মুঘল এ আজম -এর সেটে বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুরের সাথে দেখা করতে গেছেন পুত্র শাম্মী। পরিচালক জানিয়ে দিলেন দেখা হবে না কারণ পৃথ্বীরাজ সাজঘরের দরজা বন্ধ করে নিজেকে আটকে দিয়েছেন কারণ তিনি তখন তাঁর অভিনীত চরিত্রের সাথে একাত্ম বোধ করার জন্য মুড আনতে ব্যস্ত। সময় বয়ে যাচ্ছে, পৃথ্বীরাজ কিছুতেই নিজেকে ইন্সপায়ার করতে পারছেন না। অধৈর্য হয়ে শাম্মী সেট ছেড়ে চলে যায়, পরিচালক আসিফের অবশ্য কোনো উপায় ছিল না অপেক্ষা করা ছাড়া। এই গোটা গল্পটা বিবিসি-র এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত প্রখ্যাত অভিনেতা আসরানি।
ঘটনাটা বর্ণনা করার পর সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিককে আসরানি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, “আজকের দিনে, এই ব্যস্ততম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এমন ঘটনা ঘটলে কি হত বলে আপনার মনে হয়?”, এই বলে নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, “মাথায় চাঁটি মেরে সেই অভিনেতাকে সেট থেকে বের করে দেওয়া হত।” এইটুকু বলে আসরানি ব্যাখ্যা করেন যে ইনস্পিরেশনাল এক্টিং বনাম মেথড একটিং এর ধারা মধ্যেকার পার্থক্য। তাঁর কথায় উঠে আসে স্তানিস্লোভক্সি এর নাম। আমাদের দেশের বিদগ্ধ মানুষজন যাদের অনেকেই মনে করেন যে “হিন্দি পপুলার ফিল্মস আর এসেস মেড ফর মাসেস” তাঁরা এই সাক্ষাৎকারটি দেখলে মূর্ছা যাবেন।
ওইসব ফিল্ম ক্রিটিকদের কথা বাদ দিন, হিন্দী ছবির অনেক নিয়মিত দর্শক যারা আসরানির গুণমুগ্ধ তাঁরা অনেকেই জানেন না যে অসরানি অভিনয়টা প্রথাগত ভাবে শিখে ছিলেন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে রোশন তানেজা সহ নামজাদা সব শিক্ষকদের কাছে। তাই তাঁর মুখে স্তানিস্লোভক্সি, মেথড এ্কটিং এসব শব্দ একেবারেই বেমানান নয়।
আসরানিকে নিয়ে কোনো আলোচনাই হতে পারে না তাঁর অভিনীত শোলে ছায়াছবির সেই আইকনিক জেলার সাহেবকে বাদ দিয়ে, ছবির পরিচালক রমেশ সিপ্পি একটি স্বাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন সেই রোল সর্ম্পকে বলতে গিয়ে, “হি ওয়াজ বর্ন টু প্লে।” শোলে করার সময় সিপ্পির মাথায় ছিল আসরানির নাম কারণ দুজনে একসাথে কাজ করেছেন সীতা আউর গীতা ছবিতে। তাই জেলার সাহেবের চরিত্রে এই সুযোগ। আসরানিকে ডেকে আলোচনার সময় সিপ্পি এবং চিত্র নাট্যকার জুটি সেলিম-জাভেদ তাঁকে সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের একটি বই খুলে হিটলারের কিছু ছবি দেখান কারণ জেলার চরিত্র গড়ে তোলা হয়েছিল চার্লি চ্যাপলিনের গ্রেট ডিক্টেটরের ছায়া ধরে। সেই মতো মেকাপ করে, উইগ লাগিয়ে, কস্টিউম পরে আসরানি যখন হাজির হন তখন ঐ ত্রয়ী বুঝে যান যে একটা কিছু ম্যাজিক হতে চলেছে।
