অত্যধিক বকার দোষে আমি একখান লাথ খেয়ে কলকাতা থেকে মেদিনীপুরে গিয়ে পড়েছি। আরেকখান লাথ খেলে যদি সৌভাগ্যবশত পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গিয়ে পড়ি, সেই উদ্দেশ্যে লেখাটা দিচ্ছি। আমি পশ্চিমবঙ্গে থাকি আর না থাকি দয়া করে একবার পড়বেন 🙏 পড়ে একবার ভাববেন, ভেবে এক গ্লাস জল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন। কারণ বলাটা আমাদের কর্তব্য, শোনাটাও… কিন্তু ফলে তো কোনো অধিকার নেই!!
রাজনীতির একটা মূল মন্ত্রই হলো ঢাক পেটানো, একটা ন্যারেটিভ তৈরি করা। কার্যক্ষেত্রে কী হচ্ছে না হচ্ছে বড় কথা নয়, ন্যারেটিভটা যেন ঠিকঠাক থাকে! এখন এরকম একটা বড় ন্যারেটিভ হলো ফ্রি চিকিৎসা। সকল সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা চলছে। শুধু তাই নয়, বেসরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্য বীমার মাধ্যমে ফ্রি চিকিৎসা।
ফ্রি ফ্রি ফ্রি … ফ্রি-টাই ন্যারেটিভ এখানে। এটা মানুষ খেয়েছেও, সেই ন্যারেটিভ ভোটও জিতিয়েছে। এখন দেখুন ফ্রি বলে আসল ইকোনমিতে কিছু হয়না। কোথাও থেকে পয়সা আসে, কোথাও সেটা জমা হয় – ভোটের ঠেলায় সেসব গল্প চেপে যাওয়া হয়। টাকার সোর্স কিন্তু সর্বদাই সরকারি টাকা মানে আমার-আপনার ট্যাক্সের টাকা। কোথায় সেটা জমা হচ্ছে এই হিসেবটাই আসল। যেমন ধরুন দুর্গাপূজায় এক লাখ টাকা করে পুজো কমিটিগুলো পেলো। সেই টাকা দিয়ে ডেকোরেশন হলো, ডেকরেটার্স তৃণমূলের লোক। সেই টাকায় প্রসাদ বিতরণ হলো, ক্যাটারার তৃণমূলের লোক। সেই টাকায় নির্ঘণ্ট ইত্যাদি ছাপা হলো, বিজ্ঞাপন হলো, প্রেস তৃণমূলের ইত্যাদি ইত্যাদি। এইভাবে জনগণের ট্যাক্সের টাকাকে কীভাবে পার্টি ফান্ডে চালান করা যায় সেই শিল্প আপনাদের শেখাবো, ক্রনোলজি বুঝবেন কত্তা …
প্রথমে ভর্তি পেশেন্ট নিয়ে বলি কেমন! সরকারি হাসপাতালে সব চিকিৎসা ফ্রি, প্রোভাইডেড আপনি বেডটা পাবেন! বেড পেতে হলে আপনাকে বিরল রোগের শিকার হতে হবে, যাতে ডাক্তারি পড়ুয়ারা নিজেদের স্বার্থে আপনাকে ডেকে এনে ভর্তি করবে। নচেৎ ভাগ্যের হাতে আউটডোরে সাত সকালে লাইন লাগাতে হবে, নয়তো ক্যাচ ট্যাচ জোগাড় করতে হবে। আর নয়তো মিডিয়া ইনভলভ করে একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটাতে হবে। এসবের বাইরে যদি বিকেল দিকে কোনোভাবে বেড পেয়ে যান, বুঝবেন গত একচল্লিশ জন্মের পুণ্য একত্রে এজন্মে ভোগ করেছেন। বাকি দৃশ্য তো আমরা জানিই, মুমূর্ষু রোগী নিয়ে কলকাতার মেডিক্যাল কলেজগুলোতে মানুষের “যাওয়া আসা, স্রোতে ভাসা”, দালালের খপ্পরে পড়া, টাকাপয়সা দিয়ে ভর্তি হওয়া, অথবা বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়া অথবা ভেলোর অথবা যার কেউ নেই স্বর্গদ্বার তো আছেই…
