২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
গতকাল রাত বারোটা থেকে আজ ভোর ছ’টা পর্যন্ত কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে গড়ে আড়াইশো মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
মেঘভাঙা বৃষ্টি সচরাচর সমতলে হয় না বলে জানতাম। হয়ত ভুল জানতাম। যেটা একেবারেই জানতাম না সেটা হলো আবহাওয়া দফতর এই ভয়ানক অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সেরকম কোনও আগাম চেতাবনি দেয়নি। কেন? দেওয়া সম্ভব নয় বলেই কি?
জমা জলের মধ্যে পরিবহণের স্বল্পতার কারণে কর্মক্ষেত্রে অথবা হাসপাতালে পৌঁছতে দুর্ভোগ কিংবা বইপাড়া আর অসংখ্য ছোট দোকানদারদের অপূরণীয় ক্ষতির কথাও ছেড়ে দিলাম — একটি আধুনিক শহরে দিনের আলোয় কয়েকটি প্রাণ চলে গিয়েছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। কেন? বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বা বন্টন সংস্থার দায়িত্বটা ঠিক কি? শুধুই ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই? বিদ্যুতের খুঁটি, তার, বক্স রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কি অন্য কারোর? কার?
চিরকাল বেশি বৃষ্টি হলে বিভিন্ন শাখায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। এবারে তার সঙ্গী আমাদের গর্বের মেট্রো রেলও। বৃষ্টি থামার বারো ঘন্টা পরে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার রেল চলাচল স্বাভাবিক হলো। স্বাভাবিক হলো দক্ষিণেশ্বর থেকে ব্রিজি স্টেশন অবধি মেট্রো চলাচলও। বারো ঘন্টা?? তবে উন্নয়নের এত ঢক্কানিনাদ কিসের? শেষ অবধি তো দেখা যাচ্ছে সময়ের দাম সেই শূন্যই?
আমাদের রাজ্যের মাননীয়া কর্ণধার আসন্ন শারদোৎসবের ঘোষিত ছুটি আরও তিনদিন এগিয়ে দিলেন এই সদ্যঘটিত দুর্যোগের প্রেক্ষিতে। বললেন, ইশকুল বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ও নেহাত প্রয়োজন না পড়লে যেন না খোলে। বললেন, ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে। বললেন, রাস্তার জল না সরে যাওয়া পর্যন্ত পথে যেন না নামেন মানুষজন। আরও বললেন, আজকের দিনে যাঁরা চাকরিক্ষেত্রে পৌঁছতে পারেননি, তাঁদের যাতে অসুবিধে না হয় তিনি দেখবেন।
কিন্তু আমার মতো যাঁরা অত্যাবশ্যক পরিষেবার কর্মী? যাঁদের ওয়ার্ক ফ্রম হোম সম্ভব নয়? যাঁরা অসংগঠিত শ্রমিক? ছোট ব্যবসাদার? তাঁদের পথ-নিরাপত্তার কি হবে? উত্তর নেই।
উন্মাদের মতো বৃষ্টি হলে পাগলের মতো জল জমবে, কেন না কলকাতার ভৌগোলিক আকার বাটির মতো — আজন্ম শুনে আসছি এই ‘হক কথা’টি। কিন্তু এর কি কোনও সমাধান নেই?
প্রতি অতিবৃষ্টির পরে জল নামলে পুরসভার সাফাইকারী দল কেন ম্যানহোলগুলো থেকে বাতিল বালিশ, তোশক, ক্যান, ছেঁড়া কাপড়চোপড়ের পোঁটলা টেনে বের করতে থাকে গুপ্তধনের মতো? (প্লাস্টিকের কথা ছেড়েই দিলাম)।
আসলে আমাদের কারোরই কিছু করার নেই। কারণ সম্মিলিতভাবে কোনও গঠনাত্মক কাজ আমরা করতেই পারি না। সরকার, জনগণ, প্রশাসন, সরকারি-বেসরকারি পরিষেবা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থার মালিক, আধিকারিক সক্কলে মিলে একটা শহরের বৃদ্ধ, জরাগ্রস্ত নিকাশিব্যবস্থার উন্নয়ন দূরস্থান — করতে পারার কথা চিন্তাতেও আনতে পারি না।
আমরা সম্মিলিতভাবে দুর্যোগ এবং দুর্ভোগের ভিডিও তুলতে পারি, সেগুলো দিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত(?) মিম এবং রিল তৈরি করতে পারি, ‘আমরা’ ‘ওদের’ এবং ‘ওরা’ ‘আমাদের’ ব্যঙ্গ, আক্রমণ, গালিগালাজ করতে করতে পুরো সমাজমাধ্যমটাকে একটা ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে পারি, আর কয়েকজন হতভাগ্য সহনাগরিকের অপমৃত্যু ভুলে হাতে সেলফি স্ট্যাণ্ড নিয়ে জলে দাঁড়িয়ে দুগ্গাঠাকুরের মণ্ডপ দর্শন করতে পারি সোৎসাহে। উৎসব আসছে না? ওরকম একটু আধটু বানভাসি, ভোগান্তি, টুপটাপ প্রাণেদের ঝরে যাওয়া চলতেই পারে — দ্য শো মাস্ট গো অন!









