Skip to content
Facebook Twitter Google-plus Youtube Microphone
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Menu
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Swasthyer Britte Archive
Search
Generic filters
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Search
Generic filters

পঞ্চকন্যা কথা

WhatsApp Image 2024-07-18 at 7.48.35 PM
Somnath Mukhopadhyay

Somnath Mukhopadhyay

Retired school teacher, Writer
My Other Posts
  • July 21, 2024
  • 9:34 am
  • One Comment

আরও একটি পাঁচ ই জুন এসে হাজির হলো আমাদের মাঝে। এ বছর ভোটের ফলাফলের তালগোলের মধ্যেই তার হাজিরা। তাই দিনটিকে নিয়ে  আসর কতটা গরম হবে বা আদৌ এ নিয়ে হাওয়া গরম হবে কিনা তা বলা বেশ মুশকিল। অথচ আমাদের মধ্যেই এমন অনেক অনেক নিভৃত যাপনে অভ্যস্ত,নিরলস , উদগ্রীব মানুষ রয়েছেন যাঁরা এই দিনটিকে আঁকড়ে ধরেই আগামী দিনগুলোতে নিজেদের সঁপে দিতে চান ধরিত্রী মায়ের সেবায়, পরিবেশ সুরক্ষার কাজে। আজকের ভারতবর্ষের পথে প্রান্তরে পরিবেশের রক্ষায় যাঁরা কাজ করে গেছেন- নির্মাণ করে গেছেন এক অনুসরণীয় যাপনপথ অথবা আজ‌ও সেবা করে চলেছেন প্রকৃতির , তাঁদের মধ্য থেকে বাছাই করা কয়েকজনের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যই এই নিবন্ধের অবতারণা। এই নিবন্ধে  পঞ্চকন্যার কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরতে গিয়ে বাদ পড়লেন আর‌ও অনেকেই। তাঁদের সকলের জন্য, সেই সব অনলস পরিবেশ সেবকদের জন্য র‌ইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।পরিবেশের সেবা? কথাটি কি নতুন ঠেকছে? নিশ্চয়ই নয় । কেননা এই দেশের ঐতিহ্যবাহী পরম্পরায় – পাহাড় পর্বত, নদীনালা , গাছপালা, পাখ পাখালি – সবকিছুকেই নিবিড় ভাবে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার কথা সেই কোন্ কাল থেকে বলা হয়েছে। তপোবনের আশ্রমিক পরিবেশের কথা মনে পড়ে? আসলে এভাবে বেঁচে থাকাতে একটা আনন্দ আছে, এর প্রতি সহজাত অনুরাগ আছে,সুখ আছে, সমৃদ্ধি আছে, স্থিতি আছে, স্বস্তি আছে। এটা সবথেকে ভালো জানেন যাঁরা, বোঝেন যাঁরা, তাঁরা হলেন সমাজের অর্ধেক আকাশ জুড়ে থাকা মহিলারা । ঘরের কাজ পরিপাটি করে করার পাশাপাশি পরিবেশ পরিসেবাতেও তাঁদের অনেকেই উজ্জ্বল, অনন্যা । পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেকসময়ই নারীদের কৃতীকে দাবিয়ে রাখা হয়,তার‌ই মধ্যে কেউ কেউ হয়তো “ গন্ধ বিলানো ধূপের” সুবাস হয়ে আপন কর্মের সুবাদে পরিচিতি লাভ করেন বৃহত্তর নাগরিক সমাজে। দেশের পরিসীমা ছাপিয়ে কার‌ও কার‌ও পরিবেশ পরিসেবার অনন্য কীর্তিকলাপের কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে দেশান্তরের বিসারি দরিয়ায়। তখন তাঁদের পাশাপাশি গর্বিত হই আমরাও।

পাঁচ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস।  এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্যকে প্রেক্ষাপটে রেখে আজ বরং আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই আমাদের দেশের পাঁচজন অনন্যা পরিবেশ সেবিকার, লোকচক্ষুর প্রায় আড়ালে থেকে যাঁরা নিয়মিতভাবে পরিবেশের সেবা করে চলেছেন প্রকৃতি পরিবেশের প্রতি নিজেদের সুগভীর ভালোবাসার তাড়নায়। আজ যখন গোটা দুনিয়া জুড়ে এক বিপন্নতার আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে, গেল গেল রব উঠেছে জল স্থল অন্তরীক্ষ জুড়ে, তখন এই সব মানুষীদের নীরব কর্মকাণ্ডের শরিক হতে মোটেই খারাপ লাগবে না।

আমাদের দেশে পরিবেশ আন্দোলনের এক সুদীর্ঘ পরম্পরা বা ইতিহাস রয়েছে। বলতে ভালো লাগে যে এই আন্দোলনের ময়দানে অনেকক্ষেত্রেই বুঝি পুরুষদেরকে ছাপিয়ে গেছেন আমাদের দেশের বীরাঙ্গনা নারীরা। মানুষ পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন মুখর হয়ে ওঠে কখন? যখন সে উপলব্ধি করে তাঁর বা তাঁদের অনুমোদন ছাড়াই যথেচ্ছ ভাবে পরিবেশ পরিমণ্ডলের পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে যা আমাদের জীবনের প্রচলিত ভারসাম্যের নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবে। এতোসব উপলব্ধির পরেও পরিবেশের ওপর সবল শক্তির অভিঘাত মোটেই নতুন কোনো ঘটনা নয় । আমাদের মহাকাব্যের পাতাতেও অরণ্য সংহারের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। সীতা মায়ের খোঁজে লঙ্কা অভিযানে গিয়ে রাক্ষসদের হাতে বন্দি হনুমানের লেজের আগুনে লঙ্কাদহন পর্ব কিংবা মহাভারতের খাণ্ডব বন দহনের বীরোচিত আখ্যানের মধ্যে চাপা পড়ে আছে বন কেটে বসত গড়ার কারণে পরিবেশের অবক্ষয়ের করুণ কাহিনি।

