“ … লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী আর অগ্রগামী করে তোলনা কেন ?
… লক্ষ কোটি ভারতবাসীকে জাগালে না কেন? “
জাতীয় কংগ্রেস, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, অসম গণ পরিষদ, অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম, ভারতীয় জনতা পার্টি … সবাই বলেছেন ভূপেন হাজারিকা তাদের। অসম, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশের মানুষ অনুভব করেছেন ভূপেন হাজারিকা তাদের। ভূপেন হাজারিকা সত্যি কাদের? তিনি সকলের। সমস্ত ভারতবাসীর।
“ আমার গানের হাজার শ্রোতা তোমায় নমস্কার
গানের সভায় তুমিই তো প্রধান অলঙ্কার। “
ভূপেন হাজারিকা কে? তিনি একজন কালজয়ী প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীত শিল্পী, সুরকার এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। অসমিয়া, বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি সহ বিভিন্ন ভাষায় তাঁর সুরেলা মরমী মানবতাবাদী সঙ্গীত গুলি মানুষের হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে আছে।
“এই কাজল কাজল দিঘি আর পদ্মপাতার না
দেখি মনে পড়ে দ্বিজল খুলি আলতা দুধি পা
সেই তো আমার মায় আমার চাঁদ উজালী মা … “
প্রতিভাবান এই কণ্ঠ শিল্পী লোক, আঞ্চলিক, আধুনিক, গণ, চলচ্চিত্র – বিভিন্ন ধরনের অসাধারণ সৃষ্টিশীল এবং জনপ্রিয় সব গান গেয়ে গেছেন।
“বিস্তীর্ণ দুপাড়ে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও
নিঃশব্দে নীরবে ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন?“
গঙ্গা নদীর মত তাঁর সঙ্গীতের বিস্তার। গঙ্গা যেমন ভারতীয় সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে, তাঁর সঙ্গীতও সমাজকে সচেতন করে গেছে।
“ বিমূর্ত এই রাত্রি আমার, মৌনতার এই সুতোয় বোনা
একটি রঙিন চাদর।
সেই চাদরের ভাঁজে ভাঁজে নিঃশ্বাসেরই ছোঁয়া।
আছে ভালবাসা, আদর। …
দূরের আর্তনাদের নদীর ক্রন্দন কোন ঘাটের
ভ্রূক্ষেপ নেই, পেয়েছি আমি
আলিঙ্গনের সাগর।
সেই সাগরের স্রোতেই আছে নিঃশ্বাসেরই ছোঁয়া,
আছে ভালবাসা, আদর – “
ভালোবাসার কথা বলে গেছেন।
“মানুষে মানুহর বাবে মানুষ মানুষেরই জন্য
হৃদয় হৃদয়েরই জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?“
আর বলে গেছেন মানুষের কথা।
“আজ জীবন খুঁজে পাবি, ছুটে ছুটে আয়
আয় মরণ ভুলে গিয়ে ছুটে ছুটে আয়
হাসি নিয়ে আয় আর বাঁশি নিয়ে আয়
আজ যুগের নতুন দিগন্তে সব ছুটে ছুটে আয়। … “
জীবনের কথা।
“We are on the same boat brother …
মোরা যাত্রী একই তরণীর
সহযাত্রী একই তরণীর – “
সাম্যের কথা।
“দোলা, হে দোলা – হে দোলা, হে দোলা।
আঁকা বাঁকা পথে মোরা কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই
রাজা মহারাজাদের দোলা।
আমাদের জীবনের – ঘামে ভেজা শরীরের বিনিময়ে
পথ চলে দোলা। … “
শোষণ বৈষম্যের অবসানের কথা।
“শরৎ বাবু
খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে
তোমার ‘গফুর’ এখন কোথায় কেমন আছে? …
হারিয়ে গেছে কোথায় কখন তোমার ‘আমিনা’। …
গত বছর বন্যা হল, এবছর – খরা
একমুঠো ঘাস পায়না মহেশ দুঃখ ঘোচে না …
এক মুঠো ভাত পায় না খেতে গফুর – আমিনা … “
দারিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্কট মোচনের কথা।
“সজনী সজনী পদ্মা পাড়ে ছিলাম সজনী সজনী চাকরি তো খুঁজেছি
সজনী সজনী ঘর – বাড়ি ছেড়েছি সজনী সজনী থাকব না আর ফরিদপুরেতে … “
