সুধাংশুশেখর বসু, নামটা বেশ ভারিক্কি এবং নামটা শুনলে মনে হয় যার নাম তিনি লোকটি বোধহয় বেশ অনেকটা প্রভাবশালী। আসলে কিন্তু লোকটা সে তুলনায় নিতান্তই ছাপোষা এবং আদ্যোপ্রান্ত গৃহস্থ টাইপের। নিজের অবশ্য বউ বাচ্ছা নেই । তবে গৃহ ও সংসার আছে এই মধ্য বয়স্ক মানুষটির।
মা আছেন, বয়স্ক এবং অসুস্থ। একটা ভাই ছিলো নতুন বউ এবং চাকরি নিয়ে সে শহরতলীর অন্য প্রান্তে উঠে গেছে।এখন পৈতৃক বাড়িতে তিনি আর তার সত্তরোর্দ্ধ মা।
অফিস থেকে বেরিয়ে অন্য দিনের মতোই রাজভবনের পাশ দিয়ে এসে শহীদ মিনারের চত্বরে ঢুকলেন। খোলা মেলা জায়গা প্রাচীর, প্রহরী, আগল কিছুই নেই। লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে, দাঁড়িয়ে আছে। দোকানদাররা মালপত্র বিক্রির জন্য হাঁকা হাঁকি করছে। চা আছে, বাদাম আছে,ঝালমুড়ি আছে, ভুট্টা স্যাঁকা আছে।
সুধাংশু এসব দেখেন এবং বেশির ভাগ সময়ই দেখেন। কখনও সখনও একটু চা খান। তবে এই সব খাদ্যাভাসে তিনি অভ্যস্ত নন। জীবনের কিছু ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ নিয়ম কানুন তিনি মেনে চলেন। যেগুলোকে লোকে সুঅভ্যাস বলে। রোজ একটু ব্যায়াম করেন। হাঁটা হাঁটি করেন, নিজের কাজ নিজে করেন। পাড়ার লোকজনের বিপদে আপদে এগিয়ে যান।
এইতো সেদিন রঘু যাদব বলে যে লোকটা খাটালের গরু মহিষ পরিচর্যা করে আর তিনি সেখান থেকে মায়ের জন্য রোজ অল্প দুধ নেন, সন্ধ্যারাতে তার খুব পেটে ব্যথা আর বমি শুরু হলো। তিনি সে সময় ওর কাছাকাছি ছিলেন। সচরাচর লোকে এসব ঝামেলার ব্যাপার এড়িয়ে যায়। কিন্তু তিনি একটা রিকশা ডেকে তাকে কাছাকাছি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ইনজেকশন ও ওষুধের ব্যবস্থা করে তারপরে বাড়ি ফিরলেন। ভাগ্যিস ভাই আর ভাইবউ এখন থাকে না এই বাড়িতে। না হলে এই নিয়ে একপ্রস্ত বাক-বিতন্ডার সম্বাবনা অবশ্যই ছিলো। তা সুধাংশুবাবু এই ধরনের লোক। তিনি পোষ্ট এ্যান্ড টেলিগ্রাফ অফিসের কেরানি। বাবু তো বটেই।
একটা জটলা মতো কিছু নজরে পড়লো মাঠের দক্ষিণ পশ্চিম কোণের দিকটায়। আমল দিলেন না। এই জগাখিচুড়ির কলকাতা শহরে কত কিছু ঘটছে সবসময়।
ট্রাম ডিপোর কাছে বাস গুমটি থেকে একটা বাসে উঠলে তিনি সরাসরি পানিহাটি অবধি পৌঁছে যান। তাই তিনি আর ট্রেনের জন্য দৌড়ো দৌড়ি করেন না। বাসে অনেক সময় একটু ঘুমোতেও পারেন। মোটকথা বাস জার্নি তার অপছন্দ নয়।
জটলার দিক থেকেই চা ফেরিওয়ালা ছেলেটা আসছিলো।
– একটা চা দাও তো ভাই।
– আর বলবেন না। এই হিন্দুস্থানীগুলোর কথা।
চা দিতে দিতে ছেলেটা কিছু বলার চেষ্টা করলো।
– কি হয়েছে ভাই ওখানে, জটলা ক্যানো ?
