পঞ্চান্ন ঘন্টা আগে থেকে মোবাইল, আবহাওয়ার অ্যাপ, দূরদর্শনের খবরের চ্যানেল, আকাশের মেঘেদের বেপথু চলাচল মায় পুবের জানলার সামনের জামগাছের ডালপালার আন্দোলন — সক্কলে জানিয়ে দিচ্ছে, ঝড় আসছে।
হাওয়ার গতি, ঝড়ের দিক, আছড়ে পড়ার মুহূর্ত, সবকিছু জানা হয়ে যাচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে। পঁচিশ বছর আগে এমনটা ছিল না, জানেন?
তখনো চোখের উপরে হাতের বারান্দা রেখে আকাশপানে চেয়ে বিজ্ঞ মাথা নাড়িয়ে — ‘ছাইক্লোন হতি পারে’-র ভবিষ্যদ্বাণীর যুগ ছিল।
আমি তখন উত্তরবঙ্গের আধাশহর কালিয়াগঞ্জে থাকি। চাকরিসূত্রে।
জুলাইয়ের এক বিষণ্ণ ভোর থেকে আরম্ভ হলো অবিশ্রান্ত ধারাবর্ষণ। সেটা চেনা। যেটা চেনা নয়, সেটা হলো বর্ষণের সঙ্গতে পাগল করা ঝোড়ো হাওয়া। আমার রান্না কাম ঘরকন্নার কাজের লোক বেলার আসার প্রশ্ন নেই। তারা থাকত রাধিকাপুর বারসই সিঙ্গল রেললাইনের লাগোয়া পাড়ায়। সেখানে জল উঠে গিয়েছে শুনলাম। সকাল ন’টা নাগাদ বিদ্যুৎ সংযোগ চলে গেল। পাঁউরুটি-মাখন খেয়ে আউটডোরে গিয়ে বসলাম। জল ভেঙে রোগী আর কে আসবে? ইনডোরের ভর্তি রোগী দেখার দায়িত্ব অন্য ডাক্তারবাবুর। আমি জনশূন্য আউটডোরে উসখুস করতে করতে বারোটা নাগাদ উঠে পড়লাম। আউটডোরের পাশেই আমার একতলা কোয়ার্টার। ফিরে দেখলাম শোয়ার ঘরের দেওয়াল বেয়ে টুপটুপ করে জল নামছে মেঝেয়। ছাদ জখম ছিল কিনা, বর্ষার এত অকরুণ অভিঘাত সইতে পারেনি। একটা মোটা বেডকভার পাতলাম মেঝের সেই অংশে।
তারপর দরজা থেকেই হাসপাতালের গ্রুপ ডি ভাই মলয়কে একটা হাঁক দিয়ে ডেকে সামনের টিউবওয়েল থেকে দু’বালতি খাবার জল ভরে আনতে অনুরোধ করলাম। কালিয়াগঞ্জে তখনো বোতলবন্দি মিনারেল ওয়াটারের চল হয়নি।
আমার কোয়ার্টারে ফ্রিজ নেই। এলপিজি কানেকশনের জন্য দরখাস্ত করলেও তখনো আসেনি গ্যাস। রান্না হতো কেরোসিন স্টোভে। তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের কোণে গিয়ে দেখলাম কেরোসিনের ক্যানে অনেকটা তেল রয়েছে। যাক, নিশ্চিন্ত। কিন্তু কাঁচা সবজির ঝুড়িতে উঁকি দিয়ে একখানি বেগুন আর কয়েকটি শুকনো করলা বাদে বিশেষ কিছু নজরে এলো না। আলু, পেঁয়াজ, রয়েছে অবিশ্যি। কয়েকটা ডিমও আছে।
চাল, আলু আর ডিম ধুয়ে চাপিয়ে দিলাম হাঁড়িতে। এবেলাটা চলে যাবে — ওবেলার ভাবনা পরে।
দিন বিকেলের দিকে ঢলতে বৃষ্টি আর হাওয়ার তেজ বাড়ল। ঘরেই ছোট হ্যান্ড টিউবওয়েল বসিয়ে নিয়েছিলাম, তাই টয়লেট, বাসনকোসন ধোয়ার জলের অভাব হয়নি। কিন্তু বাইরে যত আঁধার ঘনিয়ে আসতে লাগল, ভয় করতে লাগল আমার।
মোমবাতি জ্বালিয়ে এককাপ লিকার চা নিয়ে বসলাম জাফরিকাটা জানলার পাশে। বেলা আসেনি, আমার রোজের বরাদ্দ একপো দুধও আসেনি তাই। অগত্যা অপছন্দের লিকার চা-ই বানালাম।
কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালের নবাগত জেনারেটরটি চালু হয়েছে দেখতে পেলাম। অনতিদূরের হাসপাতাল বাড়ির আলোকিত করিডোর আর কোয়ার্টারের সামনে রাস্তার মুখের একমাত্র হ্যালোজেনের দীপ্তি কিছুটা সাহস ফিরিয়ে আনল অবসন্ন মনে।
ছ’টা নাগাদ পাশের কোয়ার্টারের রীতাদি এলো। সেও একা থাকে। রাতের খাবারের কী হবে সেই আলোচনা করতে এলো রীতাদি।
ওর রান্না হতো হিটারে। সেটি তো বিজলি বিনে অকেজো, তাই আমার স্টোভে দুজনের জন্যেই কিছু করে নেওয়া যায় কিনা শুধোতে এসেছিল। আমরা দুজনেই রুটি খাই রাত্তিরে, কিন্তু আমি রুটি গড়তে জানি না। রীতাদির সবজির ঝুড়িতে কচু রয়েছে কেবল, আমার যদি সেটা খেয়ে অসুবিধে হয়, এই ভেবে সে চিন্তিত হলো।
