ফাইট ফর কলকাতা
কলকাতাকেকে নিয়ে সকাল থেকেই সমাজমাধ্যমে মিম শেয়ার হচ্ছে। পেনি*থেকে ভেনিস, বৈদ্য থেকে হাকিম কিছুই বাদ যাচ্ছে না। টিভিতে চলছে ব্রেকিং নিউজ।একদল বলছে লাল জলে কলকাতা মাথা অব্দি ডুবে থাকতো,এখন নীল জল নাক নিচে নেমেছে, তাই শ্বাস নিতে পারছেন। আর একদলের দাবি গেল গেরুয়া জল নাকি গোড়ালির ওপরে উঠবে না। সে যাই হোক অন্য কলকাতার ছবি দেখি। যে কলকাতা লড়ে যাচ্ছে।
হাসপাতালে রাউন্ডের জন্য সকাল দশটার সময় বেরোতে হয়েছিল। রাজাবাজার দিয়ে যাবার সময় দেখি বাজার বসেছে। হাঁটু জলে কেনাবেচা চলছে। জল তো আর বেঁধে খিদেকে থামাতে পারবেনা। একজন পাশে দাঁড়ানোর টেম্পোর ওপরে সব রাস্তার কুকুরগুলোকে তুলে দিয়ে পাউরুটি খাওয়াচ্ছে।এই ছবি আমাদের সমাজমাধ্যমে নেই। ধীরে ধীরে পৌঁছলাম বেলেঘাটার নার্সিংহোমে। একতলার রিসেপশন পুরো জলে ডোবা। কত টাকার ক্ষতি হয়েছে কে জানে? মেনগেট থেকে ওপরে ওঠার সিঁড়ি অব্দি চালু হয়েছে ট্রোলিসার্ভিস। ওয়ার্ডবয়রা ডাক্তার, নার্স এবং হাসপাতালে অন্যান্য স্টাফেদের ট্রলিতে বসিয়ে সিঁড়ি অবধি নিয়ে যাচ্ছে। আমিও হাঁটুর উপর অব্দি প্যান্ট গুটিয়ে চলিতে বসলাম।ছবি নিচে। ওয়ার্ডে দেখি নার্সিংস্টাফরা কাজে ব্যস্ত। বেশিরভাগ রোগীর বাড়ীর লোকেরা আজ আসতে পারেনি। তাই তারাই হয়ে উঠেছে রোগীর বাড়ির লোক। অনেকেই নাইট শিফট করে থেকে গেছে। কারণ দিনের স্টাফেরা আসতে পারেননি। কেউ আবার জল ঠেলে বহু দূর থেকে কাজে এসেছে। এই জলেও এমার্জেন্সি অপারেশন চলছে। এর পরের গন্তব্য ছিল নিউ টাউনের নার্সিংহোম। কিন্তু মাঝ রাস্তায় জল জমার কারণে গাড়ি ঘোরাতে হলো। তারপরের গন্তব্য পার্কস্ট্রিএর নার্সিংহোম। মা ফ্লাইওভার দিয়ে পাক সার্কাসে নামা গেল না, তাই রেসকোর্স হয়ে পার্কস্ট্রীট ঢুকতে হলো। কিছু রাস্তা জলের তলায় কিছু রাস্তায় জল নেই। প্রচুর লোক কাজে বেরিয়েছেন। এই বৃষ্টিতে পারেনি শহরকে স্তব্ধ করতে। শহরবাসী চোখে চোখ রেখে মোকাবিলা করছে। পার্ক স্ট্রিটে নার্সিংহোমে পৌঁছে দেখি অনেক স্টাফ।হাসপাতাল মানে শুধু রোগী ডাক্তার, নার্স নয়। রিসেপশনের ছেলেমেয়েরা, লিফটম্যান, হাউসকিপিং, সিকিউরিটি গার্ড।প্রচুর লোকজন। কর্তব্যের খাতিরে কেউ চন্দননগর থেকে ট্রেনে করে হাওড়া, তারপর দু,তিনটে বাস পাল্টে গন্তব্যে।কেউ বাইকে করে বারাসাত থেকে কলকাতা,কেউ খিদিরপুর থেকে হেঁটে। বাড়ি ফেরার পথে দেখলাম এক ট্রাফিক পুলিশ তিনজন ছেলেকে নিয়ে জলে আটকে যাওয়া একটা প্রাইভেট গাড়ি ঠেলছে। ড্রাইভারের সিটে এক বৃদ্ধ পাশে বসে এক বৃদ্ধা মহিলা। এইতো আমার চেনা শহর, চেনা শহরের লোকজন।
কলকাতবাসী হারতে জানে না, কলকাতা এই দুর্যোগকে হারিয়ে পুজোর আনন্দে মেতে উঠবে। শুধু আক্ষেপ থাকবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যে নয়জনকে আমরা হারালাম তাদের ঘরে পৌঁছবে না আলোর রোশনাই,ঢাকের আওয়াজ। রাজনৈতিক চাপানউতর, দাদা দিদিদের ওপর ভরসা এসব ছেড়ে আমাদেরকেই পথে নামতে হবে। যথেচ্ছ প্লাস্টিকের ব্যবহার, যেখানে সেখান জঞ্জাল ফেলা আমাদেরকেই বন্ধ করতে হবে। আমরা নিজেদের না দেখলে কেউ আমাদের দেখবে না। আমরা লন্ডন হতে চাই না আমরা কলকাতাই চাই, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করবো।









