লেখাপত্র বন্ধ রয়েছে বেশ কিছুদিন। অন্তরের তাগিদ আসছে না একেবারেই। নিজস্ব লেখা দূরস্থান — সমাজমাধ্যমের বন্ধুদের পোস্টে মন্তব্যটুকুও করে উঠতে পারছি না।
আমার নিউজফিডে যাঁদের লেখা ভেসে উঠছে,প্রায় সকলের রচনাই পড়ছি। প্রতিক্রিয়াও দিচ্ছি। কিন্তু মন্তব্য করতে গেলেই অনেক শব্দ ঠেলাঠেলি করছে কলম, থুড়ি, আঙুলের ডগায়। গুছিয়ে নিজের বক্তব্য রাখার আর ক্ষমতা হচ্ছে না। কেমন যেন মিশে গিয়েছি ‘জনৈক’ -দের ভিড়ে।
খুবই উন্নাসিক হলো উপমাটি — বিবেক অধোবদন হলো লজ্জায়। কিন্তু কথাটা আদতে সত্যি। আর এই ‘ভিড়ের একজন’ হয়ে ওঠার অনুপম মাধুর্য্যটুকু অনুভব করানোর অন্তরালে কার অবদান রয়েছে বলুন দেখি?
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পরিমার্জনের।
খোলসা করে বলি। বিহারের নির্বাচনপূর্ব অনির্বচনীয় ‘ভোটার ভ্যানিশ’ এর ম্যাজিক দেখে মন অকারণেই সন্ত্রস্ত হয়ে ছিল খানিকটা, অস্বীকার করার জায়গা নেই। তাই যখন আমার রাজ্যটির ২০০২ সালের নির্বাচকমণ্ডলীর জেলাওয়ারি তালিকা আন্তর্জালে ঘোরাঘুরি করতে আরম্ভ করল আর লোকমুখে ঐ তালিকায় নাম থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে জ্ঞাত হলাম, একটু খোঁজখবর করার উদ্যোগ নিতে হলো বৈকি!
(যদিও ভোটারের সাচ্চাত্বের বিচারে ২০০২ সালকেই কেন কষ্টিপাথর হিসেবে রাষ্ট্র বিবেচনা করলেন, সে সম্বন্ধে আমার কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই।)
যাই হোক, প্রথমদিন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট ঘেঁটে ২০০২এর ইলেকটোরাল রোলে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা নামক জেলাটির অস্তিত্ব পেলাম না। ঘাবড়ে গেলাম দস্তুরমতো। বেবাক জেলাটাকেই বিজাতীয় রাখাইন প্রদেশের বাসিন্দাদের ‘শেল্টার’ ভেবে ডিটেনশন ক্যাম্প ঘোষণা করে দিল নাকি? তারপরেই উদাস হয়ে ভাবলাম যাকগে, আমার তো সেই লাওয়ারিসের বচ্চনের মতো ‘অপনে তো আগে পিছে, না কোই উপর নিচে রোনেওয়ালা, না কোই রোনেওয়ালি, জনাবে আলি’ দশা — কিন্তু এই দুর্ঘটনা সত্যি হলে আপামর দক্ষিণ ২৪ পরগণাবাসীর ‘কেয়া হোগা’?
অবশেষে দিনকয়েকের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসানে, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের ওয়েবসাইটে প্রাপ্তব্য ২০০২ সালের নির্বাচক-তালিকায় আমার জেলাটি সগর্বে আত্মপ্রকাশ করল। আমিও নিজ ভোটবুথে নিজেকে সপরিবারে (তখন ছিল তারা) পুনরাবিষ্কার করে ধন্য হলাম।
ঘটনা কিন্তু এখানেই থেমে রইল না। কি এক অপ্রতিরোধ্য কৌতূহলে আমি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, চেনা-আধচেনা পুরোনো আলাপীদের জেলায় জেলায় খুঁজে বেড়াতে শুরু করলাম — কেমন যেন নেশা ধরে গেল। কারো ঠিকানা জানি, কারোর বা বাসস্থানের এলাকা সম্পর্কে আবছা ধারণা রয়েছে কেবল — আমি খোঁজ চালিয়ে গেলাম অক্লান্ত। যাদের ফোন নম্বর জানা রয়েছে, তাদের বুথের নাম জেনে নিলাম। যাদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় শূন্য, তাদের ক্ষেত্রে ব্যোমকেশীয় অনুমান-শাস্ত্রের প্রয়োগ আরম্ভ হলো। নিজের পাগলামি দেখে নিজেকেই ব্যর্থ শাসন করতাম কখনও, কিন্তু মনে তখন জয়েন্ট এন্ট্রান্সের উত্তীর্ণদের ঝোলানো তালিকা দেখার উত্তেজনা — আত্মশাসনে কি তার প্রশমন হয়?
কিন্তু আশ্চর্য হলো, প্রথমদিকে যা ছিল চেনা নাম খুঁজে বার করার চ্যালেঞ্জ, পরে তা মিলিয়ে গিয়ে হলো অচেনা মানুষের ঠিকুজি জানার কৌতূহল!
