মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের এক কলমের খোঁচায় প্রায় ২৬০০০ শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি বাতিল হয়েছে – এ খবর সবার জানা। এ তো আমার বাড়িরও যোগ্য কোন প্রার্থীও থাকতে পারত!
এদের অসহায়তা, সম্বলহীনতা এবং সমগ্র আগামী জীবনের অনিশ্চয়তা আমাদের পক্ষে কোনভাবেই অনুভব করা সম্ভব নয়।
(ছবি আনন্দবাজার পত্রিকা-র সৌজন্যে)
আমরা দর্শক মাত্র – আমাদের টুকরো টাকরা বিভিন্ন মন্তব্য ছুঁড়ে দেওয়া ছাড়া। ফিজিক্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া মেয়েটির কান্না চোখের সামনে ভাসছে। কতদিন ভাসবে? উত্তর জানিনা। তবে কবি তো বলেছেন – বিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু বড়োজোর একবছর।
ড্যামেজ কন্ট্রোল বা নতুন গেমপ্ল্যান
এবারে শুরু হয়েছে গেম প্ল্যানিং। ব্যাপম ইত্যাদি আকণ্ঠ দুর্নীতির কথা তুলে এটা যে কিছুই নয় কিংবা “পবিত্র” এরকম একটা লঘু করে দেবার (relativization) কাজ শুরু হয়েছে। উত্তর প্রদেশ হাজারটা পাপ করলেও আমাদের পাপ “পুণ্য” হয়ে যায়না। এই বোধ আশা করি সবার চিন্তাতেই আছে।
নন্দীগ্রামের প্রতিবাদে আমরা সবাই পা মিলিয়েছিলাম। গলা তুলেছিলাম, গান গেয়েছিলাম। আজ সেই “তৃতীয় পরিসর” কোথায়? সে জায়গা দখল নিচ্ছে দক্ষিণপন্থী শক্তি। থানা ঘেরাও, প্রকাশ্য রাস্তায় স্রেফ মস্তানি বা রামনবমী ধরনের জঙ্গি পৌরুষের প্রদর্শনী দেখছি।
আরও একধাপ এগিয়ে আবার আমার আপনার মতো কোন অর্বাচীন, অকালপক্ক, অর্ধশিক্ষিত দেখে এর মাঝে hegemony তথা মান্যতা নিয়ে টিঁকে থাকবার নানা রকমের কৃৎ-কৌশল রয়েছে। ক্রমশ ঘৃণাকে সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার কৃৎ-কৌশল রয়েছে রাষ্ট্রের অতিরাষ্ট্রের হয়ে ওঠার চারিত্র্যলক্ষণের মধ্যে – শব্দে, চিত্রকল্পে, প্রাত্যহিক সংলাপে। হিংসাকে আকর্ষণীয় প্রদর্শনী করে তুলতে হবে (spectacularized violence)। ধীরে ধীরে এগুলোকে সহনীয় করে তোলা। নিজের নিয়মেই সহনীয় হয়েও যায়। যাকে পছন্দ করিনা তাকে “দানব” বানিয়ে দাও (demonization), শিক্ষা থেকে থেকে সরিয়ে দাও প্রশ্ন করার সাহস, উৎসাহ এবং পরিসর। শিক্ষকেরা হয়ে যাবে educational managers, ছাত্রের মাঝে “কেন?”-র প্রবাহ তৈরি করার কোন জ্ঞানভিক্ষু নয়।
২৬০০০ হাজার চাকরি বাতিল শুধুমাত্র ২৬০০০-এর চাকরি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। এর অর্থ লক্ষাধিক শিশু, কিশোর, স্ত্রী, নির্ভরশীল মা-বাবারও। ওদের কী হবে? দিনকয়েক বাদে তুই হিন্দু না মুই হিন্দু – এই ন্যারেটিভ এ পরিসর দখল করবে। এ খবর সামাজিক বিস্মরণে চলে যাবে।
(সৌঃ আনন্দবাজার পত্রিকা)
তাছাড়া আরেকটা ব্যাপারও তো রয়েছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে এক লাখ বা তার বেশি লোকের ভোট পাওয়া না পাওয়া শেষ অব্দি কোন বিষয়ই নয়। ভোটের নিজস্ব ব্যাংক আছে, মসৃণ “মেশিনারি” আছে। সর্বোপরি আছে ক্ষমতা, এবং … কিছু উহ্য বিষয়।
হয়তো এই ২৬০০০-এর একটা সাময়িক কনট্র্যাকচুয়াল ব্যবস্থাও হতে পারে। আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী তো বলেছেন, নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে এদেরকে নিয়ে সভা করবেন – তিনি সহানুভূতিশীল।
শেষ অব্দি হয়তো এটাই সত্যি – “আমরা তো অল্পে খুশি, কি হবে দু:খ করে?
