস্থান করিতেছেন, কিন্তু পুষ্যভূতিরাজ পরমভট্টারক প্রভাকরবর্ধনের শারীরিক অবস্থার কিছুমাত্র উন্নতি লক্ষিত হইতেছে না।
রাজা দীর্ঘদিন রাজসভায় উপস্থিত হইতে পারেন নাই, মন্ত্রণালয়েও তিনি বহুকাল অনিয়মিত।
এমতাবস্থায় রাজকার্য সুচারুরূপে পরিচালনা করা একপ্রকার অসাধ্য হইয়া উঠিয়াছে।
অস্তগামী সূর্যের শেষ কোমল কিরণটি যুবরাজ রাজ্যবর্ধনের ভ্রুকুটিলাঞ্ছিত ললাট স্পর্শ করিয়া পশ্চিম দিগন্তে বিলীন হইয়া যাইবার মুহূর্তে তাঁর কক্ষের দ্বারপ্রান্তে একটি ছায়া পড়িল।
“পুত্র”!
“মাতা”!
পট্টমহিষী যশোমতী জ্যেষ্ঠ সন্তানের দর্শনাভিলাষী। স্বামী মৃতপ্রায়, এমতাবস্থায় পুত্রের সহিত তাঁহার কিছু গূঢ় আলোচনা প্রয়োজন।
দাসী আসিয়া দীপদণ্ড আলোকিত করিয়া গেল। প্রাসাদের মূল ফটকে প্রহরী উচ্চস্বরে যাম ঘোষণা করিল। দূরে স্থানীশ্বর মহাদেবের মন্দিরে ঘন্টা বাজিয়া উঠিল। আকাশের ধূসর গাত্র ধীরে ধীরে কজ্জলবর্ণ হইয়া আসিতেছে — তাহার বিস্তৃত অঞ্চলপ্রান্তে একটি দুইটি নক্ষত্র প্রতীয়মান হইতেছে। অবশেষে পশ্চিমাকাশে উজ্জ্বল বিন্দুসম সন্ধ্যাতারাটি তাহার স্নিগ্ধ, মার্জিত বিভায় ভাস্বর হইয়া উঠিল। তখনো চন্দ্রোদয় হয় নাই।
“পুত্র, মৌখরীরাজ গ্রহবর্মার প্রস্তাবের উত্তর দেওয়া আবশ্যক — এই বিষয়ে তোমার মতামত কী?”
এইখানে একটু পূর্বকথা প্রয়োজন। স্থানীশ্বর অধিপতি পুষ্যভূতিরাজ প্রভাকরবর্ধনের তিন সন্তান। দুই পুত্র, রাজ্যবর্ধন এবং হর্ষবর্ধন, এক কন্যা রাজ্যশ্রী।
মৌখরীরাজ অবন্তীবর্মার সহিত মগধ এবং মালবাধিপতি মহাসেনগুপ্তের সংঘর্ষের ইতিহাস প্রাচীন। ক্ষয়িষ্ণু গুপ্তবংশের কোনওরূপ শৌর্য, বীর্য বা প্রতাপ মহাসেনগুপ্তের মধ্যে আর অবশিষ্ট ছিল না। উপর্যুপরি নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণের মধ্য দিয়া অবন্তীবর্মা তাঁহাকে সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করিয়া ফেলিতে সক্ষম হইয়াছিলেন।
এমতাবস্থায় গুপ্তরাজের শেষ ভরসাস্থল ছিলেন পুষ্যভূতিরাজ আদিত্যবর্ধন — বর্তমান রাজা প্রভাকরবর্ধনের পিতা। মৈত্রী দৃঢ় করিবার আকাঙ্ক্ষায় মহাসেনগুপ্ত তাঁহার জৈষ্ঠা ভগিনীর সহিত প্রৌঢ় আদিত্যবর্ধনের বিবাহ স্থির করিতে দ্বিধা করিলেন না। প্রৌঢ় হইলেও আদিত্যবর্ধন রণকৌশলী এবং রাজ্যশাসনে পারদর্শী নৃপতি ছিলেন। মৌখরীবংশের আক্রমণস্পৃহা প্রশমিত হইয়াছিল।
আদিত্যবর্ধনের মৃত্যুর পরে প্রভাকরবর্ধন স্থানীশ্বরের পরবর্তী নৃপতি হইলেন। মৌখরীবংশের সহিত নূতন করিয়া কোনোরূপ শত্রুতার সূচনা হইল না। কারণ উভয় রাজ্যের উত্তরভাগ তখন বিদেশি হূণ জাতির দ্বারা মুহূর্মুহূ আক্রান্ত হইতেছিল। সেই ক্রান্তিকালে পরস্পর বৈরিতা উভয় রাজার পক্ষেই অসমীচীন বলিয়া বোধ হইয়াছিল।
