সকালটা সুন্দর। ঝকঝকে কাঠমান্ডু শহরের উপর রোদ আর মেঘের খেলা চলছে। ঝুপঝাপ বৃষ্টি, আবার গা জ্বালানো কড়া রোদ। মাঝখান থেকে বেশ ঠান্ডা হাওয়া। সেপ্টেম্বর মাস। কাঠমান্ডু শহরটার চারিদিকে পাহাড় ঘিরে রয়েছে। মাঝখানে বেশ পরিষ্কার ঝকঝকে শহর।
সাধারণভাবে আমরা দেখি সুন্দরবনের বন্যা হলে কলকাতার কি? ঠিক এমনই মনোভাব লাগল কাঠমান্ডুর মানুষের। সাধারণ মানুষ অনেকটাই নিজের ছন্দে। তাদের প্রতিদিনের কাজকর্মে ব্যস্ত। একটা দুর্ঘটনা হয়েছে, সবাই জানে খুব সাংঘাতিক একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কিন্তু জনতার মধ্যে নিজেদের মানুষকে নিয়ে যে আবেগ বা কনসাস বোধ থাকবে ভেবেছিলাম তা বোধহয় কম মনে হল। বরং আমরা রিলিফ টিমের হয়ে ওই বিধ্বস্ত এলাকায় যাচ্ছি শুনে লোকে অবাকই হচ্ছিল।
কাঠমান্ডুর সকালটা সত্যিই সুন্দর ছিল। আমরা উঠেছিলাম সংগঠনের এক বন্ধু, নুমার বাড়িতে। নুমা নেপালি, ওর বাড়ি দার্জিলিং জেলার মিরিকের কাছাকাছি একটি গ্রামে। সেখানেই ছোট থেকে বড় হওয়া এবং জলপাইগুড়িতে পড়াশোনা শেষ করে এখন চাকরির জন্য নেপালের কাঠমান্ডুতে। এই এলাকাটা বুড়া নীলকন্ঠ নামে পরিচিত। সেখানেই নুমার তিন কামরার ভাড়ার ফ্ল্যাট। ভাই এবং এক বন্ধু সঙ্গে থাকে। আমাদের টিমের সবাই সারারাত গাড়ি জার্নি করে কাঠমান্ডুতে এসেছিলাম। ফলে প্রত্যেকেই মারাত্মক টায়ার্ড। আমাদের জার্নিতে ওর বাড়িটা বলা যায় রিচার্জ স্টেশন। ওই এক রত্তি একটা মেয়ে অসম্ভব দ্রুততায় আমাদের বিশ্রামের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকের খাবারের ব্যবস্থা করে। আমাদের যাত্রায় ওর এই সহযোগিতা কখনো ভোলা যাবেনা। নুমার এই ভূমিকা শুধুমাত্র আতিথেয়তা বলে গুলিয়ে ফেলব না আমরা। বরং ওকে মনে রাখব একজন সহযোদ্ধা হিসেবে।
আগেই বলেছি ৮ই আগস্ট গত বছর জেন জি বিপ্লব ঘটে এদেশের পট পরিবর্তন হয়েছিল। বর্তমান সরকার সাধারণ মানুষের মনে অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল নতুন সূচনার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। সেই বিশেষ বৈপ্লবিক ঘটনার সূত্র টেনে এবছর সরকারের তরফ থেকে ছুটি দেওয়া হয়েছে শুনে আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। মনে হল এমন একটা রক্তে রাঙা দিন তো অনেক বেশি কর্মমুখর হওয়া প্রয়োজন। ছুটির নির্ভেজাল অলসতায় কি সেই গরিমা রাখা যায়?
২০২৫ এর এপ্রিলে কয়েক দিনের জন্য কাঠমান্ডু এসেছিলাম । সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম এখানকার সাধারণ মানুষ ট্যাক্সের জ্বালায় জর্জরিত। জীবনধারণ বেশ কস্টলি। এবং যাবতীয় উন্নয়ন কাঠমন্ডু শহরকে কেন্দ্র করেই। শিক্ষা স্বাস্থ্য প্রতিদিনের খরচ কোনটাই সস্তা নয়। এর মাঝখানে এই ঐতিহাসিক পট পরিবর্তন। ক্ষমতায় এসেছে নতুন সরকার। কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো না আগের চেয়ে তাদের অবস্থা খুব একটা বেশি কিছু পরিবর্তন হয়েছে। বরং শুনলাম এক বছরে ট্যাক্সের বোঝা বেড়েছে। নতুন করে ইলেকট্রিসিটির ওপর ট্যাক্স বসেছে বলে নেপালের বন্ধুরা অভিযোগ করল। যদিও নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা এখনো মনে করছে ‘আমাদের সরকার’। আমরা দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকার দিকে এগোবো আজ।
সুন্দর সকালটার অনুভূতি একটু ঘেঁটে গেল যখন জানলাম নেপাল সরকারের তরফে বিদেশী কোন সংস্থাকে এখানে চিকিৎসা করার পারমিশন দেওয়া হচ্ছে না। ফলত আমরা যে এনজিওর সঙ্গে কথা বলে নেপালে এসেছিলাম, তারা জানালো তারা সব রকমের চেষ্টা করছে কিন্তু নেপাল মেডিকেল কাউন্সিল থেকে অনুমতি পাওয়া যায়নি এখনো। ওদের অনুমতি পেলে তবেই আমাদের টিমের পক্ষে ক্যাম্প করা সম্ভব।
