বাগেস্বর বাবার বাগারম্বর নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল। কোন কোন পত্রিকা, চ্যানেলে সমালোচনা, কিন্তু ভাবা দরকার: সাহস তিনি পান কোথা থেকে? কে দেয়?
উত্তর একটাই: না।ক্ষমতাসীন বিজেপি বা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শুধু একা নন,গোটা বাঙালি দায়ী।
অনেকদিন আগে থেকেই বাঙালিকে প্রকাশ্যে অপমান চলছে। সেদিন আত্মসম্মান রাখতে প্রতিবাদ করে নি, যদিও উচিত ছিল অনেক আগেই যখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির হিন্দি বলয়ের নেতারা কথায় কথায় রামমোহন,বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, অমর্ত্য সেনের অপমান করেছে, সেলুলার জেলের স্মারক ও ইতিহাস থেকে বাঙালি বিপ্লবীদেরদের নাম মুছে দিয়েছিল।কিন্তু প্রতিবাদ তো দূরের কথা, বাঙালি বিপুলভাবে তাদেরকেই রাজ্যের ক্ষমতায় এনেছে। উজাড় করে সমর্থন জুগিয়েছে।
মনে পড়ে? ব্রিগেডে জনসভায় এক দরিদ্র প্যাটিস বিক্রেতাকে মারা হয়েছিল গীতা পাঠের সমাবেশে আমিষ প্যাটিস বিক্রির অভিযোগে।সেদিনও সেই আক্রমণকে শিক্ষিত বাঙালির একটা বড় অংশ সমর্থন জুগিয়েছিল। কদিন আগেই ভোটের পর বাড়ির মধ্যে ঢুকে কীভাবে পুজো করতে হবে বলে একটি পরিবারকে হিন্দুত্ববাদীরা হুমকি দেয়,কীভাবে একটি পরিবারের পাঁচিলে দেবতার ছবি রাখায় হুমকি দেওয়া হয়? কীভাবে বারুইপুরের চার্চে যীশুর প্রতীক ভেঙে উল্লাস করে, কীভাবে বাইবেল পথ ভন্ডুল করে হিন্দুত্ববাদীরা, প্রতিটা ঘটনায় বাঙালি চুপ করে থাকে আর নিত্য আসর গরম হয় মমতা অভিষেক তৃণমূল ভালো তৃণমূল বাম কংগ্রেসের রাজনীতি নিয়ে। কখনও বাঙালি বোঝে নি যে এভাবে দলের সমর্থন করতে করতে নিজেরাই টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।পরস্পর পরস্পরের শত্রু তে পরিণত হচ্ছে! আর গোটা জাতির অপমানে নীরব থাকলে এর পর তার পরিণতি কী হতে পারে। বাঙালি তার অপমানেও নীরব বলে, প্রতিবাদে এক কাট্টা হতে পারে না বলে ভিন রাজ্যের স্বঘোষিত ধর্ম গুরু বলার সাহস পায় : বাঙালি একটা ভন্ড জাতি!
হ্যাঁ,এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া, খবরের কাগজ, টেলিভিশনের নিউজ চ্যানেলে প্রচুর প্রতিবাদমুখর পোস্ট হয়েছে। তারপরেও আপামর জনগণ প্রতিবাদে মুখর হয়ে রাস্তায় নেমে মিছিল করে নি! কারণ এটা সত্যি ,লোভে কিংবা ভয়ে বাঙালি আত্মমর্যাদা হারিয়ে ফেলেছে। চাকরি বা ব্যবসা করে বৌ বাচ্চা খাওয়ানো ছাড়া বাকি সবেতেই চুপ থাকাতেই বুদ্ধিমানের কাজ ভেবেছে। দাসত্ব করতে করতে নিজের মেরুদণ্ড বিক্রি করে ,আপোষ করে করে এখন তাই বাঙালি যে কোনো অপমান সইতে পারে!