অবশেষে অবন্তীবর্মার প্রয়াণের পরে যখন যুবক গ্রহবর্মা মৌখরী রাজ্যের শাসনভার আপন হস্তে তুলিয়া লইলেন, তখন আদিত্যবর্ধনের পুত্র প্রভাকরবর্ধন স্থানীশ্বরে রাজত্ব করিতেছেন।
তিনি অনতিবিলম্বেই পুষ্যভূতিরাজের চতুর্দশী কন্যা রাজ্যশ্রীর পাণিপ্রার্থনা করিয়া স্থানীশ্বরে দূত পাঠাইয়া দিলেন।
মগধ এবং মালব পূর্বেই গুপ্তরাজ মহাসেনগুপ্তের হস্তচ্যুত হইয়াছিল। মহাসেনগুপ্তের গুপ্তহত্যার অব্যবহিত পরে তাঁহার মধ্যম পুত্র মাধবগুপ্ত এবং কনিষ্ঠ পুত্র কুমারগুপ্ত আপন রাজ্য হইতে বিতাড়িত হইয়া স্থানীশ্বরে আসিয়া আশ্রয় লইয়াছিলেন। মহাসেনগুপ্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রতাপশালী দেবগুপ্ত আপনাকে মালব রাজ্যের অধিপতি ঘোষণা করিয়া পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির উপর অতর্কিত আক্রমণ আরম্ভ করিয়াছিলেন। এই বিষয়ে তাঁহার প্রধান সহায় হইয়াছিলেন গৌড়াধিপতি কীর্তিমান মহারাজ শশাঙ্কদেব।
অতএব পুষ্যভূতিরাজের সহিত মৈত্রীবন্ধন দৃঢ় না করিলে আপন মৌখরীরাজ্য রক্ষা করা কষ্টকর হইয়া উঠিবে অনুমান করিয়া গ্রহবর্মা প্রভাকরবর্মনের নিকট রাজ্যশ্রীর পাণিগ্রহণের প্রস্তাব পাঠাইয়া দিলেন।
পাটরানী যুবরাজের নিকট সেই প্রস্তাবেরই সদুত্তরের আশায় তাঁহার দর্শনাভিলাষী হইয়াছেন।
রাজ্যবর্ধন অধিক চিন্তা করিলেন না। রুদ্ধকণ্ঠ কিঞ্চিৎ পরিষ্কার করিয়া স্পষ্টস্বরে বলিলেন — “মাতা, আমাদের অমত করিবার কারণ দেখি না। গ্রহবর্মাকে দেখিয়াছি — সুদর্শন যুবাপুরুষ। মালবাধিপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ যদি অবশ্যম্ভাবী হইয়া উঠে, মৌখরীরাজ্যের সাহায্য আমাদের প্রয়োজন।”
মালবাধিপতির উল্লেখে যশোমতীর মুখশ্রী অন্ধকারাচ্ছন্ন হইল, তাহা রাজ্যবর্ধনের দৃষ্টি এড়াইল না। যুবরাজের হস্ত মুষ্টিবদ্ধ, ওষ্ঠ দৃঢ়বদ্ধ হইল, মুখমণ্ডল অতি কঠিন ভাব ধারণ করিল।
অর্বাচীন দেবগুপ্ত তাঁহাদের আত্মীয় হইলেও কুচক্রী এবং অতিশয় নিষ্ঠুর — তাঁহার মাতা মালব-রাজপুত্রী যশোমতীর প্রতি দেবগুপ্তর কুদৃষ্টি পড়িয়াছিল। মালবের প্রয়াত রাজা যশোধর্মনের পুত্র শিলাদিত্যের অনুরোধে পুষ্যভূতিরাজ প্রভাকরবর্ধন স্থানীশ্বর হইতে সুদূর উজ্জয়িনী পঁহুছিয়া শিলাদিত্যের ভগিনী যশোমতীকে বিবাহ করিয়া তাঁহার প্রাণ ও সম্ভ্রম রক্ষা করিয়াছিলেন।
