অভিযুক্ত কাকে বলে? এ বিষয়ে আমাদের এতদিন অব্দি যা ধারণা ছিল (যে ধারণার বশবর্তী হয়ে জুনিয়র ডাক্তার বোনটিও “ভুল” ব্যাখ্যা করেছিল) সে ধারণা যে ঠিক নয়, এ কথা আমরা বুঝতে পারলাম। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী, যার আইনি ডিগ্রিও রয়েছে বলে জানি, আমাদের জানালেন যে, আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কেউ অভিযুক্ত নয়। অল্পবয়সী বোনটি যখন দৃঢ় স্বরে প্রত্যুত্তরে জানালো যে অভিযোগ প্রমাণ হলে সে দোষী, তার আগে অব্দি অভিযুক্ত, এরপরে আর আইনি ব্যাখ্যার লড়াই স্থায়ী হলনা। কেন? “ভগায় জানে”।
আইনের এহেন পাঠ নেবার আগে দেখা গতকাল (২১.১০.২০২৪) কী কী হল?
(১) জুনিয়র ডাক্তাররা বেঁধে-দেওয়া ১০ জনের পরিবর্তে ১৭ জন নিয়ে গেল। এবং মিটিঙয়ে বসার অনুমতিও পেল,
(২) যে সুপ্রিম কোর্টের কুমীরছানা দেখিয়ে প্রথম দিনের মিটিং ভেস্তে দেওয়া হয়েছিল, সে কুমীরছানা এবারেও ছিল। কিন্তু লাইভ স্ট্রিমিং হল – পুরো মিটিং জুড়েই। আচরণ, শিষ্টাচার এবং বলা কথার দ্বিচারিতার বাইরে একে আর কিছু বলা যায়? আমার মাথায় আসছেনা।
(৩) মিটিং থেকে জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতিনিধি দেবাশিস হালদার জানিয়েছে যে, মিটিঙয়ের শরীরী ভাষা ওর শীতল, অনান্তরিক এবং আক্রমণাত্মক মনে হয়েছে। হ্যাঁ, দেবাশিস, শরীরী ভাষার সঙ্গে মানুষের অভিব্যক্তির বিবর্তন কিভাবে ঘটেছে, এ নিয়ে নরবার্ট এলিয়াস-এর প্রামাণ্য গবেষণা রয়েছে The Civilizing Process-এ। এরা বলদর্পী, অন্যকে নিজের চেয়ারের এবং ক্ষমতার সবক শেখানোকেই “ভদ্রতা” বা “সৌজন্য” বলে জানে। এরা “মন কি বাত” বলে, শোনেনা। কিন্তু ২ ঘন্টার আলোচনায় তোমরা কথা বলেছ, একইরকম উচ্চতা ও দৃপ্ত দৃঢ়তা নিয়ে।
(৪) তোমাদের প্রতিনিধি মাননীয়ার কথা থামিয়ে দিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছে – “ম্যাডাম, আমরা কি ধর্ষকের পক্ষ নেব?”। সরকারের এ উত্তর জানা নেই। বরঞ্চ উল্টোটা জানে, ক্ষমতার পাপচক্র রক্ষা করার জন্য সমস্ত দাগী অপরাধী, গুণ্ডা এবং ধর্ষকদের আড়াল। করতে হয়। তোমরা সেটা বেআব্রু করে দিয়েছ – “রাজা তোর কাপড় কোথায়?”