– মাদারির খেলা দেখায় যে মেয়েটা তার মা মরে গেছে, বাবা তাকে খেলায় লাগিয়ে কেটে পড়েছে । সে একাই খেলা দেখাচ্ছিলো পড়ে গিয়ে কান্নাকাটি করছে।
সুধাংশুর রক্তে পরোপকার আর হৃদয়ে সহানুভূতি। সে চায়ের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে। একপা একপা করে জটলার দিকে এগিয়ে গেলেন । দেখলেন অসহায় একটা দশ বারো বছরের মেয়ে হাঁউ মাঁউ করে কাঁদছে। আর বলছে,- ও মেরি পাপা নেহি হ্যায়। মেরি মা মর চুকি। ইত্যাদি কথা বার্তা।
যতটুকু সে বোঝাতে চাইলো এবং সুধাংশু বুঝলেন তার সারমর্ম এরকম– তার নিজের মাকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে এই মাদারির খেলোয়াড় বিহার থেকে কলকাতায় পালিয়ে আসে এবং হাওড়ার কোন বস্তিতে ঘর ভাড়া করে থাকতো। মা আবার একটা বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে কাল রাতে হাসপাতালে মারা গেছে। আর মাদারির খেলোয়াড় বাপ তার সাথে আজ এই অবধি এসে খেলা শুরু করে দিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেছে। সুধাংশু বুঝলেন ঘটনা জটিল। আশপাশে তাকিয়ে দেখলেন। জটলা অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। তিনি প্রমাদ গুনলেন।
সাড়ে ছ’টা বাজে আর দেরি করলে বাসে ঠাসা ভিড় হতে থাকবে। মেয়েটার যে কোথাও খুব বেশি আঘাত লেগেছে তেমন মনে হলো না। সে বুঝতে পেরেছে তার আপন মা মারা গেছে আর পালক বাবা হয় কোন বিপদ বুঝে তাকে আরো বিপদে ফেলে নিরুদ্দেশ হয়েছে। এখানে সুধাংশু কেরানীর কি করা উচিৎ?
তিনি বুঝতে পারলেন এর মধ্যে বেশি জড়িয়ে পড়লে বিপদ তাকেও ছাড়বে না। মনের ভেতরে খুঁতখুঁতানি থাকা সত্বেও তিনি সুযোগ বুঝে পিছন ফিরে হন হন করে হাঁটতে শুরু করলেন। এখনও হয়তো বাসের লাইনে তেমন ভিড় হবে না। দূরপাল্লার বাসের ডিপোটাকে ডান দিকে রেখে রাস্তা পেরোলেন। ট্রাম ডিপোর কাছে তাঁর বাসটা দাঁড়ায়।
মনে হলো একটা বাস বোধহয় দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু জোরে হাঁটলেই পেয়ে যাবেন।
যাক পৌঁছে গেছেন। যে বাসটা দাঁড়িয়ে আছে সেটা তাঁর রুটের নয়। পাশের লাইনে কয়েকজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে আর একটা লাইনে। দু একটা মুখ চেনা। দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। মনে করার চেষ্টা করলেন অসহায় মাদারির খেল দেখানো মেয়েটির কথা। মা তো মরে বেঁচে গেলো, বাপের ছদ্মবেশে যে লোকটার কাছে সে খেল দেখাতো সে সুযোগ বুঝে পালিয়ে গেলো।
বাসটা এসে দাঁড়াতেই লাইন এগোতে থাকলো। তিনি পাদানিতে একটা পা রাখতেই মনে হলো পেছন থেকে কেউ যেন জামাটা টেনে ধরলো। পাত্তা দিলেন না। উঠে জানার ধারে একটা সিট নিয়ে বসে পড়লেন। আর তখনই তাঁর গালে মাছি যাওয়ার মতো অবস্থা। তার পাশের সিটেই ফাঁকা জায়গা পেয়ে বসে পড়লো সেই মাদারির খেল দেখানো হিন্দুস্থানি মেয়েটা। অবিন্যস্ত রুক্ষ এক মাথা চুল, ছেঁড়া তাপ্পি দেয়া একটা রংচটা জামা পরা। সজল কটা চোখে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কি করবেন বুঝতে পারলেন না। ঘন্টি বাজিয়ে বাস ছেড়ে দিলো। বসার জায়গা পরিপূর্ণ তো বটেই, দাঁড়িয়ে রয়েছে লোকজন।
তাঁর কি করা উচিৎ। মেয়েটাও কি এইদিকে থাকে? না সে কি তার পিছু নিয়েছে সাহায্যের জন্য।
– কাঁহা যায়োগি?
