আসুন, পরিচয় করা যাক, যুক্তিবাদীদের নয়নের মণি, “ভারত পথিক” রাজা রামমোহন রায়ের সাথে।
দেশী নুন চাষকে ধ্বংস করে মুনাফা বৃদ্ধির স্বার্থে বিলেত থেকে নুন আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের সবদিক খতিয়ে দেখতে ব্রিটেনের পার্লামেন্টারি কমিটি স্বাক্ষ্য নেয়। তাদের নানান প্রশ্নের মধ্যে একটি জিজ্ঞাস্য ছিল যে আমদানি করা এই বিলিতি নুনের যথেষ্ট খদ্দের পাওয়া যাবে কিনা রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজে। তাদের এই প্রশ্নের উত্তরে রাজা রামমোহন জানাচ্ছেন, “আমি জানি যে এই লবণের দাম ভারতবর্ষের প্রায় এক চতুর্থাংশ। সুতরাং এতে কোনো সন্দেহ নেই বিলিতি লবণ আমদানি করা হলে খুব অল্প সংখ্যক পেশাদার ব্রাহ্মণ ছাড়া ভারতীয়রা খুব আনন্দের সাথেই কিনবেন।” এখানেই থেমে না থেকে তিনি আরো জানিয়ে দেন যে আর্থিক দুর্দশার কারণে বাংলার মানুষের একটা বড় অংশ কেবল লবণ দিয়েই ভাত খেয়ে থাকে। [তথ্যসূত্র: ১]
ভারতীয় বাজার বিশেষজ্ঞ এ হেন “ভারতপথিক” এর কাছে কমিটির আরেকটি প্রশ্ন ছিল যে দেশীয় নুন চাষ উঠে গেলে এর সাথে যুক্ত দরিদ্র কৃষক (মালঙ্গি নামে পরিচিত) দের ভবিষ্যত কি হবে। প্রশ্নের উত্তরে রামমোহন জানাচ্ছেন, “মালঙ্গীরা যথেষ্ট পরিমাণে সরকারি খালারিগুলিতে নিযুক্ত হতে পারে (যদি ভবিষ্যতে সরকারকে একচেটিয়া লবণ ব্যবসার অনুমতি দেয়া হয়) অথবা তাদের সরকার কর্তৃক স্বীকৃত কিছু ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত লবণ শিল্পে নিযুক্ত করা যেতে পারে এবং অবশিষ্টদের কৃষি ও বাগানের মালি, গৃহ ভৃত্য ও দিন মজুরের কাজে নিয়োগ করা যেতে পারে।” নিজের দেশের কৃষিজীবি মানুষ সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্বার্থে গৃহভৃত্য তে পরিণত করার শাণিত যুক্তি সাজিয়ে দিচ্ছেন রাজা। ভারত পথিকই বটে। [তথ্যসূত্র: ২]
কোর্ট অফ ডিরেক্টরস সিদ্ধান্ত নেন যে নীলকর সাহেবরা লাগামছাড়া জমি কিনতে পারবেন না, চাষের জমিকে নীল চাষের জমিতে রূপান্তর করতে পারবে না। এর বিরুদ্ধে নীলকর সাহেবদের চটি চাটা দেশীয় দালালরা আসরে নামে। তারা সভা ডাকে। তাতে দ্বারকানাথ প্রস্তাব আনে। সেই প্রস্তাব অর্থাৎ নীলকর সাহেবদের সমর্থনে রামমোহন বলেন, “প্রস্তাবের সাথে আমি সম্পূর্ন একমত। নীলকরদের বিষয়ে বলতে পারি, বাংলা ও বিহারের অনেক জেলায় আমি ঘুরেছি। আমি দেখেছি, নীলকুঠিগুলোর কাছাকাছি অঞ্চলের লোকজনরা নীলকুঠি থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের লোকজনের চেয়ে স্পষ্টত ভালো পোশাক পরে ও ভালো অবস্থায় বসবাস করে।”
