বাড়ি থেকে একরাউন্ড গালাগালি খেয়ে বেরিয়েছি। তবে ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে যখন চাঁদপাড়া চৌগাছা স্কুলের মাঠে পৌঁছলাম, ততক্ষণে মনে হচ্ছিল গালাগালি খাওয়া সার্থক।
গালাগালিটাও নিজের দোষে খেয়েছি। সারা সপ্তাহে আমার ছুটি বলতে শনিবার আর রবিবার সন্ধ্যে টুকুই। সেই সময়টাও যদি বাড়িতে না থাকি, তাহলে গালি খাওয়াই উচিৎ। একশবার উচিৎ।
তবে বইমেলায় আমাদের বইয়ের স্টল থাকবে, আর আমি বাড়ি বসে থাকব সেটাও সম্ভব নয়। গ্রামে গঞ্জের এই হাঁটুরে বইমেলাগুলোর এক অদ্ভুত আকর্ষণ। প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিতরা মেলায় এসে বই নেড়েচেড়ে দেখছে, বইয়ের মলাটে হাত বোলাচ্ছে, বই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে- এ এক অনন্য অনুভূতি।
মেলার মাঠে পৌঁছে স্কুটারটা এক কোনায় রাখছি, তার মধ্যেই অশোকনগর থেকে দীপকদা সাইকেল নিয়ে হাজির। দীপকদার সাইকেলের গল্পও একদিন শোনাতে হবে। শোনানোর মতোই সব গল্প। তবে এখন সে গল্পে ঢুকলে বইমেলার গল্প শোনানো যাবে না।
দুজন মিলে মেলার অন্যতম উদ্যোক্তা মিলনের বাড়ি থেকে বইয়ের ব্যাগ বার করলাম। গ্রামের মেলায় আমাদের প্রকাশনীর বই ছাড়াও বাচ্চাদের বেশ কিছু বই নিয়ে আসা হয়। এই সব মেলায় ছোটোরাই বইয়ের প্রধান ক্রেতা।
আমরা ছাড়াও আরও তিনটে বইয়ের স্টল আছে। বইটই সাজিয়ে বসে পড়লাম। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা আসছে। বই নেড়েচেড়ে দেখছে। দাম জিজ্ঞাস করছে। তারপর গম্ভীর মুখে জানাচ্ছে পরে এসে নিয়ে যাবে।
এক ঠাকুমা তার দুই নাতির হাত ধরে হাজির। বই দেখে খুব খুশি। একেকটা বই তুলে ধরছেন আর নাতিদের বলছেন, পড় তো বাবা, কী লেখা।
নাতি বানান করে পড়ছে, টেনিদার কাণ্ডকারখানা, দীপ জ্বেলে যাও, ক্ষীরের পুতুল, হাসপাতালের জার্নাল…
ঠাকুমা বললেন, ও বাবা, তোদের ব্রতকথার বই নাই? লক্ষ্মীর পাঁচালী নাই? এই গুলো নাই কেন?
দীপকদা বললেন, একখান ভালো বই আছে ঠাকমা… এইটা দেখো।
ঠাকুমা বই হাতে নিয়ে নাতিকে বললেন, পড়তো ব্যাটা এটা কিসের বই?
বাচ্চা নাতিটি পড়লো, ঠাকুমার ঝুলি।
ঠাকুমার মুখে হাসি ফুটল। বললেন, এইখান ভালো বই। নাম শুনিচি। বাপধন, বইখান নিলি তুই পড়ে শোনাতে পারবি?
বড় নাতি ঠাকুমার আঁচল ধরে ঘাড় নাড়ে। ঠাকুমা বলেন, কত দাম এইখানার।
দীপকদা বলেন, ছাড়টার সব দিয়ে সত্তর টাকা লাগবে ঠাকুমা।
ঠাকুমা আঁচলের খুট খোলে। খুচরো টাকা বের করে গোনে। সমস্যা দেখা যায়। পঞ্চাশ টাকা হচ্ছে। ঠাকুমা বলেন, যদি পরে বাকি টাকা দিয়ে যাই?