– পতা নেহি।
এইটুকুই তিনি প্রত্যুত্তরে পেলেন। সমস্যা যে আরো গভীর তিনি বুঝতে পারলেন ।
পোষ্ট এন্ড টেলিগ্রাফ অফিসের করণিক সুধাংশু বাবুর এরপর কি করা উচিৎ তা তিনি নিজেই বুঝতে পারলেন না। ততক্ষণে মেয়েটা তো চোখ বুজিয়ে ঘুমোতে শুরু করেছে। বুকের ওপরে মাথাটা ঝুলে পড়েছে। তাঁর গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। সরাতে গেলে পড়ে যাবে।
কি মুস্কিল রে বাবা!
মেয়েটাকে জানালার দিকে সরিয়ে দিয়ে তিনি এপাশে বসলেন। সে যাতে আহত না হয়। একটু পরে কন্ডাকটর টিকিট নিতে এলে দুটো টিকিটই তিনি কেটে নিলেন।
বাসটা এগিয়ে চললো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, যানবাহন, অফিস ফেরতা লোকজনের আর ট্রাফিক পুলিশের হাতের সিগনাল কাটিয়ে। বোঝা গেলো আজ তিনি ঘুমোতে পারবেন না। তাঁকে পাহারাদারি করতে হবে যেন মেয়েটা অসতর্ক হয়ে মাথায় ঠোক্কর না খায়।
বুঝতে পারলেন না কাজটা ঠিক হলো? অজানা অচেনা একটা প্রাণীর দায়িত্ব এভাবে নেয়া কি যায়?
অবশ্য তাঁরই বা কি করার ছিলো?
ভিড় ভাট্টা কাটিয়ে বাসটা এগিয়ে চললো সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে শ্যামবাজারের দিকে। যাত্রীরা সবাই নিজের নিজের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কেউ বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে তো কেউ পাশের যাত্রীর সাথে বাক্যালাপ করছে। তিনি চুপচাপ চোখ বুজিয়ে রইলেন।
সমস্যার স্তর বোঝানোর জন্য লোকে শরীরের কতটা অংশ জলে নিমজ্জিত সেই সব নিয়ে উদাহরণ দেয়। সেই অর্থে তিনি গলা অবধি অনেকবারই ডুবেছেন।
যখন স্নাতক স্তরে পড়াশুনা করছেন তখন বাবা মারা যান। বাবা মিউনিসিপালিটির একটা দপ্তরে ছোটখাটো চাকরি করতেন। তাঁর হঠাৎ মৃত্যু সংসারে শুধু শূন্যতা ও শোক নিয়ে এলো না, নিয়ে এলো চুড়ান্ত আর্থিক অনটন । তখন এই বাড়িটায় সবে ছাদ ঢালাই হয়েছে। গলা জল বোধ হয় সেটাকেই বলে। মা,ছোট ভাই এই নিয়ে টানাটানির সংসার। তবুও উঠে দাঁড়ালেন। ডুবে গেলেন না। টিউশন ধরতে হলো কয়েকটা। মাকে আর্থিক অনটন খুব বেশি বুঝতে দিলেন না। ভাইও বুঝতে পারলো না। সে তখন নিতান্তই ছোট ক্লাস এইট-এ পড়ে।
মেয়েটার দিকে একবার আড় চোখে তাকালেন। অঘোরে ঘুমোচ্ছে। আর আগাম ভাবতে ভালো লাগছে না। কাল দেখা যাবে। যা হওয়ার হবে।
ভালো হলো না স্নাতকের ফলাফল তবে অনার্স নিয়ে বানিজ্য বিভাগে পাশ করলেন। এবার একটা চাকরি চাই। আর পড়া চালানো যাচ্ছে না। রাতদিন এক করে চাকরির পড়া পড়তে লাগলেন আর ফর্ম ফিল আপ করতে লাগলেন।
সহপাঠীদের সাথে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ মাড়ানো হলো না। মা বলতো তুই পড়। আমি পরের বাড়ি রান্নার কাজ করবো।
তিনি বলতেন,- মা, বাবা তোমাকে আর ভাইকে আমার দায়িত্বে দিয়ে গেছে। আমাকে সেটুকু পালন করতে দাও।
বিভাবতী বুঝেছিলেন ছেলেকে এর বেশি আর কিছু বলা যাবে না। বললেও সে শুনবে না। জীবন যুদ্ধ আরো চললো কিছুদিন।
তিনি একটা দুটো করে ইন্টারভিউয়ের ডাক পেলেন। ভাইও মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক সসম্মানে পেরিয়ে বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে ভালো কলেজে ভর্তি হলো।