কর্মহীন উদ্বাস্তু মানুষের জীবন যন্ত্রণা মোচনের কথা।
“ ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ ডম্বরু মেঘে বাজায় ডম্বরু চিকিমিকি বিজলি নাচে
ছোট ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট কুটির কাঁপে। …
ঘুণ ধরা সমাজের অন্যায় ওরা পায়ে দলে যায়। …”
তিনি জাতপাত অবসানের এবং সমাজ পরিবর্তনের আহবান রেখেছেন।
“ সময়ের অগ্রগতির পক্ষীরাজে চড়ে যাব আমি নতুন দিগন্তে এই হাসি মুখে
নাই আক্ষেপ কোন পাওয়া না পাওয়ার সামনে রয়েছে পথ এগিয়ে যাওয়ার
সত্যকে সারথি, আসে দিন আসে রাত বিরামহীন উড়ন্ত মন মানে না বাঁধা
সূর্যকে ধ্যান করে নাচে মন নাচে প্রাণ আশঙ্কাবিহীন। … “
বলে গেছেন এক নতুন পৃথিবীর কথা।
“নতুন পুরুষ, নতুন নারী,
অনাগত দিনের জাগ্রত প্রহরী। … “
নতুন মানুষের কথা।
“এখানে বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে এসে থেমে গেছে ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা,
সবুজ মাঠেরা পথ দেয় পায়ে পায়ে পথ নেই, তবু এখানে যে পথ হাঁটা। … “
আস্থা ও আশাবাদের কথা।
“শীতের শিশিরে ভেজানো রাতে
ভেঙে পড়া কুটিরের ধিকিধিকি বস্ত্রবিহীন ক্ষেত মজুরের
জ্বলে থাকা তুষে ঢাকা আগুনের রক্তিম যেন উত্তাপ হই। … “
প্রকৃতির অপরূপ বর্ণময়তার মধ্যে বৈষম্যের কারণে সব হারানো প্রকৃতির সন্তান দরিদ্র ভূমিহীন ক্ষেত মজুরদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর কথা।
“হস্তি নড়ান, হস্তি চড়ান, হস্তির গলায় দড়ি
ওরে, সত্য কইরা কনরে মাহুত, ঘরে কয়জন নারী রে?
আর গেলে কি আসিবেন মোর মাহুত বন্ধুরে? … “
গোয়ালপাড়িয়া ভাওয়াইয়া গানের অনবদ্য সুরে ফুটিয়ে তুলেছেন হাতি ধরতে আসা মাহুত প্রেমিককে নিয়ে নারীর সংশয় ও বিরহ যন্ত্রণা ।
“একটি কুঁড়ি দুটি পাতা রতনপুর বাগিচায় অমল কোমল হাত বাড়িয়ে লছমি আজও তোলে।
সবুজ পাতার বাহারে দুলতো দোদুল আহারে প্রেমের পরাগ তার ছড়াতো হাসিলে
ও বাতাসে নাচিলে।
জজ্ঞু আর লছমি যে বিয়ের রাতে ঝুমুরে রতনপুর বাগিচায় জোয়ার তুলেছে
ও জোয়ার তুলেছে। … “
গেয়েছেন অসমের বিস্তীর্ণ চা বাগিচা বলয়ে শ্রমজীবী চা জনজাতিদের জীবন সঙ্গীত।
“কিরে আমায় বিয়া করবি নাই? বলছিতো আ’মার সময় নাই –
আমায় ভুল বুঝিস নাই, মাইয়া ভুল বুঝিস নাই। … “
গেয়েছেন বিহুর পাগলা সুরে মনমাতানো সব লোকজ গান।
“ইবার দিব দালান – কোঠা মা শীতলার কিড়াকাঠি
টাটালগর কারখানায় করিবো গো চৌকিদারি
ও হ, ও রে, ও রূপসী ইবার করবো তুমার মন খুশী। … “
গেয়েছেন ঝুমুরের প্রাণ কাড়া সুরে সবহারানো আদিবাসী মানুষের স্বপ্ন দেখার গান।
“মোর গাঁয়ের সীমানার পাহাড়ের ওপারে নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি …
মোর কালো চুলে সকালের সোনালি রোদ পড়ে চোখের পাতায় লেগে থাকা কুয়াশা যায় সরে …”
মিশমি পাহাড় অতিক্রম করে ডিহাং যেখানে লুইতর বা ব্রহ্মপুত্র নদ রূপে অসম উপত্যকায় প্রবেশ করেছে , সেই নিসর্গসুন্দর নিরালা পাহাড় – সমতল – অরণ্য – জনজাতি অধ্যুষিত সদিয়ায় এক মধ্যবিত্ত শিক্ষক পরিবারে ভূপেন হাজারিকার জন্ম। সুগায়িকা মায়ের লালাবাই, পাহাড়িয়া ও জনজাতি মহিলাদের গান এবং পাখিদের সুমিষ্ট সুর শুনে বড় হওয়া ভূপেন হাজারিকা সারা জীবন অসমিয়া সহ বহু ভাষায় অসংখ্য গান – লিখেছেন, সুর দিয়েছেন, গেয়েছেন। দশ ভাইবোনের মধ্যে বড় তাঁর আদরের ডাকনাম ছিল বড় ময়না। পিতার চাকরি সূত্রে গুয়াহাটি, ধুবুরি ঘুরে যখন তেজপুরে অধিবাস