আসলে অরণ্যের নিবিড় প্রশান্তিকে ঘিরে থাকা বনবাসী মানুষের জীবন যাপন ও জীবিকা যুগে যুগে আক্রান্ত হয়েছে। যখনই মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছে, তখনই দানা বেঁধেছে প্রতিবাদী পরিবেশ আন্দোলন। আর এই আন্দোলনের ময়দানে পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন ভারতের নারীরা। কখনও কখনও পুরুষদের ভূমিকাকে ছাপিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এ দেশের মেয়েরা।

ভারতে পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রথম শহীদ হয়েছিলেন রাজস্থানের বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের বীরাঙ্গনা নারী অমৃতা দেবী আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাত ’শো বছর আগে। গুরু জাম্বেশ্বর মহারাজ তথা জাম্বোজীর অনুশাসনের অনুগামী বিষ্ণোইরা।

গোড়াতেই খুব সংক্ষেপে সেই কাহিনি নিবেদন করি।

মেওয়ারের রাজা অভয় সিংহ তাঁর নতুন রাজপ্রাসাদ নির্মাণের জন্য যোধপুরের কাছে খেজরি গাছে ঘেরা  খেজরিলি গ্রামকেই বেছে নিলেন। শাসকের তরফে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিবাদে মুখর হলো বিষ্ণোইরা। কারণ তাঁরা বুঝতে পারছিল রাজার খোয়াব পূরণ করার অর্থ হলো তাঁদের জীবন বিপন্ন হ‌ওয়া। শুরু হলো প্রতিবাদী আন্দোলন। আন্দোলনের নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন সাধারণ দেহাতি মহিলা  মা অমৃতা দেবী। গাছগুলোকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে প্রতিবাদে সরব হলেন গ্রামবাসীরা। জান কবুল করে লড়াই চালিয়ে যান তাঁরা। রাজার পাঠানো ঘাতকের দল নির্মমভাবে হত্যা করে অমৃতা দেবী ও তাঁর তিন সন্তানসহ মোট ৩৬৩ জন অকুতোভয় বিষ্ণোই মানুষকে। রাজস্থানের মাটি সাক্ষী থাকলো এক নারীর আত্মত্যাগের। এই ঘটনার

সূত্রেই বুঝি একাত্ম হয়ে যায় পরিবেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই আর মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। গৌরবান্বিত হয় ভারতবর্ষের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস। এই আন্দোলনের বহু বছর পর,ঐতিহাসিক চিপকো আন্দোলনের সূত্র ধরেই সজীব হয়ে ওঠে গাছ জড়িয়ে ধরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অনবদ্য ভারতীয় পরম্পরা। সেই আন্দোলনের ময়দানেও সক্রিয় ছিলেন অধুনা উত্তরাখণ্ডের বীরাঙ্গনারা । তাঁদের‌ই একজন, গৌরা দেবীর কথা দিয়েই আমরা বরং শুরু করি পরিবেশ সুরক্ষায় নিবেদিত প্রাণ পঞ্চ ভারতীয় কন্যার কথা।

(১) চিপকো  জননী গৌরা দেবী ( ১৯২৫- ১৯৯১ )

চিপকো আন্দোলনের জননী হিসেবে পরিচিত গৌরা দেবীর জন্ম ১৯২৫ সালে  তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের চামোলি জেলার লতা গ্রামের এক সাধারণ আদিবাসী পরিবারে। গৌরা দেবীর বয়স যখন মাত্র বারো, তখনই তার বিয়ে হয় মেহেরবান সিং এর সাথে। আর পাঁচটা স্থানীয় পাহাড়ীয়া অধিবাসীর মতো রেনে গ্রামের মানুষ মেহেরবানের জীবিকা ছিল পাহাড়ী বুগিয়ালে পালিত ভেড়া চড়ানো আর পশমের বেচাকেনা করা । যখন গৌরা দেবীর বয়স বাইশ, মেহেরবান মারা যান। সদ্য যুবতী গৌরা হাল ছাড়েননি। সন্তানদের নিয়ে সংগ্রামী জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো তাঁর।