তারপর সেই বহুপ্রতীক্ষিত দিনটা এলো যেদিন একটা জয়েনিং লেটার নিয়ে এই অফিসে যোগদান পর্ব সারলেন। জি পি ও-র লাগোয়া পশ্চিম দিকে এই অফিস। কিছুটা এগোলে হুগলী নদী। ওপারে হাওড়া স্টেশন। তাঁর বেশ পছন্দ হলো অফিসের পরিবেশ। লোয়ার ডিভিশনের পদ। তা হোক, এতে কিছু এসে যায় না। জীবনে বাঁচতে গেলে কিছু আয় করতে হয়। আর আয় করতে গেলে একটা চাকরি দরকার হয়, অন্ততঃ বাঙালির কাছে । মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে সরকারি চাকরি তো হাতে চাঁদ পাওয়ার সমান। তাও কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি।
এরপর তিনি কাজ নিয়ে পড়লেন। সেটা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করলেন কিভাবে যে কোন কাজ কতো নিঁখুত করে অতি দ্রুততার সাথে কাজের গুণগত মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে কাজ পরিসমাপ্তি করা যায়। তিনি সফলও হলেন। সবাই অফিসে জেনে গেলো সুধাংশু শেখর ভালো কাজ করেন। অফিসাররা তাঁর কাজের খাতির করে তাঁকে একটু প্রশ্রয়ও দেন।
সুধাংশুর আরো একটা গুণ, কোন ভাবেই ঝগড়াঝাটিতে জড়িয়ে পড়েন না। তাই অফিসের ক্লাবঘরে তিনি বেশ পরিচিত মুখ।
ক্লাবের নাট্যগোষ্ঠীর বার্ষিক নাট্য নিবেদনের তিনি একজন সখের অভিনেতাও বটে।
ডানলপ মোড় পেরিয়ে যাওয়ার পর বাসটা একটু টেনে চললো। আর বেশি দেরি নেই। মেয়েটির দিকে তাকালেন । দেখলেন ঘুমচোখে এখন সে মিটমিট করে তাকিয়ে আছে সুধাংশুর দিকে। সে যেন ধরেই নিয়েছে তার টিকিট কাটবেন সুধাংশু এবং তাকে জাাগিয়ে ঠিক জায়গায় নামিয়েও দেবেন তিনি ।
ও কি হাসছে তাঁর এই কাদায় পড়া অবস্থা দেখে?
আর একটা স্টপেজ পেরোলেই তাঁকে নামতে হবে।
– আভি উতারনা হোগা, তৈয়ার হোকে রহেনা।
সে তো তৈরিই আছে। তাকে আলাদা করে কি আর রেডি হতে হবে?
সুধাংশুর পিছু পিছু সে নামলো। এমন ভাবে সে নামলো দেখে মনে হলো সে এভাবে রোজ নামতেই অভ্যস্ত।
মোড়ের মাথায় চেনা স্টেশনারি দোকান থেকে কিছু টুক টাক জিনিস কিনলেন। চেনা দোকানদার। জিজ্ঞাসা করলো- দাদা, একে নিয়ে এলেন? পারবে সব সামলাতে?
কি সামলাতে হবে তিনি নিজেও জানেন না।
শুধু মা মাঝে মাঝে বলে,-এবার একটা কাজের মেয়ে নিয়ে আয়।
এইটুকু বাচ্চাকে দিয়ে কাজ করাবেন? সেটা শুধু আইন বিরুদ্ধ নয়, বিবেক বিরুদ্ধও বটে।
কয়েক মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ। একটা আগল ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সাথে আজকের ছায়া সঙ্গীও ঢুকে পড়লো। বাইরে উঠোনের মতো একটা ছোট্ট জায়গায় হাত পা ধোয়ার ব্যবস্থা। তিনি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে মায়ের ঘরে গেলেন। নবাগতাও তাকে অনুসরণ করে সেখানে হাজির।
– মা দেখো, এখন থেকে ও এখানে থাকবে।
সময় কাটানোর জন্য এই সময় বিভাবতী টেলিভিশনে খবর দেখেন, কখনও বা বাংলা ধারাবাহিক দেখেন। আর অপেক্ষা করে থাকেন কখন তার বড় ছেলে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে তাকে সারা দিনের জমিয়ে রাখা গল্প বলবেন। হাসবেন দুজনে একসঙ্গে। এই অভ্যাসটা সে ওর বাবার মতোই পেয়েছে। সন্ধ্যা বেলায় সেই গৃহ অন্ত মানুষটা কাজের শেষে এভাবেই গল্প করতেন।
বড় চোখ করে অবাক হয়ে বিভাবতী বললেন- এইটুকু পুঁচকে মেয়ে, কোত্থেকে নিয়ে এলি?
