০৫.১০.২০২৪
১০৬. সুপ্রিম কোর্টের দিকে শুধু আমরাই তাকিয়ে ছিলাম না, তাকিয়ে ছিল গোটা দেশ, এমনকি বিদেশও। সেই সুপ্রিম কোর্টের শুনানির দিন ২৭ থেকে পিছিয়ে হলো ৩০, সেই ৩০-এও প্রথমার্ধে স্থান পেলোনা শুনানি- দ্বিতীয়ার্ধে যখন বিকেল ৪:১৫ বাজে তখন কেসের সময় এলো। সলিসিটর জেনারেল বলছেন, আজ অনেক বেলা হলো পরের দিন শুনানি হোক। এই প্রহসনটা কোনো পাড়ার খাপ পঞ্চায়েতে না, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে হচ্ছে, আমরা দেখছি। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় কোটি কোটি টাকা দিয়ে রাজ্য সরকার উকিল পুষছে, আমরা নিজেদের প্রত্যক্ষ খরচে উকিল নিয়োগ করছি- আর এখানে চলছে দীর্ঘসূত্রিতা, জল মাপা, জনতাকে ভুলিয়ে রাখার কুপ্রচেষ্টা। যদিও চিফ জাস্টিস অনলাইনে মুখিয়ে থাকা দর্শকদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমাদের একটু হলেও মনোরঞ্জন করেছেন।
১০৭. সেই মনোরঞ্জনের মূল উপজীব্য বিষয় অভয়ার আসল নাম কোথায় কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, সেটা কীভাবে আটকানো যায় ইত্যাদি। রাজ্য সরকার ডাক্তারদের সুরক্ষার জন্য কত অশ্বডিম্ব প্রসব করেছেন, এত কম ডিম্ব কেন, কত তারিখে বাকি ডিম্বগুলো ডেলিভারি হবে ইত্যাদি। জুনিয়র ডাক্তারেরা ইনডোরে, নাকি আউটডোরে, নাকি ইমার্জেন্সিতে- কোথায় কোথায় তারা মার খেতে কাজে যোগ দিয়েছেন সেই নিয়ে চচ্চড়ি রান্না। যার মূলকথা না ইন্দিরা জয়সিং বুঝেছেন, না চিফ জাস্টিসকে বোঝাতে পেরেছেন, না তাদের বোঝার ইচ্ছা আছে। কারণ তাদের নিজেদের বইতেই আছে জুনিয়র ডাক্তারদের পড়াশোনার কাজ, রোগী পরিষেবার ক্ষেত্রে তাদের পরিগণিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেকথা মেনে চললে সরকার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যে গান-পয়েন্টে রাখা হয়েছে, সেটা তোলা যায় কীভাবে!! অভয়ার তদন্তের প্রশ্নে কোর্টের স্ট্যাটাস একটাই- বিচার চলছে, একদম লাইনে চলছে- সব চাঙ্গা সি…
১০৮. কথায় কথায় সাগর দত্তের কথাও এলো। রাজ্যের আইনজীবী অন ক্যামেরা বলে দিলেন, রোগীকে বেড দেওয়া হয়নি। কোনো ডাক্তার ছিলনা। তাই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে মারামারি করেছে। রোগী মারা গেল বেডে, অথচ তাকে নাকি বেড দেওয়া হয়নি! বেড দেওয়ার মালিক নাকি জুনিয়র ডাক্তার! অনেকটা ঝালমুড়ি দেওয়ার মতো, বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে যাওয়ার জিনিস। কোনো ডাক্তার ছিল না, অথচ রোগী সিপিআর পেলো, ডাক্তারকে শুনতে হলো, সিপিআর বন্ধ হলেই আরজিকর করে দেব!! সরকারের হয়ে যারা মস্তানি করে, ভোট এনে দেয়, তাদের যে এই লুম্পেনগিরি করার লাইসেন্স দেওয়া আছে, সেটা উকিলবাবু উল্লেখ করলেন না। চিফ জাস্টিস এড়িয়ে গেলেন এটাকে জেনারেল “ল’ এন্ড অর্ডারের সমস্যা” বলে। উনি এটা বলতে পারলেন সুপ্রীম কোর্টের নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। একটা খুন-ধর্ষণের রোগী দেড়মাস পরেও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আপনি কী বিচার করছেন- এই বলে আস্ত মব তাঁর উপর চড়াও হলে উনি নিশ্চয়ই নিরাপত্তাহীনতা কাকে বলে বেশ বুঝতে পারতেন।
১০৯. সুপ্রিম কোর্টে তারিখ পে তারিখ এলো আরো দু’সপ্তাহ পর। বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রিতার প্রহসন ততদিনে দিবালোকের মতো পরিষ্কার। আমরা সরকারের কড়া নাড়লাম আবারো মুখ্য সচিবকে পুরোনো প্রতিশ্রুতিগুলো মনে করিয়ে। স্বাস্থ্যকর্মীদের ও রোগী সুরক্ষায় আমাদের দাবি মেনে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অধিকাংশই অপূর্ণ। দুর্নীতি ও হুমকি সংস্কৃতি নিয়ে সরকারের অবস্থান এখনো অস্পষ্ট। তাই পুনরায় আলোচনায় বসার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, একথা জানানো হয়। কিন্তু উত্তরের অপেক্ষায় সূর্যোদয় কেটে সূর্যাস্ত পেরিয়ে পুনরায় সূর্যোদয় হয়ে যায়, কোনো উত্তরই আসেনা। প্রায় দু’মাসের আন্দোলনে আমাদের প্রাপ্তি হয় কয়েকটা পদ পরিবর্তন, কিছু মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, আর অনেকটা অবজ্ঞা, উপেক্ষা আর তারও বেশি হুমকি, নিগ্রহ!!
১১০. তাই আবারো আন্দোলনে স্টেপ-আপ প্রয়োজন হয়ে পড়লো। নয়তো যাঁরা এতদিনের আন্দোলনে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি অন্যায় হতো। গলা অব্দি দুর্নীতিতে ডুবে থাকা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার না করে আন্দোলন থেকে ফিরে আসার অর্থ কলেজে কলেজে থ্রেট সিন্ডিকেটরাজকে পুনরুজ্জীবিত করা। সর্বস্তরে নিপীড়িত মানুষেরা যে গলার আওয়াজ তুলে ধরেছিল, আরো একবার তাকে গলা টিপে মেরে দেওয়া। এটা মেনে নেওয়া ডাক্তারদের নেতৃত্বের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছে। যদিও একটা বড় অংশের দাবি ছিল আমরা অনেক কিছু পেয়ে গেছি, তাই আন্দোলন থামিয়ে দেওয়াই যায়- কিন্তু তারাও জানতো আমরা বড় আন্দোলনই করেছি, বড় ফল কিছু আনতে পারিনি। তাই আবারো এক দফা- কর্মবিরতি, আংশিক নয় সম্পূর্ণ।।











