পরিকল্পনা করে, হিসেব কষেই কাজটা করা হয়েছিল। চাকরি দেবার নামে লাখ লাখ টাকা যখন তোলা হচ্ছিল – তোলা হচ্ছিল রাখঢাক ছাড়া, একেবারে খোলাখুলিভাবে – যারা তুলছিল, বা কেন্দ্রীয়ভাবে যারা এই ফান্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল, তারা স্পষ্টই জানত, যে, এত বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে টাকা তোলা হচ্ছে যে সফল পরীক্ষার্থীর তালিকার বড় অংশ জুড়ে থাকবে ঘুষ দিয়ে অন্যায়ভাবে চাকরিপ্রাপকদের নাম। কিন্তু একটা ছোট্ট হিসেব – হিসেব নয়, জুয়া – ছিল, যোগ্য-অযোগ্য ঘুষদাতা-সৎ এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া হবে যাতে পরে জলঘোলা হলেও কেউই আসল আর নকলের প্রভেদ করতে পারবে না। অর্থাৎ এই গুলিয়ে দেওয়াটা ইচ্ছাকৃত, সুপরিকল্পিত। কেননা ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় কথাটা বহুশ্রুত হলেও এ তো জানা কথা যে ঠগ বাছা না গেলে গাঁ-টিকেই পরিত্যক্ত বলে কেউ ঘোষণা করতে পারে না।
হিসেবটা কাজ করল না। আসল আর নকল আলাদা করতে না পেরে মহামান্য আদালত আসল-নকল নির্বিশেষে সবাইকে বাতিল করে দিলেন।
এতদিন জানতাম, আইনের বিচার এমন হওয়া উচিত, যাতে হাজার অপরাধী ছাড় পেয়ে গেলেও একজন নিরপরাধও যেন সাজা না পায়। ভুল জানতাম তাহলে।
এই বাতিল ছাব্বিশ হাজারের মধ্যে ধরুন ষোল হাজার কি বারো হাজার কি নিদেনপক্ষে আট-দশ হাজার তো যোগ্য পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাঁদের কী হবে? আদালত ভাবলেন না? আদালতের দায় নেই ভাবার?
হ্যাঁ, বলা যেতে পারে, মহামান্য আদালতের হাতে আর কী-ই বা উপায় ছিল? ঘুষ দিয়ে, দুর্নীতির রাস্তা ধরে যারা চাকরিতে ঢুকল, তাদের চাকরি বহাল রাখা? অসৎ ব্যক্তিদের শিক্ষকতার মতো কাজে যুক্ত থাকতে দেওয়া? এবং এই নজির সামনে রেখে আগামী দিনে দুর্নীতির পথ আরও প্রশস্ত করা?
না, এই প্রশ্নের কোনও সরল উত্তর নেই। অন্তত আমার কাছে নেই।
তবু মনে হয়, শিরঃপীড়া যত জটিলই হোক, হাজার চেষ্টায় তাকে সারানো না গেলেও – মাথা কেটে ফেলে সে অসুখের সমাধান খোঁজার পথটি গ্রহণযোগ্য নয়।
আর তাছাড়া, স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা অব্দি প্রতিটি ক্ষেত্রকে যারা দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করল, তাদের নিয়ে বা তাদের ক্রিয়াকলাপ নিয়ে মহামান্য আদালত কিছুমাত্র বিচলিত এমন প্রমাণ যখন নেই – তাদের জন্য কঠোর সাজার কথা তো শুনলাম না – তখন উলুখাগড়ার মাথা কাটা যাওয়াই ভবিতব্য।
আপাতত অনুমান করা যায়, উলুখাগড়াদের ক্ষোভ এবং হতাশার অভিমুখ দুর্নীতির মুখ্য পরিচালক/দের দিকে না গিয়ে আদালত ও দুর্নীতিকে যাঁরা প্রকাশ্যে আনলেন, তাঁদের দিকেই থাকবে। এবং বলাই বাহুল্য, দুর্নীতির মুখ্য কারিগর ও কলাকুশলীদের গায়ে, এর পরেও, আঁচড়টুকু পড়বে না – তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরবে, সভায় সভায় বক্তৃতা করবে, এমনকি জনদরদীও সাজবে।
খাদ্যে দুর্নীতি, স্বাস্থ্যে দুর্নীতি, শিক্ষায় দুর্নীতি – মানে এই ক্ষেত্রগুলো এখনও অব্দি এক্সপোজড – শিক্ষাব্যবস্থা লাটে উঠেছে, লেখাপড়া শেখাটাই অনেকে অবান্তর সময়-নষ্ট হিসেবে ভাবছেন – লেখাপড়া করে মানুষের হাতে কাজের সুযোগ নেই, চাকরিবাকরি যাঁদের জুটেছিল তাঁরাও এরপর থেকে অনিশ্চয়তায় ভুগবেন – নির্ভরযোগ্য পেশা বলতে তোলাবাজি আর ৭৫-২৫ ফর্মুলা, তাতে তড়িৎগতিতে গাড়িবাড়ি হাঁকানো যায়, পাড়ায় সম্মান না হোক, দস্তুরমত সমীহ জোটে – পাড়ায় পাড়ায় ধর্মীয় বিভাজন আর উগ্র ধর্মান্ধতা ক্রমবর্ধমান – একদিকে মানুষ ক্রমশ ধর্মপালনে ঝুঁকছেন তো আরেকদিকে মূল্যবোধ ব্যাপারটাই সমাজজীবন থেকে অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছে – আর এই এতকিছুর পরও যে রাজ্যের নাগরিকরা একান্তে হাহুতাশের বেশি কিছুই করতে পারে না এবং সন্দেহ হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক এই পরিবেশে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছেন… তাঁদের নিয়ে কী-ই বা বলার থাকে!