গ্রামের লোকজন গৌরা দেবীর মধ্যে এক লড়াকু সৈনিকের অস্তিত্বের আভাস পেয়েছিলেন, তাই তাঁকেই গ্রামের মহিলা মঙ্গল দলের প্রধান নির্বাচন করা হলো, যাঁদের প্রধান কাজই ছিল গ্রামের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, বনের বৃক্ষরাজির সুরক্ষার দেখভাল করা। ১৯৬২ র চিনা আগ্রাসনের পর থেকেই সীমান্তবর্তী এলাকায় সামরিক প্রয়োজনে সড়ক, সেতু নির্মাণের কাজকর্ম নতুন গতি পায় । ৭০’ এর গোড়াতেই এমন উন্নয়নের ঢেউ এসে আছড়ে পড়লো উত্তরপ্রদেশের শান্ত, সমাহিত চামোলি জেলায়। রেনে গ্রামের পাহাড়ি ঢালের মাটি আঁকড়ে, আকাশপানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বহুকালের গাছগুলোর ওপর নজর পড়ল কাঠ কাটার বরাদ্দ পাওয়া ঠিকাদারদের। প্রমাদ গুনলেন গৌরা দেবী ও তাঁর দলের মহিলা সহযোগীরা। বড়ো বড়ো গাছগুলো কেটে ফেলা হলে যে তাঁদের রেনে গ্রামের পাহাড়ি মানুষের জীবন বিপন্ন হবে – নষ্ট হয়ে যাবে তাঁদের ছোট ছোট চাষের ক্ষেত, সবুজ ঘাসের গালিচায় ঢাকা বুগিয়াল, বিপন্ন হবে জলের উৎস পাহাড়ি ঝোরা আর চশমা গুলো। এমনটা যে মেনে নেওয়া যায় না। মেনে নেওয়া হলে যে মৃত্যুকে ডেকে আনতে হবে। তাহলে উপায়?  গৌরা দেবী  প্রতিরোধের এক আশ্চর্য উপায় বাতলালেন। তিনি তাঁর সঙ্গীনিদের উদ্দেশ্যে বললেন, – “ডরো মাত্ । চলো, হাম সব পেড়োকো আপনে হাতোসে চিপককে রাখেঙ্গে। হমে বগড় মারকে উনলোগ পেড়োকো কাট নহী সকোগে। মত ডরো, জিৎ হামারা হি হোঙ্গে” । একদল অতি সাধারণ, নিরক্ষর গ্রামীণ মহিলার দুর্দমনীয় মনোবল ও পরিবেশ প্রকৃতির প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, সে যাত্রায় বাঁচিয়ে দিল চামোলির অতুলনীয় অরণ্য সম্পদকে। গোটা বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়লো চিপকো আন্দোলনের চমকপ্রদ সাফল্যের বার্তা। নতুন ইতিহাস গড়লেন গৌরা দেবী ও রেনের মহিলা মঙ্গল সংগঠন। তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই।১৯৯১ সালে চিপকো জননী গৌরা দেবী মারা যান। তাঁর কৃতী কথা আজও সমুজ্জ্বল।

(২) হিমাচলের ‌ কিঙ্করি দেবী  (১৯২৫–২০০৭)

১৯২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি হিমাচল প্রদেশের সিরমৌর জেলার ঘাটো গ্রামের এক দরিদ্র দলিত পরিবারে কিঙ্করি দেবীর জন্ম। বাবা ছিলেন একজন সামান্য কৃষক। পারিবারিক আর্থিক চাহিদা মেটাতে সেই শৈশব কালেই প্রতিবেশীদের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে বাধ্য হন তিনি।

যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪ , কিঙ্করি দেবীর বিয়ে হলো শামু রাম নামে এক সামান্য চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের সঙ্গে। কিন্তু কপালে সুখ (?) স‌ইলো না। বিবাহিত জীবনের মাত্র আট বছরের মাথায় শামু রাম টাইফয়েডে মারা গেলেন। কিঙ্করির বয়স তখন মাত্র বাইশ।

সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর কাঁধে। ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ জুটলো স্থানীয় প্রশাসনিক দপ্তরে। সন্মার্জনী হাতে প্রতিদিন কাজ করতে করতে তিনি আবিষ্কার করলেন,– “ অবাক কাণ্ড! পাহাড়ি অঞ্চলে রোজ রোজ এতো ধুলো বালি আসে কোথা থেকে? ছিঃ, ছিঃ এত্তা জঞ্জাল!” খোঁজখবর নেওয়া শুরু হলো। দিন কয়েকের মধ্যেই উত্তর খুঁজে পাওয়া গেল। তাঁদের গ্রামের আশেপাশের এলাকায় পাহাড় ফাটিয়ে চুনাপাথর উত্তোলনের কাজ শুরু হয়েছে জোরকদমে। তাই এতো ধুলোবালির প্রকোপ।

কিঙ্করি দেবী দেখলেন এই খণির কারণেই বাড়ছে ধুলো, পাহাড়ি জলের উৎসগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ধানের খেত ছেয়ে গেছে সূক্ষ্ম ধুলোবালির আস্তরণে।  এমন হলে তো সর্বনাশ!

এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন ঐ সামান্য দলিত কন্যা অসামান্যা হয়ে। নিজে লেখাপড়া জানেন না, জনবল, অর্থবল কিছু নেই আছে কেবল অদম্য ইচ্ছা আর মনোবল। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন  “People’s Action for People in Need” এর সদস্যরা কিঙ্করি দেবীর পেছনে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো। সিমলা হাইকোর্টে ৪৮ জন খাদান মালিকের বিরুদ্ধে জনস্বার্থের মামলা দায়ের করলেন তিনি। কিন্তু চিরকাল‌ই যে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। খাদান মালিকদের সংগঠনের সঙ্গে এঁটে উঠবেন কি করে ঐ সহায় সম্বলহীনা দলিত মহিলা। সবাই তাঁকে বোঝালো – “কিঙ্করি! জলে থেকে তুমি কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করছো? তুমি আর‌ও বিপদে পড়বে।”

