। ১।
সমবেত সংঘে সরস্বতী পুজোটা বেশ জোরদার হয়। যেসব পাড়াতুতো প্রতিযোগিতাগুলো এখন প্রায় উঠে গেছে, সরস্বতীপুজো-ঘেঁষা রবিবারটাতে একটা বেশ বড় করে আয়োজন হয় তাদের, ‘বসে আঁকো’, ‘আবৃত্তি’ আর ‘দশ মিনিটে লেখো’। সব কটি প্রতিযোগিতাই ক্লাস টেন অবধি পড়ুয়াদের নিয়ে এবং বয়েসভিত্তিক। তিন বছর থেকে এখানে চারটে গ্রুপ,তিন থেকে পাঁচ, ছয় থেকে আট, নয় থেকে বারো আর বারো’র ওপরে ষোলো পর্যন্ত। নামে ‘সারা বাংলা হলেও, আসলে তা আশেপাশের পাড়ার পাঁচ কিলোমিটার চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ, তার বেশি দূর থেকে সচরাচর প্রতিযোগীরা আসে না।
সমস্যা হয় এতগুলো কচিকাঁচা সামলানোর। সমবেত সংঘের সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি দুটো ভাগ। বর্ষীয়ান আর মাঝবয়েসী, কমবয়েসীদের এমনিতেই ‘ক্লাব কালচার’এ ভক্তি বা বিশ্বাস নেই, এইসব সেকেলে প্রতিযোগিতায় তো একেবারেই নয়। কিন্তু এতগুলো কচিকাঁচা, মা-বাবা বাদ দিয়ে তাদের সামলানো মুখের কথা নয়, কিন্তু মা বাবাদের একটু দূরে না রাখলে কিছু ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব হয়, কিছু জায়গায় চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। বিশেষ করে প্রথম তিনটে বিভাগে অনেক সময় বাবা মা’রা সাহায্য নয়, মূর্তিমান উপদ্রব।
ঠেকে ঠেকে সমবেত সংঘের কেষ্টুবিষ্টুরা শিখে গেছেন, প্রায় সব সদস্যদের ভল্যান্টিয়ারগিরি ছাড়া এই চ্যাঁ ভ্যাঁ’র ঢেউ সামলানো সম্ভব নয়। প্রতি বছর পুজোর শেষে সেক্রেটারি নাক কান মুলে প্রতিজ্ঞা করেন পরের পুজোয় আর না! এভাবেই চলে আসছে বিগত চল্লিশ বছর। সমস্যা হচ্ছে, এ বছর প্রায় প্রত্যেক বিভাগে নাম দেওয়ার সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে। পুজোর আর মোটে সাতদিন বাকি, কাজেই জরুরি ‘হাডল’এ ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
পুজো বৃহস্পতি শুক্র মিলিয়ে পড়েছে , সে হিসেবে হাতে সময় মোটে ন’দিন।
। ২।
‘তিনদিনে তিনটে অনুষ্ঠান করলে হয় না!’প্রস্তাব কোষাধ্যক্ষ পার্থ’র। পার্থ চৌবে এ অঞ্চলে মাঝারি প্রোমোটার, পদবী ছাড়া তার আর কিছুই অবাঙালী নয়, তার বউ করবীও বাঙালি। হাঁ হাঁ করে উঠলো সঞ্জিৎ সান্যাল সেটা শুনে। ’পাগল নাকি! তিনদিন ধরে জাজ জোগাড় করো, মাইক চেয়ারের ভাড়া গোনো… খরচা তিনগুণ। সঞ্জিৎ বলতেই পারে, কারণ ও গেঁদেপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অংক আর অ্যাকাউন্টেন্সি পড়ায়। অটো-ট্রেন-টোটো আর টোটো-ট্রেন-অটো’র এক এক দিকে তিন ঘন্টার যাত্রা সামলে সকাল সাতটা থেকে রাত নটা অবধি সে বাইরে থাকে। সব সামলায় একা হাতে বাড়িতে শ্যামলী, সত্যি বলতে দোকানি-হাটুরেরা ‘বৌদি’কেই বেশি চেনে।
