প্রতিনিয়ত নারীর উপর নির্যাতনে উত্তর প্রদেশের সঙ্গে প্রথম হওয়া এই রাজ্যে এক বছর আগে ৯ আগস্ট ২০২৪ আমাদের কন্যাসম মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা স্নাতকোত্তর চিকিৎসক তিলোত্তমা কে মাননীয় মুখ্য, পুলিশ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত সন্দ্বীপ মাফিয়া পরিচালিত আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডিউটি রত অবস্থায় স্বাস্থ্য মাফিয়ারা নৃশংসভাবে অত্যাচার ও গণ ধর্ষণ করে হত্যা করে। তারপর উচ্চতম স্তর থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত পুলিশ ও স্বাস্থ্য প্রশাসন বিষয়টিকে ধামা চাপা দেওয়ার যাবতীয় প্রচেষ্টা চালায়। রক্ষকরা কখন ভক্ষকের ভূমিকায় সক্রিয় তখন পানিহাটির কুখ্যাত তৃণ নেতা নান্টু ঘোষের নেতৃত্বে তিলোত্তমার দেহ তাঁর পিতা মাতা স্বজনদের দেখতে না দিয়ে দ্রুত দাহন করে ফেলা হয়।
এরপর বেলগাছিয়া, কামারহাটি প্রভৃতি অঞ্চলের তৃণ আশ্রিত দুষ্কৃতীদের সংগঠিত করে ১৪ আগস্ট মাঝ রাতে পুলিশ কে নিষ্ক্রিয় রেখে আর জি কর হাসপাতালে ব্যাপক আক্রমণ, ভাঙচুর ও সন্ত্রাস চালানো হয়। সম্ভবত এদের লক্ষ্য ছিল তিলোত্তমার দেহকে আট তলার অর্থো ওটি থেকে পিছনের লিফট দিয়ে এনে চার তলার চেষ্ট ডিপার্টমেন্ট এর যে হল ঘরে ফেলে রেখে পাশের একটি ঘর সংলগ্ন বাথরুমে খুনিরা হাত ধুয়েছিল সেগুলি তছনছ করে আরও প্রমাণ লোপ। কিন্তু রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার অমূল্য ফসল এই দুষ্কৃতীরা ফ্লোর আর তলা গুলিয়ে ফেলে তিনতলার ই এন টি দফতর তছনছ করে দেয়। তবে স্বাস্থ্য দফতর আর দেরি না করে পি ডব্লিউ ডি কে দিয়ে ভিতর থেকে চেস্ট মেডিসিনের ঐ ঘরগুলির দেওয়াল ইত্যাদি ভেঙ্গে ফেলে। এরপর খুনিরা কেউ বিদেশে পালায়, ষড়যন্ত্রী দের কারো পদোন্নতি হয়। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী সহযোগীদের নিয়ে মিছিল ও মিটিং করে পুলিশ কর্তৃক ধৃত মুখ্যমন্ত্রী সৃষ্ট সিভিক পুলিশের এক অনবদ্য চরিত্র সঞ্জয় রাই এর ফাঁসির নিদান দিয়ে বিষয়টির যবনিকা পতন করেন এবং বিধানসভায় দ্রুত ‘ অপরাজিতা বিল ‘ নিয়ে আসেন। পশ্চিমবঙ্গের যুবরাজও তাঁকে জোরালো ভাবে সমর্থন জানান।
পশ্চিমবঙ্গের আর দশটি বিষয়ের মত এখানেই বিষয় টি মিটে যেত। তা না করে কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলেন, আদালতের শরণাপন্ন হলেন। ফল কি দাঁড়াল? রাজ্যের পুলিশ ও কেন্দ্রের সিবিআই মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর নিদান মেনে ঐ সিভিক পুলিশ কেই একমাত্র অপরাধী প্রতিপন্ন করল, নিম্ন আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল আর শীর্ষ কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শ্রী চন্দ্রচূড় জুনিয়র আসল কেসটাকেই অনেক সময় নষ্ট করে পুরো ভ্যানিশ করে দিলেন।
অন্যান্য ক্ষেত্রের মত স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও যথারীতি দুর্নীতি ও থ্রেট কালচার চলল, সেন বাবুদের জায়গায় দত্ত বাবুরা নেত্রীর কাছাকাছি এলেন, দীর্ঘ সময়ে কোন দিশা না পেয়ে বিভাজিত আন্দোলন থিতিয়ে গেল, প্রেস অন্যান্য ইস্যুতে মনোযোগী হল। শুধু সব হারানো তিলোত্তমার পিতামাতা দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে চললেন।
সত্য পরবর্তী (Post Truth) যুগে সবই মরীচিকা !