এতো চাপের মুখেও কিঙ্করি অনড়, কিঙ্করি নিরুত্তাপ। তিনি জানতেন – সত্যের নাহি পরাজয়।

অনশনে বসলেন কিঙ্করি। সেই গান্ধিবাদী পথ। সিমলা হাইকোর্টের বাইরে টানা উনিশ দিন ধরে চললো অনশন। বিচারবিভাগ নমনীয় হলো তাঁর আর্জি শুনতে। ততদিনে কিঙ্করি দেবীর এমন অনমনীয় মনোভাবের কথা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে কানাচে,এমনকি দেশের বাইরেও।১৯৮৭ সালে হাইকোর্টের রায় ঘোষণা করা হলো। তাতে কিঙ্করি দেবীর প্রিয় পাহাড়তলিতে সমস্ত রকম খাদানের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হলো। খাদান মালিকদের পক্ষ থেকে এই রায়ের বিরোধিতা করে আপীল করা হলো সুপ্রীমকোর্টে। দীর্ঘ শুনানির পর ১৯৯৫ সালে খাদান মালিকদের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। ভারতে পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে আরও একটি নতুন অধ্যায়ের সংযোজন ঘটলো কিঙ্করি দেবীর হাত ধরে। ইচ্ছাশক্তির ওপর ভরসা রাখলে একজন অতি সাধারণ অবস্থায় থাকা মানুষ‌ও যে অনেক বড়ো কাজ করতে পারে , কিঙ্করি দেবী সেটাই আমাদের শিখিয়েছেন তাঁর মহতী উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। শেষ জীবনে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য তেমন ছিলনা। সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে হিলারি ক্লিনটন তাঁকে সাহায্য করে গেছেন। তাঁর এলাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য কলেজ স্থাপনের পেছনে গভীর অবদান ছিল।  ২০০৭ সালে প্রয়াত হন কিঙ্করি দেবী ; তাঁর বয়স তখন ৮২ বছর।

(৩) অরণ্যের জীবন্ত বিশ্বকোষ তুলসী গৌড়া

রাষ্ট্রপতি ভবনের দরবার হল। এই ঐতিহাসিক দরবার হলে আজ একেবারে চাঁদের হাট বসেছে।

আজ দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান পদ্ম পুরস্কার প্রাপকদের হাতে তুলে দেবার দিন। ঘোষকের ঘোষণা অনুসারে একে একে পুরস্কার নিতে এগিয়ে আসছেন মাননীয় সম্মান প্রাপকরা রাষ্ট্রপতি শ্রী রামনাথ কোবিন্দের সামনে। উপস্থিত দর্শকদের তুমুল করতালির মধ্যে ঘোষিত হলো পদ্মশ্রী পুরস্কারের জন্য মনোনীত শ্রীমতি তুলসী গৌড়ার নাম। ধীর অকম্পিত পদক্ষেপে নগ্ন পদে প্রথাগত আদিবাসী পোশাক পরে এগিয়ে আসছেন তুলসী, দরবার হল তখন মুখরিত আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশে ব্যস্ত বিশিষ্টজনদের তুমুল করতালির শব্দে।

কে এই তুলসী গৌড়া? সেকথা জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সুদূর দক্ষিণী রাজ্য কর্ণাটকে। সেখানকার উত্তর কন্নড় জেলার বন দফতরের এক সরকারি নার্সারিতে ছোট ছোট চারা গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত এক মহিলা, নার্সারিতেই কাজ করেন তিনি। তাঁর পিছু পিছু ঘুরে বেড়ায় একটা ছোট্ট মেয়ে, মায়ের সঙ্গে সেও মেতে থাকে গাছের যত্ন আত্তিতে। মাঝে মাঝেই মা হাঁক পাড়েন – “তুলসী এল্লিড্ডিয়া? তুলসী তুমি কোথায়?” কচি কন্ঠের উত্তর ভেসে আসে – “আম্মা নানু ইল্লিড্ডেনে – মা,আমি এখানে।”

এভাবেই জীবনের শুরুর অধ্যায় কেটেছে তুলসীর – মায়ের কাজের সূত্রে রোজ নার্সারিতে যাওয়া, গাছ, গাছের বীজ, উত্তর কন্নড়ের গহীন অরণ্যের লতাগুল্ম , গাছগাছালির নিরন্তর সঙ্গ তুলসীকে একটু একটু করে গাছপালাদের বিষয়ে অভিজ্ঞ করে তোলে। তুলসীর জন্ম সম্ভবত ১৯৩৮ সালে কর্ণাটক রাজ্যের উত্তর কন্নড় জেলার হোনাল্লি গ্রামের এক হত দরিদ্র হালাক্কি উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর পরিবারে। যখন তাঁর বয়স মাত্র দুই, তুলসী হারান তাঁর বাবাকে। সেই থেকেই চলছে তাঁর লড়াই, মাথা উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। মায়ের পর নার্সারির কাজে যোগ দিলেন তুলসী – দিনমজুরের অস্থায়ী বন সহায়িকার কাজ। ছোট বেলা থেকে বনের বৃক্ষরাজির সঙ্গে কাজ করতে করতে তুলসী হয়ে ওঠেন একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী, যাঁর জ্ঞান কেতাবি ব‌ই নির্ভর নয়, জীবনের নিখাদ ভালোবাসায় ভরপুর অভিজ্ঞতা লব্ধ। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও তিনিই তাঁর বাস্তব জ্ঞানের সুবাদে হয়ে ওঠেন “ উদ্ভিদবিজ্ঞানের‌ জীবন্ত বিশ্বকোষ” । জীবনের দীর্ঘ ৩৫টি বছর বনবিভাগের দৈনিক মজুরির এক সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পর কর্ণাটক রাজ্যের বনবিভাগ তাঁকে স্থায়ীভাবে নিযুক্ত করেন।এটা হলো তুলসী গৌড়ার ঐতিহ্যবাহী পরম্পরাগত জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

