লেনিন সিফিলিস বা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে নিউরোসিফিলিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছিলেন এই হাইপোথিসিস প্রথমবার হাজির করার চেষ্টা করেন ইসরায়েল এর তিন গবেষক ডাঃ লার্নার, ডাঃ উইজম্যান এট অল [সূত্র ১: ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ নিউরোলজি, ২০০৪ সাল] । পরে এই তত্ত্ব টি বিভিন্ন জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যমে বহুল প্রচারিত হয়। এদের বক্তব্যের সপক্ষে যে যুক্তি গুলি খাড়া করা হয় সেগুলি হল: এক) ১৯২২ সালে লেনিন কে সালভারসান নামে এক ওষুধ প্রয়োগ করা হয় যেটি সিফিলিস রোগের ওষুধ। দুই) লেনিনের মেডিক্যাল রেকর্ড থেকে বেশ কিছু ল্যাব রেজাল্ট গায়েব হয়ে যায়। তিন) লেনিন কে শেষ সময় যারা চিকিৎসা করেছিলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ লেনিনের ডেথ সার্টিফিকেট সই করতে অসম্মত হয়েছিলেন।
এর বিরুদ্ধে যে যুক্তি গুলি উঠে আসে সেগুলি হল, ১) হ্যাঁ , লেনিন কে সালভারসন প্রয়োগ করা হয়েছিল।।কিন্তু এটা জেনেই যে একাধিকবার সিলিফিস এর টেস্ট (ওয়াসারম্যান টেস্ট) এর ফলাফল নেগেটিভ হয় স্বত্বেও। দুই) এই ইজরায়েলি বিজ্ঞানীরা এই ব্যাখ্যা দিতে ব্যার্থ হয়েছেন যে লেনিনের অটোপসিতে পাওয়া রিপোর্ট এর সাথে কি ভাবে সিফিলিস এর কোনো যোগাযোগ নেই। তিন) এই তত্ত্বের মস্তবড় ফাঁক এটাই যে লেনিন যদি সত্যি সত্যি সিফিলিসে আক্রান্ত হতেন তাহলে শুধুমাত্র মস্তিক নয়, লেনিনের অন্যান্য অংঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। লেনিনের হৃদযন্ত্র বা হাড়ে সিফিলিস এর কোনও চিন্হ পাওয়া যায় নি। চার) লেনিনের পারিবারিক স্ট্রোক আক্রান্ত হওয়ার তথ্যটিকে এই বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ ভাবে কেন অগ্রাহ্য করলেন।
লেনিনের রোগের সূত্রপাত হয় ১৯১৮ এর তিরিশ আগস্ট। ওইদিন ফানি কাপলান লেনিনকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলি চালান। ব্রাউনিং পিস্তলের একটি বুলেট লেনিনের কোটের মধ্যে দিয়ে চলে যায়, একটি বুলেট লেনিনের বাম কাঁধে লাগে, তৃতীয় বুলেটটি লেনিনের গলার বাম দিক দিয়ে বাম ফুসফুসে প্রবেশ করে বেরিয়ে এসে ডান কলার বোন এ আটকে যায়। প্রচুর রক্তপাত হলেও গুলির আঘাতে লেনিন মারা যান নি। গুলি চালানো পরে লেনিনের অপারেশন হয়।
ওই হত্যা প্রচেষ্টা মামলার একজন সাক্ষীর বয়ান অনুযায়ী বুলেটগুলো বিষ মাখানো ছিল। থাকতে পারে, কিন্তু ফরেনসিক মেডিসিন অনুসারে ওই হাই টেম্পারেচারে ওই বিষ এর যা কেমিক্যাল চেঞ্জ হবে তাতে ওটা কাজ করার কথা নয়, করেও নি, লেনিনের শরীরে বিষক্রিয়ার কোনও লক্ষণ ছিল না। লেনিনের উপসর্গ শুরু হয় ১৯২১ সালে – মাথাব্যাথা, অনিদ্রা, মাঝে মধ্যে মাথা ঘুরে পরে যাওয়া। গোর্কিকে চিঠিতে লেনিন লিখছেন, “খুব ক্লান্ত লাগে। কিছুই করতে ইচ্ছে করে না।” [সূত্র ২: সিক্স স্মিথ, মার্টিন, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৭, পৃষ্ঠা ১৭৫-৮০]
২২শে এপ্রিল, ১৯২২ সালে বিঁধে থাকা বুলেট বের করার জন্য লেনিনের অপারেশন হয়। এর পরে ১৯২২ সালের ২৬শে মে লেনিন প্রথমবারের জন্য স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। এফাসিয়া ও রাইট হেমিপ্লেজিয়া হয়। লেনিন আস্তে আস্তে সেরে ওঠেন।
লেনিনের দ্বিতীয় নম্বর স্ট্রোক হয় ১৯২৩ সালের মার্চ মাসে। তৃতীয় স্ট্রোক হয় ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। কথা বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। এর পরে লেনিন মারা যান ১৯২৪ সালের ২১শে জানুয়ারি আবার স্ট্রোক হয়ে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে।
চিকিৎসকদের কেউ কেউ লেনিনের মৃত্যুর জন্য ঘাতকের বুলেটকে দায়ী করলেও আজ আর কোনো সন্দেহ নেই লেনিনের মৃত্যুর জন্য দায়ী রোগ এর নাম সিভিয়ার আথেরোস্ক্লরসিস। ধমনীতে পরিবর্তন, বিশেষ করে মস্তিষ্কের ধমনীতে। এই পরিবর্তন এতটাই ছিল যে অটোপসির সময়, সার্জেন বলেছিলেন যে ফরসেপস লাগাতে “ধাতব আওয়াজ হচ্ছে।” [ সূত্র ৩: ভিন্টার্স, এইচ এট অল, হাম পাতল, ২০২৩,৪৪]
প্রশ্ন উঠে আসে লেনিনের মত মানুষ যিনি আদৌ ধূমপান করতেন না, মদ্যপান করতেন অতীব সীমিত, যার ডায়াবেটিস ছিল না তাঁর ক্ষেত্রে বার বার এই স্ট্রোকের কারণ কী। [সূত্র ৪: মারকোভিক, পি, মেডিক্যাল কেয়ার, ক্লিনিক্যাল সেন্টার, বাল্টিমোর]
লেনিনের বাবা ইলিয়া উইলিয়ানভ মারা গেছিলেন সেই স্ট্রোকে, মাত্র ৫৪ বছর বয়সে। লেনিনের তিন ভাই বোন ও ওই সেরিব্রো ভাস্কুলার রোগে মারা গেছেন। বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছেন যে NT5E জিনের মিউটেশন ঘটিত বংশগত রোগে আক্রান্ত ছিলেন লেনিন [সূত্র ৫: সেন্ট হিলারি সি এট অল, নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল, ২০১১, ৩৬৪]
এই বিজ্ঞানীরা মেনে নেন যে ডাঃ সিনথিয়া সেন্ট হিলারি এর আবিষ্কারের পর লেনিনের এই রোগের পেছনে বংশগত জিনদায়ী । [সূত্র ৬: মারকোভিক, পি, মেডিক্যাল কেয়ার, ক্লিনিক্যাল সেন্টার, বাল্টিমোর]
লেনিন সিফিলিস আক্রান্ত ছিলেন বলে যারা চিৎকার করে থাকেন তারা দয়া করে এই ফ্যাক্ট চেকটি পড়ে পাল্টা কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য হাজির করলে জানালে বাধিত হবো। ফ্যাক্ট চেকটি শেষ হল।