এখানে আদৌ কি মরিচঝাপি, নন্দীগ্রাম, বোগটুই গণহত্যা ঘটেছে? কুশীলব দের কারও কোন শাস্তি হয়েছে কেউ বলতে পারেন? সন্দেশখালি, শমসেরগঞ্জে আদৌ কিছু ঘটেছে? আর মোমিনপুর – মহেশতলা এগুলি তো সর্বশাস্ত্র বিশারদ কুনালাচার্য ও ‘ আসল বাম ‘ রা বলেই দিয়েছেন বিজেপির ষড়যন্ত্র।
আদৌ কি সারদা, নারদা, রোজ ভ্যালি, রেশন, শিক্ষা, নিয়োগ, আবাস ইত্যাদি দুর্নীতি হয়েছে? কারণ আসল যারা উপভোক্তা হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, বিদেশে টাকা সরিয়েছেন, তাদের পুলিশ, সিবিআই ধরার চেষ্টাই করেনি। তাদের কেউ এখন তৃণ, কেউ বিজেপি নেতা। মমতা দেবী তাদের দীর্ঘদিন ক্যাবিনেট মন্ত্রী করে রেখেছেন, মোদিজী তাদের দেশের দূত হিসাবে জনগণের টাকায় বিদেশে পাঠিয়েছেন। নিজেও সারা বিশ্ব ভ্রমণ করছেন।
অযোগ্য শিক্ষকদের হয়ে রাজ্য সরকার জান কবুল করছেন, আর যোগ্য শিক্ষকরা সব হারিয়ে পথের ভিখিরি। তাঁদের এবং অন্যান্য সঠিক দাবি জানানো শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মচারী, শিক্ষক প্রার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পাশে কেউ নেই। বিধানসভা নির্বাচনের ঘন্টা বেজে যেতে ‘ আসল বাম ‘, ‘ বিদ্বজ্জন ‘, ‘ বিপ্লবী ‘ প্রমুখরা দিদিকে জেতাতে তাদের উপর দেওয়া দায়িত্ব পালনে নেমে পড়েছেন।
২২ এপ্রিল পহেলগাঁও তে কিভাবে কেন কারা এতগুলো মানুষকে মেরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল দেশবাসী এখনও জানতে পারলেন না।
কিন্তু পহেলগাঁও নিয়ে মোদিজীর প্রবল আত্মপ্রচারের ঢক্কানিনাদের ফসল শিরায় শিরায় গরম সিঁদুরের ‘ অপারেশন সিঁদুর ‘ এ যে কি ঘটলো তাও মানুষ ঠিকভাবে জানতে পারলেন না এখন অবধি। সীমান্ত ঘুরে এসে সাংসদরা জানালেন আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, মোদিজীর কৃতিত্ব ম্লান করে ট্রাম্প বারবার দাবি করলেন তিনি যুদ্ধ থামিয়েছেন, কয়েকজন ভারতীয় জেনারেল জানালেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তর কারণে ভারতের অতিমূল্যবান কয়েকটি বিদেশি ফাইটার জেট ভূপতিত হয়েছে, দেখা গেল শশী তরুরের নেতৃত্বে দৌত্য ব্যর্থ হয়ে ভারত এক ঘরে হয়ে পড়েছে।
গত ১২ জুন আহমেদাবাদে ভয়ঙ্কর বিমান দুর্ঘটনায় ঘটে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটল। প্লেনটি জনবহুল এলাকায় ভেঙ্গে পড়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। ব্ল্যাক বক্স, ককপিট ভয়েস রেকর্ডার সবই উদ্ধার হওয়া সত্ত্বেও সত্য প্রকাশ না করে নানারকম গুজব ভাসিয়ে দেওয়া চললো। মার্কিন বহুজাতিক বোয়িং, ভারতীয় বৃহৎ পুঁজি টাটা, কেন্দ্র সরকারের অসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ, আহমেদাবাদের অপরিকল্পিত নগরায়ন কে বাঁচিয়ে মৃত পাইলট দের উপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হল। মোদিজী তুরস্কের সংস্থা কে আগেই তাড়িয়ে দিয়েছেন, তাই জন্য তারা এযাত্রা দোষের ভাগিদারি থেকে বেঁচে গেলেন।
সবই মায়া! ওখানে ট্রাম্প বাবাজী ও মোদিজী এবং এখানে দিদিজী যেভাবে ভোজবাজি দেখাবে সেভাবেই আমাদের সবকিছু দেখতে হবে।
একদা যে অশোক দেব বোমা বাজি ও গুণ্ডমির জন্য কুখ্যাত, তিনিই নাকি এখন অজস্র কলেজের গভর্নিং বডির প্রেসিডেন্ট। তাহলে সেই কলেজগুলি তে মনোজিত মিশ্র রাই তো তৈরি হবে। না না, রাজ্য জুড়ে এই সব খুন ধর্ষণ দুর্নীতি স্বজনপোষণ সবই মায়া! বাংলা শুধু ‘ এগিয়ে ‘ ।
দিদি বাঙালি অস্মিতার প্রসঙ্গ তুলেছেন। মোদিজী প্রতিটি নির্বাচনের আগে একেকটি ইস্যু উপহার দেন তাঁকে। এবারের নির্বাচনের আগে দিলেন ‘ এস আই আর ‘ ইস্যু। আগামী ১৬ জুলাই থেকে তিনি এই নিয়ে পথে নামবেন। তাঁর মুসলিম ও তপসিলি ভোট, যারা মূলত পরিযায়ী শ্রমিক এবং বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কারণে কয়েক প্রজন্ম ধরে আসা, তাঁদের ভোট সংহত হবে। ২১ জুলাই লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশে তিনি আগামীদিনের পথ দেখাবেন। অন্যদিকে ট্রাম্প বাবাজী এবং মোদিজী প্রতিনিয়ত দেখিয়ে চলেছেন। আমরা সেইদিকেই তাকিয়ে থাকি।










