সেই সন্ধ্যায় মন্ত্রীবর্গ, অমাত্য ও সেনানায়কদিগের উপস্থিতিতে এক দীর্ঘ মন্ত্রণাসভার অবসানে স্থির হইল যে আগামীকল্য প্রত্যুষে রাজা রাজ্যবর্ধন তাঁহার সাম্রাজ্যের উত্তরে পঞ্চনদ অভিমুখে যাত্রা করিবেন। কুমার হর্ষবর্ধন ভ্রাতার সঙ্গী হইবেন, আর সেনাপতি হিসাবে থাকিবেন ভণ্ডী স্বয়ং।
অসুস্থ প্রভাকরবর্ধনের দায়িত্ব শুধুমাত্র মাতা যশোমতীর স্কন্ধে ন্যস্ত করিয়া যুদ্ধে গমন করিবার ইচ্ছা রাজ্যবর্ধনের ছিল না, কিন্তু যখন শত্রু শিয়রে, তখন এই সকল ভাবনা নিরর্থক বিলাসিতা। তাঁহার চিন্তান্বিত মুখচ্ছবি অবলোকন করিয়া তাত মাধবগুপ্ত তাঁহাকে আশ্বস্ত করিলেন।
বয়োজ্যেষ্ঠ হিসাবে তিনি ও কুমারগুপ্ত তো স্থানীশ্বরে উপস্থিত রহিলেন — এক্ষণে বিদেশী হূণ দমনে রাজার একনিষ্ঠ হওয়াই সমীচীন।
গান্ধার পার্বত্য প্রদেশ। সেই দুর্গম গিরিশিরাময় অঞ্চলে হস্তীযূথ লইয়া যুদ্ধে যাওয়া সুবিবেচনার কার্য হইবে না, এমত অনুমান করিয়া কেবল পদাতিক এবং অশ্বারোহী বাহিনীই সৈন্যদলের অন্তর্ভুক্ত থাকিবে বলিয়া স্থির হইল। দুই সহস্র পদাতিক সৈন্য এবং দশ সহস্র অশ্বারোহী লইয়া রাজ্যবর্ধন বর্বর হূণদের গান্ধার রাজ্যের সীমানা পার করাইতে সক্ষম হইবেন, এমত প্রত্যাশা ও বিশ্বাস সকলেরই ছিল।
আকস্মিক আপৎকালীন পরিস্থিতিতে রাজ্যবর্ধনের বিবাহের অনুষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হইয়া গেল।
এই সংবাদে ক্ষেমদত্ত অতীব বিমর্ষ হইয়া পড়িলেন। কিন্তু স্বীয় রাজ্যের প্রতিরক্ষা ও ক্ষাত্রধর্ম পালন প্রত্যেক পরমভট্টারক সম্রাটের অবশ্যকর্তব্য — তাই বিবাহ পিছাইয়া যাওয়া যে অবশ্যম্ভাবী, ক্ষেমদত্ত তাহাও বুঝিলেন।
শকুন্তলা কিন্তু আদৌ বিমর্ষ হইল না। বিগত কয়েক পক্ষকাল তাহার হৃদয় অনাগত আশঙ্কায় ভয়তাড়িত হইয়া ফিরিতেছিল — অন্তরে উদ্বেগ এবং বিরাগের তুষানল জ্বালিয়া সে নির্বিকারভাবে বাগদান অনুষ্ঠানে আপন সম্মতি ব্যক্ত করিয়াছে। কেবলমাত্র পিতার সম্মান এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করিয়া সে আপনার সহিত এতবড় অন্যায় ঘটিতে দিয়াছে — বাঙনিষ্পত্তি করে নাই। তাহার নীরব থাকিবার আরও একটি হেতু ছিল। সে অহর্নিশ চিন্তা করিতেছিল, চন্দ্রবর্মা পূর্বে তাহার প্রতি যতই ঔদাসীন্য প্রদর্শন করিয়া থাকুক, রাজার সহিত আশু পরিণয়ের এই সংবাদে নিশ্চয় স্থির থাকিতে পারিবে না। প্রকাশ্যে নিরুৎসুক থাকিলেও চন্দ্রবর্মা কখনওই তাহার আকুল প্রেম নিবেদন সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিতে পারিবে না — এইরূপ অসম্ভব বিশ্বাস শকুন্তলার ছিল। সুতরাং মহেশ্বরের কৃপায় কিছু উদ্বৃত্ত মুহূর্ত অযাচিতভাবে উপহার পাইয়া তাহার মনে নূতন আশার সঞ্চার হইল।
এখনও চন্দ্রবর্মার সহিত মিলনের সম্ভাবনা সুদূরপরাহত হইয়া মরীচিকার ন্যায় দিগন্তে মিলাইয়া যায় নাই — এখনও আশা রহিয়াছে। রাজ্যবর্ধনের অনুপস্থিতিতে চন্দ্রবর্মাকে আরও গাঢ়ভাবে আপন প্রণয়পাশে বাঁধিবার নানা কূট কৌশল শকুন্তলার মনোমধ্যে জালবিস্তার করিতে আরম্ভ করিল। হয়ত শূলপাণিরও এমনই অভীষ্ট, নচেৎ এই সময়েই বিদেশী হূণ আকস্মিকভাবে পুষ্যভূতি সাম্রাজ্য আক্রমণ করিবে কেন?
