আজ প্রথমে এক পরিবার এসেছিল তাদের ঊনআশি বছরের বৃদ্ধা (থুড়ি বয়স্কা, আশি বছর না হলে বৃদ্ধা বলা যাবে না এখন) মা কে নিয়ে এসেছিল। তিন মাস আগে তাঁর কোমর ভেঙেছিল। অপারেশন করে দিয়েছিলাম। রোগী দিব্যি হাঁটছিল। তারপর আবার পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছে।
এক্স-রে করা হল। কোমরের অবস্থা খুব খারাপ। মেরুদন্ডের হাড় ক্ষয়ে গিয়ে বেঁকে গেছে। অষ্টিওপোরোসিস হয়ে হাড়গুলো ঝাঁঝরা। কয়েকটা হাড় চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। কোনোটা নতুন ভাঙা কিনা বোঝা যাচ্ছে না। এম আর আই স্ক্যান করা দরকার।
রোগীর ছেলে বলল, ‘এনার কি ভবিষ্যত?’
‘দেখুন, আমি তো ডাক্তার। রোগীর চিকিৎসা করি। ভবিষ্যত গণনা করা আমার কাজ নয়। তবে হ্যাঁ, এমনও হয়েছে, ১০১ বছরের রোগীর অপারেশন করেছি। তারপর তিনি সুস্থ শরীরে আরো তিন বছর বহাল তবিয়তে ছিলেন।আবার বিয়াল্লিশ বছরের ডায়াবেটিক রোগীর পায়ে পুঁজ হয়েছে। অপারেশনের পরিকল্পনা চলছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঠিক আগের দিন রোগী নিজের বাড়িতেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে হঠাৎ মারা গেছে। তাই ভবিষ্যতে কি ঘটবে, তা আমি বলতে পারব না।’
তারপর আর একজন রোগী এলেন। বেশ অবস্থাপন্ন। একটা ছোট অ্যাক্সিডেন্টে বুকের দুটো পাঁজর ভেঙেছিল দু’মাস আগে। এখন প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি ভয়ে নিজে থেকেই মাসে দুবার করে এক্স-রে করান। এবারও করিয়ে নিয়ে এসেছেন।
‘ডাক্তারবাবু, হাড় জুড়ে গেছে?’
‘জুড়ছে। তবে এই হাড় পুরোপুরি না জুড়লেও সমস্যা ছিল না।’
শুনে রোগীর ছেলে আঁৎকে উঠল। ‘সে আবার কি?’
‘হ্যাঁ, বুকের সার্জারির সময় থোরাসিক সার্জেনরা এবং মেরুদন্ডের সার্জারির সময় স্পাইন সার্জেনরা অনেক সময় একটা পাঁজর কেটে রোগের আসল জায়গায় পৌঁছায়। তাতে তো রোগীদের কোনো অসুবিধা হয় না। তাহলে এক্ষেত্রে হবে কেন?’
রোগী বলল, ‘অদ্ভুত তো!’
আমি বললাম, ‘সেইজন্য পাঁজর ভাঙলেই, বিশেষ কোনো জটিলতা না থাকলে আমি বারবার এক্স-রে করাই না। প্রয়োজন নেই।’
রোগী বলল, ‘আসলে সবাই বলল, আর আমি ভয় পেয়ে গেলাম।’
‘মানুষের এই ভয়কেই মূলধন করে ব্যবসা চালাচ্ছে কত লোক ! আচ্ছা এটা ভেবে দেখেছেন, কিছু ডাক্তারকে কমিশন দিয়ে বেশী বেশী টেষ্ট লিখিয়ে অন্যায্য ব্যবসা করার থেকে অনেক কার্যকরী উপায় হচ্ছে সাংবাদিকদের ঘুষ দিয়ে সংবাদপত্রে বা ওয়েবসাইটে মিথ্যে লেখা লিখে জনসাধারণকে ভয় পাইয়ে দেওয়া- যাতে দলে দলে লোক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হাসপাতাল-ল্যাবরেটরীতে দৌড়ায়।’
রোগীর ছেলে বলল, ‘কিন্তু অনেক সময় কর্পোরেট কোম্পানীগুলো তো এগুলো ফ্রী-তে করায়!’
