মেক্সিকোর বিশিষ্ট শিক্ষা ও পরিবেশবিদ এবং বামপন্থী ‘ ন্যাশনাল রেজেনারেশন মুভমেন্ট’ (MORENA) দলের নেত্রী ক্লডিয়া শেনবাম পার্দো (জন্ম: ১৯৬২) প্রতিপক্ষকে ৩০% এর বেশি ভোট পার্থক্যে পরাজিত করে আগামী ছয় বছরের জন্য মেক্সিকোর প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট নির্বচিত হলেন। বিশ্ব বিদ্যালয়ে এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং এ উচ্চ ডিগ্রি ধারী এবং ১০০ এর বেশি গবেষণা পত্র, গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও পুস্তকের রচয়িতা বামপন্থী ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই বিদুষী জননেত্রী প্রশাসক হিসাবেও দক্ষ।
‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ‘ (আই পি সি সি) এর সাথে কাজ করেছেন। মেক্সিকোর সিটি সরকারের পরিবেশ সেক্রেটারি ছিলেন (২০০০ – ২০২৬)। ছিলেন তালপান (Tlalpan) ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলের মেয়র (২০১৫ – ‘১৭) এবং মেক্সিকো সিটি সরকারের প্রধান (২০১৮ – ‘২৩)। তাঁর কর্মজীবনে মেক্সিকোর বিখ্যাত গণপরিবহন ব্যবস্থা (Bus Rapid Transport) METROBUS, মেক্সিকো সিটি কে ঘিরে রিং রোড (Anille Periferice) নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ১ কোটি ২০ লক্ষ প্রি স্কুল থেকে সেকেন্ডারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ প্রদান, ইনস্টিটিউট অফ হায়ার স্টাডিজ ও ইউনিভার্সিটি অফ হেল্থ নির্মাণ, প্রান্তিক অঞ্চলে কমিউনিটি সেন্টার (Pilares) নির্মাণ করে বণ্টন ব্যবস্থার উন্নতি, নানা পদ্ধতি নিয়ে ৩০% দূষণ কমানো, দেড় কোটি বৃক্ষ রোপন ও তাদের বড় করা, সিঙ্গেল ইউজ প্লাষ্টিক নিষিদ্ধ করা, বর্জ্য পৃথকীকরণ সংস্থাপন ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা চালু করা, বিভিন্ন স্থানে সোলার প্যানেল বসিয়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন, ২০০ কিমি বাইসাইকেল রোড বানিয়ে ও বাইসাইকেল বণ্টন করে দূষণহীন স্বাস্থ্যকর পরিবহনের ব্যবস্থা, দূষণহীন কেবল বাস চালু ইত্যাদি তাঁর অন্যান্য পদক্ষেপ। তাঁর সময় আমেরিকায় ঔপনিবেশিকতার প্রতীক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের বিশাল মূর্তি সরানো এবং একটি গির্জার দখল করা জমিতে বেআইনি নির্মাণ ভাঙ্গা হয়। আইন শৃংখলার উন্নতি ঘটে। কোভিড পরিস্হিতি ভালোভাবে সামলানোর জন্য তাঁর নাম World Mayor Prize ২০২১ এর জন্য মনোনীত হয়।
প্রেসিডেন্ট শেনবাম মেক্সিকোর প্রথম ইহুদি বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্ট। তাঁর পিতা ও মাতা উভয়েই বিজ্ঞানী। ভাই পদার্থবিদ। বর্তমান স্বামী অর্থনীতিবিদ। দুই সন্তানের জননী প্রেসিডেন্ট তাঁর পূর্বসুরী ও নেতা আন্দ্রে ম্যানুয়াল লোপেজ ওব্রাডর (AMLO) এর মত দেশের চতুর্থ রূপান্তরের (4th Transformation) প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
তাঁদের চতুর্থ রূপান্তরের পথ: এতদিনকার কতিপয় ধনীদের কথা ভেবে নীতিমালার বর্জন। জনশিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও গণ পরিবহন সহ দেশের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও পরিষেবার উন্নতি, বিনামূল্যে সকলের জন্যে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, বয়স্কদের জন্য পেনশন, পড়ুয়া দের জন্য স্কলারশিপ, দুর্গম ও জনজাতি অঞ্চলে খাদ্য বণ্টন ও সরকারি সুযোগ সুবিধা প্রভৃতির ব্যবস্থা। ১৫০০ কিমি এর বেশি বিস্তৃত Mayan Rail (TREN MAYA) রেল ব্যবস্থাকে কার্যকর করা। গ্রাম এবং দুর্গম প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া। দুর্নীতি রোধ ও গণতন্ত্র রক্ষা। নারী কল্যাণ। আইন শৃংখলার উন্নতি। ড্রাগ ঘটিত অপরাধ কমানো। বিভিন্ন জনমুখী দিশা ও প্রকল্প।