আমি আটা মেখে দিলাম, শিলে বেটে দিলাম সামান্য আদা লঙ্কা। (কিমাশ্চর্যম, আমার ঘরে ফ্রিজ, গ্যাস না থাকলেও একটা মজবুত শিলনোড়া ছিল।)
রীতাদি রুটি গড়ে কচু আলুর তরকারি করে নিল স্টোভে, মোমবাতির আলোয়। আমি একটু আলু-বেগুন ভেজে নিলাম নিজের জন্য। বিভুঁয়ে, দুর্যোগের রাতে খাবার নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার দুঃসাহস হলো না।
আটটার মধ্যে রান্না, খাওয়া, বাসনমাজা শেষ করে রীতাদি বলল, বাইরে বেরোবে।
আমি আঁতকে উঠলাম। রীতাদি আশ্বস্ত করে বলল, হাসপাতালের সবেধন নীলমণি জিপগাড়ির সারথি কালীদার সঙ্গে ওর কথা হয়েছে। সে ওর পাশের কোয়ার্টারেই থাকে। কালীদা ইভনিং শিফটের সিস্টার স্নিগ্ধাদিকে ওর বাড়িতে নামিয়ে আসবে আর নাইট শিফটের দিদি কৃষ্ণা আচার্যিকে তুলে আনবে তার বাসা থেকে। ওই জিপেই বেরোব আমরা। রোগী আসার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে, তবু দুটি শিফটের মাঝের হ্যান্ড ওভারের সময়টুকু এক আবাসিক নার্সদিদি সামলে দেবেন।
বেরিয়ে পড়লাম দুজনে।
অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা! এক মৃত শহরের মধ্যে দিয়ে চললাম যেন আমরা ক’জন।
অধিকাংশ রাস্তা ডুবেছে জলের তলায়। একটিও দোকান খোলা নেই, ওষুধের দোকানও না। আশপাশের গৃহস্থ বাড়িগুলি দরজা জানলা এঁটে, ভুতুড়ে অন্ধকারে নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই সঞ্চরমান জিপগাড়ি আর তার হেডলাইট ছাড়া কোথাও কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। আমার ওয়াল্টার ডি লা মেয়ারের দ্য লিসনার্স মনে পড়ে যাচ্ছিল।
অন্ধকারে ডুবে থাকা বয়রা কালীবাড়ি, নিঝুম কলকাতা যাওয়ার বাসের গুমটি ছাড়িয়ে স্নিগ্ধাদিকে নামানো হলো তার বাড়ির গলির মুখে।
কালীদা গাড়ি ঘুরিয়ে নেওয়ার মুহূর্তে দেখলাম, তিরের মতো বৃষ্টির ফলার মধ্যে তালপাকানো হেডলাইটের আলোর বৃত্তে একটি কুয়াশাময়ী অবয়ব পাশের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে।
রাতে কোয়ার্টারের দরজায় আমাকে নামিয়ে কালীদা সাবধান করে দিয়ে গেল — ‘দেওয়াল ভিজে রয়েছে, ভুলেও হাত ছোঁয়াবেন না দিদি, কারেন্ট খেয়ে যেতে পারেন।’
লোহার খাটের ঠাণ্ডা বিছানায়, মশারির নিচে চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে বাইরে নারকেল গাছের পাতায় পাতায় উন্মত্ত ঘষাঘষির সরসর আওয়াজ, ঘনঘন বিদ্যুচ্চমকের সঙ্গে কড়কড়ে বাজের ডাক শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই।
একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল মাঝরাতে। কালিয়াগঞ্জের কোয়ার্টারে তখন সব জানলার পাল্লাই কাঠের। একেবারে বন্ধ করে দিলে নিশ্ছিদ্র আঁধারে ডুবে যাব, তাই অসময়ের শীত ধরানো ঝড়জলের রাতেও একটা জানলার আধখানা পাল্লা খুলে রেখে শুয়েছিলাম। সেই ফাঁক দিয়ে হ্যালোজেনের বাতির ক্ষীণ রেখা এসে আলোকিত করছিল ঘরের একটা কোণ — তাতে স্বস্তি হচ্ছিল কিছুটা।
এখন বুঝলাম আলো নিভে গিয়েছে। কারেন্ট এলো কী? সন্তর্পণে নেমে জানলার বাইরে উঁকি দিলাম। না, নী নী করা অন্ধকারে ডুবে রয়েছে হাসপাতাল বাড়ি। বুঝলাম, নবাগত জেনারেটর জবাব দিয়েছে। হাতের কাছে টর্চটা ছিল — দেওয়ালে ফেললাম। সুদৃশ্য দেওয়ালঘড়ি জানান দিল, সাড়ে তিনটে — দুর্যোগের রাত পার হবার মুখে।
বাইরে ঝড়ের ফোঁসফোঁসানি কমলেও বৃষ্টির তেজ কমেনি। এত মেঘ কোন ঠিকানায় আত্মগোপন করে ছিল এতকাল কে জানে!