অকস্মাৎ তড়িচ্চমকের ন্যায় একটি চিন্তা প্রবল আঘাতে তাহার মস্তিষ্ককে ক্ষণকালের জন্য অচল করিয়া দিল। মদনাহতা শকুন্তলা বিস্মৃত হইয়াছিল যে চন্দ্রবর্মা রাজার পদাতি বাহিনীর একজন সেনানী — এই সমরাভিযানে তাহাকে যদি রাজার সৈন্যদলের অনুগামী হইতে হয়, তাহার প্রেমকাহিনীর পরিণাম কি হইবে?
যুদ্ধযাত্রার পূর্বে, স্বীয় বাগদত্তার সহিত রাজ্যবর্ধনের সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রবল হইয়া উঠিল।
ক্ষেমদত্তের জ্ঞাতসারে, রাজপ্রাসাদের প্রমোদকানন সংলগ্ন দীর্ঘিকার পার্শ্বে, রাত্রির দ্বিতীয় যামে শকুন্তলার সহিত তাঁহার সাক্ষাতের অবকাশ ঘটিল। রাজমাতা যশোমতীর অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রাজা কিছুমাত্র অনুভব করিলেন না।
নির্মেঘ আকাশে চন্দ্রাস্ত হইয়াছে। দূরে রাজপুরীর দীপগুলির ক্ষীণ রশ্মি আসিয়া শকুন্তলার মুখাবয়বে পড়িয়াছে, রাজা তৃষ্ণার্ত চক্ষে তাহার পানে চাহিয়া রহিলেন। তাঁহার মুখের উপর এক পলকের জন্য চক্ষু ন্যস্ত করিয়া শকুন্তলার কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না — রাজার মুখ অন্ধকার।
খানিকক্ষণ পরে রাজ্যবর্ধন কথা কহিলেন। “দেবি, আসন্ন বিবাহ স্থগিত হইয়া গেল বলিয়া তোমার উৎকণ্ঠা আমি অনুধাবন করিতে পারি। তবে হূণদের পররাজ্য আক্রমণের এই দুর্দান্ত স্পর্ধা দমন করা অবশ্য প্রয়োজন, ইহা নিশ্চয় তুমিও বুঝিয়াছ?”
শকুন্তলাকে নিরুত্তর পাইয়া রাজা পুনরায় কহিলেন — “অভিমান করিও না। তোমার সম্পর্কে একটি রটনাও আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি না সুন্দরি! যে কাননে সুগন্ধি পুষ্পরাজি ফুটিয়া থাকে, মধুলুব্ধ ভ্রমরের গুঞ্জনও কর্ণগোচর হয় — ইহা স্বাভাবিক ঘটনা। আমি তোমার উদ্যানের মধুকর সখাদের প্রতি বিরূপ নহি — আমার কেবল একটিই প্রার্থনা, তুমি অন্তরে বিশ্বাস রাখিও, আমি জয়ী হইয়া ফিরিয়া আসিব। তাহার পরে স্থানীশ্বর মহাদেবের মন্দিরে অগ্নিকে সাক্ষী রাখিয়া আমাদের বিবাহ হইবে। তুমি — তুমি প্রতীক্ষা করিও। আমি নিশ্চিত ফিরিয়া আসিব।”
তাঁহার কণ্ঠস্বর ক্রমশ আবেগমথিত হইয়া উঠিল — তিনি দুই পদ অগ্রসর হইয়া নিজ হস্তমধ্যে শকুন্তলার হস্তধারণ করিলেন। তাহার কোমল, শীতল হস্ত দুইটি আপনার করে নিষ্পেষিত করিতে করিতে রাজা শুনিতে পাইলেন, যেন বহুদূর হইতে শকুন্তলা কহিতেছে — “রাজন, সেনানী চন্দ্রবর্মা কি যুদ্ধে আপনার অনুগামী হইবে?”
