২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
“বারান্দায় উঠে আসুন স্যার।” ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ স্টোর এর ফার্মাসিস্ট রাজীবের সনির্বন্ধ অনুরোধ। ৩০সে মার্চ। সন্ধ্যে আট টা। প্রচুর ওষুধ এসেছে শেষ মুহূর্তে। সেই সব গুছিয়ে তোলার পালা চলছিল। আমি ডি আর এসের উঠোনে ঘোরাঘুরি করছিলাম। এমন সময় রাজীবের ওই অনুরোধ। “আশেপাশে প্রচুর সাপ। তাই উঠে আসুন স্যার।” উঠে এলাম। নতুন আসা বাক্স গুলো নিজের আনমনে নেড়ে চেরে দেখি। আর্টেমিসিনিন এর একটা বাক্স।
এসিটি। আর্টেমিসিনিন কম্বিনেশন থেরাপি। ক্লোরোকুইন রেজিস্ট্যান্ট ম্যালেরিয়ার একমাত্র ওষুধ। পালিয়ে যাচ্ছিলাম কেন ? পিছিয়ে যাচ্ছিলাম কয়েকটা বছর। ২০০৮ সাল। মালবাজার, জলপাইগুড়ি। মশামাছি এর মতো মানুষ মরে যাচ্ছে ম্যালেরিয়ায়। ক্লোরোকুইন কাজ করছে না।
মিনগ্লাস চা বাগানের কুলি লাইনে গিয়েছিলাম বুধন ওঁরাও এর ঘরে। তার স্ত্রী মারা গেছে ম্যালেরিয়ায়। আমি গেছি ডেথ অডিট করতে। সদ্য স্ত্রী বিয়োগের শোক সামলে বুধন উত্তর দিচ্ছিল শান্তভাবে আমার প্রশ্নগুলির। উঠে আসার আগে পাল্টা প্রশ্ন হটাৎ। ডাক্তারবাবু, ওষুধ তো নিয়ম করে খাইয়েছিলাম। তাও কেন মরে গেল বৌটা ? কোনো উত্তর ছিল না আমার কাছে। গাড়ি ঘুরিয়ে পালিয়ে বেঁচেছিলাম। বিকল্প ওষুধ তখন ছিল না আমার হাতে।
বিকল্প ওষুধ ছিল না হো চি মিন এর হাতেও। ১৯৬৭ সালে হো চি মিন বিশেষ অনুরোধ পাঠালেন চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই কে। বন্দুক, কামান, গুলি গোলা নয়, ওষুধ চাই বলে। এমন ওষুধ যেটা আবিষ্কার হয় নি। ওই সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের গাদাগুচ্ছের গেরিলা ম্যালেরিয়ায় পটাপট মারা যাচ্ছিল। বাজার চলতি ওষুধ ক্লোরোকুইন কাজে দিচ্ছিল না। তাই এই নতুন ওষুধের আবদার।
চীনের দক্ষিণ প্রদেশগুলি যেমন হাইনান, উনান, গুয়াংসি, সেখানেও একই অবস্থা। চৌ এন লাই তখন মাও সে তুং কে বুঝিয়ে ওষুধ আবিষ্কারের জন্য একটা গোপন প্রজেক্ট চালু করেন। নাম প্রজেক্ট ৫২৩। তারিখ ২৩শে মে, সাল ১৯৬৭
প্রজেক্ট ৫২৩ এর প্রধান হিসেবে ১৯৬৯ সালের গোড়ার দিকে নিযুক্ত হন বেজিং মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ ফার্মাসির ছাত্রী স্নাতক তু ইউ ইউ। বয়েস তখন ৩৯ বছর। চীনা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ঘেঁটে ঘুটে প্রায় ৬৪০ টা ওষুধ চিহ্নিত করেন তু। অবশেষে আর্টিমিসিয়া আনুয়া হার্ব এর থেকে তৈরি হল ওষুধ। ডাই হাইড্রো আর্টিমিসিনিন। ইঁদুর, বাঁদর এর পর্ব পেরিয়ে হিউম্যান এক্সপেরিমেন্ট। ফার্মাসিস্ট তু নিজের শরীরে প্রয়োগ করলেন।
সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এর শেষে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হল সায়েন্টিফিক জার্নালে পেপার নাম না দিয়ে। ১৯৮১ তে ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন এর মিটিং এ টু পাঠ করলেন তার প্রবন্ধ। ২০১৫ সালের ৫ই অক্টোবর তু আরো দুজনের সাথে ভাগাভাগি করে নিলেন মেডিসিন এর নোবেল প্রাইজ প্রথম চীনা মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে।
