আজ আপনাদের হাসিনার গল্প শোনাই। হাসিনার মতো মেয়েদের গল্প খুব বড়ো মুখ করে বলার জন্য কেইবা কলম বাগিয়ে মুখিয়ে থাকবে বলুনতো! তাও কিছু সংবেদনশীল মানুষ যত্ন করে হাসিনাদের কথা লেখেন আরও অনেক মানুষের মধ্যে তাদের কথা ছড়িয়ে দেবার জন্য। তেমনই এক কিতাব থেকে তুলে ধরছি হাসিনার কথা।
- “হাসিনা বেগম চেয়েছিল বাঁচতে আর মা হতে – বাঁচতে আর মা হতে। বাঁচতে , মানুষের মত – না না, তার নিজের জন্যে না। শুধু আগতপ্রায়, একটা কোমল, সুন্দর ফুটফুটে শিশুর জন্যে। তার নিজের জীবনের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা ধীরে ধীরে দানা বেঁধে উঠৈছিল। কি তার জীবন! কি আর কতটূকু বা দাম তার। কতদিন আর কেইবা বাঁচতে পারে পশুর মত পালিয়ে পালিয়ে।রাত নেই দিন নেই শুধু পালানো আর পালানো। “ভাগো, ভাগো , পুলিশ কে কুত্তে পিছে হ্যায়”, শুনতে শুনতে তার কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছে । কোনো বিশ্রাম নেই, নেই কোনো বিরাম আর বিরতি এই রাতদিন জঙ্গল , পাহাড় আর নদীর আনাচে -কানাচে লুকিয়ে আর পালিয়ে বেড়ানোর জীবনযাত্রায়। এক একটা রাত মনে হয় যেন একটা বিভীষিকা, একটা দুঃস্বপ্ন। রাতে ঘুম নেই, দিনে বিশ্রাম নেই। কত সইতে পারে একটা মানুষের শরীর? কখনও কখনও ক্লান্তি আর শ্রান্তি সারা দেহ -মনকে জড়িয়ে ধরে আর কাজলটানা চোখের পাতা দুটো নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও নেমে আসে । তখনই সেই ক্ষণিকের জন্যে মনে হয় কি সুন্দর এই। শান্তির ঘুম।”
ওপরের অংশটুকু পড়ে নিশ্চয়ই ইচ্ছে করছে হাসিনার কথা আরও জানতে? এক অনিশ্চয়তা ভরা জীবনকে টেনে নিয়ে চলতে হয় হাসিনা বেগমের মতো আরও বহু মানুষকে। বেহড়ের রুখু প্রাণহীন পরিবেশের আবাসিক এই মানুষদের একমাত্র পরিণতি কাঁধে অগ্নিবর্ষী বন্দুক ঝুলিয়ে বাগী হয়ে যাওয়া। পুতলি, হাসিনা, ফুলন,সীমা ……সময়ের সাথে সাথে নামের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় , কিন্তু তাদের অন্তহীন সমস্যার সমাধান হয় না। আর সেই কারণেই চম্বলের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে আরও আরও অনেক মানুষের নাম যাদের পরিচিতি নিছক মানুষ হিসেবে নয়,বেহড়ের দাগী অপরাধী হিসেবে।
আজি হতে দশক দেড় আগে
এমনই এক অঞ্চলের মানুষের কথা নিয়েই আজ আমার কথকতা। গাঁয়ের নাম করৌলি। পুলিশের খাতায় এই জনপদের পরিচিতি,’ডাকু লোগোকা গাঁও’ নামে । করৌলির অরোরা গ্রামেই বাস করেন সিয়ারাম জী । বিপত্নীক সিয়ারামের এখন ৭০ বছর বয়স, পেশায় কৃষক কিন্তু নেশায় একজন লোকগায়ক। মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের সুখ দুখের কথা নিয়েই গান বাঁধেন সিয়ারাম। হাতে থাকা তার যন্ত্রে ছড় টেনে তোলা সুরের সাথে গলা মিলিয়ে গাইছেন তাঁর নিজের লেখা আর সুর দেওয়া এক দুখিয়া গান–
পানি কি ডোরি হাত নহী
তুম চাহতো বরষাত নহী,
পানি কি অজীব কহানি হ্যায়–
আব ভাই খুয়ারি বিন্ পানি হ্যায়।
***
তোমার হাতে নেইকো জলের ভার
ইচ্ছে তোমার বিফলে যায় তাই।
জলের মর্জি বুঝতে নারি ভাই,
