উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নতুন বাড়ি তৈরি হওয়ায় খুশি হয়ে সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মী এএনএম দিদি তাঁর ব্লকের বিএমওএইচ কে মেসেজ করে জানাচ্ছেন, “খুব খুশি। এত বছর কাজ করার পর এই প্রথম একটা টয়লেট পেলাম, মায়েরা যেতে পারছেন, আমারও যেতে পারছি। লজ্জায় মুখ ফুটে এই অসুবিধের কথাটা বলতে পারি নি।”
সেই দিদিমণির গল্পও শোনানোর আগে আপনাকে আজ আরেক দিদিমনির গল্প শোনাবো। না, ইনি আপনার মতো অক্সিলিয়ারী নার্স-কাম- মিডওয়াইফ ছিলেন না। ইন ফ্যাক্ট বাঙালিই ছিলেন না। ছিলেন জার্মান- অস্ট্রিয়ান, ইহুদি পরিবারের মেয়ে। এনার নাম লিজা মাইটনার।
ইনি ১৯০৫ সালে ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিক্স এ প্রথম মহিলা ডক্টরেট (আর গোটা বিশ্বে দ্বিতীয়) উপাধি পান। এর কিছু পরে সতীর্থ অটো হান এর সাথে বার্লিনের কাইজার উইলহেল্ম ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করার সুযোগ পান। ওই সময়ে প্রাসিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মহিলাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। সৌভাগ্যক্রমে অটো হানের গবেষণাগারটি ছিল মাটির তলায় বেসমেন্ট এর একটা ছুতোরশালা। তাই কোনোমতে সেখানে লিজা গবেষক হিসেবে প্রবেশ করতে পারেন।
শুরু থেকেই ফিজিক্স -কেমিস্ট্রির মতো পুরুষ প্রধান বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে লিজাকে প্রচন্ড বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এও শুনতে হয়েছে যে লম্বা চুল নিয়ে ল্যাবে কাজ করা বিপদজনক, যদি চুলে আগুন ধরে যায়। ওই বেসমেন্ট এ কাজ করার আরেকটা বিরাট অসুবিধে ছিল। ওতে মহিলাদের জন্য কোনো শৌচাগার ছিল না। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে প্রতিবার লিজাকে হেঁটে হেঁটে যেতে হত কয়েক ব্লক দূরের এক রেস্তোরাঁয়। সেখানে ফিমেল টয়লেট ছিল।
আপনি ঠিক এই অসুবিধের কথাই বলতে চেয়েছিলেন আমার এ এন এম দিদিভাই। আপনি বলেছিলেন যে কিছু উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে এখনো কোনো টয়লেট নেই। ছেলেদের মতো মাঠে ঘাটে যাওয়া যায় না। কখন দরকার পড়বে সেই ভয়ে আপনি সিঁটিয়ে যান। তেস্টায় ছাতি ফেটে গেলেও জলের বোতলে চুমুক দেন রেশন করে মেপে। একদমই না পারলে গ্রামের এক সহৃদয় মানুষের বাড়িতে যেতে হয়। এ জিনিস চলছে বহুদিন ধরে।
লিজাকে কিন্তু কোনো বাধা দমিয়ে রাখতে পারেনি। নিষ্ঠা ভরে নিজের কাজটুকু করে গেছেন ঠিক যেমনটা আপনি করে যাচ্ছেন দিদিভাই। লিজা তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯ বার কেমিস্ট্রি আর ২৯ বার ফিজিক্স এ নোবেল প্রাইজের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। আমার মতো আরো অনেক খারাপ লোকে বলে থাকে যে তার সতীর্থ অটো হান যেমন নোবেল পেয়েছিলেন, তেমনি লিজারও পাওয়া উচিত ছিল- মহিলা বলেই পান নি।
সেই লিজা মাইটনার এর গল্প এখানেই শেষ যিনি হান আর স্ট্রাসম্যান এর সাথে পৃথিবীতে “প্রথম সজ্ঞানে পরমাণুর হৃদয় বিদীর্ণ করেছিলেন”। আমি জানি দিদিভাই, যে আপনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করেন না, মানুষের চোখে আপনি জনস্বাস্থ্যের সামান্য একজন কর্মী। কিন্তু আপনার ওই সমস্যাটা কোনো অংশে লিজা মাইটনার এর সমস্যার চেয়ে কম না। ভাবতে লজ্জা লাগে যে লিজার ঘটনার পরে একশ বছর কেটে গেলেও স্বচ্ছ ভারতে কর্মরত মহিলা সহকর্মীদের সবার জন্য একটা ঠিকমতো শৌচাগারের ব্যবস্থা আমরা করে উঠতে পারিনি অথচ আমরা পরমাণু বোমা বানাতে পারি, মঙ্গলগ্রহে রকেট পাঠাতে পারি।
একাডেমিক জগৎ, গবেষণার জগৎ, কাজের জগৎ জুড়ে মহিলাদের কাছে লিজা মাইটনার আজো একটা প্রেরণার নাম। আর আমার কাছে জনস্বাস্থ্যের সাথে যুক্ত লোকজনের কাছে দিদিভাই আপনি ও আপনার মতো কর্মীরাও প্রেরণার একটা নাম। আমি দুঃখিত, লজ্জিত যে আপনাদের সবার জন্য টয়লেট এর ব্যবস্থা এখনো করা যায় নি। বিশ্বাস করুন দিদিভাই, লিজা মাইটনারও বেঁচে থাকলে আপনার কষ্টে দুঃখিত হতেন, লজ্জিত হতেন। আপনি লজ্জা পাবেন না মুখ ফুটে নিজেদের অসুবিধের কথা বলতে। বলতে হবে, শুনতে হবে, শোনাতে হবে। তাতে যদি কোনোদিন এই অবস্থা বদলায়। এই আশা রেখে আপনার জন্য এই লেখা।










এই সাধারণ অথচ o sadharon lojjajonok পরিবেশ কে বোঝাতে আপনি লিজা মাইটানের
উদাহরণ দিয়ে এই বার্তা দিলেন তুমি নোবেল পাও কি ঝাড়ুদার হোয় মহিলাদের কাজে পুরুষতন্ত্রের সাথে লড়াই করতেই হবে।আমি এই লেখা পড়ে নিজে ঋদ্ধ হলাম।জয়গুরু।