বনের বৃক্ষরাজির যেকোনো গাছের মাতৃ প্রজাতি শনাক্ত করার বিষয়ে তুলসীর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। অরণ্যের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এই মাতৃ বৃক্ষের ভূমিকা অনন্য। এগুলিকে যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ ও প্রতিপালনের মাধ্যমেই একটি অরণ্যের প্রাকৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। তুলসী গৌড়া এই শুদ্ধতা বজায় রাখতে সাহায্য করেন বনবিভাগকে। এই কাজ তিনি করে চলেছেন নিরলস প্রচেষ্টায়। গাছের সেবা মানে প্রকৃতির সেবা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করা ; এর থেকে জরুরি কাজ আর কিইবা হতে পারে? তুলসীকে তাঁর জনগোষ্ঠীর মানুষেরা আদর করে ডাকে “বনদেবী , অরণ্যের জননী,কাদিনা দেবাতে।” প্রকৃতির সেবায় নিয়োজিত এই অনন্য ব্যক্তিত্বের প্রতি র‌ইলো একরাশ ভালোবাসা আর পরিবেশ দিবসের শুভেচ্ছা। ভালো থাকবেন তুলসী। আজকের পৃথিবীতে আপনাকে বড়ো প্রয়োজন আমাদের।

(৪) দ্য লেডি টারজান যমুনা টুডু (১৯৮০)

শকুন্তলার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? কন্ব মুনির পালিত কন্যা। তপোবনের ছায়াঘন আশ্রমিক পরিবেশের মধ্যেই তাঁর ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠা। সহজ সরল আনন্দময় যাপনে অভ্যস্ত বনবালার জীবনে পশু পাখি ,গাছপালা লতা বিতানের প্রভাব ছিল অপরিসীম। অরণ্যের শান্ত সমাহিত পরিবেশ‌ই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র আশ্রয়। অরণ্য হলো জীবদাত্রী, জীবধাত্রী।আর তাই সবুজের সমারোহ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে মন চায় না।

আমাদের এই পর্বের নায়িকা যমুনা টুডুর জীবনের গল্পটাও অনেকটাই এমন। বর্তমানে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পূর্ব চাকুলিয়া গ্রামের গৃহবধূ যমুনা টুডুর বাপের বাড়ি ওড়িশার ময়ূরভঞ্জে। ১৯৮০ সালে ময়ূরভঞ্জের রায়রঙপুর গ্রামের এক সাধারণ আদিবাসী কৃষক পরিবারে যমুনার জন্ম। পড়াশোনার প্রতি ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল,তাই বাবা তাঁকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। দশম শ্রেণির পড়াশোনা শেষ হলে বছর ১৮ র যমুনার বিয়ে হলো পূর্ব সিংভূম জেলার মুতুরাখাম গ্রামের মান সিং টুডুর সঙ্গে। ওড়িশার শকুন্তলার নতুন ঠাঁই হলো জঙ্গলে ঢাকা ঝাড়খণ্ড রাজ্যে।

কথায় বলে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও নাকি ধান ভানে। যমুনার বেলাতেও তেমনি ঘটলো। ওড়িশায় থাকতে বাবাকে দেখেছেন বাড়ির আশপাশে থাকা গাছেদের পরিচর্যা করতে। বাবার মুখেই সে শুনেছে আদিবাসী মানুষের জীবনে গাছপালা, বনজঙ্গলের গভীর প্রভাবের কথা। বাবা বলতেন – “গাছ হলো মাটি মায়ের প্রাণ। তাই তাদের যত্ন নিতে হবে, না হলে যে পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে মারাঙ্ বুরুর অভিশাপ”। ওপর‌ওয়ালা তাঁকে ঘর আলো করে থাকা একটা সন্তান দেননি, কিন্তু সেই দুঃখ ভুলে তিনি অরণ্য সংরক্ষণের কাজে নিজেকে ডুবিয়ে দিলেন। সবুজ গাছেরাই হয়ে উঠলো যমুনার পরম আত্মীয়, আত্মার আত্মজন।