শুকায়ে যায় ক্ষেতের ফসল মোর।

এই এলাকার সমস্ত মানুষের কহানি এক। আসা যাক সম্পত্তি দেবীর কথায়। লোকজন বিদ্রুপ করে ডাকুকা বিবি বা ডাকাতের বিবি বলে। সবসময় মনে গভীর শঙ্কা বয়ে বেড়াতে হয় তাঁর প্রিয় মানুষটির জন্য – যদি না ফেরে! এলাকা জুড়ে দাপিয়ে বেড়ায় খরা আর ডাকুদের দলবল। সম্পত্তি দেবী জানেন এমন বৃষ্টিহীন রুক্ষতার জন্যই এলাকার মরদ আর জেনানারা ডাকাতি করতে বাধ্য হয়েছে। বেহড়ের বন্ধুর পটভূমি, আর এমন লাগাতার খরা আর অনাবৃষ্টির জন্যই তাদের এলাকার এমন প্রতিকূল পরিণতি। বহু বছর আগে তাঁদের পুরখোরা যেসব ইঁদারা, তলাব খনন করেছিলেন সেগুলো এখন নির্জলা খটখটে। সম্পত্তি শুনেছেন – ধরতী কি বাতাবরণ বদলে গেছে। তাই তাঁদের এমন দুর্গতি – চাষবাস লাটে উঠেছে, গৃহস্থালি পশুদের মাঠে মাঠে চড়ানোর কাজও বিলকুল বন্ধ।
নাই চাষ তো হাহুতাশ। চলো ডাকাতি করি , যাঁদের কিছু আছে চলো তাদের কাছ থেকে লুটমার করে আনি। পুলিশের হাত এড়িয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা, আর বেহড়ের পাথুরে খাঁজ, কন্দরের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকা। এক অনিশ্চিত জীবনের নিরন্তর টানাপড়েন। ১৯৫১ – ২০০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে করৌলিতে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৭২২.১ মিলিমিটার। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে তা কমে দাঁড়ায় ৫৬৩.৯৪ মিলিমিটার , প্রায় ১৫০ মিলিমিটারের ঘাটতি। প্রাকৃতিক প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করতে করতে পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে। ২০১০ সালে এলাকার সমস্ত মহিলারা সংগঠিত হয় পালটা লড়াইয়ের জন্য। প্রতিপক্ষ প্রকৃতি আর সমাজ।
প্রথমে তাঁরা তাঁদের মরদদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে বন্দুক ছেড়ে আবার গাইতি আর লাঙ্গল ধরার ডাক দেয়। এমন আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে পুরুষরা স্বাভাবিক ভাবেই খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাঁদের বাগী হয়ে যাওয়া মন জমিনের কাছাকাছি ফিরতে চাইলেও, মেজাজ বন্দুকের বন্ধুত্বকে এড়াতে চায়না। আবার শুরু হয় নতুন এক যুদ্ধ – চেনা জীবনে ফিরে আসার লড়াই। অদম্য নিষ্ঠায় প্রমীলা বাহিনীর যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে। কুখ্যাত হয়ে ওঠা স্বামীদের আবার জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার লড়াই।
“আমি হয়তো এতোদিনে পুলিশের গুলিতে শেষ হয়ে যেতাম। কিন্তু সম্পত্তি আমাকে তেমন পরিণতি হাত থেকে রক্ষা করেছে। ওঁর কথাতেই রাজি হয়ে আমি থানেদার বাবুর কাছে গিয়ে আমার বন্দুক ফেরত দিয়ে আবার লাঙ্গল হাতে তুলে নিয়েছি। আমার মতো আরও অনেককে সম্পত্তি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে , বদল এনেছে আমাদের অনিশ্চিত সঙ্কুল জীবনে। আমার বয়স এখন ৫৮। এই বয়স শান্তি চায় , স্বস্তি চায়। এখন এই জীবনে নতুন করে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছি। “ – নিজের কথাতেই কেমন মজে যান প্রবীণ বয়সের উপান্তে এসে পৌছানো জগদীশ জী, সম্পত্তি দেবীর স্বামী।