‘তাছাড়া ট্রাডিশন বলে একটা কথা আছে তো‘ প্রেসিডেন্ট শ্যামাপদ মান্না বললেন। ‘জানোই তো তোমাদের তপতী বৌদি এ অঞ্চলেরই মেয়ে,ওর ছোটোবেলা জড়িয়ে এই প্রোগ্রামটার সাথে। গৃহশান্তি বজায় রাখতে ওটা একদিনেই করতে হবে, কিন্তু এবারে ভল্যান্টিয়ার চাই অনেক বেশি।
‘মাফ করবেন দাদা, ইয়ং ব্রিগেড এই কাজ করবে না। ওইদিন খেলা পড়েছে। ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া।’ আমাদেরও বেশ কিছু লোক কিন্তু ক্লাবের টিভি’র সামনেই থাকবে সারাদিন।’ বলে উঠলো সুখেন্দু শাসমল, এবছর সে-ই পুজো কমিটির আহ্বায়ক। ক্লাবে বেশি সময় কাটানোর জন্য সুখেন্দুকে বৌ রঞ্জনার কাছে কম গঞ্জনা শুনতে হয় না, তবুও সে ক্লাব-অন্ত-প্রাণ ।
। ৩।
‘উপায় আছে একটা কিন্তু।’ বলে উঠলো হংস মধ্যে বক যথা বয়স্কদের মাঝে বসা নীলোৎপল রায়। বছর তিরিশেকের নীলের অলিপার সাথে বিয়ে হয়েছে এক বছর আগে, এই সমবেত সংঘের অনুষ্ঠান-ঘরে। বৌ আই টি সেক্টরে একটা বড় কোম্পানির নাম্বার টু। নীলোৎপলও কম যায় না, হাইকোর্টে সবচেয়ে নামী উকিলের সে একনম্বর জুনিয়র।
সকলে তার দিকে তাকানোর পরে সে ধীরে বললো ‘আমাদের বৌদের যদি ভল্যান্টিয়ার হিসেবে নেওয়া যায়..’
পাক্কা এক মিনিট শ্মশানের নীরবতা। তারপরে দুম করে ডাক্তার সুশোভন সমাদ্দার বলে উঠলো, ‘যাহ! ওরা রাজি হবে কেন ,ক্লাব বললেই বাড়িতে ঝাড় খাই তো‘ সুশোভন হাড়ের ডাক্তার, পসার মন্দ নয়। তবে তার স্ত্রী সুতপা এলাকার এক নম্বর অংকোলজিস্ট, রাজ্যের বাইরে এমন কি দেশের বাইরেও তার নাম ছড়ানো। সদাহাস্যময়ী ডাক্তার-বৌদি ‘ক্লাবের জন্য’ সুশোভনকে বকুনি দিচ্ছে, হয়তো সেটা ভেবেই পার্থ আর সুখেন্দু চোখাচোখি করে হেসে ফেললো।
। ৪।
কিন্তু প্রস্তাবটা মনে ধরলো সকলেরই ।নারী ব্রিগেড যোগ দিলে মুহূর্তে কাজের লোকসংখ্যা ডবল হয়, এটা কেন যে কেউ ভাবেনি আগে! মজার ব্যাপার হলো, বেটার হাফরা প্রস্তাব শুনে একটুও বিটার হলেন না, বাটারের মসৃণতায় তাঁরা কয়েকটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করে ফেললেন, যার একটায় তাঁরা সব্বাই, অন্যগুলোয় দুজন অ্যাডমিন, আর নির্দিষ্ট গ্রুপের কচিকাঁচার বাবা অথবা মা’রা, সুতরাং এক মেসেজ সবার সাথে যোগাযোগ করা অতি সহজ হয়ে গেলো। এতগুলো বছর
ধরে কেন যে এটা মাথায় আসেনি কারো!