আমাদের টিমের জন্য প্রথম ধাক্কাটা মনে হয় এটাই ছিল। আমরা জানতাম আমরা দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে কিভাবে ক্যাম্প করব, কিভাবে ক্যাম্প ম্যানেজ করব। কারণ এর আগেও ইউনিসেফ এর পাশাপাশি অন্যান্য অনেক সংস্থার সঙ্গে নানান দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকায় ক্যাম্প করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের। ওটা আমরা গুছিয়ে করতে পারি। কিন্তু অভূতপূর্বভাবে দেশের মেডিকেল কাউন্সিলের তরফ থেকে এই বিপত্তি ঘটবে এটা আমরা আশা করিনি।
যদিও এর আগেই নেপাল সরকার ঘোষণা করেছিল, বাইরের দেশ থেকে কোন রকম ফান্ড বা রিলিফ তারা নিচ্ছেন না। কিন্তু আমাদের টিমের পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ২০১৫ তে যখন নেপালে ভূমিকম্প হয়েছিল সেসময় প্রচুর মানুষ বাইরে থেকে সাহায্যের জন্য এসেছিল রিলিফ নিয়ে। পাশাপাশি ওই সময়ে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি মেডিকেল ক্যাম্প করা হয়েছিল। এবারটাও সরকারি ঘোষণার নিয়মকানুন ওপর ওপর হবে ভেবেই তারা এই প্ল্যান করেছিল।
আমরা ক্যাম্প করতে পারব এটা আমাদের টিমের দৃঢ় ধারণা ছিল। ঘটনাটা একটু বেসুরো হলেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার দিকে এগোলাম।
তার আগে কাঠমান্ডু থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কাছাকাছি থাকার জন্য টেন্ট, ম্যাট্রেস এগুলোও সংগ্রহ করেছিলাম। একটা টিম গিয়েছিল ওষুধ কিনতে। অন্যরা থেকে গিয়েছিল লোকাল একটি চা দোকান চত্বরে। আমরা যারা থেকে গিয়েছিলাম তারা সময়ের সদ্ব্যবহার করে লোকাল মার্কেট দেখতে চলে যাই কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু তিন-চার ঘন্টা কেটে যাওয়ার পরেও ওষুধ আনতে যাওয়ার টিম ফিরে না আসায় বেশ বিরক্ত লাগছিল। আসলে মনে মনে সবাই প্রস্তুত ছিলাম এবং যত তাড়াতাড়ি দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে ওনাদের কাজে লাগতে পারি, সেই ভাবনাটা মাথায় কাজ করছিল। পাশাপাশি আরও একটা বিষয়, আমরা যারা পুণ্যব্রত গুণ-এর ট্রেনিং এ বেড়ে উঠেছি, তারা এইরকম সময়ে কখনোই সময় নষ্ট করার কথা ভাববে না। উনার প্রত্যেকটা বিষয় খুব গোছানো।
বিদুর নগরপালিকা যাওয়ার আগে আমাদের সঙ্গে নুয়াকোট জেলার অন্য আরেক নগরপালিকা কিস্পামের একটি লোকাল সংস্থার কথা হয়েছিল মেডিকেল ক্যাম্পের বিষয়ে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কি কি ধরনের ওষুধ প্রয়োজন তার একটি তালিকা পাঠিয়েছিল আমাদের। সেই তালিকা অনুযায়ী ওষুধ কেনা হয়। পরে ওনারা পিছিয়ে আসেন, তাই কিস্পামের বদলে বিদুরের এই সংস্থার সঙ্গে কথা চালানো হয়।
পরিমাণটা অনেক। আমাদের দেশে আমরা অর্থাৎ শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ সব ক্লিনিকগুলোতে জেনেরিক মেডিসিন ব্যবহার করেই চিকিৎসা চালায়। ফলে আমরা কম খরচে যুক্তি সঙ্গত বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা পৌঁছে দিতে পারি মানুষের কাছে।
এই সব কিছু কাজ সম্পূর্ণ করে প্রায় সন্ধ্যে ছটায় আমরা রওনা দিলাম কাঠমান্ডু থেকে সবচেয়ে কাছের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা নুয়াকোর্টের উদ্দেশ্যে। কাঠমান্ডু থেকে নুয়াকোটের দূরত্ব সাধারণ ভাবে আড়াই থেকে তিন’ঘণ্টার কাছাকাছি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি ও সহজে এখানেই পৌঁছানো যায়, এবং আমাদের দার্জিলিং এর সহযোগী লালিগুরাসের বন্ধুরা এখানকারই একটি এনজিওর সঙ্গে মেডিকেল ক্যাম্পের জন্য কথাবার্তা চালিয়ে রেখেছিল। নুয়াকোট নেপালের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। সেইসঙ্গে নুয়াকোট একসময়ের রাজধানীও বটে।
রাস্তা খারাপ হলে আরো কিছুক্ষণ বেশি সময় লাগে। নেপাল এমনিতেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা। যেদিকে তাকাবে সেখানে সবুজ আর নীলের এক অসাধারণ কম্বিনেশন এর সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ। প্রচুর ধানের চাষ হয়েছে চারিদিকে। সবজি খুব সীমিত। দেখলাম ধান আর বীনস, কুমড়ো, তিল আর স্থানীয় কিছু শাক সবজির চাষ। নুয়াকোর্টের বিদুর মিউনিসিপ্যালিটির ঢুঙ্গরি এলাকায় আমরা পৌছালাম।