তখন মায়ের শেখানো শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের একটি ভোরগীত গেয়ে অসমের সংস্কৃতি জগতের জ্যোতিষ্ক জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়াল (১৯০৩ – ১৯৫১) এবং বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার (১৯০৯ – ১৯৬৯) চোখে পড়ে যান। মাত্র ১০ বছর বয়সে কলকাতার স্টুডিয়ো তে ভূপেন হাজারিকার গানের রেকর্ড হয়। ১৩ বছর বয়সে জ্যোতিপ্রসাদের অসমিয়া চলচ্চিত্র ‘ইন্দ্রমালতী’ তে দুটি গান করেন। ১৪ বছর বয়সে তাঁর লেখা কবিতা প্রশংসিত হয়। তেজপুর থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে স্নাতক হন। অল ইন্ডিয়া রেডিও তে কাজ করেন। বেনারস হিন্দু বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পল রবসনের (১৮৯৮ -১৯৭৬) নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার আন্দোলনে যুক্ত থাকেন।
“জেগে ওঠা মানুষের হাজার চিৎকারে আকাশ ছোঁয়া অনেক বাঁধার পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে
মানব সাগরের কোলাহল শুনি নতুন দিনের যেন পদধ্বনি শুনি। “
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯৫৩ তে দেশে ফিরে ৫০ এর দশক জুড়ে কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণাধীন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার এ্যাসোসিয়েশন (আই পি টি এ)’ এর কাজে যুক্ত ও ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নতুন নতুন সৃষ্টি এবং সেগুলি একদম সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়ে গিয়ে প্রয়োগ। বিভিন্ন গণ আন্দোলনে যোগদান। সংগঠনের কাজে নিয়মিত বম্বে – অসম যাতায়াত। ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ অবধি অসম আই পি টি এ – র সোনার সময়। এই সময় ভূপেন হাজারিকারও সৃষ্টির অন্যতম সময়। গানের পাশাপাশি তিনি প্রতিধ্বনি, শকুন্তলা সহ কয়েকটি পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ক্রমে বাম ও বাম সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিভিন্ন বিভাজন ও জটিলতার মধ্যে পরে। তিনি গুয়াহাটি বিশ্ব বিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ নেন। পরে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে ইস্তফা দেন। এরপর নিজেকে সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রথমে কলকাতা, পরে মুম্বাইতে চলে যান। আর্থিক সংকট, ব্যক্তিজীবনের টানা পোড়েন ইত্যাদি তো ছিলই। তার উপর উচ্চবর্ণের পাঞ্জাবি, বাঙালি, মারাঠি, দক্ষিণ ভারতীয় দের নিয়ন্ত্রিত গান ও চলচ্চিত্র জগতে একজন অনগ্রসর অসমীয়া হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে তাঁকে প্রবল সংগ্রাম করতে হয়। বাকিটা ইতিহাস। আঞ্চলিক ভাষায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসাবে ‘শকুন্তলা’ (১৯৬১) র জন্য এবং ‘চামেলি মেমসাব’ (১৯৭৫) চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে জাতীয় পুরস্কার, পদ্মশ্রী (১৯৭৭), সঙ্গীত নাটক একাদেমি পুরস্কার (১৯৮৭), দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৯২) সহ দেশ বিদেশের এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। মরণোত্তর তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছে পদ্মবিভূষণ (২০১২) এবং ভারতরত্ন (২০১৯) পুরস্কারে।
“মৌন রাতি আছে চারিধারে ঘিরে দিগন্তে সূর্য কোথায় ?
