গতকালই বন্ধুদের এক আড্ডায় আইটি-কর্মী এক বন্ধুর সঙ্গে খানিক তক্কাতক্কি হয়ে গেল। বন্ধুর পেশাপরিচয়টা দিতেই হলো – কেননা পেশাগত দক্ষতার বাইরে বাকি প্রায় সমস্ত বিষয়ে এতখানি ill-informed ও অর্ধশিক্ষিত – আরেকদিকে চূড়ান্ত gullible, বর্ণপরিচয়ের গোপালের মতো সমাজমাধ্যমে যাহা পায় তাহা খায় (এঁরাই কি যথার্থ অর্থে গোপাল পাঁঠা? বা, rather, পাঁঠা গোপাল? 🤔) – অথচ নিজেকে সর্বজ্ঞ দিগগজ ভাবার অভ্যেস – এ জিনিস অন্য পেশায় এত দ্রুত তৈরী হতে দেখিনা (তবে ডাক্তারবাবুরাও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে, এব্যাপারে, এঁদের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন)।
তিনি জানালেন যে তিনি মুসলমানদের ঘৃণা করেন। তবে সব মুসলমান খারাপ নয়। এবং তাঁর বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই মুসলমান।
তিনি এ-ও জানালেন যে তিনি বামপন্থীদের ঘৃণা করেন। তবে বামপন্থীদের মধ্যে অনেক ভালো লোক আছে। যেমন, তিনি আমাকেই বন্ধু ভাবেন ও আমাকে নাকি যথেষ্ট রেসপেক্টের চোখে দেখেন।
তিনি জানালেন, বামপন্থীরা যেভাবে চলছে তাতে তারা এই নির্বাচনের পরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সবিনয়ে জানালাম যে তাতে তো তাঁর সবিশেষ প্রীত হওয়ার কথা কেননা তিনিই বলেছেন যে তিনি বামপন্থীদের ঘৃণা করেন।
ও হ্যাঁ, এসবের পাশাপাশি তিনি প্রবলভাবে নেতাজী-অনুরাগী এবং গুমনামী-বাবা-আদতে-নেতাজী তত্ত্বে গভীরভাবে বিশ্বাসীও বটেন।
তারপর কথায় কথায় এটাসেটা বলতে বলতেই তিনি জানালেন যে বামপন্থীদের মূল সমস্যা হলো যে তারা সবকিছুতেই রাজনীতি করে।
তো যেহেতু আমি বামপন্থী – unabashedly leftist – এবং যেহেতু আমি বিশ্বাস করি যে বামপন্থী (বা অন্য যেকোনও পন্থী) রাজনৈতিক দলের কার্যপ্রণালী ধর্মীয় মিশন বা আশ্রম গোত্রের নয় – রাজনৈতিক দলের কাজ রাজনীতি করা, যারা “রাজনীতি করি না”-র আড়ালে রাজনীতি করতে চায় তারা ধান্দাবাজ বিপজ্জনক ও পরিত্যাজ্য – এবং রাজনীতি করা, বা নিদেনপক্ষে বোঝার চেষ্টা করাটা, প্রতিটি সচেতন ও শিক্ষিত মানুষেরই অবশ্যকর্তব্য, কেননা প্রাকৃতিক ঘটনা বাদে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তার প্রতিটিতেই বৃহত্তর অর্থে কোনও না কোনও ভাবে রাজনীতি যুক্ত (এবং প্রাকৃতিক ঘটনার ইন্টারপ্রেটেনশন-ও রাজনীতি-ভিত্তিক) – সেহেতু অত্যন্ত বিরক্তি নিয়েই, সেই তথাকথিত বন্ধুটিকে দু’কথা না শুনিয়ে পারলাম না।
আর গতকালই, দেখলাম, Soumya Chattopadhyay লিখেছেন :
.
আপনাকে একটা শর্টকাট শেখাচ্ছি। গলাটা খাদে করে একটু উদাস হয়ে বলতে পারলে দুম করে অনেকটা মাইলেজ পাবেন। বলতে হবে, ‘এটা রাজনীতি করার সময় না! সবকিছুতে রাজনীতি করবেন না’
ডেলিভারিটা একটু ম্যানেজ করতে হবে যদিও, ডেলিভারিটাই সব। শুরুতে এক-দুবার সোশিও-ইকোনোমিক, রিয়েল-পলিটিক, সাব-অল্টারণ এগুলো বলবেন, .. কিন্তু বেশী বলবেন না, মানুষ আজকাল সন্দেহ করে। পুরোটা ইংরিজি একদমই বলবেন না, ইংরিজি বলার রিটার্ন অন্ ইনভেস্টমেন্ট প্রায় নেগেটিভে আজকাল।
চশমা থাকলে, চশমাটা মুছে নিয়ে বলতে হবে,.. ‘সত্যি করে গ্রাম কাকে বলে দেখেছো কোনদিন?’
