একটা দল কখন জনগণের মুখপত্র হয়ে ওঠে? যখন সেই দলের মধ্যে দিয়ে মানুষ খুঁজে পায় তার শ্রেণিস্বার্থ, নেতার প্রতি আইকনিক আকর্ষণ, দলের নীতিতে প্রবল সমর্থন, সমাজ মন, জাতিগত ও ধর্মগত অবস্থান থেকে নিজের সত্তার সাযুজ্য আর সাংস্কৃতিক চেতনা খুঁজে পায়,তখন সেই দলের প্রতি জনমনে তৈরি হতে থাকে সমর্থন। মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান নির্মিত হয় এই বিষয়গুলির উপর। ককরোচ জনতা পার্টির জন্মলগ্নে এই কথাগুলি বলার কারণ, এই নিরিখেই জনগণ তাকে মূল্যায়ন করবে, কতটা এই নব দল কোন শ্রেণির মানুষের মুখপাত্র হয়ে উঠবে।
ক্ষমতা বদলের ইতিহাসও নির্মিত হয় এই মৌলিক মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করেই। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়া কেবল এই উপাদান নিয়ে প্রচারের হাওয়া নির্মাণ করে। যখন মিডিয়াকেই দুর্বল এবং কুক্ষিগত করে ক্ষমতাসীন দল নিজের সমর্থনে প্রচার চালায় আর রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে বিরুদ্ধ মত দমন করে, তখন মানুষের মধ্যে বিরোধিতা প্রকাশের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হতে থাকে। কিন্তু বিরোধী মত গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিরোধিতার স্বাভাবিক প্রকাশ যত রুদ্ধ হয়, বিরোধিতা থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ তত দানা বাঁধতে থাকে। ক্ষমতার ক্রিয়া – প্রতিক্রিয়ার কারণে জনমনে যে আবেগ তৈরি হয় সেটাই সংগঠিত হয়ে নিজের মতো রূপ ও গতিধারা তৈরি করে। তার স্বাভাবিক প্রকাশের ধারা রুদ্ধ হলে একটা সময়ের পর নিজেই বিস্ফোরিত হয়।
ককরোচ জনতা পার্টির গড়ে ওঠার প্রেক্ষিত এরকমই। খেয়াল করলে দেখা যাবে, গত শতকের শেষভাগে এদেশের মানুষ বিকল্প খুঁজেছে এভাবেই। সত্তরের মাঝে একদিন ‘জনতা পার্টি’ এভাবেই জনসমক্ষে এসেছিল। জরুরি অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে জয়প্রকাশ নারায়ণের ডাকে তখন জনতা পার্টির জন্ম হয়েছিল ইন্দিরার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন অবসানের লক্ষ্যে। কিন্তু তাদের কার্যকারিতায় হতাশ জনমনে জমে থাকা ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে,পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টি উঠে এল। আশির দশকের শুরুতে কংগ্রেসের মুসলিম তোষণবাদের বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায়ের রাষ্টবাদী দাবি তুলে ধরতে তৈরি হল ভারতীয় জনতা পার্টি। আশির দশকের মধ্যভাগে মন্ডল কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে জাতিসত্তার রাজনীতিতে বিভাজিত জনমন সমর্থন জুগালো জাতপাতভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে। একের পর এক মন্ডল কমিশন বিরোধী আন্দোলন থেকে বিহারে, উত্তরপ্রদেশে গড়ে উঠল বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক দল। লালুপ্রসাদ, নীতীশ কুমার, মুলায়ম সিং যাদব, মায়াবতীর দলের উত্থান এভাবেই। তাদের উত্থানে দুর্বল হল জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। কংগ্রেস সেই প্রেক্ষিতে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে পারল না, টুকরো হল। জাতীয় স্তরে মিলিজুলি সরকার স্থায়ী নেতৃত্বের শূন্যতায় জনমনের আস্থা হারালো। এদিকে এলাকার মানুষের ক্ষোভ থেকে তৈরি হতে থাকল রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক দল। কংগ্রেসের অপশাসন,দুর্নীতির বিরুদ্ধে জমতে থাকা জনমত থেকে তৈরি হল আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন। দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন ক্ষমতার পরিবর্তন চাইল। পিছন থেকে হাওয়া দেওয়া শুরু করে বিজেপি। আন্নার জনপ্রিয়তা হাইজ্যাক করে ক্ষমতায় বদল আনার চেষ্টা করল তারা।
এই ইস্যুতেই দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে ফাটল তৈরি হল । জন্ম নিল আপ পার্টি।সত্তর থেকে নব্বইয়ের দুটি দশক দেখল জনমনে একটার পর একটা ক্ষোভ থেকে পার্টি তৈরি হচ্ছে। বদল হতে থাকল জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ।