এটা বাংলার বাইরের , বিশেষত হিন্দি বলয়ের লোকজন বুঝে গেছে যে সেই বাঙালি আর নেই। বাঙালি দলীয় রাজনীতির বিষে আত্মবিস্মৃত। দলের রঙে নিজেকে রাঙাতে গিয়ে বাঙালি হয়ে গেছে বর্ণচোরা। স্বার্থের প্রয়োজনে টুকরো হতে হতে নিজের জাতিসত্তা হারিয়ে ফেলেছে। ভুলে গেছে তার সম্মান, মর্যাদা, গরিমা । তার গর্ব, ইতিহাস কিংবা ঐতিহ্যের কোনো মূল্য তার কাছে নেই ।শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ ভুলে গেছে দলহীন প্রতিবাদের কথা। উল্টে শুধুই ক্ষমতার পা চাটতে জানে, কি করে ক্ষমতার হাত ধরে নিজের সুবিধে পেতে হয়, পকেট ভর্তি করতে হবে সেটা ছাড়া আর কিছুই জানতে চায় না।
তাই দিনের পর দিন অবাঙালি রাজনীতিকরা সর্বস্তরে বাঙালিকে অপদস্থ করতে করতে, সর্ব মহলে ঠেলতে ঠেলতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। ফলে সম্মান খোয়াতে খোয়াতে বাঙালি মর্যাদা বোধ হারিয়ে ফেলেছে। হিন্দি বলয়ের মানুষদের অন্যায় আধিপত্য আর অপমানেও সে নীরব কারণ সে জানে সে দুর্বল । তাই সর্বদা একজন দাসের মতোই তার আচরণ। নিজের ভাষা ছেড়ে হিন্দি ভাষায় কথা বলে বাঙালি গরিমা উপভোগ করে, এলিট সমাজে নিজের ভাষায় কথা বলতেও লজ্জা বোধ করে।খোদ বাংলায় বাজারে গিয়ে কিংবা একটা রিক্সা চালকের কাছেও হিন্দিতে কথা বলে, কর্পোরেট অফিস কিংবা সিনেমা বা সিরিয়াল দেখে হিন্দি কালচার নিতে নিতে এখন ধনতেরাস থেকে বিয়েতেও সামাজিক অনুষ্ঠানে হিন্দি সংস্কৃতি গিলে নিয়েছে, উগ্র হিন্দুত্বের সংস্কৃতি বাংলার গ্রামে শহরে সর্বত্র। কালী মন্দিরে পুজো কমছে, বাঙালি সংকট মোচনে হনুমান মন্দিরে মানত করে, এভাবেই অবচেতনভাবে বাঙালি নিজের ভাষা , সংস্কৃতি ও সত্তা হারিয়ে গৌণ করে ফেলেছে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি।হিন্দি বলয়ে কোন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকরা মার খেলে, বাঙালির প্রতি অত্যাচারে কোনো বাঙালি কোনোদিন কোন প্রতিবাদ করে না। আরও বেশি দুঃখের কথা যেটা,সেটা হল পাওনা গণ্ডা ও ক্ষমতার লোভে বাঙালিরাই এখন হিন্দি বলয়ের নেতাদের দালাল হয়ে গেছে।
এসব জানা সত্ত্বেও সরকারের পরিবর্তন ঘটাতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ক্ষমতায় এনেছে একটি অবাঙালি দলকে , যাঁদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাঙালি জাতি,সত্তা ও সংস্কৃতির নির্মূলকরণ, আর বাংলায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা । নির্বাচনের বহু আগে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরা উত্তরপ্রদেশ,মধ্যপ্রদেশ,রাজস্থানে আক্রান্ত হচ্ছিল, তখন তাদের জন্য কেউ প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, রাজনীতিক দল প্রতিবাদ করলে মিডিয়ায় লেখা হয়েছে “বাঙালি তাস ” ফেলে রাজনীতি করছে। অথচ শিক্ষক দিবসে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে ফেলা হল নতুন সরকার আসবার পর থিঙ্কজ, একটিও প্রতিবাদ হয়েছে? কোন মিডিয়ায় কোন আলোচনা? কোন শিক্ষক সংগঠন তার জন্য নিন্দা করে বিবৃতিটুকু দেয় নি, মিছিল তো দূরের কথা।
উল্টে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া বাঙালি জাতি সারাক্ষণ নানা ইস্যুতে বিতর্কে মত্ত। পরস্পর বিরোধিতা আর হিংসায় লিপ্ত। বিজাতীয় রাজনীতির পা চাটতে চাটতে হারাতে থাকে আত্মসম্মান আর অস্তিত্ব। ক্রমে দাসানুদাস হয়ে যায় । আধিপত্যবাদী হিন্দি বলয়ের রাজনীতি গ্রাস করছে সুযোগবাদী বাঙালিকে। ক্ষমতার লোভে তাদেরই পাতা ফাঁদে পড়ে আত্মঘাতী বাঙালি নিজেদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন করে চলেছে । ক্রমাগত জাতিভেদ আর হিন্দু – মুসলমান করে নিজেদের দুর্বল করে চলেছে।অথচ এই বাংলায় কবি লিখেছিলেন, “হিন্দু না মুসলিম জিজ্ঞাসা করে কোন জন?”