করৌলির মানুষ এখন জানে – জল মানেই জীবন,জল মানেই কর্ষণ,সৃজন এবং জীবনের উল্লাস। করৌলিতে এখন খরা আর বন্যার প্রবেশ নিষেধ। প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে নদী থেকে বেআইনি ভাবে বালি তোলা, আর পাহাড় ফাটিয়ে যথেচ্ছভাবে খোঁড়াখুঁড়ির বিরুদ্ধে। প্রকৃতিকে এভাবে নষ্ট করে ফেলার বিরুদ্ধেও চলে গণজাগৃতির পর্ব। সবই ওই ডাকাতিয়া বউদের উদ্যোগে।
দেড় দশক আগের করৌলি আজ বিলকুল বদলে গেছে। ওখানকার মানুষ আজ বুঝতে পেরেছে সুস্থিত উন্নয়নের অর্থ। বড়ো বড়ো প্রকল্পের হাত ধরে নয়,বদল এসেছে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই আর হাতে হাত রেখে সমবেত প্রয়াসের মাধ্যমে। রাজস্থানের সবথেকে ভয়ানক ডাকাত অধ্যুষিত খতরনাক্ এলাকা, খেতি বারির কল্যাণে পরিবর্তিত হয়েছে এক সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চলে। সমৃদ্ধি এখন করৌলির জীবনের সমার্থক। যাঁদের এককালে খাটো চোখে দেখতো সমাজ, সেই ডাকাতিয়া বউরাই নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছে নীরবে নিভৃতে নিঃশব্দে। কোনো প্রশংসাই যে ওদের জন্য যথেষ্ট নয়।
আজও গান গাইছেন সেদিনের সেই সিয়ারাম জী। জীবন যেমন কখনও থেমে থাকেনা,তেমনই থেমে থাকেনা গান, মানুষের গান, মাটির গান। সিয়ারাম এখনও গান বাঁধেন,গান গেয়ে ওঠেন নিজের খেয়ালে। বয়স বেড়েছে । বছর দুই আগে হারিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী,সহধর্মিনী প্রেমা দেবীকে।
এখন সুখ এসে ঘর বেঁধেছে করৌলির মহল্লায় মহল্লায়। আর তাই সিয়ারাম জীর গানের কথা আর সুরে এসেছে পরিবর্তন।
বছর পনের আগের দুঃখের গান তাই বদলে গেছে উপচে পড়া সুখ স্বস্তি আর সমৃদ্ধির পরশে। সিয়ারাম গান ধরেন –
পানি হী জীবনকা সাথী
পানি বিন্ মর যায়ে হাতী,
শুন্ লো দাদা,ভাই ,নাতি
মিল জায়গা ধন রতন
আগর হাম পানি রোকনেকা
করে যতন, করে যতন।
***
জল যে মোদের জীবনসাথী, মানোহ্ সবাই
জলাভাবে হাতীও মরে, জানোহ্ সবাই।
একথা আমি আজকে কহি শুনহ্ সবাই
শুনহ্ দাদা,শুনহ্ ভাই, শুনহ্ সব নাতি ,
পরম ধন পাইবে খুঁজে, যদি চাহে মন–
জল গড়ানো বন্ধ করো,পাওগো সুখ অতি।
সূর্যদেব পাটে নেমেছেন বেশ খানিকক্ষণ আগে । বাড়ির দাওয়ায় বসে একমনে গেয়ে চলেছেন সিয়ারাম জী। তাঁর গানের সুর ছড়িয়ে যায় করৌলির মাঠে – প্রান্তরে। সেই সুর শরীরে মেখে খলখলিয়ে বয়ে চলে ছোট্ট শেরনি নদী। খরার শুখা কাটিয়ে সেও যে আজ পরম সুখী।
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন সর্বভারতীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন। ছবি প্রতিনিধিত্ব মূলক।
আগস্ট ২৯.২০২৫












বাহ! অসামান্য কাজ কে অসামান্য ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন!
অ সামান্য মন্তব্য। ধন্যবাদ রইলো।
খুব সুন্দর কষ্টার্জিত সাফল্যের গল্পঃ। ভালো লাগলো বেশ পড়ে।
কষ্ট করে পাওয়া সাফল্যের আনন্দই আলাদা ।