আর জি কর আন্দোলন অন্য আর পাঁচটা আন্দোলন থেকে আলাদা। দীর্ঘ পাঁচমাস ব্যাপী এই আন্দোলন চলছে। রাজনৈতিক দল যাদের সমর্থকের সংখ্যা হাজার লাখ কেনো কোটিতে আছে তারাও এতো দীর্ঘ আন্দোলন করা তো দূরের কথা, ভাবতেই ভয় পাবে। মূলধারার রাজনৈতিক আন্দোলন যা হয় সেটা মূলত ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। প্রতিটা মিছিল সভা হয় ভোটের বাক্সে তার কতটা প্রতিফলন হবে সেটা মাথায় রেখে। এই আন্দোলন প্রথমেই তার সুর বেঁধেছে সত্যি কি সেটার সন্ধানে। ফলত যারা ভোটের কারবারি তারা প্রথমে দুয়েকটা মিটিং মিছিল করলেও এখন ঘরে ঢুকে গেছে। আঙ্গুর ফল যেহেতু শৃগালের কাছে টক, তাই মুখ খুললেও এই আন্দোলনকে নিন্দা মন্দ করতেই বেশি ব্যস্ত আছে।
যারা আন্দোলন করছে তারা মনে প্রানে চায় তিলোত্তমার মৃত্যুর পিছনে কি আছে সেই সত্যের উদঘাটন। ফলত সঞ্জয় রাই এর যে বিচার চলছে তাই নিয়ে কেউ চিন্তিত নয়। ওর ফাঁসি হলেও কেউ মনে শান্তি পাবেনা। সবাই নিজের অন্তরাত্মা থেকে জানে এই খুন কোনো একজনের কাজ নয়। অনেকে আছে। এক বৃহত্তর ষড়যন্ত্র আছে। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক খুন।
সত্যের সন্ধানে দুটি স্তর এখানে আছে। সামনের স্তর হলো বৃহত্তর ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত তাদের সবার মুখোশ খোলা। প্রতিটি অপরাধীকে বিচারের আলোয় নিয়ে আসা।
এই দীর্ঘ আন্দোলনে মানুষ নিজেকে অনেক শিক্ষিত করেছে। প্রতিদিন মানুষের নজরে থাকছে গণতন্ত্রের চারটি পিলার। যেগুলো সবাই প্রশ্নাতীত বলে মনে করতো সেগুলোকেই প্রশ্নের সামনে ফেলছে। অন্যান্য আন্দোলনে প্রথম স্তর থাকলেও দ্বিতীয় স্তর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থাকে। আমরা নির্দ্ধিধায় রাষ্ট্রকে ভোট এই ট্যাক্স দিতে অভ্যস্ত। একটি বিশ্বাস থেকে মানুষ ভোট আর ট্যাক্স দেয়। পুলিশ জনতাকে রক্ষা করবে। কোনো অপরাধ ঘটলে তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করবে। পুলিশ তদন্তে সহযোগিতা করবে। তদন্তের ভিত্তিতে আদালত অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ন্যায়ের পক্ষে থাকবে।
এই বিশ্বাসের জায়গাটি আর জি করের ঘটনা টলিয়ে দিয়েছে। মানুষের বিশ্বাসের জায়গায় এই ঘটনা আর তার পরবর্তী আন্দোলন একটি বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এটাই এই আন্দোলনের সুদূর প্রসারী সাফল্য।
আমরা আর জি করের ঘটনার পরে কি দেখলাম?
