সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো দাম নেই, নিরাপত্তাহীন ভাবে কাজ করতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে যাওয়া হোক বা সরকারি হাসপাতালে এসে লিফটের মধ্যে থেঁতলে মৃত্যু, সরকারি আবাসনের চাঙর মাথায় ভেঙে পড়ে শিশুমৃত্যু হোক, বা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রেফার হতে হতে নিস্তেজ হয়ে পড়া রোগীর মৃত্যু। সব গুলোতেই একটাই সাধারণ ব্যাপার, দায়টা ঠিক কার সেই জায়গাটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই ঝাপসা, অস্পষ্ট! বছর বছর নির্বাচিত হয়ে আসা সরকার যে কাজটা সম্ভবত সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারে সেটা হল – দায় অস্বীকার করা! পলিসিগত বা পরিকল্পনাগত অব্যবস্থার জাঁতাকলে নাগরিকের মৃত্যুর কোনো দায় রাষ্ট্র নেবে না – এটাই যেন আজকের দস্তুর!
শেষ কয়েকদিনের কয়েকটা উদাহরণ নিয়ে যদি আলোচনা করা যায়, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও তার উপভোক্তা সাধারণ মানুষ এর অবস্থার যে চিত্র উঠে আসে তা ভয়াবহ!
অভয়ার মৃত্যুর সময় আমরা প্রথম থেকেই বলে এসেছি, অভয়ার মৃত্যু একপ্রকার পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক মৃত্যু। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশা, আর জি কর সহ পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ এবং সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগের লাগামছাড়া দুর্নীতি এই ঘটনায় সঙ্গে পরোক্ষ ভাবে জড়িত। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের এই বক্তব্য অভয়ার মৃত্যুর আগেও ছিল, (কালের নিয়মে তা কোনোদিনই সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব পায়নি, অভয়া আমাদের মাঝে থাকলে মিডিয়া আজও গুরুত্ব দিত না), পরেও আছে।
সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু ঘটনার দিকে যদি আমরা দেখি —
১) নীলরতন সরকার হাসপাতালে , ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট (CCU) এর ছাদ ভেঙে পড়ে যাওয়ায় রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত। আপনারা শুধু একবার ভাববেন , যে পর্যাপ্ত রোগীর অনুপাতে বেডের অভাব , পরিকাঠামোর অভাব , দালাল চক্র পেরিয়ে কলকাতার ৭-৮ টা হাসপাতালে সারাদিন সারারাত ঘুরে ঘুরে আপনার বাড়ির মুমূর্ষ রোগীকে একটা হাসপাতালের CCU তে ভর্তি করার সুযোগ পেয়েছেন , আর আপনি জানতে পারলেন সেই CCU এর ছাদের চাঙ্গর খুলে পড়ে আপনার মুমূর্ষ রোগীর উপর , তাহলে সেই ঘটনার বিচার আপনাকে কে দেবে? এর দায় কার?
২) কিছুদিন আগে আর জি কর হাসপাতালে মহিলা ডাক্তারদের হোস্টেলের ছাদ ভেঙে পড়ে। আপনি হাসপাতালে আপনার বাড়ির মুমূর্ষ রোগীকে নিয়ে এসে শুনলেন যে ডাক্তার ম্যাডাম চিকিৎসা করবেন তাঁরই থাকার জায়গা নেই , ছাদ ভেঙে পড়ে , আপনার রোগীকে চিকিৎসা কে দেবে? ডাক্তারই বেঁচে নেই, রোগী কীভাবে বাঁচবে? আপনার বাড়ির রোগীর চিকিৎসার দায় কার কার?
