মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার মারা গেলেন। বিমান-দুর্ঘটনায় মৃত্যু। ব্যক্তিগত বিমানে সপার্ষদ সফর করছিলেন, অবতরণের ঠিক আগেই বিমান ভেঙে পড়ে। বয়স হয়েছিল মাত্র ছেষট্টি। তুখোড় রাজনীতিক, সুতরাং বেঁচে থাকলে আরও অনেকগুলো বছর সক্রিয় থাকতে পারতেন। সক্রিয় থাকা বলতে – মানুষের জন্য কিছু করতে পারা। অথবা, দিতে পারা ও নিতে পারা। মৃত্যু, বিশেষ করে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর দিন কিছু বলতে নেই – তবু সত্যের খাতিরে তথ্যটুকু জানিয়ে রাখা যাক, অজিত পাওয়ারের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি, তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির যে অভিযোগ ছিল, সে-ও সত্তর হাজার কোটি টাকার ঘাপলা।
তো আমাদের গর্বের কথা এই যে আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এমন মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন। এবং তাঁর ততোধিক গভীর বিচক্ষণতা তাঁকে গভীর শোকের সঙ্গে সন্দিহানও হতে শিখিয়েছে। আচমকা এমন দুর্ঘটনার পেছনে যে সুগভীর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে, এমন সন্দেহের কথা জানিয়ে তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এমনিতে দেশের বিচারবিভাগের উৎকর্ষ এমন চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছে যে সাধারণ বিচার-প্রক্রিয়াই বলুন কিংবা তদন্ত, তার আগে ‘নিরপেক্ষ’ বিশেষণ আলাদা করে জুড়ে না দিলে ঠিক বুঝিয়ে ওঠা যায় না আমরা এক্স্যাক্টলি কী চেয়েছিলাম (আর কী পাই শেষমেশ, সে তো রোজই দেখা যাচ্ছে)। কিন্তু ওসব কথা থাক।
তো আমাদের মুখ্যমন্ত্রী শুধু রাজনীতিকদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রমূলক নাশকতার সম্ভাবনা দেখলেই উতলা হন এবং স্রেফ তদন্তের দাবি জানিয়েই ক্ষান্ত হন, এমন নয় – তিনি কর্মযোগী (নাকি কর্মযোগিনী লেখা উচিত?) করিৎকর্মা মানুষ। ক’দিন আগেই আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে একটি বেসরকারি সংস্থার মালিকের বাড়িতে ও সংস্থার আপিসে কেন্দ্রীয় তদন্ত-সংস্থা খানাতল্লাশি করতে আসে, আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী সপার্ষদ (অর্থাৎ পুলিশের বড়কর্তা ও রাজ্যের শীর্ষ আমলাবৃন্দ) সেখানে হাজির হয়ে যান – এবং জানান, আইপ্যাক নামক বেসরকারি সংস্থাটি আদতে তৃণমূলেরই শাখা (তাহলে মালিকের নাম হিসেবে জৈন পদবিধারী জনৈক ব্যক্তির উল্লেখ কেন, কে জানে) – এবং সেই সুবাদে সংস্থার আপিস আদতে তৃণমূলেরই পার্টি-অফিস। শেষমেশ কেন্দ্রীয় তদন্ত-সংস্থার নাকের ডগা দিয়ে, চক্রান্তের মুখে নুড়ো জ্বেলে দিয়ে, তিনি গাড়ি ভরে ফাইল ল্যাপটপ হার্ডডিস্ক ইত্যাদি নিয়ে চলে আসেন।
তো অজিত পাওয়ারের বিমানে আগুন ধরে যাবার ঢের আগেই মুখ্যমন্ত্রীর রাজ্যের রাজধানী শহর কলকাতার একটি গুদামঘরে আগুন লেগেছিল। বাইরে থেকে তালাবন্ধ গোডাউনে ঝলসে মরে গেল ষোলজন (নাকি তিরিশজন?) মানুষ। না, তাঁদের একজনেরও নাম জানি না। এঁরা মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন, তা-ও জানি না। শুধু অনুমান করতে পারি – না, অনুমান নয়, নিশ্চিত বলতে পারি – এঁদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ অজিত পাওয়ারের হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির এক হাজার ভাগের এক ভাগও হবে না।