গঙ্গা, তিস্তা আর মেকং দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। হো চি মিন, চৌ এন লাই, মাও সে তুং মারা গেছেন অনেকদিন। এই আবিষ্কার হো চি মিন এর প্রাণ প্রিয় গেরিলাদের কোনো কাজে লাগে নি। ওটা ছাড়াই তারা দোর্দন্ডপ্রতাপ আমেরিকানদের দেশ ছাড়া করেছিল। সে আজ ইতিহাস। ভিয়েতনাম আজ পেপসি কোকাকোলার আউটলেট এ ছেয়ে গেছে।
আমি বসে বসে ভাবছিলাম, মার্চ মাসের এই ঝক্কি সামলে রাজীব কবে স্বাস্থ্যকর্মী আর ডাক্তারদের পাঠাতে শুরু করবে তাদের যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম – ড্রাগস, কমজুমেবলস, লিনেন, ফার্নিচার, ইকুইপমেন্ট, লজিস্টিকস। কেবল যদি ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে দশটা বছর ঘুরিয়ে দিতে পারতাম। কেবল যদি একটা গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে দিতে পারতাম। গাড়িটা এসে দাঁড়াতো মিনগ্লাস চা বাগানে সেই বুধন ওঁরাও এর ঘরের সামনে, কুলি লাইনে। রাজীব মনের আনন্দে বিলি করতে শুরু করতো এসিটি। ডাক্তার আর ফার্মাসিস্ট। পাশাপাশি। ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে। এসিটি হাতে।
সময় যাবে। উত্তর চব্বিশ পরগনার রাজীব যে রাত আট টা এর সময়েও হাসিমুখে ওষুধের গাড়িকে রিসিভ করে পরের দিন কাঁটায় কাঁটায় সকাল দশটায় হাজির হয়ে যায় অফিসে, সমান উৎসাহ নিয়ে ওষুধ বিলি করার জন্য, সেই রাজীবের বয়েস বাড়বে। ছিপছিপে শরীর একটু ভারী হবে। মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে আসবে। আর কিছুই বদলাবে না। দপ্তরের খাতায় রাজীব অবসরের দিন অবধি সেই ডিসপেনসিং ফার্মাসিস্ট থেকে যাবে। আমি জানি যে এ জীবনে রাজীবের কোনোদিন তু ইউ ইউ হয়ে ওঠা উঠবে না। কোথায় নোবেল প্রাইজ জেতা তু আর কোথায় ভারতের তৃতীয় বিশ্বের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ফার্মাসিস্ট রাজীব মন্ডল। আমি কিন্তু নিশ্চিত যে কোনোদিন রাজীবের সাথে আলাপ করার সুযোগ হলে তু খুশি হতেন। দুই নিবেদিত প্রাণ স্বাস্থ্যকর্মী।
আজ ওয়ার্ল্ড ফার্মাসিস্ট দিবস। সব রাজীবদের, সব ফার্মাসিস্টদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ভালোবাসা, অভিনন্দন।











লেখাটা সুন্দর।তবে জনৈষধী র দোকানে বোঝালো ,যে একজন ডাক্তার কিভাবে ওষুধ বিক্রি করেন।আর ওষুধের কোম্পানির লোকেরা কত ভাগ ভাগ ভাগে ভাগে কমিশন খেতে ও খাওয়াতে, সেইসঙ্গে সরকারের ঘরে সেই কমিশনের ভাগ পাঠিয়ে তবে এক একটা ওষুধের দাম নির্ধারিত হয় নির্ধারিত করে ওষুধের কোম্পানি গুলি কমিশন চাপিয়ে জন সাধারণের কাছে। যার মূল কারিয়াকর্তা হলো সবার আগে একজন ডাক্তার।এটাই বড়ো সত্যির।
সমুদ্র সেনগুপ্তর লেখা পরে সব সময় সমৃদ্ধ হই। তথ্যের বৈচিত্র্য আর মানবিকতার স্পর্শ লেখা কে বিশেষ মাত্রা দেয়
হ্যাঁ একদম্ ঠিক বলেছেন তাইই।