অপরের বিশেষতঃ অপছন্দের লোকের অসুবিধায় মানুষের ভীষণ আনন্দ হয়, এমনকি তাতে যদি নিজের সমস্যা হয়, তাও সই। Demonetisation এর সময়ে চরম দুর্দশাতেও মানুষ ভেবে আনন্দ পাচ্ছিলো, কালোটাকার অধিকারীরা কী নাকালই না হচ্ছে। তখন যে শহরে থাকতাম, সেখানে আবার জনগণ সেই সময়ে কালোটাকার অধিকারী বলতে মূলতঃ ডাক্তারদেরই বুঝতো, রাজনৈতিক মাফিয়ারা ‘ফিল্ডে’ নেমে পড়লেও, তখনো এতোটা প্রকাশিত বা উন্মোচিত ছিল না বলেই হয়তো। নিত্য নতুন কাহিনী বাজারে আসতে লাগলো। কোন্ ডাক্তার পাগল হয়ে গেছে, কে গলায় দড়ি দিয়েই ফেলেছে অথবা গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে গেছে, কাকে দেখা গেছে মাঝগঙ্গায় নৌকোয় বড় বড় বস্তা নিয়ে যেতে, ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের দুর্দশা চুলোয় যাক, কালোটাকার কারবারিদের হেনস্থাতেই যেন পরম আনন্দ!! যে কারণেই হোক, আমার নাম এই পর্যায়ে অনুচ্চারিতই ছিল। প্রীতিবশতঃ মনে করার কোনো কারণই নেই, আসলে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি।
যাইহোক, জনমানসের এই সবিশেষ ঝোঁক বা ‘ট্রেন্ড’কে পাথেয় করেই সম্ভবতঃ অধুনা অপরিমেয় ‘বঙ্কিমপ্রীতি’। বন্দেমাতরম গানের সম্পূর্ণ অংশের উপর স্বাধীন ভারতে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল বলে তো জানা নেই। তাহলে, এতোদিন এই বঙ্কিমভক্তরা গাইছিলো না কেন? জাতীয় সঙ্গীত মূল সঙ্গীত থেকে কাটছাঁট করে (truncated) গ্রহণ করার অনেক কারণ থাকে, সবচেয়ে বড় কথা সুদীর্ঘ না করা, সকলের সুবিধার্থেই। ‘জনগণমন’ও তো অংশতই গাওয়া হয়, সম্ভবতঃ ‘God Save the King’ এর ক্ষেত্রেও তাই। বাংলাদেশে এখনো যে জাতীয় সঙ্গীত আছে (রবীন্দ্রনাথের অবস্থা সব জায়গাতেই খারাপ, তাই কতোদিন থাকবে জানা নেই), তাও তো প্রথম কয়েক লাইন, সবটা নয়।
আসলে, এখানে প্রীতির থেকে অপ্রীতি বা কারুর না কারুর অস্বাচ্ছন্দ্যই বড় কথা। বন্দেমাতরম গানের পুরো অংশটা গাইতে গেলে কার কার সবচেয়ে বিড়ম্বনা হবে, সেটাই হলো মূল deciding factor, বাকি সব কী যেন বলে……
যাক, এই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই, আমার concern সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপারে। সঠিক কিনা জানিনা, বন্দেমাতরম নাকি পুরোটা গাইতে হবে স্কুল আরম্ভ হবার আগে। এখানে ঘোরতর সমস্যা আছে। এক, যদি শুধু মাস্টারমশাই বা দিদিমণি গান, ঠিক আছে। কিন্তু তিন মিনিটের বেশি সময় ধরে পুরো জমায়তকে চুপচাপ রাখা সোজা কথা নয়। যাক, এটা তাও মন্দের ভালো।