কয়েকটি দুঃসহ পল ধীরপদে উভয়ের মধ্য দিয়া অতিক্রান্ত হইয়া গেল। রাজ্যবর্ধনের দৃঢ়মুষ্টি শিথিল হইল — তিনি ধীরে ধীরে শকুন্তলার করতল ছাড়িয়া দিলেন। আপন মুখমণ্ডলের উপর একবার কঠিনভাবে অঙ্গুলি চালনা করিয়া নীরস স্বরে বলিলেন –“রাত্রি গভীর হইয়াছে। প্রতীহারদ্বয়ের প্রহরায় তুমি নির্ভয়ে পিতৃগৃহে ফিরিয়া যাও। একাকিনী যাইতে হইবে না, অন্তঃপুরের বিশ্বস্তা দাসীদ্বয় তোমার সঙ্গে যাইবে।”
তাহার পরে অকস্মাৎ ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন — “চিন্তা করিও না। আসন্ন যুদ্ধযাত্রায় চন্দ্রবর্মা আমার অনুগামী হইবে না। নগর প্রহরাতেও তো সৈন্যসামন্তের উপস্থিতি প্রয়োজন।”
এই বাক্যটি উচ্চারণের পূর্বে তাঁহার সুবিশাল সৈন্যবাহিনীতে চন্দ্রবর্মা নামক কোনও সেনানীর অস্তিত্ব সম্পর্কে রাজ্যবর্ধন আদৌ জ্ঞাত ছিলেন না। তাঁহার বাল্যসখা রাজবয়স্য ভূষণবর্মা এবং সেনানায়ক ভণ্ডীর মুখে শকুন্তলা এবং ‘জনৈক’ চন্দ্রবর্মার সম্পর্ক লইয়া একটি অস্পষ্ট গুঞ্জন রাজ্যবর্ধন শুনিয়াছিলেন বটে, তবে গ্রাহ্য করেন নাই। সম্রাটের স্বাভাবিক অহঙ্কারে সেই গুঞ্জনকে বিপুল অট্টহাস্যের সঙ্গতে তৃণজ্ঞানে উড়াইয়া দিয়াছিলেন। কি ভয়ানক ভ্রান্তি! কি নিষ্করুণ প্রমাদ!
রাজা তালি বাজাইয়া প্রতীহারদের আহ্বান করিলেন।
শকুন্তলা আভূমি প্রণত হইল। তাহার পরে প্রহরী পরিবেষ্টিত হইয়া অদূরে অপেক্ষারত তাহার শিবিকা অভিমুখে চলিয়া গেল।
রাজ্যবর্ধনের অন্তরাকাশ হতাশা ও সুতীব্র বেদনার কৃষ্ণমেঘে আচ্ছন্ন হইয়া গেল। প্রতারণার নিগূঢ় অপমান তাঁহার পুরুষকারকে প্রতি পলে তিরস্কার করিয়া ফিরিতে লাগিল। প্রণয়ের যত্নচয়িত পুষ্পটি কীটদষ্ট জানিয়া রাজার হৃদয় অনুশোচনা ও আত্মধিক্কারে ভরিয়া গেল।
তমসাবৃত মনে, ক্লান্ত পদক্ষেপে রাজা রাজ্যবর্ধন আপন কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিলেন। অদ্য নিশীথে আঁখিপাতে আর নিদ্রা আসিবে না। তিনি বলপূর্বক বিশ্বাসঘাতিনী শকুন্তলার চিন্তা সরাইয়া রণকৌশলের ভাবনায় অবাধ্য মনকে নিয়োজিত করিতে সচেষ্ট হইলেন।
তাঁহার প্রয়াস ব্যর্থ হইল। চিন্তা সংহত হইল না। নিজ নির্বুদ্ধিতা এবং হৃদয়দৌর্বল্য ব্যতীত অন্য কিছুকেই তিনি দায়ী করিতে পারিলেন না। কোমল শয্যা কন্টকসঙ্কুল হইয়া উঠিল।
ক্লিষ্ট, বিনিদ্র রজনীর সমাপনে ধীরে ধীরে পূর্ব গগনে অরুণাভা ফুটিয়া উঠিল।
একটি নূতন দিবস যেন নূতন সম্ভাবনা লইয়া তাঁহার অঙ্গনে দাঁড়াইয়া তাঁহাকে অভিবাদন জানাইল। রাজ্যবর্ধন শয্যাত্যাগ করিলেন।
যুদ্ধযাত্রার সময় সমাগত। তাঁহার বিস্মৃত কর্তব্য যেন শিব মুরতি ধরিয়া তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। তিনি নবোদিত দিবাকরকে যুক্তকরে প্রণাম জানাইলেন।
(ক্রমশ)