(৫) ধর্মতলার নশন মঞ্চ থেকে রুমেলিকা খুব প্রত্যয়ী স্বরে জানিয়েছে – “কোনও সরকারি অনুরোধে নয়, কাকু-কাকিমা (নির্যাতিতার বাবা-মা) এবং সাধারণ মানুষের কথা ভেবেই আমরা অনশন তুলে নিলাম।”
(৬) মিটিং চলাকালীন আমরা দেখেছি, ঘটনার সত্যতা জানানোর কিভাবে কলেজের অধ্যক্ষকে এক ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। একটি সংবাদপত্রের খবরের শিরোনামও হয়েছে “‘না জানিয়ে ৪৭ জনকে সাসপেন্ড, এটা থ্রেট কালচার নয়?’ আর জি করের অধ্যক্ষের কাছে জবাব চাইলেন মমতা”। ছাত্রদের সামনে অধ্যক্ষের এরকম অপমান কোথায় বাজতে পারে, ভেবে দেখুন? প্রকৃতপক্ষে “হুমকি সংস্কৃতি”র গর্ভগৃহে বসেই আমরা ঠাণ্ডা গলায় হুমকি শুনলাম। একে অনেকেই বলছেন, ফ্যাসিস্ট আচরণ।
(৭) ১৯৭৭ সাল থেকে আমি বিভিন্ন ফর্মের ছাত্র এবং জুনিয়র ডাক্তার আন্দোলনের সাথে যুক্ত। এরকম নাগরিক সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের এ চরিত্রের বুকঢালা ভালোবাসা এবং অংশগ্রহণ আমি দেখিনি। হয়তো বা বঙভঙ রদ বিরোধী আন্দোলনের সাথে তুলনীয়। আমি মনে করি, জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন ডাক্তারসমাজের এই প্রথম আন্দোলন যা pro-active, reactve নয়। আমরা প্রায় সবসময়ই রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলন করি। কিন্তু এই অভূতপূর্ব, হিংসা বা গর্জন-বর্জিত, বিপুল জনসমর্থনে পুষ্ট এবং নারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে দীর্ঘস্থায়ী এ আন্দোলন সরকারকে অনেকটা দিশেহারা করে দিয়েছে। এরা reactive অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছে। নিত্যনতুন স্ট্র্যাটেজি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। সামজিক ক্ষেত্রে একটি নতুন নাগরিক পরিসরের উন্মোচন ঘটিয়েছে।
(৮) শুধু এটুকুই নয়, এ আন্দোলনের অভিঘাতে নারীরা সামাজিক সুরক্ষা এবং ব্যক্তি নারীর স্বাতন্ত্র্যচিহ্ন খুঁজে পেয়েছে। সমস্ত নাগরিক সমাজ – সবরকমের দলীয় প্রভাবকে দূরে সরিয়ে রেখে – একটি নতুন পরিসর তৈরি করেছে। এরকম তৃতীয় পরিসর বা নাগরিক পরিসর স্মরণীয় কালের মধ্যে সমাজে উন্মোচিত হয়নি।
এবারে বিষয়টিতে আসব তা হল কলেজ কাউন্সিলের প্রশ্ন। পরে আবার ভালো করে বলা যাবে। আপাতত যেটা বলার, ১৮৩৫-এ যেদিন মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হয়েছিল, তার ১ বছরের মধ্যে কলেজের আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, লেখাপড়ার মান, উপযুক্ত মানের চিকিৎসা এবং চিকিৎসা ও সিলেবাসের ব্যাপারে সার্বিক দেখাশোনার জন্য কলেজ কাউন্সিল গঠন করা হয়।
এর ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কাউন্সিল নিত – যেমন ১৮৩৩৮-৩৯-এর প্রথম পাস করা ছাত্রদের সার্টিফিকেট দেওয়া, ৪ জন ছাত্রকে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে পাঠানো, এমনকি কাদম্বিনীকে ভর্তি ও পাস করানোর মতো ক্ষেত্রে। এরপরে প্রয়োজনে এডুকেশন কমিটির কাছে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো। আরেকটি ইতিহাসও বলা দরকার। ১৮৪৪-৪৫ সালে মেডিক্যাল কলেজের কলেজ কাউন্সিল তাদের বিস্তারিত বার্ষিক রিপোর্টে “রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস” নথিবদ্ধ করে। ১৮৪৪ এবং ১৮৪৯ সালে দু’বার এই সুপারিশকে ভিত্তি করে Rules and Regulations og Bengal Medical College প্রকাশ করে। নিচে ১৮৪৪-৪৫ সালের মেডিক্যাল কলেজের কলেজ কাউন্সিলের স্ক্যানড কপি দিলাম।
এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি এতই কার্যকরী ছিল যে, এনএমসি-ও একে মান্যতা দেয়। এখানে কোন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত ধর্তব্যের মধ্যে নয়, সে তিনি যে পদেই থাকুন না কেন।
আজ এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে আঘাত করা এবং নাকচ করা হল। কীভাবে? কলেজ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হতে হবে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ মারফত। ব্যক্তি এখানে গণতান্তন্ত্রিক স্বায়ত্ত্বশাসিত নির্বাচিত সংস্থার উর্ধে!