তারপর নবাগতার উদ্দ্যেশে বললেন – এই মেয়ে কি নাম তোর?
– লছমি, মাইয়া।
– ও বাবা, এতো মা লক্ষ্মী! তুই বাংলা জানিস না?
– হঁ মা জি, হাম সব সমঝতা হ্যাঁয়।
তাকে কলঘরে পাঠিয়ে সব বুঝিয়ে দিয়ে সুধাংশু মাকে ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণ দিলেন। মা শুধু বললেন,- ওই বাক্সটা খোল দেখ, ভাইয়ের ছোটবেলার দু একটা জামা প্যান্ট আছে ।
সে শুধু মাদারির খেলাতেই দক্ষ নয়। সে সাংসারিক জীবনেও বেশ চটপটে। সে শ্যাম্পু করেছে, গায়ে সাবান দিয়েছে এবং তাকে দেয়া ব্রাশ পেষ্টেরও সঠিক ব্যবহার করেছে। একটা গামছা জড়িয়ে দ্বারপ্রান্তে এসে তাকে এরপর কি করতে হবে তার নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে।
রাতে সুধাংশু নিশ্চিন্তে অনেকক্ষণ ঘুমোলেন। রাতে মা জল পান করেন এক দুবার বাথরুমে যান। কাল একবারও তাঁকে উঠতে হয়নি। ওই ঘর থেকে কোন ডাক আসেনি। নিশ্চয়ই ঐ মাদারির খেল দেখানো চটপটে মেয়েটা সব সামলে নিয়েছে।
মা সকাল থেকে হাঁক পাড়ছেন- এ লছমি, ইধার আয়। দাদাকে চায়ে দে।
একটা রাত সে এবাড়িতে পার করেছে। কিন্তু তার চলন বলনে চলা ফেরায় সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
তিনি নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে বেরিয়ে গেলেন। বুঝলেন মাকে বোঝানোর কিছু নেই। কি ভাবে বাঁশের মাথায় টাঙানো দড়ির ওপরে ট্রাপিজের খেলা দেখানো মেয়েটাকে সামলাবেন সেটা তিনি বুঝে গেছেন।
একটা ফাঁকা বাসে জানালার ধারে সিট পেয়ে গেলেন। এই অফিস টাইমে এরকম প্রাপ্তি যেন লটারি পাওয়ার সমান। যদিও বাসের উৎস স্থানটা একটা দুটো স্টপেজ আগে।
বিভাময়ী এই সময়টা একা কাটান বাড়িতে। ছোট ছেলে বৌমা এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এই শূন্যতা তাকে গ্রাস করে। পাশের বস্তিতে থাকা একটা মেয়ে এসে কিছু সময়ের মধ্যে ঠিকে কাজ এই বাসন মাজা, ঘর ছাড়া মোছা করে চলে যায়।
রান্নার লোক আসে পরে। সে রান্নাবান্না করে খেয়ে দুপুরের ঘুমটা এখানে সেরে বিভাময়ীকে চা বানিয়ে দিয়ে যায়।আজ তিনি অন্ততঃ একাকী হবেন না , নিঃসঙ্গতা থাকবে না। লছমী তাকে সঙ্গ দিতে পারবে।
হংকং ব্যাঙ্কের স্টপেজে বাসটা থামতেই তিনি নেমে পড়লেন। একটু আগে পিছে নামেন তিনি, হয়তো একটু হাঁটেন। এই শহরের ফুটপাত তাঁকে বেশ আকর্ষণ করে। কত রকমারি পসরা নিয়ে শহরের বাইরের প্রত্যন্ত জায়গা থেকে এখানে জিনিসপত্র বিক্রি করতে লোকজন আসে। হয়তো ফুটপাত দখল করে নেয়। পথচারীদের হাঁটতে অসুবিধা হয়। তবুও তো সৎপথে কিছু উপার্জন করে সংসার চালায়।
তিনি দেখেন আর ভাবেন, ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাদের অবস্থান তো একই হওয়ার কথা। জীবনটা কি একটা কম বড় যুদ্ধ?
