১.
একটা গপ্পো বলি। অবশ্য এটা ঠিক গপ্পো নয়, একশো শতাংশ সত্যি ঘটনা । তবে অনেক সময় এমন হয়না যে আমাদের চলতি জীবনের কোনো ঘটনা তার বিশেষতার কারণে ঠিক গপ্পো হয়ে ওঠে। এটা ঠিক তেমনই।
আজকের এই গপ্পের পটভূমিতে রয়েছে সাবেকি উত্তর কোলকাতার এক বর্ধিষ্ণু পল্লি। তখনও আকাশ ছোঁয়া বাক্স বাড়ির দাপট সব কিছু নেড়ে ঘেঁটে দেয়নি। গাড়ি বারান্দা আর রোয়াক শোভিত বাড়িঘরের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল একধরনের নিবিড় নিবিষ্ট যাপন। এমনি এক পল্লির গৃহবধূ হলেন স্নেহলতা দেবী। বেজায় দাপুটে মহিলা। তা সেবার হলো কি প্রতিবেশী সান্যালদের বাড়ির পুশি এসে তাঁদের একতলার ঘরে এসে তিন তিনটি শাবক প্রসব করলো। প্রথম প্রথম টের না পেলেও হপ্তা গড়াতে না গড়াতেই মিউ মিউ মিউজিকে ভরে উঠলো সারা বাড়ি। স্নেহলতা দিন কয়েকের জন্য গুরুগৃহে তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে উঠোন জুড়ে পুশির ছানা পোনাদের ছোটাছুটি করতে দেখেই একেবারে ফস্ করে জ্বলে উঠলেন। মনে মনে বিড়বিড় করে বললেন – এগুলোর একটা গতি না করে আমার স্বস্তি নেই।
– আমার ব্যাগ! নিজের ব্যাগ পড়ে গেলো, আর আমি তা টের পেলুম না ! এমনটা হয় নাকি! ও …ওই ব্যাগ কখনোই আমার নয়। যার তার ব্যা … ব্যাগ আমাকে গছিয়ে দিলেই হলো? আমার রাস্তা থেকে সরে যা তোরা,না হলে আমি কিন্তু ফটিককে ডাকবো।
এরপরের পর্বটুকুকে অনুমান করতে বোধহয় কারোরই তেমন অসুবিধা নেই। ফটিককে আর ডাকতে হয় নি। পাড়ার রোয়াকে বসা তথাকথিত বখাটে ছেলেদের পাল্লায় পড়ে স্নেহলতা দেবী তার ফেলে দেওয়া ব্যাগ পুনরায় তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। কেষ্টর জীবেরা ব্যাগ বন্দি হয়ে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছিল। ব্যাগের মুখ খুলে দিতেই তারা একেবারে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বিমর্ষ মুখে বসে থাকা মায়ের কাছে দৌড়ে যায়। এখন যে তাদের দুধ পানের সময়।
২.
এ পাড়া এখন গিজগিজ করছে কংক্রিটের ভিড়ে। এই তো কিছুদিন আগেও কেমন ফাঁকা ফাঁকা ছিল। এই দ্রুত গতিতে বেড়ে ওঠা জঙ্গলেও অনেকটা মরুভূমির মধ্যে থাকা মরুদ্যানের মতো টিকে রয়েছে একফালি জমি। লোকজন অবশ্য বলে – এটা কালো বাবুর জমি, তবে পুরনো বাসিন্দাদের দু – একজন ছাড়া তাঁকে বিশেষ কেউ দেখেনি। তা এই কালো বাবুর জমিই, হয়ে উঠেছে এ পাড়ার আস্তাকুঁড়।
কেবলমাত্র এ পাড়ার মানুষেরা নয় আশপাশের পাড়ার লোকজনও নির্দ্বিধায় বাড়ির রকমারি আবর্জনা এনে ফেলে যায় এই জমিতে। প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগে মোড়া দৈনন্দিন পূজার বাসি ফুল, অজস্র রকমের প্লাস্টিকের প্যাকেট, বোতল, বাড়ির পুরনো ঝাঁটা, রকমারি ভাঙ্গাচোরা জিনিস, পুরনো জামা জুতো থেকে শুরু করে ঘর মোছার ফেলে দেওয়া ন্যাতা – কী নেই তাতে!! মাঝে মাঝেই ময়লা কুড়ানিরা খাটো পাঁচিলের বাধা টপকে মাঠের ভেতরে ঢুকে ডাই করে থাকা ময়লা ঘেঁটে তাদের প্রয়োজনমতো কিছু উপকরণ তুলে নিয়ে যায় বটে। তবে তা মোট পরিমাণের এক ন্যূনতম ভগ্নাংশ মাত্র। কেউ কাউকে বাধা দেয় না,বারণ করেনা ; আর বললেও কেউ সেসব কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনা। শেষ পর্যন্ত একজন আর সইতে না পেরে রুখে দাঁড়ালো। মাঠের পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে সে বাধা দিতে শুরু করলো। সবাইকে সাফ জানিয়ে দিলো রীতিমতো হুঙ্কার দিয়ে – এখানে আবর্জনা ফেলা চলবে না। আপনাদের বাড়ির ময়লা প্রত্যেকে নিজের বাড়িতেই রাখুন। এই মাঠটা কখনোই ডাম্পিং গ্রাউন্ড নয়। এরপরেও যদি এই কাজ চলতে থাকে, তাহলে আমি যাকে দেখবো ময়লা ফেলতে তাকে দিয়ে ময়লা তুলিয়ে বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দেবো।” রীতিমতো হুমকি দিয়ে রুখে দাঁড়ালেন তিনি। এরপরেই চাকা ঘুরতে থাকে। একজন গৃহবধূর প্রতিবাদ আস্তে আস্তে মান্যতা পেতে শুরু করলো আরও বেশ কিছু মানুষের মধ্যে। আবর্জনার স্তূপ খাটো হতে থাকলো একটু একটু করে। ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানলো এক অন্যায় কাজের বিড়ম্বিত অধ্যায়।
৩.
