পৃথিবীর নীল ফুসফুস গভীর ক্ষয়রোগে আক্রান্ত। একটু একটু করে তা অন্তিমের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সুবিস্তৃত নীল জলভাগ থেকে ভেসে আসা অস্ফুট আর্তনাদ প্রতিনিয়তই জানান দিচ্ছে তার বিপন্নতার কথা। সে যেন জরুরি বার্তা পাঠিয়ে বলছে – “আমি আর শ্বাস নিতে পারছিনা। তোমরা আমার কথা শোন, আমার দিকে তাকাও”।
এসো,কান পেতে রই….
এই জরুরি কথাগুলো শোনা ও শোনাতেই খুব সম্প্রতি ফ্রান্সের নাইস্ শহরে পালিত হলো বিশ্ব মহাসমুদ্র দিবস (জুন ৮, ২০২৫ )।আলোচ্য সম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমুদ্র বিশেষজ্ঞদের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এই ঘনিয়ে আসা বিপদের কথা। শুনতে অবাক লাগলেও বলি, সমুদ্র জলের অক্সিজেন মাত্রা উদ্বেগজনক হারে কমছে। মহাসমুদ্রের মধ্যেই তৈরি হয়েছে ডেড্ জোন বা মৃত এলাকা যেখানে সামুদ্রিক প্রাণিরা আর বাঁচতে পারছে না। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে প্রায় প্রতিদিনই এই মৃত এলাকার পরিসর বেড়ে চলেছে যা, এই মুহূর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আয়তনের সমতুল। বিগত প্রায় পাঁচ দশক ধরে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তিলেতিলে। আমরা সবাই চোখ বুজে একরকম ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলাম এতোগুলো দিন। এবার কি তাহলে স্বপ্ন ভঙ্গের পর্ব শুরু হলো? এ জিজ্ঞাসা সকলের।
অনন্ত জীবনের আখ্যান ও বেড়ে চলা উষ্ণতা।
অথচ সমুদ্র জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অনন্ত জীবনের স্পন্দন। এই বিশাল সামুদ্রিক পরিবারে রয়েছে প্রায় ২৫০,০০০ প্রজাতির প্রাণি যাদের মধ্যে রয়েছে আণুবীক্ষণিক প্ল্যাঙ্কটন, বর্ণিল রীফ কোরাল থেকে শুরু করে সুবিশাল আকৃতির নীল তিমি। নীল জলের এই বিপুল সম্পদের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর প্রায় ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ সুলভ প্রোটিন পুষ্টির জোগানের জন্য।
এদিকে সমুদ্র জলের উষ্ণতা বাড়ছে । এই উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্র জুড়ে এখন বিপন্নতার হাহাকার। বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর বিস্তির্ণ জলভাগ এখন marine hypoxia রোগে আক্রান্ত। স্থলবাসীরা বাতাসের অক্সিজেন থেকে নিজেদের প্রয়োজন মেটায়। অন্যদিকে জলচর প্রাণিরা সমুদ্রের জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন ব্যবহার করে তাদের শ্বসনের জন্য। মুশকিল হলো এই যে, সমুদ্রের জল ক্রমশই দূষণের কবলে পড়ায় জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে লক্ষণীয়ভাবে।আর এতেই শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে অক্সিজেন মাত্রা কমে যাওয়ায় সমুদ্রের বুকে এই hypoxic zone বা অক্সিজেন সঙ্কুল অঞ্চলের বিস্তৃতি ক্রমশই বাড়ছে যার অর্থ এই সব এলাকার জল কোনো ধরনের প্রাণির বসবাস করার উপযোগী নয়। এইসব এলাকাকে সমুদ্রের মৃত এলাকা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে । ১৯৬০ এর দশকে এমন নথিভুক্ত মৃত সমুদ্র অঞ্চলের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ টি যেগুলো সবই সীমাবদ্ধ ছিল একেবারে উপকূল লাগোয়া অঞ্চলে। আর আজ? সেই সংখ্যাটাই বাড়তে বাড়তে এসে পৌঁছেছে ৫০০ টি হাইপক্সিক এলাকায় ! এই বন্ধ্যা সামুদ্রিক এলাকার পরিসর আগামী দিনে রাতারাতি কমে যাবে এমন কখনোই নয় বরং বাড়বে। এরফলে সমুদ্রের বিপুল পরিমাণ সম্পদ থেকে আমরা বঞ্চিত হতে চলেছি। আরও সুতীব্র হবে বিপন্নতার হাহাকার।
নতুন কৃষিতে বাড়ে মৃত্যুর মিছিল
কেন এমন মুমূর্ষু হাল আমাদের পৃথিবীর মহাসাগর গুলোর?