‘প্রান্তিক মানুষ’ বলবেন গুনে গুনে এক-দুবার।
‘প্রান্তিক মানুষ’ হচ্ছে রান্না শেষে গরম মশলা দেবার মতো, লোভ হবে আর এক চিমটে দেবার। কিন্তু সংবরণ করুন নিজেকে।
কিন্তু যেটা শুরুতে বলছিলাম, বিগত দশবছরের ম্যাক্সিমাম রিটার্ন দেওয়া মিউচুয়াল ফান্ড, ইয়ে সরি ক্যাচলাইন হচ্ছে .. ‘এটা রাজনীতি করার সময় না! সবকিছুতে রাজনীতি করবেন না’।
খাটের নীচে টাকার পাহাড় পাওয়া গেলো, ২৬০০০ শিক্ষকের চাকরি গেলো,.. গাঁ-গঞ্জ, সদর শহর, শহরতলিতে, হাটে বাজারে, বাস ট্রেন অটোতে একদম ছাপোষা রাম শ্যাম যদু মধু টাইপ লোকজন বলতে শুরু করলো,.. একি রে ভাই? এতো দুর্নীতি! এতো চুরি! ছেলেমেয়ে গুলো তাহলে লেখাপড়া শিখে লাভ কি?
তখন কিছু মানুষ পথ দেখিয়েছিলেন, বলেছিলেন, আহ! এটা আইনি জটিলতার প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষের প্রশ্ন, অর্জুন রামপালের দাড়ি কামানোর প্রশ্ন, কিন্তু কিছুতেই রাজনীতির প্রশ্ন না। অতএব, ‘এটা রাজনীতি করার সময় না! সবকিছুতে রাজনীতি করবেন না’।
যখন অভয়ার খুন হলো, মানুষ রাগে দিশাহারা, স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। শাসকের বিরুদ্ধে আপনি রাগে ফুঁসছেন! আপনার মোটামাথায় যখন সরকারের গাফিলতি, বিচার, জবাবদিহি এইসব ভুল পথের ভাবনা আসছে, তখন কিছু মানুষ পথ দেখিয়েছিলেন।
বলেছিলেন … সোশিও-ইকোনোমিক,হিবিসকাস রোজা সাইনেনসিস, প্যানথেরা লিও , পেরিপ্লানেটা এ্যামোরিকানা। আপনি ভেবলে গিয়ে বলেছিএলন, তাহলে স্যার?
তাঁরা চশমাটা মুছে নিয়ে বলেছিলেন, .. কি বলেছিলেন?
Yes, you guessed it ! ‘এটা রাজনীতি করার সময় না! সবকিছুতে রাজনীতি করবেন না’।
আশেপাশে চোখ মেলে টিয়াপাখি খুঁজুন। সামাজিক ব্যক্তিত্ব.. যেমন লেখক, অভিনেতা, কবি। কবির মৃত্যু হলে কবিরা টিয়াপাখি হয়ে যায়। শাসক একটা খাঁচা বানায়, কবি দাঁড়ে ঝোলে। ছোলা খায়, এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে শাসককে দেখে। যত সাহিত্য সম্মেলন হয়, উত্তরীয় চাপিয়ে সভা আলো করে বসে। উত্তরীয় সরালে দেখবেন সবুজ একটা পাখি, লাল ঠোঁট, ছোলা খাচ্ছে। কিছু হলেই বলছে, সবই বুঝলাম, “কিন্তু …”
কিন্তুতেই আটকে দিন। বলুন, জানি তো স্যার, জানি! আর কতবার বলবেন! একদমই এটা রাজনীতি করার সময় না!
আর তিনটে সপ্তাহ পরে আপনি ভোট দিতে যাবেন।
প্লিজ, বোতামটা টেপার আগে মনে রাখবেন যে ভোট মানে ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকার প্রশ্ন , .. এটা জাইলেম আর ফ্লোয়েম কলার তিনটি পার্থক্য লেখার প্রশ্ন।
কিন্তু একদমই ‘এটা রাজনীতি করার সময় না! সবকিছুতে রাজনীতি করবেন না’।
.
.
আবারও বলে রাখি, লেখাটা সৌম্য চট্টোপাধ্যায়ের।