এই মুহূর্তে যে কাহিনি পরিবেশন করবো তার সঙ্গে ওপরের দুই কাহিনির বিলক্ষণ মিল রয়েছে, কেবল প্রেক্ষাপটটি অনেক সুবিস্তৃত। এই সময়ের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো সমস্যার একটি হলো বর্জ্য সমস্যা, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য বা ই- বর্জ্যের সমস্যা। আমাদের দেশের কথা ধরলেই দেখা যাবে যে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এদেশেও এই ই- বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে মানুষের জীবন যাত্রার মান আমাদের তুলনায় কয়েক কদম এগিয়ে, যারফলে ঐসব দেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। ইদানিং সার্কুলার ইকোনমির কথা খুব বলা হচ্ছে, জোর দেওয়া হয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর ,তা সত্বেও ঐ সব দেশে সমানে বেড়ে চলেছে ই -বর্জ্যের পরিমাণ। নিজেদের দেশে এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে না রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো এই বর্জ্য পদার্থকে পাচার করে দিচ্ছে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে। এইসব দেশের মানুষের বিদেশি পণ্য বুভুক্ষাকে কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উপকরণকে তাঁরা সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই পাঠিয়ে দিচ্ছে এই উন্নয়নকামী দেশগুলোতে। অনেক দিন ধরেই এমনটা চলছে, তবে এবার রুখে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট দেশ থাইল্যান্ড। বর্জ্য ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার প্রতিবাদ। বিষয়টিকে একটু খোলাসা করেই না হয় বলি।
বিশ্বময় দাদাগিরিতে অভ্যস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১২ টি কন্টেইনার বোঝাই করে ২৮৪ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কোনো রকম বৈধ বাণিজ্যিক ঘোষণাপত্র ছাড়াই এনে হাজির করেছে থাইল্যান্ডের বন্দরে। এটাই প্রথমবার তেমন হয়তো নয়, তবে মুখের ওপর না বলাটা এবারেই প্রথম।


এপ্রিল ৪,২০২৬















Amader o eirokom kora uchit
এই বর্জনের মনোভাব সর্বস্তরে প্রাথমিকতা পেলে পৃথিবীর চেহারা অনেকটাই বদলে যাবে।
শেষ পর্যন্ত কি হলো জানার ইচ্ছে রইল। ভারতেও কিছু বর্জ্য আসে বলে শুনেছি।
এর আগে এই বিষয়ে অনেক দীর্ঘ আলোচনা করেছি অন্য একটি নিবন্ধে। থাইল্যান্ডের মতো ছোটো একটা দেশ এই মনোভাব বজায় রাখতে পারবে সেটাই এখন দেখার।
বর্জ্যে র পুনঃ ব্যবহারের নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কারে আরও মনোযোগী হতে হবে।
খুব ভালো লাগলো বাসেল কনভেনশনের কথা জেনে, আর থাইল্যান্ডের শিরদাঁড়ার জোর দেখে। একটা জিনিস বুঝলাম না, আমেরিকা বা ইউরোপের ধনী দেশগুলো এই ইলেকট্রনিক বর্জ্য তুলনায় গরিব দেশে কেন পাঠায়? ওই বর্জ্য কি পুনর্ব্যবহারযোগ্য?