ককরোচ জনতা পার্টি তেমনই একটি বিক্ষুব্ধ জনমনের বিস্ফোরণ। বেকার যুব সম্প্রদায়, প্রতিবাদী গণ আন্দোলনকারী এরা সবাই ককরচ, এরা সিস্টেমকে আঘাত করছে) থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে কোটি কোটি যুবক যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে একজোট হয়ে গেল, এটা কিন্তু হওয়ারই ছিল। কারণ যুব মনে ক্ষোভ জমছিল বহুদিন ধরেই। তীব্র বেকারত্বের হাঁসফাঁস, সরকারি চাকরি হ্রাস, বেসরকারি ক্ষেত্রে অস্থায়ী চাকরি, অনিশ্চিত ভবিষ্যত থেকে রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকার বিরোধী প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে বহুদিন ধরেই। জনমন বিভাজিত হয়েছে বিজেপির সাম্প্রদায়িক নীতিতে, তাদের বুলডোজার শাসন, নারী নির্যাতনের সংখ্যার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি, কৃষকদের প্রতি ধ্বংসাত্মক নীতি এবং সর্বস্তরে চূড়ান্ত দুর্নীতির ফলে মানুষের মধ্যে বিজেপির বিকল্প খোঁজা শুরু হয়ে গেছিল। গত লোকসভা নির্বাচনে তাদের আসন কমে আসা থেকে কোনো শিক্ষা নেয় নি, উল্টে সরকারে থাকার সুবিধা নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিজেপি যথেচ্ছ দমন করা শুরু করে। ঠিক এমন অবস্থায় নিটের উপর্যুপুরি পরপর চারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সি বি এস সি পরীক্ষার উত্তরপত্র চেকিং নিয়েও স্ক্যাম, বিভিন্ন চাকুরীর পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস প্রায় এক কোটি ছাত্রের মনে গভীর ক্ষোভ হতাশা ও বিকল্পের অন্বেষণে চাহিদা তৈরি করে। প্রতিটা ক্ষেত্রে শীর্ষ স্তরের দুর্নীতি ক্ষোভের আগুন বাড়িয়ে দেয়। ইতিমধ্যে দিল্লি হাইকোর্টে কোটি টাকার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তকে প্রধান বিচারপতির পদে আনা হয়। তিনিই যুবসমাজকে ককরোচ বলে মন্তব্য করে যুব অসন্তোষের অনলে ঘৃতাহুতি দিয়ে যুব অসন্তোষকে দানা বাঁধতে অনুঘটকের কাজ করলেন তাঁর মন্তব্যের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদে তৈরি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে নিমিষে কোটি কোটি ছাএযুব সমর্থন করার পিছনে এটাই প্রেক্ষাপট।
কার্যত প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত দেশের ছাত্র যুব ক্ষুব্ধ জনতাকে সরকার বিরোধী আন্দোলনের দিকেই ঠেলে দিলেন। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য এমন বার্তা দিল যে শীর্ষ আদালত ঝুঁকে গেছে ক্ষমতার দিকে, জনগণের বিচার পাওয়া নিয়ে তাতে আরও আশঙ্কা তৈরি হল। সরকার আর আদালতের বোঝাপড়া যখন প্রতীয়মান হয়ে যায়, জনগণ তখনই ঠিক করে সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যেভাবে বিজেপি রাষ্ট্র শাসনের সুবিধা নিয়ে সংবিধানের সমস্ত বিধি কুক্ষিগত করে, ক্ষমতাকে অনৈতিক পথে মুষ্টিবদ্ধ করে নিরঙ্কুশ করতে চাইছে তাতে জনগণের সহ্যের ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে বলেই আজ ককরোচ পার্টির আহ্বায়ক দিল্লিতে এসে আত্মপ্রকাশ ঘটালেন যুবদের পার্টি যারা দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষা প্রশাসনের স্বার্থে অদক্ষ শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা চায়। এটা একটা ইস্যুভিত্তিক প্রোগ্রাম মাত্র, কিন্তু এর বাইরে তারা কি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণকে কোনো বিকল্প দেখাতে চায়? সেটা কিন্তু এখনও অস্পষ্ট। অর্থাৎ কেবলই যুব সমাজের প্রবল ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিবাদ জন্ম দিল একটি রাজনৈতিক দল। শেষ পর্যন্ত তারা কী চায়, কোন পথে চায়, কোন শ্রেণির মানুষের জন্য রাস্তায় নামতে চায়, নাকি শুধু ছাত্র যুবদের একাডেমিক পরীক্ষা আর চাকুরীর পরীক্ষার শুদ্ধতার দাবিতেই তারা আটকে থাকবে এটা জানার পর জানা যাবে প্রতিবাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত তারা কাদের জন্য আকাশে ছুঁড়তে চায়। সবই সময় বলবে। যুব ও জনমনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সংগঠিত করে যথাযথ অবস্থান ও কৌশল নিয়ে তারা ক্ষমতার প্রাচীরে আদৌ আঘাত হানতে চায় কিনা, এবং সেটাতে দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে তাদের সমীকরণ কী হবে এখন সেটাই দেখার।