মেক্সিকোর বামপন্থীদের কাছে দেশের প্রথম তিনটি রূপান্তর: ঔপনিবেশিক স্পেনের থেকে স্বাধীনতা (১৮১০ -‘২১), গির্জা থেকে সরকারের পৃথকীকরণ সহ সংস্কার (১৮৫৮ – ‘৬১) এবং বিপ্লব (১৯১০ – ‘৭০)।
প্রসঙ্গত মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টি (Partido Communista Mexicana, PCM), প্রথমে ১৯১৭ তে সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি (PSO), পরে ১৯১৯ তে পূর্ণাঙ্গ রূপে গড়ে ওঠে প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী মানবেন্দ্র নাথ রায় (নরেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য ১৮৮৭ – ১৯৫৪) এবং তাঁর সমাজতন্ত্রী মার্কিন স্ত্রী শান্তি দেবীর (ইভলিন ট্রেন্ট রয়, ১৮৯২ – ১৯৭০) হাত ধরে। আবার তাঁদের ও অবনী মুখার্জির হাত ধরে ১৯২০ তে সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দ এ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (Indian Communist Party) জন্ম।
মেক্সিকোর কমিউনিস্ট পার্টি (PCM) তারপর বহু চড়াই উতরাই, দমন নিষেধাজ্ঞা, আন্দোলন পশ্চাদপসরণ, ভাঙ্গা গড়া র মধ্যে দিয়ে ১৯৮১ তে সমমনস্ক কয়েকটি বাম দলের সাথে মিলিত হয়ে তৈরি হয় ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অফ মেক্সিকো (PSUM)। ১৯৮৯ তে পার্টি অফ ডেমোক্র্যাটিক রিভলিউশন (PRD) এর সাথে যুক্ত হয়। শেনবাম ছিলেন ছাত্র ফ্রন্টে PRD এর নেত্রী। পরে আরও কিছু ভাঙ্গা গড়ার মধ্যে দিয়ে মেক্সিকান সোশ্যালিস্ট পার্টি (PMS), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (FDN) প্রভৃতির সাথে যৌথ কার্যকলাপের পর ১৯৯৪ তে তৈরি হয় কমিউনিস্ট পার্টি অফ মেক্সিকো (PCM)। অন্যদিকে রেভলিউশনারি ইনস্টিটিউট পার্টি (PRI) ও PRD থেকে বড় অংশ Amlo র নেতৃত্বে বেরিয়ে গিয়ে MORENA গঠন করে। এটি বর্তমানে মেক্সিকোর সর্ববৃহৎ বাম দল এবং ২০১৮ থেকে দেশের ক্ষমতায়।
অবশ্যই প্রেসিডেন্ট শেনবামের পদ ফুল বিছানো নয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা একটি অতি ধনী শ্রেনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল এতদিন। এছাড়া আছে শক্তিশালী রাজনীতিক মাফিয়া – ড্রাগ কার্টেল – দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ মিলিটারি চক্র। অন্যদিকে দেশের বিস্তীর্ণ অংশে অপার দারিদ্র্য, পশ্চাদপদতা ও প্রশাসনিক ঘাটতি। এছাড়া ঋণের পাহাড়, পরনির্ভর দুর্বল অর্থনীতি। সবচাইতে বড় বিষয় শ্যাম চাচার নাকের ডগায় অর্থাৎ বৃহৎ পুঁজির কর্পোরেটদের সদর দফতর ও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের প্রধান কেন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাঙ্ক প্রভৃতির ঘরের পাশের নিজস্ব পুঁজিবাদের গবেষণাগার মেক্সিকো তে এরকম একটি জনমুখী বামপন্থী সরকার ও তার জননেত্রীকে তারা কতদিন মেনে নেবে আর অন্যদিকে এগুলিকে সামলে নিয়ে প্রেসিডেন্ট শেনবাম ঠিকপথে কতটা কাজ করে যেতে পারবেন সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
২২.০৬.২০২৪











