এটা বাচ্চা ছেলেও জানে যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সম্মতি ছাড়া কেউ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চটি কাদা ছুঁড়বেন না, আর এটা প্রকাশিত সত্য যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি সেটাই করে চলেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ দিয়ে শুরু, এদিক ওদিক সকল স্তরের তৃণমূল নেতা,জনপ্রতিনিধি, পুরসভা ও পঞ্চায়েত প্রধানের পর এরপর তৃণমূল সুপ্রিমো, এসবই নাকি ১৫ বছরের অপশাসনের অবসানের পর জনগণের স্বাভাবিক ক্ষোভ, এভাবেই বিজেপির ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের ব্যাখ্যা। অগ্নিমিত্রা পাল সে ব্যাখ্যা দিয়েছেন মমতা আক্রান্ত হওয়ার পর, তিনি শুভেন্দু অধিকারীর পরামর্শ ও সমর্থন ছাড়া কথা বলেন না, তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, এই ঘটনায় শুভেন্দু অধিকারীর সমর্থন আছে। কিন্তু বিজেপির রাজ্য সভাপতির স্বভাব সুলভ মননশীল বিবৃতি, এটা বাংলার সংস্কৃতি নয়, স্বভাবতই তাঁর দলের অন্য নেতাদের থেকে পৃথক অবস্থান সূচিত করছে। প্রশ্ন হল এসব কি দলীয় নেতাদের নিজেদের বক্তব্য না দলের বক্তব্য? কোনটা দলের বক্তব্য? শমীকবাবু দলের সভাপতি। তাই তাঁর কথাকেই রাজ্য বিজেপির নীতি বলে ভাবলে প্রশ্ন ওঠে: তাঁর কথায় সায় নেই তাহলে মুখ্যমন্ত্রীর, রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই দলের দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে ফাটল প্রকাশ্যে এসে গেল। মমতা আক্রান্ত হলেও সফল তাঁর রাজনীতিতে, কারণ
১। এই ঘটনা দেখিয়ে দিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করা যদি যায় তাহলে বিরোধী দলের সকলকেই টার্গেট করা যায়, রাজ্যে যে অঘোষিত স্বৈরতন্ত্র কায়েম হয়েছে তার প্রমাণ এই ঘটনা।
২। বিজেপির বিরুদ্ধে এটাই প্রথম অভিযোগ, তারা গণতন্ত্রের মূল্যবোধ নিয়ে মানুষের অধিকার নাগরিকের অধিকার মানে না, মমতা আক্রান্ত হয়ে দেখিয়ে দিলেন এই অভিযোগ মিথ্যে নয়।
৩। রাজ্যে বিরোধী নেত্রী তিনিই। সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর নিয়মে তাঁর দলের মধ্যে বিক্ষুব্ধরা বেরিয়ে নতুন দল বা পুরোনো তৃণমূলের আসল অংশ বলে বলে দাবি করলেও মমতার সমান রাজনৈতিক ওজন বিরোধীদের মধ্যে কারুর নেই। তাই ওসব সংসদীয় হিসেব সরিয়ে মানুষের মনে তিনিই প্রধান বিরোধী মুখ। তাঁর আজকের এই আক্রান্ত হওয়া মানে এই রাজ্যে গণতন্ত্র নেই, বিরোধী রাজনীতির পরিসর নেই। একটাই দলের শাসন (স্বৈরশাসন না অপশাসন??? জনগণ ঠিক করবে) এই দেশের রাজনীতির পরিবেশে ভয়ঙ্কর ঈঙ্গিত!
৪। এত সব সাধারণ মানুষ ও বোঝে, বিজেপি নেতৃত্ব বোঝে না? বোঝে। এবং সবটুকু বুঝে এটা পরিকল্পিত আক্রমণ। কেন? সেটাই বোঝা দরকার।
মমতাকে আসলে বিজেপি বিরোধী মুখ হিসেবেই চায়। বামেরা ইদানীং উঠে এসেছে ভোট পরবর্তী নতুন সরকারের উচ্ছেদ সহ নানা জনবিরোধী ইস্যুর বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করার জন্য। বিরোধী স্পেস থেকেও কোণঠাসা হতে হচ্ছে মমতাকে। এটা শুধু শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের জন্য নয়, তাঁর দলের আকাশ ছোঁয়া দুর্নীতির সংবাদ যত বেরোচ্ছে তত মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থায় মমতা যাতে ফের নিজের জায়গায় ফিরে নতুন করে দলকে সাজিয়ে নিতে পারে, তার জন্যেই তাঁকে আবার একবার মানুষের কাছে সহানুভূতির সমর্থন পাইয়ে দিতেই মমতার উপর এই আক্রমণ, এবং এটাই আর এস এস চায়। কারণ নীতিগত দিক থেকে বিরোধী মুখ হিসেবে মমতাই আর এস এসের প্রথম পছন্দ। ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে মমতাকে সামনে রাখলে বিজেপির লাভ, এসব শমীক বোঝেন, অন্যদিকে শুভেন্দুর রাজনীতির অঙ্কে মমতাকেই বিরোধী মুখ করে রাখাটা সমস্যা। তাই শুরু থেকেই তিনি শমীকের আপত্তি সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেসের বিভাজন করে ভালো তৃণমূল বলে আলাদা করে তাদের সঙ্গে নিয়ে চলছেন। শুভেন্দু রাজনৈতিকভাবে রাজ্যে একমেব অদ্বিতীয়ম হতে চান, কিন্তু শমীক ভট্টাচার্যের রাজনীতি আর এস এসের ভাবনায় পুষ্ট। তাদের উদ্দেশ্য মমতাকে বামেদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে বিরোধী ভোট বিভাজন ও রাজ্যে-দেশে বিজেপির শাসনকেই শক্তিশালী করা। তাই মমতাকে টিকিয়ে রাখা দরকার তাঁর ইমেজ নিয়েই। সেই ইমেজে ধাক্কা আসছিল তৃণমূল ভেঙে বিক্ষুব্ধদের বেরিয়ে যাওয়া বা তাদের সরকার ও দলের নেতাদের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগে, মমতাকে তাই ফের লাইম লাইটে আনা খুব জরুরি ছিল বিজেপির প্রয়োজনেই। তাই ভেবেচিন্তেই মমতাকে আক্রমণ,এভাবেই আরও টুকটাক ঘটনা ঘটবে, তার ঈঙ্গিত স্পষ্ট।
আক্রমণের দিন ও সময়টা খেয়াল করা দরকার। এই দিনটা অভয়ার উপর অমানবিক নির্যাতনের পর খুন করার দিন, এটাই অভয়া নিয়ে অবিচারের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিন। এই দিনে মমতা তথা তৃণমূল ও বিজেপি সরকারের অভয়াকে নিয়ে তদন্ত ও বিচারের নামে প্রহসনের দ্বিতীয় বর্ষ পূর্তি প্রতিবাদ সমাবেশ ছিল। তার থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে মমতাকে আক্রমণের জন্য বেছে নেওয়া হল এই দিনটিকেই। আক্রমণ সংঘটিত হল পূর্ণ পরিকল্পনা করে। বুঝতে হবে, এটাই বিজেপি – তৃণমূলের বোঝাপড়ার রাজনীতি। বাংলার মানুষ কি আর কিছু না বুঝে আছে?