প্রভাতী পাখিরা কেন গায়? … “
তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সংস্থাপক, যন্ত্র ব্যবস্থাপক, কবি, লেখক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্দেশক, নাটক ও চলচ্চিত্রের সঙ্গীত নির্দেশক ও পরিচালক, সমাজ কর্মী, বিধায়ক … এক বিরল বহুমুখী চরিত্র।
“ রাত্রি তোমার নাম, রাত্রি তোমার নাম, অঙ্গে অঙ্গে মধুজোছনা লুকোচুরি করে
এ নয়ন বুঝি তাই ভালবাসে তোমায় হৃদয় ভরে। … “
তিনি যেমন ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছেন, পেয়েছেনও দু হাত ভরে। একবাক্যে সকলেই স্বীকার করেছেন যে তিনি শঙ্করদেব – জ্যোতিপ্রসাদ পুষ্ট অসমিয়া সংস্কৃতির মূল স্রোতের সঙ্গে অসমের বিস্তৃত ও বহুত্ব লোক ও জনজাতি সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। অসমিয়া শিল্প – সংস্কৃতির উন্নত ধারাকে অবশিষ্ট ভারত ও বিশ্বের কাছে মেলে ধরেছেন।
“লুইতর চাপরিতে চাকৈয়ে কান্দিলে মানুহর নাওখান চাই
মানুহর দুখতে মানুহর বুরিব আনকচোন দুষিবর নাই। … “
অসম যখন বাঙালি বিরোধী জাতিদাঙ্গায় বিদীর্ণ তখন ১৯৬০ এ বিশিষ্ট গণ সঙ্গীত গায়ক ও অসম আই পি টি এ – র প্রতিষ্ঠাতা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপনা করলেন ঐতিহাসিক দ্বিভাষিক ‘হারাধন রংমন কথা’ গানটি । সারা অসম ঘুরে তাঁরা দুজন এই গানটি গেয়ে দাঙ্গা থামালেন। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গত দিয়েছিল বিষ্ণু রাভা, মঘাই ওঝা প্রমুখ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
“আকাশী গঙ্গা খুঁজিনি তো , না খুঁজিনি স্বর্ণ অলংকার
নিষ্ঠুর জীবনের সংগ্রামে চেয়েছি প্রেরণা ভালোবাসার। … “
১৯৭৫ – ’৭৭ যখন সারা দেশ জুড়ে স্বৈরতন্ত্র ও জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন চলছিল তখন বিভিন্ন মঞ্চে তাঁর গান বাজিয়ে উদ্দীপনা সঞ্চার করা হত।
“প্রথম না হয়, দ্বিতীয় না হয়, তৃতীয় শ্রেণীর
আমরা সবাই জীবন রেলের যাত্রীরে রে ভাই। … “
তিনি জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়াল, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, আব্বাসউদ্দিন দের সঙ্গে কাজ করেছেন। ছিলেন পল রবসন, পিট সিগার, হ্যারি বেলাফন্টে দের সুহৃদ। ছিলেন সলিল চৌধুরী, বলরাজ সাহানি দের সহযোদ্ধা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকার, প্রতিমা বড়ুয়া , রুনা লায়লা প্রমুখ ছিলেন তাঁর সহশিল্পী। নিজের রচিত গান ও সুর ছাড়াও জ্যোতিপ্রসাদ, রবসন, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, গুলজার, শিবপ্রসাদ ভট্টাচার্য দের কথা ও সুরে প্রাণসঞ্চার করেছেন। আবদুল মজিদ, কল্পনা লাছমি, সাই পরাঞ্জপে, মকবুল ফিদা হোসেন দের চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন।
“আর ফুল নয়, আর মালা নয়, নয় ফাগুনের কোন কাব্য
মধু রাত নয়, মায়া চাঁদ নয়, মানুষের কথা ভাববো, শুধু মানুষের কথা ভাববো। … “
গণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ১৯৬৭ তে লখিমপুরের নাওবাইচা কেন্দ্র থেকে নির্দল বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে ১৯৭২ অবধি অসম বিধানসভায় মানুষের কথা বলা।
“গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা, দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা যমুনা
একই আকাশ, একই বাতাস, এক হৃদয়ের একই তো শ্বাস
দোয়েল কোয়েল পাখির ঠোঁটে একই মূর্ছনা – । … “
আকর্ষণীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন দেশ ও জাতির অভিন্ন ঠিকানা।
“মুই এটি যাযাবর আমি এক যাযাবর
পৃথিবী আমাকে আপন করেছে ছেড়েছি নিজের ঘর। … “
তিনি ছিলেন এক বিশ্ব পথিক। বিশ্ব জুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির কথা বলেছেন।
“জীবন নাটকের নাট্যকার কি বিধাতা পুরুষ
যেই হোক নাটক লেখার মত নেই তার হাত
সে নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে দেখি দিনকে করেছে রাত। … “
ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদাভেদ সহ সমস্ত বৈষম্য উত্তীর্ণ করে নতুন সমাজ বীক্ষার আহবান রেখেছেন।
“জীবনটা যদি অভিনয় হয় যদি অভিনয় টাই জীবন হয়
সেই জীবনের তাহলে কি মানে?