কিন্তু, দ্বিতীয় ‘অপসন’ মানে যদি সকলকে গাইতে হয়, তাহলে যে কী কী কান্ড ঘটতে পারে তা চিন্তারও অতীত। ভাববেন না আমি পড়ুয়াদের দুর্দশায় কাতর হয়ে এসব কথা বলছি। আমি অন্য কিছুর দুর্দশার আশঙ্কাতেই রীতিমতো চিন্তিত। আসলে, সাধারণ ধ্যানধারণার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব অবস্থার মিল খুব কম থাকে। এতকাল শহুরে মানুষ বিশেষত বুদ্ধিজীবীরা বলে এসেছে গ্রামের মানুষ সরল সাধাসিধে। কিন্তু বাস্তবে তাদের অনেকেই বিশেষতঃ পঞ্চায়েত পর্ব শুরু হওয়ার পরে,শহরের অনেক বুদ্ধিমান লোককেই গোটা তিনেক ‘প্যাঁচ’ দিয়ে দিতে রীতিমতোই সক্ষম।তেমনি, তথাকথিত ‘সুকুমারমতি’ বালকবালিকারা যে কি পরিমাণ ‘বিচ্চু’ হতে পারে, সেটা স্কুলের শিক্ষক ও আমাদের মতো কিছু অভাগা যাদের অনেক দশক কেটেছে এদেরই সান্নিধ্যে, তারা ছাড়া কেউ বুঝবে না। এমনকি বাবা-মাও নয়, তারা তো ভাবে তাদের বাচ্চার মতো সুশীল সুভদ্র ছেলে /মেয়ে ভূভারতে নেই!! কঠিন সংস্কৃত শব্দ উচ্চারণে তারা কতটা কাহিল হবে জানিনা, তবে তাদের উচ্চারণে বন্দেমাতরম গানের কী হাল হবে, সেটাই ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি।
এই প্রসঙ্গে একটু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করা যাক, ‘জীবনস্মৃতি’তে তাঁর উক্তি, “…. তাহা হইতে আস্ত ইংরেজি গানটা তুলিয়া তাঁহারা আরাম বোধ করিয়াছিলেন। আমাদের মুখে সেই ইংরেজিটা কী ভাষায় পরিণত হইয়াছিল,তাহার আলোচনা শব্দতত্ত্ববিদ্ গণের পক্ষে নিঃসন্দেহ মূল্যবান। কেবল একটা লাইন মনে পড়িতেছে….
কলোকী পুলোকী সিংগিল মেলালিং মেলালিং মেলালিং।
অনেক চিন্তা করিয়া ইহার কিয়দংশের মূল উদ্ধার করিতে পারিয়াছি— কিন্তু ‘কলোকী’ কথাটা যে কিসের রূপান্তর তাহা আজও ভাবিয়া পাই নাই। বাকি অংশটা আমার বোধহয় —-
Full of glee, singing merrily, merrily, merrily,”
সে কতো যুগ আগের কথা, আর আজ..?!
বন্দেমাতরম সঙ্গীতের মাঝের অংশের সুদীর্ঘ শব্দবন্ধ ‘দ্বিসপ্তকোটীভুজৈর্ধৃতখরকরবালে’ বা শেষের দু লাইন যে এদের হাতে বা গলায় পড়ে কী হাল হবে,কী পরিমাণ বিবর্তনের সম্মুখীন হতে হবে,তা সত্যিই চিন্তারও অতীত!!
বাস্তবিক পক্ষে, আমার মূল concern বন্দেমাতরম সঙ্গীতের অখণ্ডতা নিয়েই, অন্য কোনো কিছু নয়।
তাই, সনির্বন্ধ অনুরোধ, যা প্রাণে চান করুন, অপরকে অসুবিধায় ফেলে অদ্ভুত আনন্দলাভ করুন, কিছু বলার নেই; কিন্তু দয়া করে স্কুলের ‘প্রারম্ভিক গীতি’ থেকে একে দূরে রাখুন, যতদূর সম্ভব…………