হিন্দী ছবিতে কমেডি রিলিফ অংশ নতুন কিছু নয়, শোলে-র আগেও হয়েছে, পরেও। কিন্তু ওই সাড়ে নয় মিনিট এর স্ক্রিন প্রেজেন্স এর সুযোগ নিয়ে আসরানি যা করে গেছেন,, তার তুলনা মেলা ভার। আমরা সবাই জানি যে অর্থ উপার্জনের জন্য বলিউড টলিউড সবখানেরই অভিনেতা অভিনেত্রীদের স্টেজ শো করতে হয়। আসরানিকেও করতে হয়েছে, সংখ্যাটা কয়েক হাজার। এর প্রতিটা শো তে উপস্থিত দর্শকদের চাহিদা মেনে আসরানি ওকে বলতে হয়েছে জেলার সাহেবের সেই সব সংলাপ। এখানে বলে রাখা দরকার যে চরিত্রটা হিটলারের ছায়া অবলম্বনে হলেও, সাধারণ দর্শকদের কথা ভেবে “জার্মান জামানা” না লিখে “আংরেজ জামানা কি জেলার” সংলাপ নিয়ে আসেন সেলিম জাভেদ।
ট্র্যাজেডিটা এইখানেই যে সত্যকাম, অভিমান, নমক হারাম, বাবুর্চি, চুপকে চুপকে, মেরে আপনে সহ নানান ছবিতে ফাটিয়ে কাজ করার পরেও শোলে-র এই গগনচুম্বি সাফল্যের পর বলিউড ইন্ডাস্ট্রি এই আসরানিকে ব্যবহার করে গেছে একের পর এক টাইপ কাস্ট চরিত্রে যেখানে কোনো না কোনো ভাবে সেই জেলার সাহেবের চরিত্রের ছায়া।
চলচ্চিত্র বেসিক্যালি ডাইরেক্টরস্ মিডিয়াম। প্রযোজক পরিচালক যেমন বলবেন তেমন রোলে অভিনয় করতে হবে। পুনে ইনস্টিটিউট এর এই মেধাবী ছাত্র ও অতিথি অধ্যাপক তাই সারা জীবন অসংখ্য স্ল্যাপস্টিক কমেডি রোল করে গেছেন, উচ্চারণ করে গেছেন যৌনগন্ধ যুক্ত প্রায় অবসিন সংলাপ। একটু অন্যরকম করার তাগিদে “চলা মুরারি হিরো বননে” জাতীয় ছবি করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু বক্স অফিসে মুখ ধুবড়ে পড়েছেন। যে সমাজ ব্যবস্থায় চলচ্চিত্র নামের একটি সৃষ্টিকর্মের সাফল্যের অবিসংবাদী মাপকাঠি হল বক্স অফিস কালেকশন সেখানে এটা হতে বাধ্য। পথের পাঁচালী প্রযোজক খুঁজে পায় নি আমাদের মনে আছে।
আজ আসরানির এপিটাফ লিখতে বসে আজ তাই মনে হচ্ছে যে শোলে ছবির ওই সাড়ে নয় মিনিট আসলে আমাদের দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সর্বোত্তম কমেডি নয়, ট্র্যাজেডি। যে ট্র্যাজেডি শেষ করে দিয়েছে অস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা যুক্ত এক অভিনেতার ক্যারিয়ারকে। আসরানি নামক একটি প্রভূত সম্ভাবনাময় প্রতিভাকে আমরা অনেক আগেই মেরে ফেলেছি। দুই দিন আগে তার শারীরিক মৃত্যু ঘটেছে এই যা। গোবর্ধন কুমার আসরানি অমর থাকবেন আমাদের মনে।










দূর্দান্ত লেখাটা।🩵🙏
আসরানী মৃত্যু টা ঠিক, দূর্দান্ত ব্যাটিং করা দীর্ঘদিনের এক বেতো ঘোড়ার পার্মানেন্ট অবসর।কোন্ ছবি এই মুহূর্তে আমার ঠিক এখন নামটা মনে পরছে না। গোবিন্দা ,নায়ক।আসরানির কোমরে ব্যাথা। অবশেষে গোবিন্দা দিয়ে কোমড়ে একখান লাথি মারিয়ে একটা জলাশয়ের সামনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা য়।🙂এমন এক কমেডির দূর্দান্ত রূপায়ন এই আসরানির পক্ষেই সম্ভব।
সত্যিকারেরই সিনেমা টা দেখতে দেখতে মনে হয় কোমড়ের ব্যাথা হলে এমনই কেউ যদি ভীষন জোরে কোমড়ের সেই জায়গায় আঘাত করে বা লাথি মারে তাতে আরাম হবে বা সেরে যাবে ।সেই অবস্থায় ঠান্ডা জল বা গরম জলে সেঁকের মতোন স্নান টাও গভীর ভাবে অন্তরঙ্গ করাতে এই আসরানীই সক্ষম। যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য তোমার।।