সত্যজিতের শঙ্কু-কাহিনীর যন্ত্রগোলক কম্পু গল্পের শেষে হিমশীতল গলায় ঘোষণা করেছিল –‘মৃত্যুর পরের অবস্থা আমি জানি।’
আর আজ ৭ই জুন ২০২৬, জনৈক সুকন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় চিৎকার করে বলে উঠতে পারে, বিশ বছরের জাদুনিদ্রার পরে রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মনের অবস্থা ঠিক কি রকম হয়েছিল, আমিও জানি।
ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প ছিল খড়দহের রহড়ায়। চিরচেনা বিটি রোড। বহিরঙ্গে যত পরিবর্তনই হোক, সিঁথির মোড়ের খানিক আগে ‘কর্ণফুলী’ লেখা সেই বাড়ি, চলমান বাসের গায়ে লেগে থাকা ‘ডানলপ’ শব্দটি, আগরপাড়া জুট মিল আর বন্ধ হয়ে যাওয়া ন্যাশনাল টোব্যাকোর পরিচিত সাদাটে বিল্ডিং, ট্র্যাকটর্স ইণ্ডিয়ার পাঁচিল, টেক্সম্যাকোর গেট, সুখচর গির্জার বেঁটে মোটা মিনার আর সোদপুর মোড়ের পাশে পানিহাটি মিউনিসিপ্যালিটি লেখা ভবন আমাকে শৈশবে আছড়ে নিয়ে ফেলল নির্ভুলভাবে।
কিছু ঝাপসা ছবি, অব্যক্ত যন্ত্রণা, পুরোনো ক্ষতের দাগে দরদী আঙুল — এইটুকুতেই শেষ হয়ে যেতে পারত আজকের স্মৃতিময় পরিচ্ছেদ। হলো না নিজেরই নির্বুদ্ধিতায়।
শিবির সেরে ফেরার পথে বিশ্বজিৎকে বললাম, ঐ যে সামনের নেতাজি আর বিবেকানন্দের স্ট্যাচুওয়ালা মোড়টা দেখছ — ওটা হলো আগরপাড়া তেঁতুলতলা স্টপ। ওখান থেকে ডানহাতি গলিটা ধরবে।
“কোথায় যাবে দিদি? চেনা কেউ থাকে এদিকে?”
“কেউ থাকে না, কেউ নেই। শুধু পুরোনো ভিটেটা একবার দেখতে যাব। হোক অন্য লোকের প্রপার্টি — একবার কেবল বাইরে থেকে দেখে চলে আসব।”
বিশ্বজিৎ বাধ্য এবং বিশ্বস্ত সারথি — অবাক হলেও দ্বিতীয় প্রশ্ন করল না।
ইলিয়াস রোড। কিচ্ছু চিনতে পারছি না, কিচ্ছু না। এত দোকানপাট, ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ, মোমো আর পিজ্জার আউটলেট, অসংখ্য বহুতলের ভিড়ে কোথায় হারিয়ে গেল সেই গানের ইস্কুলের মলিন সাইনবোর্ড — ‘কড়ি ও কোমল’? আগরপাড়া পাঠাগারকে চিনতে পেরে উল্লসিত হয়ে উঠলেও, উল্টোদিকের পানাপুকুর আর তার পাশের আইসক্রিম ফ্যাকটরিটাকে খুঁজে পেলাম না। হারিয়ে গিয়েছে। ছোটবেলায় পাঁচ পয়সার লাল-কমলা কাঠি-বরফ খাওয়ার বায়না ধরলেই মায়ের ‘ডোবার নোংরা জল থেকে আইসক্রিমগুলো তৈরি হয়, জানিস তো খুকু’ বলে মিছিমিছি ভয় দেখানোটাও যেমন হারিয়ে গিয়েছে, ঠিক তেমনই।
ঐ তো, ডানদিকে আশুতোষ ভবন আর তার লাগোয়া শিবমন্দিরটা দেখা যাচ্ছে। যাক বাবা, ওটা অন্তত অটুট আছে। ওখান থেকে বাঁ দিকে বেঁকলে ডান পাশে গাবু চাটুজ্জেদের সাতমহলা জমিদারবাড়ির খণ্ডহর দেখতে পাব, আর তার পরেই বুড়োদাদুর ভিটে!