তাঁকেও কি কম লড়াই করতে হয়েছে। শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই আর তিনটি প্রানীর অন্নসংস্থান করতে গিয়ে অপরিনত বয়সের কঠিন একক লড়াই।
প্রসন্ন চিত্তে কাজ শুরু করলেন। কালকে কাজটার যেখানে যতি রেখে চলে গিয়েছিলেন সেখান থেকেই শুরু। কয়েকটা নোট পড়ে একটা সারবত্তা লিখতে হবে। যেটার নীচে তাঁকে ছোট সই করে ওপরওয়ালার কাছে নিয়ে যেতে হবে। আসলে তার হয়েই তিনি নোট-টা বানাচ্ছেন।
এবারের বিষয়টা বেশ দুঃখজনক। কিন্তু সময়ের সাথে তাল মেলাতে দপ্তরকে এগুলো করতেই হয়। অপ্রয়োজনীয় অনেকগুলি ডাকঘর সরকার আর চালাতে চাইছে না। সেগুলোকে চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। তার সপক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছিলেন।
তাঁর টেবিলে একটা ফোন আছে। সব সময় চলে না।
আজ বেজে উঠলো।
– সুধাংশুবাবু একটু আসবেন।
মিঃ মিত্র, সুদীপ মিত্র সেকশনাল অফিসার। বলতে গেলে তাঁর ঠিক ওপরের কর্তা।
অনুমতি নিয়ে ঢুকলেন।
– একটা সুখবর আছে মিস্টার বসু।আপনাদের আপার ডিভিশনের লিষ্টটা আজ বেরিয়েছে। আপনার নাম প্রথম দিকে আছে। অর্ডারের একটা কপি নিয়ে রাখুন।
– থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।
তিনি একটা ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা দিয়েছিলেন। চাকরির অবস্থানের পরবর্তী ওপরের ধাপে ওঠার জন্য। সবাই যেমন করে। পদমর্যাদা বাড়ে কিছুটা, আর্থিক বৃদ্ধিও হয়। অনেকদিন ধরেই লিষ্টটা ঝুলে ছিলো। বেশ আনন্দ হলো তার। সংসারে কাজে লাগবে। ভাই কিছু সাহায্য করতো। সে তো এখন ভিন্ন সংসারী। অফিসের এক মেয়ে সহকর্মী এবং বর্তমানে যে তার সহধর্মিণী তাকে নিয়ে উঠে গেছে একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে। এই পুরোনো বাড়িটা তাদের পছন্দ হচ্ছিল না। আর পরিবেশটাও এখানে নাকি ভালো না । মা খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। তাকে মানুষ করতে তো কম দুঃখ কষ্ট পেতে হয়নি দুজনকে।
তবে তারা সুখে আছে সেটাই হয়তো দুজনের দুঃখের ওপরে কিছুটা প্রশান্তির প্রলেপ। প্রথম প্রথম মা খুব কাঁদতেন এখন আর কান্না আসে না । ছোট ছেলে মাঝে মাঝে একা একাই আসে। মায়ের কাছে বসে কথা বলে, চলে যায়।
মা তার ছোট ছেলের প্রিয় জিনিসটা কখনও হয়তো খাওয়াতে চান। কিন্তু তার সময় হয় না। সে খুব ব্যস্ত থাকে। আর বিভাবতীর কাছে সন্তানের মুখটা খুব বিষণ্নতায় ভরা বলে মনে হয়। অবশ্য সব মায়ের কাছে সন্তানের মুখ সবসময় বিষন্নতা মাখা মনে হয়। বিশেষতঃ তারা যখন মায়ের থেকে দূরে থাকে।
সুধাংশু শেখরের আজ খুবই আনন্দ হলো। তিনি এই প্রমোশনের কথাটা এখনই মাকে জানাতে চাইলেন । মায়ের জন্য একটা টেলিফোনের লাইন নেয়া হয়েছে। কখন কি দরকার হয়।
টেবিলে ফিরে এসে একটা রিং করলেন বাড়িতে।
অন্য দিনের তুলনায় আজ রিসিভারটা একটু তাড়াতাড়ি উঠলো।
– হ্যালো, মা কেমন আছো? সব ঠিক আছে তো?