আমার কাছে বিষয়টি এত স্পর্শকাতর যে হাইকোর্টে যাবার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। মনে রাখা দরকার, এর আগে প্রায় সমস্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে নাকচ করা হয়েছে। এবার আক্রমণ এল কলেজ কাউন্সিলের ওপরে। অর্থাৎ যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এবং স্তম্ভগুলোর ওপরে একটি মুক্ত, সন্ত্রাসহীন, অবারিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহমান থাকে সে অঙ্গগুলো একটি একটি করে কেটে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
হুমকি ও ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ লড়াই দীর্ঘকালীন। ৭২ দিন ধরে অল্প অল্প করে ঘরের ছেলেমেয়ে ওঠা চেনামুখগুলো সময়ের নিয়মে কলেজ ছেড়ে চলে যাবে। বিশ্বাস রাখব, এদের এই হার-না-মানা জেদের এবং লড়াইয়ের ব্যাটন পরবর্তী সন্তানেরা তুলে নেবে।
আমাদের অর্থাৎ সিনিয়র ডাক্তার এবং অগণন সাধারণ মানুষের এ বিশ্বাসে স্থিত থাকতে হবে যে, প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি পাড়া, প্রতিটি অঞ্চল, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি শহরের আনাচে-কানাচে, শিক্ষায়তনে এবং, এমনকি প্রতিটি রাজ্যে – দেশব্যাপী – ভয়, নিথর ভয় এবং হুমকি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সামাজিক-পারিবারিক সংলাপ শুরু করতে হবে।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আমাদের জানিয়েছিলেন –
পিচ্ছিল নেপথ্যে আজও রয়েছে মানুষ –একা – নরক দর্শন করে
তবু অন্ধ নয়, খোঁড়া নয়;
রক্ত মাংস কর্দমের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে, নদী সাঁতরিয়ে
নরক উত্তীর্ণ হতে ক্লান্তিহীন যাত্রা তার;
মাথা উঁচু রাখাই নিয়ম।
আভূমি কুর্ণিশ জুনিয়র ডাক্তারদের এই আন্দোলনকে – তোমরা আমাদের অনেক কিছু শেখালে। আমাদের শিক্ষক হয়ে রইলে। শিক্ষার আবার বয়স কী?











Completely agree with you sir.
গণতন্ত্রের ওপর শাসকের এরকম নগ্ন, নির্লজ্জ, হিংস্র আক্রমণ হিটলারের পরে আর দেখা যায় নি। অন্য নামে এসএস বাহিনীও রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের ভূমি প্রস্তুত নয়। বামপন্থীরা সে চেষ্টাও করেনি।এখনো করে না।
অদ্ভুত এক নৈরাশ্য ঘিরে ধরেছে। শাসক প্রকাশ্য গণমাধ্যমে খুনিদের মুক্তির আদেশনামায় সীলমোহর দিচ্ছে।
শেষ খেলা হবে ভোট মেশিনারি বনাম গণতন্ত্র। সেখানেই খেলা শেষ হবে।
অসাধারণ লিখেছো দাদা ! এই সন্তানসম ছেলেমেয়েগুলিকে আভূমি কুর্নিশ।
একদম ঠিক লিখেছেন
আমরা অনেক কিছু শিখলাম
জুনিয়র ডাক্তারদের এই আন্দোলন থেকে
আপনার লেখাও অনবদ্দ🙏🙏🙏🙏
গণ মানুষের অকুতোভয় জাগরণই এই আন্দোলনের বৃহত্তম প্রাপ্তি। সেই সঙ্গে নারী চেতনার বিস্ময়কর আত্ম-আবিষ্কার। দৃঢ় বিশ্বাস, এই স্ফুলিঙ্গ নিভে যাওয়ার নয়।
ভালো লাগলো। সময়োপযোগী লেখা ও কলেজ কাউন্সিল নিয়ে মন্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ
— জয়ন্ত সব শুনলাম — উত্তর হলো — wich of Mcbeth advises all of us to — walk on Head
সুন্দর সাবলীল ব্যাখ্যা এবং বিবরণ। চিন্তার বিষয় যেভাবে গণতন্ত্র কোণঠাসা হচ্ছে ক্রমাগত…পরিসর সঙ্কুচিত হচ্ছে।
সে সব তো বুঝলাম, কিন্ত ঐ জঘন্য অপরাধ যারা করেছিল তাদের শাস্তি র কি হোলো ?
অপরাধীদের শাস্তির কি হোলো
জয়ন্তঃ অনেক শিখলাম। home work is in-depth and due diligence is duly appreciated!
Where can I see the original proceeding? The names on the council is impressive. The famous native, the first Anatomy Demonstrator, at CMC on the board is illuminating.
Khub sundor lekha jayanta da.
অসাধারণ বিশ্লেষণাত্মক লেখা। ঔদ্ধত্য ও শালীনতার ফারাক ‘লাইভ স্ট্রিমিং’ না হলে স্পষ্ট হত না। আন্দোলনরত চিকিৎসকরা এক অনন্য ইতিহাস গড়লেন। লেখককে ধন্যবাদ।
Khub valo lekha 👍
Another masterly contribution.
However, it is worth noting that Justice Chanda at the High Court ruled in favour of the CM with regards to the suspension of 51 doctors by the RG Kar administration!
When would we see the JUSTICE?
বিষয়টার সাথে সহমত। এর সাথে আরো এক দুটো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
তৃণমূলের বিভিন্ন নেতানেত্রী একের পর এক কুরুচিকর মন্তব্য করে সাথে সাথে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে – এটা আগে কখনো চোখে পড়েনি।
তাছাড়া দলবিহীন নাগরিক পরিসরের বদলে সরাসরি কোনো বাম দলের নেতৃত্ব থাকলে গোটাটা আরো বেশি সফল হত মনে হয়।