আসলে নিজের উৎপত্তি ও অস্তিত্বের ইতিহাস ভুলে গেছে বাঙালি। তাই হিন্দু আর মুসলিমের দ্বন্দ্বে লিপ্ত।সেই ব্রিটিশ আমলের থেকেই। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে দাঙ্গার মধ্যে দিয়ে দেশভাগ মেনে। আজও কি তার জন্য কোন অনুশোচনা আছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির?বাংলাদশের দিকে আঙুল তুলে এই রাজ্যের মন্ত্রীরা সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়াচ্ছেন বাঙালিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত করে দুর্বল করার জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ ধ্বংস করে হিন্দু আর মুসলিমের মধ্যে বাঙালিকে ভাগ করে দিচ্ছে, এও বাংলার আঞ্চলিক অখণ্ডতা ধ্বংস করার চক্রান্ত — উত্তরবঙ্গ আর দক্ষিণবঙ্গে ভাগ, শ্যামাপ্রসাদ আর নেতাজির দ্বন্দ্বে ভাগ করে দিচ্ছে।এক বাঙালি অন্য বাঙালিকে আজ মারতে উদ্যত শুধু রাজনীতির রং দেখে আর হিন্দু – মুসলিম করে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ায়। এদিকে বাংলা ও বাঙালির দখল নিচ্ছে ভিন রাজ্যের অবাঙালি ক্ষমতার প্রভুরা ,তাই উন্নয়ন, চাকরি,শিল্পের সম্ভাবনার কথা বলে বাংলা ও বাঙালি দখলের রাস্তা করে দিচ্ছে এই রাজ্যের বিজেপি নেতৃবৃন্দ। ।তাই অবাঙালিরা এসে শেখায় বাঙালি কীভাবে দুর্গাপুজো করবে! হিন্দি রাজনীতির প্রভুদের নিরন্তর তোষামোদ করে শমীক ভট্টাচার্য বলছেন,আগরওয়ালরা ছিল বলে বাঙালি বেঁচে গেছে! বাগেশ্বর বাবা এসে বলছে গোটা বাঙালি জাতি ভন্ড, আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রাজ্যের বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে তোয়াজ করছেন । বলছেন, এই বাংলায় আপনি আসুন,বাংলা আপনাকে চায় ! হিন্দি বলয়ের লোকজন এসে শেখাবে বাঙালি কীভাবে পুজো করবে, বাঙালিরা সেটাকেও অপমান করে না।
উল্টে এত অসম্মানেও বাঙালির মধ্যে বিতর্ক অব্যহত। রাজনীতির কারণেই অনেকেই সমর্থন করছেন সেই ব্যক্তিবর্গকে যে বা যারা বাঙালিকে প্রকাশ্যে অপমান করে । দলীয় রাজনীতির চক্রে বাঙালি ভুলে গেল তার জাতি সত্তা, ধর্ম, বৈশিষ্ট্য, অধিকার।এমনকি যূথবদ্ধ প্রতিবাদ! সে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে ,কেউ হিন্দু কেউ মুসলিম, কেউ বাম, কেউ তৃণমূল কেউ বিজেপি, কেউ বজরং কেউ নকশাল,কিন্তু কেউ এই সব দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে বাঙালি জাতির মর্যাদার প্রশ্নে এক নয় ।সবার আগে বাঙালি যূথবদ্ধ বাঙালি নয়।
এই অপমান তাই তার প্রাপ্য। কোটি কোটি বাঙালিকে ভন্ড, পাখন্ড, ধর্মচ্যুত বলে প্রকাশ্যে নিন্দে করে যাওয়ার তিনদিন পরেও কজন বাগেশ্বরের প্রতিবাদে রাস্তায় নামল?