অতঃপর বিংশতি বৎসরের সুদীর্ঘ, সধৈর্য্য ষড়যন্ত্রের শেষে, গুপ্তঘাতকের হস্তে পিতা মহাসেনগুপ্তের হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করাইয়া, ভ্রাতাদের রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া, মালবরাজ শিলাদিত্যকে পরাজিত করিয়া নিষ্কন্টক নরপিশাচ দেবগুপ্ত এক্ষণে মালবের রাজসিংহাসনে আসীন হইয়াছে। এবং গুপ্তহস্তচ্যুত মগধ পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষায় অনুক্ষণ পুষ্যভূতি এবং মৌখরীরাজবংশকে উত্যক্ত করিয়া ফিরিতেছে।
এইসকল কথা চিন্তা করিলেই যুবরাজ রাজ্যবর্ধনের রুধির উত্তপ্ত হইয়া উঠিত, চক্ষে সমস্ত জগৎসংসার রক্তবর্ণ প্রতিভাত হইত, শাণিত তরবারির অগ্রভাগ দেবগুপ্তের পঞ্জরে সজোরে বিঁধাইয়া দিবার দানবিক প্রবৃত্তি অন্তরে জাগরূক হইয়া উঠিত।
নষ্টমতি দেবগুপ্তের যশোমতীর প্রতি লালসা প্রদর্শন এবং পরবর্তী হীন কার্যকলাপের বিবরণ যুবরাজ তাঁহার পিতার আশ্রিত, ভাগ্যতাড়িত গুপ্তরাজপুত্র মাধবগুপ্তের নিকট শ্রবণ করিয়াছিলেন।
কিয়ৎকাল পরে আত্মসংবরণ করিয়া যশোমতী বলিলেন, “হাঁ, তোমার যৌবরাজ্যে অভিষেককালে অন্যান্য নৃপতিদের সহিত গ্রহবর্মাও আমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। সুপুরুষ তিনি — দূতমুখে শুনিয়াছি কুশলী কূটনীতিবিদও বটে। রাজ্যশ্রীর অমত হইবে না আশা করি, দুটিতে সুন্দর মানাইবে।” — কন্যার সুকোমল, নিষ্পাপ, সুস্মিত মুখশ্রী তাঁহার মানসপটে জাগিয়া উঠিল — কণ্ঠ স্নেহার্দ্র ও চক্ষু সজল হইয়া আসিল। বস্তুত, তিন সন্তানের মধ্যে রাজ্যশ্রীকেই তিনি অধিক ভালবাসিতেন।
রাজ্যবর্ধন ঈষৎ ইতস্তত করিয়া কহিলেন — “কিন্তু পিতা? পিতার এইরূপ শারীরিক অবস্থায় ভগিনীর বিবাহ কেমন করিয়া সম্ভব হইবে মাতা?”
যশোমতীর কণ্ঠে পট্টমহিষীর অবিচল দৃঢ়তা ফিরিয়া আসিল। তিনি স্থির অচঞ্চল স্বরে বলিলেন — “পরমভট্টারক মহারাজেরও ইহাই বাসনা। তাঁহার জীবদ্দশাতেই তোমার রাজ্যাভিষেক এবং রাজ্যশ্রীর বিবাহ, উভয়ই তিনি সম্পন্ন করিতে উৎসুক। বিশ্রাম করো পুত্র। আমি আসি, আমার সান্ধ্যপূজার সময় অতিক্রান্ত হইয়া যাইতেছে”।
মাতাকে যথাযথ অভিবাদনপূর্বক বিদায় জানাইয়া যুবরাজ পুনরায় গবাক্ষের নিকট আসিয়া দাঁড়াইলেন।
সম্মুখে রাজপথ জনবিরল হইয়া আসিতেছে। দূরে গৃহস্থবাটীর কম্পমান প্রদীপগুলি একটি একটি করিয়া নির্বাপিত হইয়া যাইতেছে। নির্মেঘ আকাশে শরৎশশী নির্মল আনন্দে হাসিতেছে।
রাজ্যবর্ধনের হৃদয়ে অকস্মাৎ এক অপার্থিব অলৌকিক আশঙ্কা শ্যেনপক্ষীতুল্য বৃহৎ দুইটি কৃষ্ণ পক্ষ বিস্তারিত করিয়া তাঁহার মনের আকাশ আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। তাঁহার স্থির বিশ্বাস জন্মাইল যে অদূর ভবিষ্যতে অতীব ক্রূর কোনও নিষাদ নিশ্চিতভাবে তাঁহার রাজ্য এবং পরিবারের উপর ধীরে ধীরে এক অচ্ছেদ্য অশুভ আবরণ বিস্তার করিতে আরম্ভ করিয়াছে।
(ক্রমশ)