তাই মুশকিল আসান… স্বাস্থ্য সাথী কার্ড। বেসরকারি হাসপাতালেও ফ্রি চিকিৎসা!! মজাই মজা। সরকারও এটাই চায়! আপনি স্বাস্থ্য সাথী কার্ডে বাইরে চিকিৎসা করান। চায়, সেটা জলের মত পরিস্কার। আমি কার্ডিওলজি বুঝি, ওইটুকুই বলি। আপনার হার্ট ব্লক, পেসমেকার লাগবে। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হবেন। টেম্পোরারি পেসমেকার হবে, আপনি সেটা কোমরে লাগিয়ে শুয়ে থাকবেন, পেসমেকার ইন্ডেন্ট হবে – তিন চার দিন গড় সময় আপনার পেসমেকার হওয়ার। সিঙ্গেল চেম্বার না ডুয়াল চেম্বার কোনো চয়েস আপনার হাতে নেই। আমার ছাত্রাবস্থায় একজন রোগী সিআরটিপি মেশিনের জন্য টেম্পোরারি নিয়ে এক মাস শয্যাশায়ী ছিল! একটা দিন গরমের মধ্যে জাস্ট বিছানায় শুয়ে থাকুন, আপনি বুঝতে পারবেন একটা মানুষের উপর কী বয়ে গেছে! আর মাঝে তো আপনারা জানেনই ভারতীয় এক পেসমেকার কোম্পানির পেসমেকার সরকারি টেন্ডারে এসেছিল। তামাম ডাক্তার জানতেন ওই পেসমেকারের কোনো ভরসা নেই, কোনটা কখন বন্ধ হয়ে যাবে! তাও লাগানো হয়েছিল। একজন রোগী পরিজন সেটা মিডিয়ায় ফাঁস করার পর ওই টেন্ডার বন্ধ হয়। কতজন যে মাঝে হারিয়ে গেছে, সে হিসাব কিন্তু আমরা রাখিনি!
এবার আপনি স্বাস্থ্য সাথী কার্ড নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাবেন, দিনের দিন পেসমেকার, ডুয়াল চেম্বার, এম আর আই কম্প্যাটিবল – সব সুবিধা সহ। আপনি কোথায় যাবেন? বেসরকারি হাসপাতালে নিশ্চয়ই! আবার ধরুন, আপনার বুকে স্টেন্ট বসবে। সরকারি হাসপাতালে অধিকাংশ সাপ্লাই ভারতীয় কমদামী স্টেন্ট, বেসরকারি হাসপাতালে ওই স্টেন্ট কেউ ভুলেও লাগাবে না। আপনি সব ইমপ্ল্যান্ট স্বাস্থ্য সাথী কার্ডে বাইরে পাবেন, সরকারি হাসপাতাল ছেড়ে ওদিকেই যাবেন। সরকার এটাই চায়। কারণ ওই বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মাসের শেষে হপ্তা ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাবে, এই খবরটা আপনারা আবার পাবেন না।
কিন্তু আবার স্বাস্থ্য সাথী সব প্যাকেজ ভালো না, হাসপাতাল গুলো অনেক সময় রোগী নিতে চায় না। সবার কার্ডও নেই। তবে সে নিয়েও চিন্তা নেই, উডবার্ন আছে, সবার জন্য অবারিত দ্বার। ফেলো কড়ি মাখো তেল। এখন উডবার্নে আপনারা ভর্তি হয়ে যে টাকা দেন, তার সিংহভাগ যায় উডবার্নের রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত সংস্থার কাছে- রিলায়েবল। এটা কার কোম্পানি, কার সাথে তাদের বোঝাপড়া এটা নিয়ে পড়াশোনা করবেন আপনারা, সব আমি বলবো নাকি!