আমরা দেখলাম জন প্রতিনিধি দ্রুত দেহ দাহ করতে তৎপর। পুলিশ অপরাধের তদন্ত না করে অপরাধীদের আড়াল করতে কাজ করছে। টালা থানার ওসি প্রমাণ লোপাটের দায়ে গ্রেফতার হলো। অপরাধ স্থল সুরক্ষিত না রেখে পুলিশ প্রমাণ লোপাট করতে চাইলো। ডি সি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় প্রেস কনফারেন্সে করে ডাহা মিথ্যা বললো। লাল জামা কে ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্ট বলে চালাতে গেলো। চোদ্দ তারিখ রাতে আর জি করে ভাংচুর সংগঠিত করতে পরোক্ষ ভাবে পুলিশ সাহায্য করলো। পুলিশ গিয়ে মৃতার বাবাকে টাকা অফার করে তার মুখ বন্ধ করতে চাইলো। তদন্ত ভার সিবিআই এর হাতে গেলো। সেখানেও দেখা গেলো তদন্তের নামে প্রহসন চলছে। মহামান্য আদালত এই তদন্ত মনিটরিং করছে। সিবিআই এর এই দায়সারা তদন্ত কোনো অজ্ঞাত কারণে আদালতের এখনো পর্যন্ত চোখে পড়লো না।
এই সমস্ত ঘটনা মানুষের মনের বিশ্বাস টলিয়ে দিয়েছে। মানুষ একজন ভারত রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ভরসা রাখতে চাইছে আইনসভা আদালত মিডিয়া সবার ওপর, কিন্তু আর জি করের ঘটনা বারবার তাকে ধাক্কা দিচ্ছে এই বিশ্বাসের জায়গায়। তিলোত্তমার মৃত্যু আজকে এক ক্রান্তিকালে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পিছনের সত্যি উদঘাটনের ওপর নির্ভর করছে রাষ্ট্রের ও তার পিলারগুলির ওপর নাগরিকের আস্থা থাকবে কি থাকবে না। এই তদন্ত আর বিচার আসলে ভারত রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক বিভাগকে এক লিটমাস টেস্টের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যদি ন্যায় বিচার আসে তাহলে মানুষ আবার বিশ্বাস করবে ভারত রাষ্ট্র তার তদন্ত সংস্থা বিচার ব্যবস্থা সব কিছু নিয়ে নাগরিককে ন্যায় দিতে সক্ষম। যদি দেখা যায় সঞ্জয় রাই একা অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হলো তাহলে মানুষের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে, আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র একটি ধর্ষণ আর খুনের কেসে তার নাগরিককে ন্যায় বিচার দিকে অক্ষম। যদি এই অক্ষমতা প্রমাণ হয়ে যায় তবে সেটি হবে আমার মতো একজন ভারতীয় নাগরিকের কাছে সবচেয়ে বেশি দুঃখের এবং লজ্জার। আমি এখনো আশা করবো যারা দেশের প্রশাসনিক পদে তদন্ত সংস্থায় বা বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আছেন তারা এমন কিছু করবেন না যাতে একজন নাগরিককে এই অক্ষমতার লজ্জা এবং গ্লানি বহন করতে হয়। ভারতের প্রতিটি নাগরিক এখনো মনে প্রাণে বিশ্বাস করে আমাদের রাষ্ট্র তার নাগরিককে ন্যায় বিচার দিতে সক্ষম। আর জি কর কেসে যেনো সেই বিশ্বাস টলে না যায়, এটাই আমার মনে প্রাণে প্রার্থনা।










মনোজ্ঞ লেখা।কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনকে কটাক্ষ করা হচ্ছে ভোটের রাজনীতি ছাড়া নাকি রাজনৈতিক দল আন্দোলন করেন না।এটা ই সমস্যা।এই অভয়ার আন্দোলন ও কিন্তু রাজনৈতিক কারন এখানে আপনি প্রশাসন কে তার সদিচ্ছা সততা কে চ্যালেঞ্জ করছেন।তাহলে শাসকের বিরুদ্ধে পক্ষ নিতে হচ্ছে।কেন? আপনাদের সুরক্ষা আর নির্যাতিতার বিচার।সব দাবিই রাজনৈতিক। আর এই আন্দোলন এই রাজনিতিকে সামনে কেন আনছেন না সেটাই বিস্ময়ের।আর সত্য সন্ধান করতে গেলে রাজনিতি কে বাদ রাখলে সত্য স্নধান না হয়ে অর্ধ সত্য সন্ধান হবে।এটি আমার অভিমত।তবে আপনারা মাননিয়/মাননীয়া ডাক্তারবাবুদের বধ কেই মূল্য দিতে হবে কারন তারাই আন্দলোনে আছেন।আমার মত ছাপষা পাবলিক নয়।তবু মুক্ত মনে সাহসে ভর করে ভাবনাটা বললাম।