এই ডাহা মিথ্যে কথাটা বলার পর রাজার মনে বোধ হয় কিঞ্চিৎ বিবেক দংশন হয়েছিল। তাই ঢোক গিলে বলেন, “নীলকরেরা আংশিক ভাবে ক্ষতি করে থাকতে পারে।” কিন্তু চটি চাটার স্বভাব যাবে কোথায়, তাই পরের লাইনেই যোগ করেন, “কিন্তু সব দিক দিয়ে বিচার করে বলা যেতে পারে, সরকারি ও বেসরকারি সব শ্রেণীর ইউরোপীয়দের চেয়ে এই নীলকরেরা এদেশের সাধারণ লোকের অনেক বেশি উপকার করেছে।” অত্যাচারী লম্পট নির্মম নীলকর সাহেবেরা কি কি উপকার করেছে সে বিষয়ে অবশ্য রাজা নীরব ছিলেন, বানিয়ে গল্প বলার ক্ষমতারও তো একটা লিমিট থাকে। [তথ্যসূত্র: ৩]
স্কুল পাঠ্য বইতে লেখা রাজার জীবনীতে এসব তথ্য পাওয়া যাবে না। তাই দোষ আমার বা আমাদের নয়, আমাদের জানতে দেওয়া হয় নি। লবণ চাষীদের, নীল চাষের রায়তদের বীভৎস যে শোষণের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের বাবু বিবিরা বৌদ্ধিক বিহার করে গেছেন তাঁরাই তো আমাদের ইতিহাস ঠিক করে দিয়ে গেছেন, আমরা কতটুকু জানবো আর জানবো না। এটা আমাদের “দুর্ভাগ্য”। এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই তথ্যগুলো কিন্তু কোনো প্রেক্ষিত বিহীন ডিসক্রিট ডাটা নয়। ওইগুলি ছিল রামমোহনের দীর্ঘ মেয়াদী স্ট্যান্ড।
আমাদের “দুর্ভাগ্য” কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আমরা এতো প্রবল ভক্তিবাদের দেশে বাস করি যে সাধারণ ভক্তিবাদীতো বটেই এমন কি যুক্তিবাদীদেরও মরাল স্ট্রেন্থ সংগ্রহ করার জন্য আইকন লাগে, অবতার লাগে, তারা সেই আইকনকে ঘিরে অবিকল ভক্তিবাদীদের মতো দু হাত তুলে নৃত্য করে, সে আইকন রামমোহন এর মতো একজন অমানবিক, নুনের, নীল চাষের দালাল হলেও। তারা ভেবেও দেখে না যে মানবিকতাকে সরিয়ে রেখে কোনো বাদই হয় না, যুক্তিবাদতো নয়ই। আমার বেসিক্যালি করুণা হয় এই অমানবিক যুক্তিবাদের চর্চা দেখে।
সূত্র এক: Rammohun Roy on Indian Economy: Susobhan Chandra Sarkar: Rare book publishing syndicate, 1965: pg 80 to 81
সূত্র দুই: তদেব
সূত্র তিন: Raja Rammohun Roy and progressive movements in India: Jarindra Kumar Majumdar, Art Press, 1941: pg 439












আহা দক্ষিণ বায়ু আনো পুষ্প বনে
ঘুচাও বিষাদেরও কুহেলিকা….❤️
লহো লহো মোর খ্যাতি
লহো মোর কীর্তি লহো পৌরুষ গর্ব
লহো মোর সর্ব।😊🙂
এতো ন্যারোটিভ বেরিয়ে যেত যদি এই মানুষ টি
না জন্মাতেন রামমোহনরায় তথাকথিত। স্ত্রীলোকের বুদ্ধি স্ত্রীলোকের বেঁচে থাকা।আর সর্বপরি স্ত্রীলোকের শিক্ষা।
ঘাটের মরা পুরুষের সঙ্গে তার সহমরণ।
উত্তরাধিকার। আর এতো পান্ডিত্য বেরিয়ে যেতো বেছে বেছে ন্যারোটিভ বের করা ।ঘরের সেই মানুষটি রেদার মাতৃ প্রতিমারূপী মেয়ে মানুষটিই যদি এই রামমোহন বিনা আজও স্বমহিমায় বিরাজিত হতেন।🙏🙏
I tried to say বলতে চাইছি রামমোহন না থাকলে তাঁর আবির্ভাব না ঘটলে স্ত্রীলোকের অস্তিত্ব ,বেঁচে থাকাই দায় হতো। তাদের লেখাপড়ার সমস্ত টা।
কাজের এইসব পান্ডিত্য ন্যারোটিভ খুঁজে খুঁজে পড়াশোনার স্পৃহার উত্তর পুরুষ যেন তাঁর জন্ম দাত্রীর কাছে ঋণ স্বীকার করে। তাহলেই হবে।
রামমোহন রায়ের ইতিহাসে শ্রদ্ধা পেতে বয়েই গ্যাছে।