টর্চের আলোতেই দেখলাম কোয়ার্টারের সামনের একফালি জমি জলে ভাসছে, নয়ানজুলি ভাসিয়ে জল উঠে এসেছে হাসপাতালের সামনের রাস্তাতেও।
আধোঘুম, আধো জাগরণের মধ্যে কেটে গেল বাকি রাতটুকু।
সকালে উঠে দেখলাম, ফ্যাকাশে প্রসূতির মতো আকাশ কান্নাকাটি বন্ধ করেছে অবশেষে। হাসপাতাল বাড়ির দিক থেকে মানুষের হাঁকডাক কানে আসছে।
আজও ডিম-আলুসিদ্ধ আর ভাত খেতে হবে কিনা ভাবতে ভাবতেই চায়ের জল চাপালাম।
মেঝের বেডকভার জলে সপসপ করছে তখন।
আরো খানিক পরে দেখলাম বেলা আসছে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে। এসেই ফরমাশ করল — ‘তোমার দু’টা পুরনো সায়া আর শাড়ি দাও তো দিদি, আমার ঘরে একটাও শুকনা কাপড় নাই আর।’
দুজনে চা পাঁউরুটি খেলাম তারপরে। বেলা আজ দুধ আনতে পারেনি, কিন্তু বাজারের ব্যাগটি চেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল — ‘কিছুমিছু তো আনতে লাগবা, নইলে খাবা কী?’
বিএমওএইচ ডক্টর কোলে এলেন হাঁটু পর্যন্ত গামবুট পরে। বললেন, ‘রাধিকাপুরে খুব ওয়াটার লগিং হয়েছে, ট্রেন লাইন ডুবে গেছে শুনলাম। আমি কিছু ওআরএস, মেট্রোজিল, প্যারাসিটামল নিয়ে চললাম সেখানে, তুমি এদিকে থেকো।’
সঙ্গে যেতে চেয়ে ধমক খেলাম।
‘ভটচাজ নেই, এদিকটাও তো কাউকে দেখতে হবে’।
ডঃ কালীশঙ্কর ভট্টাচার্য আমাদের কলিগ — স্থিতধী, কুশলী ডাক্তার, তখন বাড়ি গিয়েছিলেন, ছিলেন না শহরে।
কারেন্ট এলো দুপুরের পরে। জল নেমে গেল বিকেলে। রোদ উঠল পরদিন। সপ্তাহখানেক পরে আমার কোয়ার্টারের ছাদ মেরামত হয়ে পিচচটের আস্তরণ পড়ল — আর কোনো বর্ষায় জল চোঁয়ায়নি দেওয়ালে।
কেন হঠাৎ পঁচিশ বছর আগের অকিঞ্চিৎকর স্মৃতির রোমন্থন?
আজ আবার এসেছে ঝড়ের রাত্রি — একলা পার করার জন্য।
মাতৃহীন প্রথম পুজো, প্রথম বড়দিন, নববর্ষ, জন্মদিনের মতো প্রথম ঝড়ের রাত এসেছে আজ। নিজের ঘরে, চিরপুরাতন পালঙ্ক-বিছানায়, পরিচিত জানলাটির ধারে বসে বাইরের রোডলাইটের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। জামগাছ দুলছে, দুলছে দূরের নারকেল গাছের মাথা। আঁধারি মেঘাচ্ছন্ন আকাশের চালচিত্রে তাদের ভুতুড়ে দুলুনির সিল্যুয়েট দেখছি বসে বসে। আজও হাতে লিকার চায়ের কাপ, তবে তা আর অপছন্দের নয়। অভ্যাস।
ভয় পাচ্ছি কী? না তো। অন্তরের নিত্য তুফান ঠেলে দিনাতিপাত জলচল হয়ে গিয়েছে, জড়জগতের ঝড়বাদল আর তেমন করে রোমাঞ্চ জাগাতে পারে না।
সকলে সুস্থ থাকুন, সাবধানে থাকুন।।দুর্যোগ পার হয়ে যাবে ঠিক।
ছবিঃ ডা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য