বললাম, ‘ইংরেজীতে একটা কথা আছে- দেয়ার ইজ নো ফ্রী লাঞ্চ। ভেবে দেখেছেন কখনো- কর্পোরেট সংস্থাগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে তাদের সুস্থ সবল তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী কর্মীদের বাৎসরিক হেল্থ চেক আপ করায় কেন?’
‘কেন?’
‘তথ্য। এতে করে কর্মীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য কোম্পানীর হাতে চলে যায়। তার উপর ভিত্তি করে কোম্পানীগুলো কর্মীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, ছাঁটাই- এসব বিষয়ে তার ষ্ট্র্যাটেজি ঠিক করে।’
‘অ্যাঁ, বলেন কি?’
‘বড় বড় ল্যাবরেটরি বা হাসপাতাল গুলোর লাভ হয়- তারা অনেক খদ্দের (খদ্দের-ই বলা উচিত, কারণ এরা সুস্থ মানুষ, রোগী নন) এবং অনেক পরীক্ষা একসাথে পায়। তাই বেশ কিছু ডিসকাউন্ট দিয়েও তাদের লাভ থাকে।’
সবাই সমস্বরে বলল, ‘আর আমরা ফ্রী-তে বা সস্তায় হেল্থ চেক-আপ হচ্ছে বলে মহানন্দে লাফাতে লাফাতে পরীক্ষা করাতে যাই।’
‘ঠিক তাই।’
‘তাহলে রোগ হওয়ার আগে কি করে আটকানো যাবে?’
‘রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। যেমন- ধূমপান ত্যাগ, ব্যয়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, টাটকা খাবার খাওয়া, মশা বা জলবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ – এসব তো করাই যায়। এছাড়া, কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ কোনো কোনো রোগ বেশী হয়। তাদের মধ্যে সবার ওই রোগনির্ণয় সংক্রান্ত পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং টেষ্ট আগে থেকে করে লাভ হয়। যেমন ৪৫-৫৫ বছরের মহিলাদের মধ্যে স্তনের ক্যান্সার, ড্রাইভারদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের স্ক্রিনিং টেষ্ট।’
রোগীর ছেলে জিজ্ঞাসা করল, ‘হেল্থ চেক আপ প্যাকেজে তো প্রচুর অপ্রয়োজনীয় টেষ্ট হয়?’
‘হয় তো! একটা উদাহরণ দেই। কয়েকদিন আগে একজন হোমরা-চোমরা পুরুষ রোগী আমাকে দেখাতে এসেছে। হাতে বেশ কিছু রিপোর্ট নিয়ে। তাতে কলকাতার এক নামকরা সরকারি হাসপাতালে করা একটা হেল্থ চেক আপ প্যাকেজে করা কিছু রিপোর্ট ছিল। তারমধ্যে দেখি ‘সি এ-১২৫’ নামক এক টেষ্টের রিপোর্ট। যেটা ওভারি বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার সনাক্ত করতে ব্যবহার হয়। এটা হয়ত অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু এতে সরকারি হাসপাতালের মূল্যবান রিসোর্স নষ্ট হয়েছে।’
রোগী বলল, ‘এ তো বিয়েবাড়িতে গাদা গাদা খাবার নষ্ট করার মত ব্যপার।’
‘একদম তাই। আর দেখা যাবে, প্রত্যন্ত গ্রাম্য অঞ্চলে সামান্য এক্স রে বা রক্তের সহজ কিছু পরীক্ষার সুযোগ নেই বলে কত মানুষ মারা যায় বা শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে থাকে।’
‘বুঝেছি। আর এরকম পাগলের মত অকারণে বারবার এক্স-রে করতে দৌড়ব না।