আমাদের দিন চলে যায় সাধারণ ভাতকাপড়ে।”
সুপ্রিম কোর্টের কিছু পর্যবেক্ষণ
সুপড়িম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমার সমগ্র সিলেকশন প্রক্রিয়াটিকে “vitiated and tainted” বলেছেন, কারণ হল “large-scale and pervasive manipulations”। এ দু’জন মহাম্য বিচারপতি খোলাখুলি বলেছেন – “গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াই কলুষিত হয়ে গিয়েছে। এতটাই কালিমাল্পত যে তা সমাধানের ঊর্ধে।” ওএমআর শিট নষ্ট করে ফেলা হয়েছে (না কি নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষিত করা আছে?)। ফলে যোগ্য অযোগ্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এঁদের পর্যবেক্ষণ – “প্রতিটি স্তরে ক্যামোফ্লেজ ও কারচুপির ফলে তা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
এবার কী?
আমাদের মনে রাখতে “অভয়া”র ধর্ষণ ও খুনে ডাক্তার সমাজ একযোগে রাস্তায় নেমেছিল বলে কিছুদিনের জন্য বিপুল জনরোল তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আজা যাদের চাকরি খতম হয়ে গেল, তাঁরাও দিনের পর দিন ধর্মতলায় অবস্থান, অনশন করেছেন – জলে ভিজে রোদে পুড়ে। আমাদের তরফে কেবল তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া ছিলনা। সামাজিক মানুষ এবং বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এই সন্তানদের জন্য এগিয়ে আসেনি।
এই দূরত্বগুলো থাকার অর্থই হচ্ছে সামাজিক তথা নাগরিক পরিসরে দুর্লঙ্ঘ্য ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এখানে তৃতীয় পরিসর গড়ে উঠবে কীভাবে? দক্ষিণপন্থী সক্তি তাদের বাহুবল ও পেছনের রাষ্ট্রক্ষমতার জোরে সহজেই এ জায়গা দখল করবে, করছেও।
এখানে এসে বোধ করি বিচারের প্রহসনে বিচারহীন “অভয়া” এবং বরখাস্ত হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকারা এক গ্রন্থিতে বাঁধা পড়েন।















এখনও সময় আছে, সংগঠিত জনরোষ তৈরি হোক, এই বিপুল সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে, যার জন্য এতগুলো মানুষ আজ কর্মহারা হলেন, এতগুলো পরিবার স্রোতের মুখে ভেসে গেলো। আমরা তো সত্যিই তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করিনি আন্দোলন রত শিক্ষকদের জন্য। দায় আমরাই বা এড়িয়ে যাই কি করে। এখনও যদি এই আন্দোলন কে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ না দেই, তাহলে এমন বিপর্যয় বাড়ে বাড়ে আসবে
বিশেষত শিক্ষক সমাজ কী নিরাপদ নিশ্চিতিতে কাপুরুষ ঘুমে কাতর আছে!
ঠিক দাদা। আমরা সাধারণভাবে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সমাজের অন্য অংশের সাথে হয়তো কোনওদিনই মিলতে পারিনি। তা সত্তেও অভয়া পরবর্তী মাসগুলিতে নাগরিক সমাজ যেভাবে এগিয়ে এসেছিল, তা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা উচিৎ ছিল। কিন্তু আমরা নিজেদের গুহাতেই ঢুকে গেলাম আবার।
দুঃখিত জয়ন্তদা বহুদিন থেকে এই তৃতীয় পরিসর (3rd Space) এর কথা শুনে আসছি। আমার মনে হয় সময় এসেছে এই ধারণার বাস্তবতা বা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করার। একদিকে অমানবিক রাষ্ট্রশক্তি আর তার বিপ্রতীপে যুক্তিবাদী সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী। এর বাইরে আর কিছু নেই। এই ভাবনায় সংহত হওয়া প্রয়োজন।
“হয়তো এই ২৬০০০-এর একটা সাময়িক কনট্র্যাকচুয়াল ব্যবস্থাও হতে পারে।”
এইটাই হবে, এইটাই রাজনীতি।
অস্যার্থ, ২৬০০০ বলির পাঁঠা। একটা নিওলিবেরাল সোসাইটির শেষ পরিণতি, মানুষকে পণ্যে পরিণত করা।
নারী নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তো বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েই ছিল, তার সাথে যোগ হল শিক্ষা। যোগ্য, অযোগ্যর ডামাডোলে অসংখ্য পরিবার আজ বিপন্ন। এই যোগ্য – অযোগ্য আলাদা করতে না পারার দায় কার? টাকা নিয়েছিলেনই বা কারা? তাদেরও নাম প্রকাশ্যে আসা উচিত। তার উপর দিশেহারা চাকরিহারাদের উপর পুলিশের নির্বিচারে লাঠি চালানো ঠিক যেন “মরার উপর খাঁড়ার ঘা”। চমকে উঠেছি এ দৃশ্য দেখে। সেদিনকার মতো চমকের কোটা পূর্ণ হল, সদ্য চকরিহারা এক শিক্ষকের পেটে পুলিশের লাথি মারার দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় উঠে আসায়। আর যে কি কি দেখা বাকি আছে জানি না … শুধু ভোট এলে পরিস্থিতি বদলে যাবে…দেখে ভয় লাগে যে কোন বিভীষিকাময় সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি… সত্যিই ভয় পাচ্ছি…