ঘ্যাঁসসসস — আচমকা ব্রেক কষল বিশ্বজিৎ।
‘বাঁয়ে গলি তো রয়েচে দিদি, কিন্তু পোড়োবাড়ি কোথায়? এ তো ঝাঁ চকচকে এককাঁড়ি ফেল্যাট দেখচি!’
উদভ্রান্তের মতো গাড়ি থেকে নামি — চাটুজ্জেদের ছোটতরফের ছোটছেলে, আমার ছোট্টবেলার বন্ধু শুভদের পোড়োবাড়ির লম্বা পাঁচিল, মজা পুকুরের ভাঙা ঘাট আর ওপাশে জড়ামড়ি করে থাকা আম-জাম-জামরুলের জঙ্গুলে অন্ধকার কোন মন্ত্রবলে গায়েব হয়ে গিয়েছে। সেখানে পশ্চিমের সূর্যকিরণ আড়াল করে মাথা তুলেছে আকাশলীনা বাক্সবাড়ি — মুখ উঁচু করে বিড়বিড় করে পড়লাম নামটা – আনন্দময়ী অ্যাপার্টমেন্ট।
অস্থির পায়ে এগিয়ে যাই ফ্ল্যাটগুলোর সামনে। চোখ আটকে যায় মিউনিসিপ্যালিটির একটা ট্যাপকলে। স্মৃতি ঝলসে ওঠে — ঠিক এখানেই তো একটা টিউবওয়েল ছিল, কাজের লোক মীরামাসি তেঁতুল দিয়ে মাজা ঝকঝকে পেতলের কলসি ভরে জল নিয়ে আসত বাড়িতে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কলের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ — তারপর সামনের দিকে চাইতেই চোখ আটকে গেল একটা একতলা শ্রীহীন বাড়ির বারান্দার মরচে ধরা গ্রিলে। অত্যন্ত পরিচিত গ্রিল। হবে না, ও তো শুভ’র জ্যাঠতুতো দাদা রণুদার বাড়ি!
রাঙা চেলি পরে ফুলে সাজানো সাদা অ্যাম্বাসাডর থেকে নামছে কনেবউ বেবিবউদি — সোনালি ওড়নায় ঘেরা পানপাতা মুখ, কাঁচের মতো ত্বক আর টানা টানা মায়াবি চোখের বেবিবউদি — গাবু চাটুজ্জেদের আধভাঙা প্রাচীন অট্টালিকা যেন ঝলমল করে উঠছে তার আভায়।
বাপ-মা’র সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় পৈতৃক ভিটের উল্টোদিকে একফালি জমিতে নিজের একতলা বাড়ি করে পৃথক হলো রণুদা। শুভ’র সঙ্গে কতবার খেলতে গিয়েছি সেই নতুন বাড়িতে। মনে পড়ে, ভিতরের খাবার ঘর থেকে ছাদের সিঁড়ি উঠল যখন, প্রথমে তাতে রেলিং বসানো হয়নি। আমরা সিঁড়ির ধাপে হুটোপাটি করলেই হাতে ঘরে তৈরি নাড়ুর প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে বেবিবউদি আতঙ্কিত হয়ে চেঁচাত,
‘ন্যাড়া সিঁড়ি খুকু, আস্তে আস্তে ওঠো — পড়ে যাবে যে!’
আজ কেউ নেই। রণুদা নয়, বেবিবউদি নয়, সেই খুকুও নয়। তবু ম্লান হেসে বারান্দার গ্রিল বলে উঠল — ‘কতদিন পরে এলে! ভাল আছো তো?’
আমি যন্ত্রচালিতের মতো ঘাড় ঘোরালাম রাস্তার উল্টোদিকে। ওখানেই থাকার কথা তার — আমার বুড়োদাদুর ভিটের।
কিন্তু, এটা কি?