তবে মাথায় যেটা এলো শ্যামাপদবাবুর, সেটাও কোনোদিন ঘটেনি। তাঁর প্রস্তাব, এবারে প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনে শুধু জয়ীদেরই নয়. ভল্যান্টিয়ারদের জন্যও প্রাইজ থাকবে, আর সেটা হবে চমক, আগে থাকে জানানোই হবে না। এই সিদ্ধান্ত তিনি ছাড়া জানলো শুধু পার্থ আর সুখেন্দু ।
। ৫।
হইহই করে হয়ে গেলো বসে আঁকো, দশ মিনিটে লেখো আর আবৃত্তি। কোনোটাতেই ভদ্রমহিলারা আর কাউকে কিছু করতে দেননি, বলাই বাহুল্য। কচিদের ভ্যাঁ ভ্যাঁ সামলানো, মা বাবাদের আব্দার ও অভিযোগ শোনা, জাজদের সুষ্ঠু ভাবে আনা ও বিচারে সাহায্য করা, সকাল থেকে তেল খাওয়া মেশিনের মতো চললো সব। বেলা তিনটের মধ্যে সব জয়ীদেরে নাম এসে পড়লো, সেই মতো তাদের মা বাবাদের খবর দিয়ে লেডিজ’রা লাপতা হয়ে গেলেন যার যার ঘরে।
সন্ধ্যে সাতটায় প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন। বয়স্করা যার যার বাড়ি ঘুরে পাঁচটার মধ্যে হাজির, ইয়ং ব্রিগেডদের বেশ কয়েকজনও এসে পড়েছে, অস্ট্রেলিয়াকে ভারত শেষ ওভারে হারিয়েছে, সুতরাং মন বেশ ফুরফুরে সবার।
লোকাল কাউন্সিলর মৃদুল দত্ত আর পাড়ার সবচেয়ে বয়স্ক রতন সাহা এসে পড়তেই অনুষ্ঠান চালু হয়ে গেলো। কিন্তু, মেয়েরা কোথায়?
। ৬।
এই ধরণের অনুষ্ঠানে সাধারনতঃ যারা প্রাইজ পেয়েছে তাদের বাড়ির লোকেরাই আসে, এবং যত সিনিয়রদের পুরস্কারের দিকে ঘোষণা এগোয়, ততই ফাঁকা হতে থাকে ভিড়। একটা ছোট্ট কায়দায় এবার সেটা এড়ানো গেছে। সকলের জন্য রাত্রিবেলা প্যাকেটে বিরিয়ানি আছে,
সেই ঘোষণায় এমন কি প্রাইজ না পাওয়া জনতাও ভিড় করে আছে। অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে, এইবার, সেই চমক..
। ৭।
‘এই, তুমি কোথায়?‘ পার্থ’র ফোন করবীকে। সে আর সুখেন্দুই শুধু জানে এরপর কী ঘোষণা হবে।
‘কোথায় মানে! কাল মেয়ের ম্যাথস এক্সাম, পড়াচ্ছি!’
‘না মানে, ক্লাবে বিরিয়ানি..’
‘তোমার কি মনে হয় আমার এখন ক্লাবে যাওয়ার সময় আছে?’
থতমত পার্থ মন দেয় অনুষ্ঠানে। ঘোষক সঞ্জয় বলে চলেছে, ‘এবার আমাদের এই অনুষ্ঠান যাদের জন্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাঁদের জন্য এক একটা প্রাইজ! আমাদের ভল্যান্টিয়ারদের জন্য একটা জোরে হাততালি!’
। ৮।
নাম ঘোষণা শুরু হয়.. করবী চৌবে.. আসবে না, পার্থ ইশারা করে।
শ্যামলী সান্যাল.. নেই। বাড়িতে বৃদ্ধ শ্বশুরের রাতের খাবার দিচ্ছে।
তপতী মান্না.. ফোন করেই ধাতানি খেলেন শ্যামাপদ। কুকুরদুটোকে খাওয়াবে কে!
রঞ্জনা শাসমল. . সুখেন্দু আগেই জানে, আগামীকালের সমস্ত রান্না এখন করছে রঞ্জনা, দুজনেই সকালে কাজে বেরোবে।
‘অলিপা গুপ্ত রায়… জরুরি মিটিংএ, ওয়ার্ক ফ্রম হোম না ওয়ার অ্যাট হোম, বোঝা দুষ্কর।
‘ডাঃ সুতপা মৈত্র সমাদ্দার’ .. জানা কথাই, রোগী দেখতে রাউন্ডে। সুশোভনের মতো চেম্বার বন্ধ করে মোবাইল অফ করা নয় তার।
আরো আরো আরো.. যে ক’জন মহিলা ভল্যান্টিয়ারিতে বেলা তিনটে অবধি প্রাণপাত করে গেছেন, কেউ প্রাইজ নিতে উপস্থিত নেই, সকলেই
ব্যস্ত সংসারের রোজকার ভল্যান্টিয়ারিতে।
‘প্রাইজগুলো যে যার বাড়িতে সাবধানে নিয়ে যেও।’ ঘোষক নীরব হওয়ার পরে বললেন শ্যামাপদ মান্না।