৩) খুবই সাম্প্রতিক, আর জি কর হাসপাতালের লিফটে ও বাথরুমে যাওয়ার পথে প্রাণ হারান দুজন মানুষ, যাঁরা চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। তাঁদের মৃত্যুতে বহু আলোচনা তর্ক বিতর্ক হয়েছিল কিন্তু তার পরেও কি পরিস্থিতি বদলেছে সব জায়গায়? না। এখনও লিফটের দায় কর্তৃপক্ষের নেই। লিফট চালানোর এবং ম্যানেজ করার মতো লোকই নেই সরকারের।
৪) ২০২৫ সালের আগস্ট মাসের ঘটনা, ১১ বছরের বাচ্চার ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ বাদ দেওয়ার পর ইনফেকশন হওয়ায় মারা যায়। বাচ্চাটি নীলরতন সরকার , এস এস কে এম , কলকাতা মেডিক্যাল সহ একাধিক হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে শেষে রাস্তায় মারা যায়। কারণ তাকে ভর্তি করার মতো বেডই ছিল না। আর রাজ্যের ৯৯.৯৯% হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে তো তাকে ভর্তি করার মতো পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগটাই নেই। ১১ বছরের শিশুর মৃত্যুর দায় কার?
আমরা বারবার প্রশ্ন করেছি ,
১) শুধু এক এর পর এক নতুন মেডিক্যাল কলেজ খুলে, বিল্ডিং বাড়িয়ে, অথচ তার ভিতরে ন্যূনতম কোনো পরিকাঠামোর উন্নতি না করে, স্বাস্থ্য দপ্তর সাধারণ মানুষের কী উপকার করতে চায়?
২) কলকাতার অপেক্ষাকৃত বড় (রোগী উপস্থিতির হারের সাপেক্ষে) শতাব্দী প্রাচীন মেডিক্যাল কলেজ সহ জেলার বড় হাসপাতাল গুলোতে রোগীর সংখ্যা ও রোগীর স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রেখে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন যে অনুপাতে হওয়ার কথা, তার ছিটে ফোঁটাও হাসপাতাল গুলোতে নেই। রক্ষণাবেক্ষণ করার ন্যূনতম পরিকাঠামো সরকারি হাসপাতালে নেই।
৩) ক্রম বর্ধমান সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ, অথচ তাতে না আছে কোনো বড় অপারেশনের ব্যবস্থা, না আছে প্রাথমিক ইমারজেন্সি পরিষেবার ব্যবস্থা। কাকদ্বীপ থেকে দিনহাটা, উত্তর থেকে দক্ষিণ , এত সুপারস্পেসালিটি হাসপাতালের বাহ্যিক চকচকে চেহারা, অথচ এই হাসপাতাল গুলোতে রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে যে অপারেশন হওয়ার কথা, সেইসব অপারেশন করার কোনো ব্যবস্থাই নেই।
৪) প্রায় ৪ বছর পর গ্রামীণ হাসপাতালে ডাক্তার ও সরকারী ক্ষেত্রে নার্স নিয়োগ হয়েছে ও ৬ বছর পর সরকারি মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষক-চিকিৎসক নিয়োগ হয়েছে। এত এত মেডিক্যাল কলেজ করে কী লাভ যদি চিকিৎসা কর্মীদের রিক্রুটমেন্টই না হয়? হাসপাতাল গুলোতে ডাক্তার নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী না থাকলে রোগীর চিকিৎসা করবে কারা? তাহলে এত হাসপাতাল বাড়িয়ে, আট তলা – দশ তলা বাড়ির বাহ্যিক আড়ম্বরে মানুষের জীবনের গুরুত্ব আসলে কোথায়? চিকিৎসার পরিকাঠামো কোথায়?
৫) স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাজেট কত? তা কোথায় কীভাবে ব্যবহার করা হয়? প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ল্যাব গ্রামীন হাসপাতাল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুলিতে থাকেনা কেনো? চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিবর্তে স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা হয়না কেন? এত টাকা, কোথায় যায়? সাধারণ গরিব মানুষের জীবনের দাম নেই? সন্দীপ ঘোষ আসলে কতজন মানুষ মিলে তৈরি হয়? আসলে কতজন সন্দীপ ঘোষ ঢুকে আছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়?
চাইলে এই তালিকা আরও দীর্ঘ করা যেতে পারে আমরা শুরু থেকেই এই সমস্ত প্রশ্ন করেছি আগামীতেও করবো।
প্রশ্ন অনেক, উত্তর অমীমাংসিত, অথচ প্রত্যেকদিন নতুন অনিয়ম। মানুষের জীবনের দায় কার?
#wbjdf #NRSMCH #rgkar