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে রাসায়নিক সার নির্ভর নয়া কৃষি ব্যবস্থার পত্তনের আগে পর্যন্ত সমুদ্র পরিসরের এমন নেতিবাচক পরিবর্তন সম্পর্কে আমরা মোটেই অবহিত ছিলাম না। আসলে রাসায়নিক সার সমুদ্রের গভীর অংশ পর্যন্ত এক শৃঙ্খলিত বিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কৃষিক্ষেত্রে কৃষকেরা যে সব রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন তাদের শেষ গন্তব্য হলো সমুদ্র। সমুদ্রের জলে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস ঘটিত রাসায়নিক সারের পাশাপাশি শহরাঞ্চলের নানান ধরনের বর্জ্য, শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য নদী বাহিত হয়ে এসে মিশছে সমুদ্রে। এদের সম্মিলিত প্রভাবে সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও অ্যালগিরা বৃদ্ধি পায় অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। এর দরুণ সূর্যের আলো পর্যাপ্ত পরিমাণে গভীরতর অংশে পৌঁছতে না পারায় মাছ সহ অন্যান্য প্রাণিদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।
আমাদের আবার চিন্তা কী ?
প্রশ্ন হলো,স্থলবাসী হিসেবে আমরা সবাই কেন সমুদ্রের স্বাস্থ্য নিয়ে এতখানি উদ্বিগ্ন হবো? এই প্রশ্নের উত্তরে একটুই বলার যে আমাদের সমৃদ্ধির সঙ্গে সমুদ্রের স্বাভাবিকতা বজায় থাকার বিষয়টি নিবিড় সম্পর্কে সম্পর্কিত। একটা সাধারণ হিসেব থেকে জানা যাচ্ছে যে সমুদ্র সম্পদ পৃথিবীর অর্থনীতিতে প্রায় $ ২.৫ ট্রিলিয়ন অর্থের জোগান দেয় এবং কয়েক বিলিয়ন মানুষ যারা সমুদ্রের উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করেন তারা কর্মসংস্থান ও খাবারের জন্য প্রত্যক্ষভাবে সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে marine hypoxia আক্রান্ত এলাকার পরিমাণ যত বাড়বে ততই এই বিপুল সম্পদের জোগান থেকে আমরা বঞ্চিত হবো।
মহাসম্মেলন বার্তা…..
নাইস্ শহরের সম্মেলন থেকে একটা জরুরি সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্রের মানুষজনের কাছে। এই বার্তায় বলা হয়েছে যে দূষণের কালো ছায়া এবার আমাদের সমুদ্রকেও তিলেতিলে গ্রাস করছে। জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার অর্থই হলো সামুদ্রিক মাছের জোগানে টান পড়া। এরফলে সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের মহিলাদের। পরিসংখ্যান বলছে যে মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে কর্মরত মোট শ্রমশক্তির ৫০% হলেন সাধারণ আয়ের মহিলারা। মাছের জোগানে ঘাটতি তৈরি হলে এই মহিলাদের অধিকাংশই কর্মহীন হয়ে পড়বেন। চাপ বাড়বে পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্যে। নেমে আসবে গভীর অর্থনৈতিক মন্দা যার প্রভাব কাটিয়ে ওঠা খুব সহজে সম্ভব হবে না।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে তাঁদের কাছে এখনো পর্যন্ত যে তথ্য এসে পৌঁছেছে তাতে করে এটা স্পষ্ট যে সমুদ্রের অক্সিজেন মাত্রা কমছে । দীর্ঘমেয়াদে এর প্রতিক্রিয়া সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র তথা উপকুলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে সেই বিষয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে , বর্তমানে যে হারে সমস্যা বাড়ছে তা যদি অপরিবর্তিত থাকে তাহলে তা উষ্ণতার কারণে অতীতের গণ বিলুপ্তির আশঙ্কাকে তীব্রতর করছে।
বিজ্ঞানীদের এই সতর্কবার্তা অমূলক বলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করা হলে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। মনে রাখতে হবে যে সমুদ্রের মৃত এলাকা নিয়তই বেড়ে চলেছে মানে আমাদের সকলের দায়িত্ব বাড়ছে সমানতালে। পৃথিবীর পরিবেশ নিয়ে আমাদের নিরন্তর সতর্ক করে চলেছে যে আন্তর্জাতিক সংস্থা সেই The Global Environment Facility ‘ এর Clean and Healthy Ocean Integrated Programme ( CHOIP) হলো এই লক্ষ্যপূরণের ক্ষেত্রে এক দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ যার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো স্থলভাগ থেকে মাত্রাহীনভাবে রাসায়নিক সারের জলে মেশাকে নিয়ন্ত্রণে এনে সমুদ্র জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করা। এই