আকাশ একটা যদি কাগজ হয় আর চাঁদ টা যদি আসল না হয়
সেই জোছনার আসল কি মানে? … “
সামাজিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে গেছেন।
“ আগুন ভেবে যারে কাছে ডাকি নি মন তবু তারে চায়
ভুল বুঝে কি নীরবে বিদায়? … “
অনগ্রসর সম্প্রদায়ের হওয়ায় যৌবনের প্রেয়সী ব্রাহ্মণ কন্যাকে না পাওয়ার অব্যক্ত যন্ত্রণা।
“প্রেম আমার শত শ্রাবণের অবিরাম বৃষ্টির বন্যা আনে। … “
গভীর বিরহে প্রবল বেদনা পেয়ে গেছেন।
“আমি ভালোবাসি মানুষকে তুমি ভালোবাসো আমাকে
আমাদের দুজনের সব ভালোবাসা আজ এসো বিলিয়ে দিই এই দেশ টাকে। … “
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ১৯৫০ এ কৃতি নারী প্রিয়ম্বদা প্যাটেলকে বিবাহ। ১৯৫২ তে পুত্র তেজ এর জন্ম। তারপর অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে দেশে ফিরে কাজ শুরু। কিন্তু এই সম্পর্ক টেকে না। স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ।
“একখানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে একঝাঁক বুনো হাঁস পথ হারালো
একা একা বসে আছি জানালা পাশে সে কি আসে যারে আমি বেসেছি ভালো। … “
একদিকে কর্ম ব্যস্ততা, শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নিরন্তর সংগ্রাম, অন্যদিকে পরিবার ভেঙ্গে যাওয়া। সেই সময় প্রতিমা বড়ুয়া, লতা মঙ্গেশকারদের নিয়ে জনশ্রুতি।
“চিত্রলেখা চিত্রলেখা চিত্র এখন আঁকো না
চিত্রপটে চিন্তাশীল এক চিন্তানায়ক আঁকো না। … “
মধ্যবয়সে গুরু দত্ত ও শ্যাম বেনেগালের ভাগ্নী, চিত্রকর ললিতা লাজমির কন্যা এবং পরবর্তীতে ‘এক পল’, ‘লোহিত কিনারে’ , ‘রুদালি’, ‘দমন’ প্রমুখ চলচ্চিত্র নির্মাতা সপ্তদশী কল্পনায় (কল্পনা লাছমি, ১৯৫৪ – ২০১৮) থিতু হওয়া। তারপর তাঁদের চার দশকের অসম বয়সের অবিবাহিত সম্পর্কের উদযাপন।
“ সহস্র জনে মোরে প্রশ্ন করে …
বেদের মন্ত্র নয় গো নয়, হৃদয়ের মন্ত্র আমি পেয়েছি … ।“
হিংসা ও সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতা এবং জাতীয় ঐক্যের পক্ষে থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসাবে গুয়াহাটি সংসদীয় কেন্দ্রে প্রার্থী হয়ে জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। পরে আত্মসমালোচনা করে দলীয় রাজনীতি থেকে সরে আসেন। জনপ্রিয়তা অটুট থাকে।
“সবুজ প্রান্তরে তোমার নিরালা ঘরে
বিদায় বেলায় ভেবেছো যে কথা বলবে হয়তো বা ভুলে গেলে। … “
অসুস্থতার শেষ বছরগুলিতে কল্পনা লাছমি কর্তৃক মুম্বাই তে চিকিৎসা ও শুশ্রষার ব্যবস্থা।
“মানসী বিদায় তোমাকেই বিদায়
ফুলের মালা চন্দনে সাজিয়ে দিলাম চিতায় …। “
অবশেষে এই বর্ণময় জীবনের অবসান হয়। ১০ লক্ষ অসনবাসী অশ্রুসজল চোখে তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে অংশ নেন।









খুব ভালো লেখা। 👍 দারুন।