কিন্তু এখানে কাজটা ময়ূরভঞ্জের মতো মোটেই সহজ ছিলনা।

সিংভূমের জঙ্গলে কাঠ মাফিয়াদের দাপাদাপি ভীষণ রকমের। মাটি থেকে আকাশ ছোঁয়া বড়ো বড়ো শালগাছ, কেমন সুশৃঙ্খল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সে সবে অবশ্য মন মজেনা মাফিয়া বাহিনীর। রাতের অন্ধকারে সেই গাছগুলো কেটে শহরে পাচার করে তারা। এমনটা নজরে আসতেই যমুনা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। তাঁর একার মানায় কাজ হাসিল হবেনা বুঝতে পেরে তিনি ধীরে ধীরে সংগঠিত করতে শুরু করলেন গ্রামের মহিলাদের। ১৯৯৮ সালে মাত্র পাঁচজন মহিলাকে নিয়ে তৈরি হলো “বন সুরক্ষা সমিতি”। শুরুতে অনেক অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে যমুনাকে। “গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে” – তাঁর মুখে এমন কথা শুনে গ্রামের মানুষজন‌ই প্রথমে বিরোধীতা শুরু করে। তাদের প্রশ্ন – “গাছ না কাটলে উনুন জ্বালানোর রসদ মিলবে কোথা থেকে?”এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে একটুও বেগ পেতে হয়নি যমুনার। তাঁর উত্তর শুনে একটু একটু করে যমুনার ওপর ভরসা রাখতে শুরু করে গাঁয়ের লোকজন। যমুনা বুঝতে পারেন , ঘরের লড়াইকে এবার বাইরের ময়দানে নিয়ে যেতে হবে। লড়াই হবে মুখোমুখি – এক দিকে কাঠ মাফিয়াদের সংগঠিত চক্র,যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মৌরসিপাট্টা কায়েম করে রেখেছে সিংভূমের বনাঞ্চলের ওপর, অন্যদিকে অকুতোভয়ী যমুনা টুডু ও তাঁর সদ্যগঠিত বন সুরক্ষা সমিতি। অসম লড়াই জেনেও যমুনা পিছপা হননি, আক্রান্ত হয়েছেন, গাছ কাটা বন্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছেন একাধিকবার , তবুও হতোদ্যম হননি। নিজের বিশ্বাসে অটুট থেকেছেন।

তাঁর এই লড়াইয়ের কথা ছড়িয়ে পড়তেই ভিড় বেড়েছে বন সুরক্ষা বাহিনীর ছাতার  তলায়। প্রতিরোধের মুখে আরও মরীয়া হয়ে ওঠে বন মাফিয়া আর চোরাচালানকারীরা। ২০০৪ সালে যমুনাদের বাড়ির ওপর হামলা চালায়, প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বেশ কয়েকবার। কিন্তু কোনোকিছুই যমুনাকে টলাতে পারেনি। ২০০৮ সালে মাফিয়াদের দলবল এক প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যমুনা ও তাঁর পরিবারকে নিকেষ করে দেবার চেষ্টা করে, কিন্তু সমবেত প্রতিরোধের কাছে পরাভূত হয় অশুভ শক্তি। বন বিভাগ তথা প্রশাসনের নজরে আসে যমুনা টুডু ও বন সুরক্ষা সমিতির সদস্যদের হার না মানা লড়াইয়ের কথা। এতো কাল চোখ বুজে থাকা প্রশাসন নড়েচড়ে বসতেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে মাফিয়া চক্রের লোকজন। জয় হয় মানুষের সম্মিলিত শক্তির, জয় হয় বন সুরক্ষা প্রচেষ্টার,জয় হয় যমুনা টুডুর। এতোদিন বেআইনিভাবে জঙ্গল কেটে  মুনাফা অর্জন ছিল ঐ অঞ্চলের এক শ্রেণির মানুষের উপার্জনের একটি সহজ মাধ্যম। যমুনা জানতেন সে কথা। তাই তিনি তিলতিল করে নিজেকে ও তাঁর এলাকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছেন চরম লড়াইয়ের জন্য । বন-মাফিয়া এবং কাঠপাচারকারীদের থেকে বারবার হুমকি,বাধা পেয়েও থেমে থাকেননি যমুনাদেবী। বন্দুকবাজ বন-মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লাঠি, তীর-ধনুক, বর্শা হাতেই স্থানীয় মহিলারা তাঁর নেতৃত্বে  বনরক্ষার লড়াই শুরু করে জয় সহজে আসবেনা জেনেও। অবশেষে স্বস্তি ফিরে আসে পূর্ব সিংভূমের জঙ্গলতলিতে। মুতুরাখাম গ্রামের প্রমীলা বাহিনীর লড়াইয়ের কথা আজও আলোচনার টেবিলে ঝড় তোলে।

বর্তমানে সেই পাঁচজন মহিলাকে নিয়ে গড়া বন সুরক্ষা সমিতির কলেবর বৃদ্ধি হয়েছে অনেকটাই।

এখন   “বন সুরক্ষা সমিতির”, ৩০০ টি দল রয়েছে এবং প্রত্যেক দলে ৩০ জন করে সদস্য রয়েছেন। তাঁরা যমুনাদেবীর নেতৃত্বে আজও বনভূমি বাঁচাতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। এখন ঝাড়খন্ড

পুলিশ ও বনবিভাগ তাঁদের নিয়ে যৌথভাবে বনরক্ষার কাজ পরিচালনা করেন। ঝাড়খন্ড সরকার বর্তমানে যমুনাদের গ্রামটিকে দত্তক নিয়েছেন। শিক্ষা ও জল পরিষেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে যমুনার নিরলস লড়াইয়ে সুফল হিসেবে। এখন তাঁর গ্রামের কোনো পরিবারে একটি কন্যাসন্তানের  জন্ম হলে ১৮ টি নতুন চারাগাছ এবং কন্যার বিবাহ হলে ১০ টি নতুন চারাগাছ রোপণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গাছের সঙ্গে মানুষের সখ্যতা চিরন্তন। তাই প্রতিবছর রাখী পূর্ণিমার দিন যমুনার নেতৃত্বে গ্রামের লোকজন গাছেদের রাখী পড়ায় মহা ধূমধামের সঙ্গে। যমুনা টুডু বিশ্বাস করেন ভাইয়েরা যেমন বোনেদের রক্ষা করে সমস্ত আপদ বিপদের হাত থেকে, ঠিক একই ভাবে গাছেরাও জীবনভর রক্ষা করে সমগ্র বিশ্বকে। এই গভীর ভালোবাসা আর অন্তহীন বিশ্বাস‌ই যমুনা টুডুর মতো এক সাধারণ আদিবাসী মহিলাকে স্বতন্ত্র, অনন্যসাধারণ করে তোলে। তাঁকে কুর্ণিশ জানাই।