– ম্যায় লছমী বোল রহি হুঁ। মাইজি থোড়া বাহার গিয়া। আপ রহিয়ে, মেঁয় লেকে আতি হুঁ।
– ঠিক হ্যায় ঠিক হ্যায়, ধীরে ধীরে লে কে আও।
ডাক্তারবাবু মাকে হাঁটতে বলেছেন। অল্প অল্প করে হাঁটে। তাঁর এই নব-সঙ্গীনি যদি একটু দেখভাল করে তো খুব ভালো হয়।
এই মেয়েটি কি করে জানে ফোনে কি ভাবে কথা বলতে হয়, কিম্বা কিভাবে ডায়াল করতে হয়? সেটাও তো বেশ কাজে আসতে পারে সময়ে অসময়ে। ঐ নোংরা পোশাক পরা হিন্দুস্থানি বাচ্চা মেয়েটা, যে শহীদ মিনারের নীচে বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো দড়িতে ট্রাপিজের খেলা দেখায়। সে কি আধুনিক যন্ত্রপাতি সম্বন্ধেও ওয়াকিবহাল।
আজ টিফিনের সময়ে বেরিয়ে আন্দাজ মতো কয়েকটা জামা প্যান্ট কিনে নিলেন ।
সাড়ে পাঁচটা বাজতেই সুধাংশু অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ধর্মতলার মোড়ের মাথায় টিপু সুলতান মসজিদের উল্টোদিকের একটা দোকান থেকে কিছু মিষ্টি কিনে নিলেন। মা’র মিষ্টি খাওয়া মানা। সুধাংশু নিজেও খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে সংযমী। প্রযোজনের অতিরিক্ত কখনও খান না। নিয়মিত যোগাসন অভ্যাস করেন এবং তার জীবনে নেশা বলতে অফিসের সখের নাটকের দলে অভিনয়।
অদ্ভূৎ, এবারও জানালার ধারে একটা সিট পেয়ে গেলেন। আজ ভীড়ের চাপ একটু কম। মাঝে মাঝেই বাসের এই প্রিয় জায়গাটা তিনি পেয়ে যান। না পেলেও কোন অসুবিধা হয় না।
বাড়িতে এসে বাইরের গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকতেই একরাশ বিস্ময়ে তিনি নির্বাক হয়ে গেলেন। একটা কৃশকায় কিশোর দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হাফ শার্ট ও প্যান্ট পরা। ঘাড় অবধি সুবিন্যস্ত চুল। পোশাক গুলোও চেনা চেনা মনে হচ্ছে। এতো তাঁর ভাই দীপ্তাংশুর প্রাইমারী স্কুল বয়সের পোশাক।
একটা সুন্দর হাসি দিয়ে সে হাত থেকে জিনিসপত্র নিয়ে ঘরের দিকে মুখ ঘোরালো।
লছমীকে চিনতেই প্রথমে বেগ পেতে হলো। কিন্তু তার নির্মল হাসি আর ত্রস্ত গতি তাকে চিনিয়ে দিলো।
– আর বলিস না, কেষ্ট পরামানিক, তোর বাবার বন্ধু একটা কাজে এসেছিলো। বললাম দাও তো ঠাকুরপো একটু মাথাটা সাফসুতরো করে। মা হাসতে হাসতে বললেন।
অন্যদিন সুধাংশু নিজে চা করেন এবং মায়ের সাথে বসে কথা বলতে বলতে দু’জনে এই অফিস ফেরত সন্ধ্যার সময়টুকু উপভোগ করেন। মাকে প্রমোশনের কথাটা বললেন। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে মায়ের আশীর্বাদ নিলেন।
প্রথম প্রথম মা খুব দুঃখ পেতেন তার এই চাকরির পদ নিয়ে। কারণ সুধাংশু ছাত্র হিসাবে যথেষ্ট ভালো ছিলেন। বাবার অসময়ে চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি তাকে সংসারের দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে। না হলে সে ও তার ভাইয়ের মতো বড় চাকরি করতে পারতো।
অপটু হাতে লছমী চায়ের ট্রে এগিয়ে দিলো মা আর ছেলের সামনে।
সেও চা নিলো নিজের জন্য।
– তোর খারাপ লাগছে না তো, লছমী?