নতুন উঁচু পাঁচিলের মধ্যে দুটো বিশাল লোহার পাত বসানো গেট। ভারি গেটে চকচকে মজবুত তালা ঝুলছে। পাঁচিলের ও পাশে কি রয়েছে রাস্তার এপাশ থেকে বোঝা দায়। একছুটে সরু রাস্তা পেরিয়ে গেটের দুটো পাল্লার মধ্যে চোখ রাখলাম।
নেই, নেই! ঠাকুমার হাতে পোঁতা বাতাবিলেবুর গাছ, আতা গাছ, বাহারি ক্রোটন, দুপুরের একলা অবকাশে হাতের পাঁচ আঙুলে মুকুট করে পরা হলদে রঙের কলকে ফুলের গাছ — কিচ্ছু নেই।
শুধু সর্বাঙ্গে শ্যাওলা মেখে, কপালে সময়ের নিষ্ঠুর কালসিটের চিহ্ন নিয়ে ভূতগ্রস্তের মতো একলা দাঁড়িয়ে রয়েছে আমার বুড়োদাদুর বাড়ি।
ঐ তো ফাটা রোয়াক, আমার পিতপিতে কাগজ মোড়া তেড়াবেঁকা রথ টানবার রাস্তা। মোটা গরাদে দেওয়া জানলাগুলোর পাল্লা খুলে ঝুলছে — ওর ফাঁক দিয়ে রোদ এসে ভাসিয়ে দিত আমাদের লম্বাটে বাইরের ঘর। এই বাড়িতেই বিয়ে হয়ে এসেছিল আমার মা — গোলাপি বেনারসী পরে সন্ত্রস্ত পদক্ষেপে এসে দাঁড়িয়েছিল ইঁটপাতা উঠোনে, বরণ করে ঘরে তুলেছিলেন লখনৌয়ের বড়জ্যেঠি। আজও বড়জ্যেঠির গুরগাঁওবাসী সত্তরোর্ধ্ব সন্তান, আমার মাধুদা, হোয়াটস্যাপে মেসেজ করেন আমায় –
‘হাউ ইজ় ছোটকাকিমা’জ় ডটার নাউ?’
বুড়োদাদু ন’জ্যাঠার রূপনারায়ণপুরের কোয়ার্টারে মারা গিয়েছিলেন, ১৯৭২এ।
শুনেছিলাম, কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে মাকে ডেকে বলেছিলেন —
‘জানো ছোটবৌমা, খুব ইচ্ছে করে, আমার আগরপাড়ার বাড়িতে ফিরে যাই আর কষে তোমার হাতের রান্না ভুনি খিচুড়ি খাই’ –তাঁর ফেরা হয়নি।
বাবা, ন’জ্যাঠা, জেম্মা, মা — কারোরই ফেরা হলো না আর।
কিন্তু আমাকে তো এবার ফিরতে হবে।
অচেনা, অদেখা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে গ্যালভানাইজ়ড আয়রনের কঠিন দরজার পাল্লা বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনতা জল। ফিসফিস করে বললাম — ‘আমি এসেছিলাম বুড়োদাদু। বাবা জ্যাঠার বিক্রি করে দেওয়া এই বাড়িটা ফের কিনে নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তবে এই মাটিতে, পাঁচ নম্বর হরিমোহন চ্যাটার্জি রোডের হাওয়ায় আমার স্পর্শ রেখে গেলাম। প্রণাম নিও।’
গ্রীষ্মের পড়ন্ত বেলায় এক অপরিচিত পাড়ার পথচলতি কিছু মানুষজন অবাক চোখে দেখলেন বন্ধ লোহার গেট ধরে এক মধ্যবয়সিনীর আকুল অশ্রুবিসর্জন। তবে সময় এখন ভারি সভ্যভব্য, কেউ অকারণে অপরের ব্যক্তিগত পরিসরে নাক গলান না — তাই সদ্যজাগ্রত বিস্ময়কে পাশ ফিরিয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজেদের পথে চলে গেলেন সকলেই।
গাড়িতে এসে বসলাম। ইলিয়াস রোড থেকে বিটি রোডে পড়ল গাড়ি। সেখান থেকে শ্যামবাজার হয়ে মেডিক্যাল কলেজ। মুঠোফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে দেখলাম আজ নাকি বিশ্ব যত্ন দিবস। অপরের মনের খেয়াল রাখার দিন। অন্য কোনও ব্যক্তির বিপন্নতায়, বিষণ্ণতায়, তার হাতের উপর হাত রাখার দিন। একাকী মানুষের নিঃসঙ্গতাকে ব্যঙ্গ না করে তাকে ‘পাশে আছি’ বলার দিন।
হবে হয়ত! হু কেয়ার্স?