(৫) লিসিপ্রিয়া কাঙ্গুজাম  ( ২০১১)

ওর যা বয়স তাতে করে এখন খেলে বেড়ানোর কথা । সেই সবে মেতে না থেকে অথবা সেই সব করেও আমাদের এই ছয় ছোট্ট কন্যাটি নিয়মিত হিল্লি – দিল্লি, বেজিং – নিউইয়র্ক চষে বেড়ায়। এই ছোট্ট মেয়েটিই হয়তো আগামীদিনে ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারী যদিও এখনও অনেক অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে ওকে।

এই মেয়েটিই হলো লিসিপ্রিয়া কাঙ্গুজাম, ভারতের গ্রেটা থুনবার্গ। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সর্ব কনিষ্ঠ পরিবেশ কর্মী।

মণিপুর কন্যা লিসিপ্রিয়ার জন্ম ২০১১ সালের ২ অক্টোবর বাশিখঙ্ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মৈতেই উপজাতীয় পরিবারে। বাবা কানারজিৎ ও  মা বিদ্যারাণী দেবীর দুই মেয়ের মধ্যে লিসিপ্রিয়া বড়ো। এই ছোট্ট মেয়েটির পরিবেশের প্রতি অনুরাগের পেছনে সুইডিশ কন্যা গ্রেটা থুনবার্গের খুব বড়ো ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে

লিসিপ্রিয়া নিজেও এ কথা স্বীকার করে নিয়েছে।

এতে এই ছোট্ট মেয়েটির কৃতিত্ব কোনোভাবেই খাটো হয়না, কেননা কেউ অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হবেন এটা খুবই স্বাভাবিক , বিশেষ করে মহতী কোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রে। যখন লিসিপ্রিয়ার বয়স মাত্র সাত, তখনই সে প্রথম পৃথিবীর বদলে যাওয়া বাতাবরণের সংকটের কথা এবং তার ফল হিসেবে বিপর্যয়ের সম্ভাব্যতা বিষয়ে মুখ খোলে।

২০১৮ সালেই সে তার বাবার সঙ্গে পাড়ি জমায় সুদূর মঙ্গোলিয়ায় সংযুক্ত রাষ্ট্রসঙ্ঘের দ্বারা আয়োজিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিষয়ক এক আলোচনা সভায়। এই সভায় উপস্থিত বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যে লিসিপ্রিয়া এতটাই প্রাণিত হয় যে দেশে ফিরেই সে চাইল্ড মুভমেন্ট নামে একটি সংগঠন স্থাপনের কথা ঘোষণা করে। জয় মা বলে উত্তাল সমুদ্রে পাড়ি দেবার সেই শুরু।

২০১৮ সালে বানভাসি কেরালার মানুষজনের সাহায্যে ১০০০০০ টাকা তুলে দিয়ে আবারও সংবাদের শিরোনামে উঠে আসে লিসিপ্রিয়া। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর চিঠিতে লিসি জানিয়েছিল, এই সামান্য সাহায্য যেন বন্যা পীড়িত শিশু কিশোরদের সহায়তায় খরচ করা হয়। এভাবেই সে একজন সংবেদনশীল মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

২০১৯ সালের ৪ অক্টোবর এক প্রতীকী সারভাইভাল কিট সামনে এনে রীতিমতো হইচই ফেলে দেয় লিসিপ্রিয়া। পৃথিবীর বায়ুদূষণ সমস্যা একটা ভয়ঙ্কর মাত্রায় পৌঁছেছে। এরফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের প্রবীণ ও শিশুদের ভবিষ্যৎ। অথচ এই বিষয়ে সরকার তথা দেশের নাগরিক সমাজের খুব যে হেলদোল আছে তা মোটেই মনে হয় না। লিসিপ্রিয়া উদ্ভাবিত SUKIFU (Survival Kit for the Future) এই দূষণ সমস্যার থেকে স্বস্তি পাওয়ার একটা উপায় হয়ে উঠবে বলেই মনে করে এই ছোট্ট মেয়েটি। আই আই টি কাশ্মীরের অধ্যাপক চন্দন ঘোষের সহায়তায় তৈরি এই কিট টি দিল্লির ভয়াবহ দূষণের কথা মাথায় রেখেই হয়তো তৈরি তবে আগামী দিনে এইটি হয়তো পৃথিবীর সবার জন্যই অনিবার্য হয়ে উঠবে।