মাথা নেড়ে বললো, যে তার খারাপ লাগছে না।
সে তার মাকে হারিয়েছে। আর পালিত বাবা, যে তার মাকে দেহাত থেকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে এসেছিলো সে ও সুযোগ বুঝে পালিয়েছে। ভেসে যাওয়ার মতো সবরকম পরিস্থিতির সামনে খড়কুটোর মতো পড়েও সে নিরুত্তাপ এবং কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশ ও অনাত্মীয়, অপরিচিত কিছু লোকের মধ্যে নিজে ভালো আছে এই বোধটা আনতে পারছে সেটাই অভিনব।
– রাঁধতে পারে ও, কুমকুমের মাকে বললো ওকে দেখিয়ে দিতে। সব্জি কাটলো কিছুটা, রান্না করলো।
– ওর জন্য জামা প্যান্ট নিয়ে এসেছি আজ। সেটা পরবে কাল থেকে। আর কার্ত্তিক ঠাকুর হয়ে ঘুরে বেড়াবে না। এবার সে লক্ষ্মী হয়ে ঘুরে বেড়াবে।
দেখতে সে লক্ষ্মীর বাড়া। তার আর্যসুলভ তীক্ষ্ণ নাক আর লম্বাটে মুখের গড়নে সে অন্যদের থেকে অনেকটা আলাদা।সুসজ্জিত দাঁতের গড়নে তার হাসি অনিন্দ্য সুন্দর।
হিন্দি বাংলা মেশানো বচনে মনে হয় সে বাংলা বিহারের লাগোয়া অঞ্চলের বাসিন্দা।
আস্তে আস্তে লছমী এই সংসারে লক্ষ্মী হয়ে গেল। সে সব সময় বিভাবতীর ধারে কাছে ঘুর ঘুর করে। হাতে হাতে কাজ করে দেয় ঠিকে কাজের মাসি ও রান্নার দিদিকে। কোন দিন তারা না এলে সে নিজেও সব কিছু করে নিতে পারে।
সে যে এই পরিবারের লোক নয় তার কাজ-কর্মে তা বোঝা যায় না। সে বিভাবতীকে মাইয়া এবং সুধাংশুকে বড়া ভাইয়া বলে ডাকে। তার ছোট ভাইয়া , বিভাবতীর ছোট ছেলে মাঝে মাঝে আসে তবে বেশির ভাগ একাই আসে। স্ত্রী আসে কালে ভদ্রে। প্রথম দর্শনে সে থানায় ইনফর্ম করার যুক্তি দিয়েছিলো।
এই সব বাচ্চারা যে বিপজ্জনক সে সতর্কবার্তা দিয়ে গেছিলো এবং যখনই সে আসে সেটা মনে করিয়ে দেয়।
লছমী ছুটে পাড়ার দোকানে যেতে পারে। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনতে পারে। আবার কাছাকাছি সকালের সব্জি ও মাছের বাজারেও যেতে পারে।
সে যেন হরিণ শাবকের মতো সাবলীল ও চঞ্চল। ফাঁকা পেলে বাড়ির ছাদে গিয়ে এক্কা দোক্কা খেলতে লাগে। বিভাবতীকে হাত ধরে নিয়ে চলে যায়।
বিভাবতী বাড়ির চারপাশটা দেখতে দেখতে আর ওর উচ্ছলতা দেখতে দেখতে ভাবেন কতদিন তিনি পেরিয়ে এসেছেন এই জীবন। তবুও মনে আছে বাড়ির উঠোনে তিনিও এভাবে এক্কা দোক্কা খেলতেন। তবে সে দেশ এখন ওপারে একটা তার কাঁটার বেড়া পেরিয়ে।
একদিন এই পাগলি লছমির সাথে তিনি একটু খেলার চেষ্টা করলেন।
রাতে ফিরে এসব শুনে ছেলের কি হাসি! বহু বছর তো মা হাসতেই ভুলে গেছিলো।
এইভাবে দিন মাস বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। লছমীকে স্কুলে ভর্তি করা হবে। বাড়িতে বই পত্র নাড়া চাড়া করলেও সেভাবে সে শিখতে চায় না। তার বাবার নাম সে মনে করতে পারে না। বাড়ির ঠিকানা কি সেটাও মনে বলতে পারে না।সরকারি স্কুল হলেও নাম ঠিকানা দিতে হবে।
সুধাংশু অফিসে যান, বাড়ি ফেরন লক্ষ্মীকে পড়ানোর চেষ্টা করেন।
(প্রথম পর্ব শেষ)