কাজের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। United Nations Food and Agriculture Organization এবং সহযোগী সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগের মুখ্য উদ্দেশ্যই হলো বঙ্গোপসাগর থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পৃথিবীর প্রধান ১০ টি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের শৃঙ্খলাকে পুনরুদ্ধার করা। এদের প্রধান লক্ষ্যই হলো একেবারে উৎসক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এজন্য নতুন করে প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণ করা, আর্থিক সহায়তা প্রদান ও মুখ্যত প্রাকৃতিক উপায়ে তাকে সমাধান করার ওপর জোর দিতে চাইছেন বিজ্ঞানীরা।
চলো, কোমর বাঁধি
CHOIP ‘ এর প্রাথমিক ও মুখ্য উদ্দেশ্য হলো marine hypoxia বিষয়ে একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টি করা যাতে করে সমস্যার শিকড়ে পৌঁছৈ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি এই সমস্যার হাত থেকে রেহাই পেতে গেলে রাষ্ট্রনৈতিক সদিচ্ছারও প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় স্তরে গৃহীত ব্যবস্থাই পরবর্তীতে বৈশ্বিক পটভূমিতে সদর্থক হয়ে উঠতে পারে। এজন্য নীতিনির্ধারকদের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে যথোপযুক্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর জলভাগগুলোর অবক্ষয় সম্পর্কে আগাম সতর্কতা জারি করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করার কথা ভাবা হচ্ছে যাতে করে চটজলদি সমাধানের পথে হাঁটতে পারি আমরা। জলের কান্না দৃশ্যমান নয়; ফলে সমুদ্রের অশ্রু বিসর্জন আমাদের নজরে পড়েনা। দীর্ঘ উপেক্ষা আর অবহেলার কারণে ষআমাদের পৃথিবীর বারি ভাগের বিস্তির্ণ অংশে ছায়া ঘনাইছে। মাথায় রাখতে হবে একটি কঠিন সত্যকে – সমুদ্রকে নষ্ট করেছি আমরা, আর তাই একে পরিশুদ্ধ, প্রাণময় করে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা যেন আমাদের ইতিকর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ও দায়বদ্ধ থাকি।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব মহাসাগর দিবসের আলোচনা সংক্রান্ত বিভিন্ন রিপোর্ট।
জুন ১৬, ২০২৫.
















সলিলেও স্বখাত।জল ,স্থল,বায়ু,অন্তরীক্ষ কিছু বাদ নেই!
সবকিছুর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নিয়ে কর্তৃত্ব ফলাবো আর ফল ভোগ করবো না এটাতো হয়না। নিজেদের পাতা ফাঁদে এখন নিজেরাই জড়িয়ে পড়েছি। এখন চেঁচিয়ে লাভ হবে না।
আরও একটি তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা আমাদের সচেতন ও সমৃদ্ধ করলো। সমুদ্রের জলে এই ঘনায়মান ছায়া আমাদের পরমায়ু একটু একটু করে নিঃশেষ করছে। আমরা বেহুঁশ।মরা মাছের ছবিটি ভয়ঙ্করভাবে মনকে নাড়া দেয়। লেখককে ধন্যবাদ।
অত মাছের মৃত্যু হলো বলে হতাশা জাগছে? এভাবেই আমাদের অবহেলা, আমাদের ঔদ্ধত্য পৃথিবীর বাতাবরণকে একেবারে ধ্বংসের প্রান্তসীমায় এনে ফেলেছে। Marine Hypoxia র দাওয়াই কি ডাক্তারবাবুদের জানা আছে? ছায়া কিন্তু সত্যিই ঘনিয়ে উঠছে।
What if? Increased algae population in Marine environment—> zooplankton and subsequently fishes thrive more—> increased marine life population?
When there is enough food the consumers increase.
Or is it related to chemicals inside the algae growing which can disrupt the physiological processes in the consumers…?
Needs further research and studies on this worldwide…
Dear Sir, Your equation is not working here. The causes of the problem have been discussed elaborately. If the sun light can’t penetrate deep below then how could the marine lives survive ? Please go through the article again. Thanks.
Money hoy onektai Deri hoye gachey!
Tao ekbar shesh cheshta korey dekha jak.
Eto shundor ekti lekhar jonyo dhanyobad!
Aro erokom lekha chai. Sachetanata baruk!
সত্যি সত্যিই যদি এমন সামান্য লেখা পড়ে মানুষের মধ্যে সামান্যতম শুভ বুদ্ধির জাগরণ হয়, তাহলে আমি হাজার বছর ধরে লিখে যেতে রাজি। ছড়িয়ে পড়ুক এই লেখাগুলো সচেতনতার জন্য। একবার এদের জন্য শ্লোগান উঠুক।