লিসিপ্রিয়া কাঙ্গুজাম ভারত তথা গোটা বিশ্বের জাগ্রত পরিবেশ চেতনার প্রতীক। আগামী পৃথিবীর ভার লিসিপ্রিয়াদের হাতে । এই হাত যত বেশি শক্তিশালী হবে তত টেকস‌ই হবে পৃথিবীর পরিবেশের ভবিষ্যৎ। সবে শুরু তাঁর দীর্ঘ পদযাত্রা। কোনো গিমিক নয় , লিসিপ্রিয়া বেড়ে উঠুক আপন চেতনার আলোকে। আমরা তাঁর বৃহত্তর কর্মকাণ্ডের জন্য অপেক্ষা করে থাকবো।

অন্তকথা

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ভারতের পাঁচজন কৃতী পরিবেশবিদদের সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিলাম। পরিবেশ নিয়ে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এইসব মানুষদের আরও বেশি করে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসতে হবে আমাদের । এই পঞ্চকন্যার কর্মকাণ্ডের ইতিবৃত্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ করে যদি আমাদের নবীনতর প্রজন্মের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করতে পারে তাহলে সেটাই হবে পরিবেশ দিবস উদযাপনের সবথেকে বড়ো সার্থকতা।

জুন ৫, ২০২৪ প্রথম প্রকাশিত

PrevPreviousবাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন: অন্য চোখে
Nextডাক্তার অনির্বাণ দত্তের সাথেNext
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
অঞ্জনা মুখোপাধ্যায়
অঞ্জনা মুখোপাধ্যায়
1 year ago

আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই নিবন্ধে। আমরা মহিলাদের সশক্তিকরণের কথা বলে আসর জমাই, অথচ এইসব গ্রামীণ মহিলারা কোনো রকম ভাষণের মুখাপেক্ষী না হয়েই নীরবে, নিভৃতে তাঁদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চরম বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। এদের কথা এভাবে তুলে ধরার চেষ্টাকে কুর্নিশ জানাই। আমিই প্রথম মতামত দিচ্ছি ?? অবাক লাগে।

0
Reply

সম্পর্কিত পোস্ট

হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে

June 10, 2026 No Comments

পশ্চিম বাঙলায় শতকরা কতো শতাংশ মানুষ ‘রেগুলার’ বেসিসে কাজ করে অর্থাৎ মাস গেলে মাইনে পায়? যারা আছেন তাদের মধ‍্য থেকে যদি আবার গৃহ সহায়ক/সহায়িকা, আয়া

ধর্মের নামে ভাগ করে, ‘বাঙালি জাতি’র সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা চলছে

June 10, 2026 No Comments

(এক) ‘বাঙালি’ মানে কখনোই শুধু ইসলামিরা নন। শুধু হিন্দুরাও নন। অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসীরাও নন। ধর্মীয় বিচারে ‘বাঙালি’ যা-কিছুই হতে পারে। কিন্তু ভাষিক বা সাংস্কৃতিক বিচারে যাঁরাই

ম্যানিয়া বা উল্লাস রোগ অথবা বাইপোলার ওয়ান রোগ

June 10, 2026 No Comments

একটি রোগের এত নাম কেন। সেটায় আসব। সাধারণ মানুষ ম্যানিয়া বলতে বোঝে একটা মানুষ সবসময় একটিমাত্র চিন্তা করে যাচ্ছে, নোংরার বাতিকে খালি হাত পা ধুচ্ছে

বিজ্ঞান, ব্যক্তিমানুষ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা – এখন গভীর প্রশ্নের মুখে

June 9, 2026 No Comments

৫ জুন, ২০২৬-এ নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো বিখ্যাত সংবাদপত্রের একটি খবরের শিরোনাম ছিল “Police Remove Diabetes Experts From Conference for Distributing Critique of Trump Administration”

নিয়োগবিহীন ডেন্টাল-দীর্ঘ ৮ বছর!

June 9, 2026 No Comments

পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেক কঙ্কালসার চিত্র তুলে ধরার সময় এসেছে। ২০১৩ সালে জন্ম হয় WBHRB (West Bengal Health Recruitment Board)

সাম্প্রতিক পোস্ট

হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে

Dr. Amit Pan June 10, 2026

ধর্মের নামে ভাগ করে, ‘বাঙালি জাতি’র সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা চলছে

Dipak Piplai June 10, 2026

ম্যানিয়া বা উল্লাস রোগ অথবা বাইপোলার ওয়ান রোগ

Dr. Sumit Das June 10, 2026

বিজ্ঞান, ব্যক্তিমানুষ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা – এখন গভীর প্রশ্নের মুখে

Dr. Jayanta Bhattacharya June 9, 2026

নিয়োগবিহীন ডেন্টাল-দীর্ঘ ৮ বছর!

West Bengal Junior Doctors Front June 9, 2026

An Initiative of Swasthyer Britto society

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

Contact Us

Editorial Committee:
Dr. Punyabrata Gun
Dr. Jayanta Das
Dr. Chinmay Nath
Dr. Indranil Saha
Dr. Aindril Bhowmik
Executive Editor: Piyali Dey Biswas

Address: 

Shramajibi Swasthya Udyog
HA 44, Salt Lake, Sector-3, Kolkata-700097

Leave an audio message

নীচে Justori র মাধ্যমে আমাদের সদস্য হন  – নিজে বলুন আপনার প্রশ্ন, মতামত – সরাসরি উত্তর পান ডাক্তারের কাছ থেকে

Total Visitor

629823
Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on linkedin

Copyright © 2019 by Doctors’ Dialogue

wpDiscuz

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

[wppb-register]