মুখ্যমন্ত্রী এঁদের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন কিনা, সেটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে আইপ্যাকের অফিসে তল্লাশির খবর পাবার মতো করে উতলা হয়ে দৌড়ে যেতে পারেননি, এটুকু দেখতে পেয়েছি। দমকলমন্ত্রী এবং দমকল-আধিকারিক জানিয়েছেন যে ওই গোডাউনের যথাযথ সার্টিফিকেট ছিল কিনা, সেটা তাঁরা এখুনি বলতে পারছেন না। শহরের মেয়রের কাছেও সংশ্লিষ্ট গোডাউন বিষয়ে যথেষ্ট খবর নেই। পুরমন্ত্রী/মেয়র/দমকলমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত’ না হোক, সরকারি বা দলীয় তদন্ত হবে এমন কথা মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন বলে এখনও খবর নেই।
প্রতুল মুখোপাধ্যায় গেয়েছিলেন – সব মরণ নয় রে সমান। প্রতুলবাবু আমৃত্যু মাননীয়ার গুণমুগ্ধ ছিলেন, এমনটাই শুনেছি। তাঁর গানের বাণীর এমন সার্থক প্রয়োগ দেখলে তিনি, নিশ্চিতভাবেই, মাননীয়ার গুণে নতুন করে মুগ্ধ হতেন।
গোডাউনের মালিক কে বা কারা – সেই কোম্পানির মোমো খাব কি খাব না – এসব নিয়ে অনেক পোস্ট দেখলাম। খুবই ভালো কথা। পুরীর মন্দিরে মানত করতে গেলে গাছে সুতো বেঁধে কোনও প্রিয় ফল ত্যাগের কড়ার (অর্থাৎ মনোবাঞ্ছা পূরণ না হওয়া অবধি ওই ফল খাব না, এমন প্রতিজ্ঞা) করতে হয় – দুটি বিষয় ঠিক একই না হলেও প্রায় কাছাকাছিই। কেউ কেউ আবার বাম আমলে জলা বুজিয়ে সরকারি হাউজিং হয়েছিল কিনা এসব তর্কের জাল বিছিয়ে “সব সরকার/দলই একইরকম” (অতএব সবই মায়া) জাতীয় তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ব্যস্ত।
শুধু কেউ এটুকু বলছে না, যে, “কুকুরের কাজ কুকুর করেছে/ কামড় দিয়াছে পায়”-এর মতোই, বাণিজ্যিক সংস্থাকে নজরদারিহীন ব্যবসা করার সুযোগ দিলে তারা যাবতীয় খরচায় (যার মধ্যে কর্মীদের ন্যূনতম মজুরি, ন্যূনতম নিরাপত্তা ইত্যাদি ব্যয়-ও পড়ে) কাটছাঁট করে মুনাফা যথেচ্ছ বাড়ানোর চেষ্টা করে। করবে। করবেই।
গত পনের বছর যাবত রাজ্যে সরকার চালাচ্ছে তৃণমূল।
গোডাউন যাদেরই হোক, তার ছাড়পত্র অনুমতিপত্র নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ইত্যাদি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব ও দায় যে সরকারের ছিল, সেই সরকার তৃণমূল কংগ্রেসের।
কিন্তু সেই ‘খতিয়ে দেখা’ কিংবা নিয়মিত নজরদারি চালানোর কাজটিতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হলেন যাঁরা – সেই দমকলমন্ত্রী/মেয়র/পুরমন্ত্রী/সরকারকে দায়ী করে সোচ্চার হওয়াটা কঠিন। এবং সত্যি বলতে কি, সেভাবে নিরাপদও নয়।
তাই, আপাতত মোমো-ত্যাগই পথ।
পুরীর মন্দিরে মানতের সুতো বাঁধার গাছটির পাশে দাঁড়ানো পূজারী-ঠাকুর তেমন পরামর্শই দেন – সবচাইতে প্রিয় ফলের নাম বলতে হবে না, একবছর যেটা না খেলে অসুবিধে হবে না সেরকম ফলের নাম বলুন।
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা তারে যেন… ইত্যাদি প্রভৃতি… ধ্যাৎ! এসব কবেই তামাদি হয়ে গেছে।