এই তালিকা দেখার জন্য হামলে না পড়লে আমার ঘুণাক্ষরেও জানা হতো না, এই রাজ্যে মহিন্তা, সাঁত (সাঁতরা নয়) বা সিংহকার্জি বলে কোনও পদবির অস্তিত্ব রয়েছে। কোনও মতদাতার নাম বাচ্চানি, সাইবেনিবালা বা অক্ষাংশ দেখে যেমন হতভম্ব হয়ে গিয়েছি, মনে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে দেশব্রত, মিতাশা বা সত্যম্বদ-র মতো অশ্রুত, মধুর নামগুলি।
বিশ্বাস করুন বন্ধুরা, কখন যেন একই আঙুলছাপের আত্মীয়তায় জড়িয়ে গিয়েছি এঁদের সঙ্গে।
পরিচিত বন্ধুস্বজনেরা যখন উপহাস করে বলেছে, এটাই তাহলে এখন তোমার ফেভারিট পাসটাইম — শ্লেষ অগ্রাহ্য করে হেসে জবাব এড়িয়ে গিয়েছি। মনে মনে ভেবেছি, এই বিশ বছরেরও বেশি পুরোনো ভোটার লিস্ট আমাকে ইতিহাসের যে অনাঘ্রাত সুবাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, তোমরা তার সন্ধান পাবে না কোনওদিন।
মুঠোফোনের উজ্জ্বল পর্দায় যখন বহু বছর আগে ‘নেই’ হয়ে যাওয়া দাদুভাই, মামা, মাইমা, মেসোমশাই, বুড়োদাদু, সম্প্রতি চলে যাওয়া বন্ধুবান্ধবের বাবা-মায়ের নাম দেখতে পাই, যত্নে আঙুল বোলাই সেগুলোর উপরে — জলে ভরে ওঠে দু’চোখ। বড় মায়া, বড্ড মায়া। যখন ফেলে আসা উত্তরবঙ্গের চেনা ইশকুল-বুথগুলোর নাম খুঁজে পাই তালিকায়, অতীত তার অনচ্ছ মুখাবরণ সরিয়ে জীবন্ত হয়ে এসে দাঁড়ায় আমার সামনে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘুরে বেড়াই পার্বতীসুন্দরী স্কুল, মহেন্দ্রগঞ্জ বাজার, শেঠ কলোনি আর হাসপাতাল পাড়ার পরিচিত গলিঘুঁজিতে।
আমি বই পড়তে ভুলেছি, গান শুনতে অনীহা, কোন লেখাতে কি মন্তব্য করব গুলিয়ে যাচ্ছে। বড়স্যারের চোখরাঙানি, অবিরাম বৃষ্টি, বাড়ির সামনে গোড়ালি উপচোনো জল, সেই জল বেয়ে সিঁড়িঘরে চিতিবোড়ার রোমাঞ্চকর অনুপ্রবেশ — কিছুতেই আমাকে টলাতে পারছে না অনবদ্য অতীত রোমন্থন থেকে।
একটা বহুচর্চিত, বহুবিতর্কিত ভোটার তালিকা আমাকে হারিয়ে যাওয়া বা না যাওয়া, জানা-অজানা অসংখ্য সহনাগরিকের সঙ্গে একাত্ম-বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে, কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিয়েছে সেই ‘বিতে হুয়ে দিন’এর ঝিম ধরা সৌরভ, এই তীব্র অপ্রেমের, নিষ্ঠুর ঔদাসীন্যের, মূর্তিমান হিংস্রতার কর্কশ বর্তমানে এনে দিয়েছে পেলব সহমর্মী একটুকরো সৌভ্রাতৃত্ববোধ — এ বড় সামান্য ব্যাপার নয়।
নিঃসঙ্গ বর্তমানের কালচে সবুজ পাতায় একলা শূককীট ফুল্ল ভবিষ্যতের দিকে অসীম আগ্রহে বুকে হেঁটে যায়, আজকের দিন নিঃশব্দে আংটিবদল করে কালকের সঙ্গে। দীঘির জলে দীর্ঘ ছায়া ফেলে চলে যায় তেইশটা বছর। ভিতু জানলার পাশে কাঠফাটা রোদ ঠেকিয়ে রাখে একদলা নরম কুয়াশা, একটা ছেয়েরঙের মনখারাপি শামুক গুটগুট করে নেমে আসে আকাশিপাড়ার রাস্তায়। ভাঙা চৌকাঠে কার ভিজে পায়ের ছাপ পড়ে, ফের মিলিয়ে যায় অবেলার বাঁকে — তবু কিছুতেই আমার বাবা-মায়ের এই বাড়িটাকে তার ঠিকানা হারাতে দেয় না।
২০০২ সালে তোলা এই একটিই ছবি পেলাম অ্যালবামে। কালিয়াগঞ্জের স্টুডেন্টস হেলথ হোমের অনুষ্ঠানে।
অতীতমুহূর্তশিকারী নিষাদের মতো স্মৃতিপত্রে তাই নিয়ে এলাম সকলের জন্য, নিজের জন্য।