এবার আসি আউটডোরের কথায়। ইনডোরের গল্প অনেক হলো। এমনিই অধৈর্য হয়ে পড়েছেন নিশ্চয়ই!! আউটডোর তো রমরমা, বিশাল ভিড়। সব কলেজ লক্ষ লক্ষ রোগীকে পরিষেবা দিচ্ছে। কেউ আজ অব্দি প্রশ্ন তুলল না এই লক্ষ লক্ষ রোগীর কি আদৌ মেডিক্যাল কলেজে দেখানোর প্রয়োজন ছিল! দ্বিতীয় স্তরের হাসপাতালগুলোতে তাদের চিকিৎসা করা কি অসম্ভব ছিল? সব থেকে বড় প্রশ্ন যেটা আরোই কেউ করলো না, এত লক্ষ রোগীকে এত জন ডাক্তার যে ওপিডি আওয়ার্সে দেখলো, রোগী প্রতি সময় কত হলো তাহলে!! ঘণ্টার পর ঘন্টা জার্নি করে এসে, লাইন দিয়ে, রোদে জলে ভিজে… মিনিট দুয়েকের বার্তালাপ, পাঁচ মিনিট বড় জোর!! ডাক্তার জানেন তাকে একশ রোগী দেখতেই হবে, সময় সীমিত। এর মাঝে রোগ যদি নিজে এসে ধরা দিল খুব ভালো, নয়তো রেফার টু দিস ওপিডি অর দ্যাট ওপিডি!! আবার গিয়ে লাইন লাগাও।
কে দেখলো সেটাও জানা গেলো না। ওপিডি টিকিটে নাম যে স্যারের তিনি কি দেখলেন! সম্ভব না। আপনি দু’টাকা দিয়ে ডাক্তার নির্বাচন করারও সুযোগ পাবেন! এটা একটু বাড়াবাড়ি না!! তাছাড়া ওনার কাজও তো রয়েছে, রাউন্ড দেওয়া, ছেলে পড়ানো। তারপর সবুজ কালির কাগজ নিয়ে আসা রোগীদের আপ্যায়ন করা। এসব করে সময় পেলে না হয় কিছু রোগী উনি দেখবেন। সবাইকে স্যাটিসফাই করা কি সম্ভব!! তাই তো সরকার বলছেন, দু টাকার জায়গায় সাড়ে তিনশ টাকা দিন। সব সুযোগ পাবেন। ডাক্তারবাবু, যাঁকে আপনি দেখাতে চান, তাঁকেই পাবেন। সরকার সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। অর্থাৎ সরকার বাহাদুর বকলমে বলেই দিচ্ছেন লম্বা লাইন দিয়ে দু’টাকার লোকেদের চিকিৎসা আর সাড়ে তিনশ টাকার লোকেদের চিকিৎসা একই ছাদের নিচে আলাদা হবে! বাকিটা আপনি বুঝে নিন।
এই অত্যধিক রোগীর চাপ, এটা ম্যান-মেড। অমর্ত্য সেনের মন্বন্তরের মত কেউ যদি এটা নিয়ে গবেষণা করেন নিশ্চয়ই পাবেন – দিস ইজ ম্যান মেড প্যান্ডেমোনিয়াম। ইচ্ছাকৃত ভাবে ক্রমাগত এই কৃত্রিম ডিমান্ড তৈরি করা হয়েছে। যাতে এই পেইড বিকল্পটাকে প্রমোট করা যায়। এই ওষুধের সাপ্লাই ডিসেন্ট্রালাইজ করা, কড়া রেফারেল ব্যবস্থার মাধ্যমে যাদের প্রকৃত উচ্চস্তরের চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদেরই মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা – এসব হলে আজ সাড়ে তিনশ টাকা দিয়ে বড় ডাক্তারদের দেখাতে হতো না। আমি এটাও বলে দিচ্ছি এনারা অধিকাংশই সন্ধ্যার ওপিডি একা একা করবেন না, তাঁদের রেসিডেন্টদেরও নিয়ে যাবেন। তাতে আখেরে ওয়ার্ডের রোগীগুলো আরো একটু কম অ্যাটেনশন পাবে। তা পাক, দু’টাকার রোগীদের নিয়ে ভেবে লাভ নেই, ওরা বরং স্বাস্থ্য সাথী দিয়ে বাইরে ভর্তি হোক, পয়সা আসবে কিছু…












অসাধারন লেখা। ঠিক তাইই হচ্ছে।