অনেক হবু মায়েরই সিজারিয়ান সেকশনে বাচ্চা হওয়ার পর কী কী বিষয়ে সাবধানতা মেনে চলতে হবে তা নিয়ে খুব বেশি রকম চিন্তা থাকে। পেট কেটে বাচ্চা বের করার পর কি খুব যন্ত্রণা হবে? বাচ্চাকে কদিনে কোলে নিতে পারবো? প্রথম ৬-৮ ঘণ্টা এবং তারপর ২৪ ঘন্টায় সব কী করে সামলাবো? বাচ্চার ঠিকমতো দেখাশোনা করার জন্য কতদিন সময় লাগবে? এমনই সব প্রশ্ন ভিড় করে আসে। যদিও এ নিয়ে আগে থেকে দুশ্চিন্তা করে জটিলতা না বাড়ানোই ভাল। তার চেয়ে জেনে নিন সিজারিয়ান সেকশনে বাচ্চা হওয়ার পরবর্তী ধাপ গুলো।
আজকাল বেশিরভাগ অপারেশন স্পাইনাল অ্যানাসথেসিয়া করে হয়। তার মানে পিঠে ইনজেকশন দিয়ে পেট আর পা অবশ করে দেওয়া হয়। তাই আপনি জেগে থাকবেন, কিন্তু কোনো ব্যথা পাবেন না। কোনো ইমার্জেন্সী হলে বা যদি স্পাইনাল অ্যানাসথেসিয়া না দেওয়া যায় তবেই পুরো অজ্ঞান করা হয়।
সিজারিয়ান সেকশনে বাচ্চা হওয়ার পর বেডে দিতে আরও ১-২ ঘণ্টা সময় লাগে। কারণ এ সময়ে রোগীকে ক্লোজ মনিটরিং এ রেখে দেখে নিই তাঁর পালস, রক্তচাপ, ব্লিডিং সব স্বাভাবিক থাকছে কিনা। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র দেওয়া হয়।
- কারও কারও ব্লিডিং বেশি হয়। তবে এ নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই। এটা স্বাভাবিক।
- কারও কারও কাঁপুনি হয়। এতেও চিন্তার কোনও কারণ নেই। এগুলো ওষুধ বা স্যালাইনের জন্য হতে পারে।
শিশুকে যত তাড়াতাড়ি মা কোলে নিতে পারে, বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারে তত তাড়াতড়ি অনেক সমস্যা থেকে রেহাই পেতে পারেন।
- মা-কে বেডে দেওয়ার পর তাঁর চারপাশে আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ঘিরে থাকে। সবাই আনন্দ করে। এ সময়ে একটা কথা ভুললে চলবে না যে, তখন মা-ও খুশি। কিন্তু ইঞ্জেকশন, বমি না হওয়ার ওষুধ তার ওপর অতটা জায়গা কাঁটার জন্য তিনি তখন খুবই ক্লান্ত। তাঁর বিশ্রামের দরকার। কাজেই মায়ের পাশে ভিড় জমিয়ে বাচ্চা কত সুন্দর হয়েছে, কার মতো হয়েছে, খবর শুনে কে, কী প্রতিক্রিয়া দিল এত কথা না বলাই ভাল।
- মা-কে বেডে দেওয়া হলেও মায়ের নীচের দিকটা তখন অবশ থাকে। উঠে বসতে পারে না। বাচ্চাকে তখন শুয়ে শুয়েই বুকের দুধ খাওয়ানো দরকার।
- সিজার করার পর মায়ের শরীরে দুটো নল লাগানো থাকে। একটা আইভি ফ্লুইড যাওয়ার জন্য আর অন্যটা ক্যাথিটার, ইউরিন পাস করার জন্য। ৪-৬ ঘণ্টা মুখে জল দেওয়া হয় না,তবে মুখ শুকিয়ে গেলে অল্প জল খাওয়া যায়।
- বাচ্চা হওয়ার ৬-৮ ঘণ্টা পর মা উঠে বসতে পারে। আর যত তাড়াতাড়ি মা উঠে চলাফেরা করতে পারে মায়ের জন্য ততই ভাল। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ক্যাথিটারও খুলে দেওয়া হয়।
- ৬-৮ ঘণ্টা পর সলিড খাবার দেওয়া হয়। এরপর খুব তাড়াতাড়ি নরমাল ডায়েট শুরু করা হয়।
- দিনে ২-২ ১/২ লিটার জল খেতে হবে। নয়তো ইউরিন ইনফেকশনের চান্স থাকে বা বুকের দুধের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
- সিজারের তিন চার দিন পর মা – বাচ্চা কে ছেড়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালে থাকার সময়ে মায়ের জন্য অনেকে ফুল বা বাচ্চার জন্য নানারকম গিফট নিয়ে যায়। এসব বাচ্চার থেকে দূরে রাখাই ভাল। কারণ এর থেকে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়ায়।
- বাচ্চাকে এর-ওর কোলে দেওয়া ঠিক নয়। এতেও সংক্রমণ হতে পারে।
- এ সময়ে বাচ্চার ডাক্তার বিলিরুবিনসহ নানা টেস্ট করতে পারেন। এ নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই। এসব রুটিন টেস্টের মধ্যেই পড়ে।
- মায়ের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হলে তাঁকে ইনজেকশন দেওয়া হয় যাতে পরবর্তী প্রেগন্যান্সিতে সমস্যা না হয়।
- অনেক সময়ে বাচ্চা হওয়ার পর ডাক্তার বা সিস্টাররা বারবার এসে পেটে হাত দিয়ে দেখতে পারেন। এতে রাগ করবেন না। আসলে এভাবে তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেন, জরায়ু যা বাচ্চা হওয়ার সময় বড় হয়ে গিয়েছিল তা স্বাভাবিক হচ্ছে কিনা তা নীচের দিকে নামছে কিনা ।
- বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় অক্সিটোনিন নিঃসৃত হয় যাতে দুধের পরিমাণ বাড়ে আবার জরায়ু স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসতে পারে।
- সিজারের পর বাইরের কাঁটা ছেড়া শুকিয়ে গেলেও ভিতরটা শুকোতে মাস দেড়েক লাগেই। কাজেই কিছুদিন পর্যন্ত পেটে ব্যথা হলে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
- হাসপাতালে থাকার সময়ে সিস্টার ও ডাক্তারদের কাছে থেকে ভাল করে জেনে নিন বাচ্চাকে কীভাবে খাওয়াবেন, কোলে নেবেন। সেইভাবে চেষ্টা করুন। নিজে শুয়ে থেকে অন্যের ওপর নির্ভর করে থাকবেন না। এতে মায়েরই সমস্যা হবে।
- ব্লিডিং এর সঙ্গে হালকা জ্বর, স্তনে ব্যথা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খেতে হতে পারে।
মায়ের নিয়মিত ৬-৮ ঘণ্টার ঘুম দরকার। শুধু বাচ্চার নয়, নিজেরও যত্ন নিন।