আমি বলি, দিয়ে দেন দীপকদা। ঠাকুমার এতো ইচ্ছা যখন।
ঠাকুমা বইটা নিয়ে ফোকলা দাঁতে একগাল হাসেন। নাতিদের বলেন, আজ রাতেই পড়ে শোনাবি, হ্যাঁ…
নাতিরা ঘাড় নাড়ে।
ওরা চলে যেতেই দীপকদা বলেন, ব্যাপারটা ভাবো তুমি। নাতিরা ঠাকুমাকে ঠাকুমার ঝুলি পড়ে শোনাচ্ছে। একেবারে উল্টো ব্যাপার।
এরপর টুকটুক করে লোকজন আসতে থাকে। পাখিরাও তারস্বরে কিচিরমিচির করতে করতে বাসায় ফেরে। মেলার মঞ্চে নাটক শুরু হয়। ছোটোদের নাটক- কানকাটা মাসি। ভুবন আর তার মাসির গল্প। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের লেখা গল্পের নাট্যরূপ। ভুবন আস্তে আস্তে চুরি করায় হাত পাকাচ্ছে। আর তার মাসি শাসন না করে চুরিতে যথাসাধ্য উৎসাহ দিয়ে চলেছেন। মাসিকে দেখতে দেখতে একজনের কথা মনে পড়ছিল। কিন্তু তার নাম বললে মেলার গল্প না হয়ে এটা অন্য কিছু হয়ে যবে। তাই আর বললাম না।
এর মধ্যে একজন মানুষ গামছা মুড়ি দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে বই দেখছেন। পাথরের মতো অভিব্যক্তিহীন মুখ। সারা গায়ে ধুলোবালি। গায়ের গেঞ্জিতে অন্তত গোটা পঞ্চাশেক ছিদ্র। বইয়ের মলাটে পরম মমতায় হাত বোলাচ্ছেন।
বাচ্চাদের একটা চটি বই তুলে বললেন, এইডা কিসের বই?
দীপকদা বললেন, ছবিতে বাচ্চাদের রামায়ণ।
এই বইখান ভালো হবে? কত দাম এই খানার?
দীপকদা বললেন, কুড়ি টাকা? তা কে পড়বে গো?
– আমার মেয়ে পড়বে। তারপর লোকটি খানিকক্ষণ চুপ করে বলেন, আমার মেয়ে দ্বিতীয় ক্লাসে পড়ে। ও বাংলা পড়তে পারে। এইটুকু বলার সময় লোকটির পাথরের মতো মুখ কোমল হয়ে যায়। মেয়ের গর্বে ঝকমক করে ওঠে। তবে শুধু ওইটুকু সময়ের জন্যই। আবার তিনি চুপ করে যান। কুণ্ঠিত মুখ করে তাকান। তারপর বলেন, কুড়ি টাকা হলে আর একখান কিনতে পারব। তুমি একটা বেছে দাও।
দীপকদা বিদ্যাসাগরের নীতিকথার একটি বই বের করে দেন। মানুষটি লুঙির গোঁজ থেকে একটা ছেঁড়া খোঁড়া প্লাস্টিক বার করেন। গার্ডার দিয়ে পেঁচানো। গার্ডার খুলে সাবধানে সারাদিনের আয় বের করেন। সেখান থেকে দুটো কুড়ি টাকার নোট বের করে দেন।
দীপকদা জিজ্ঞেস করেন, তুমি কী কাজ করো গো?
মানুষটি বলেন, জোগাড়ের কাজ করি। তারপর তিনি বই দুটো সযত্নে বগলদাবা করে আস্তে আস্তে চলে যান।
আমি চুপচাপ তাকিয়ে থাকি। ভালোবাসা মনকে আর্দ্র করে দেয়। একজন নিরক্ষর বাবা সারাদিন খেটে খুটে বই মেলায় এসেছেন। সামান্য যেটুকু টাকা বেঁচেছে তাই দিয়ে নেশা করেন নি, স্কুল পড়ুয়া মেয়ের জন্য বই কিনছেন। কে বলেছে সর্বহারারা স্বপ্ন দেখে না।
রাত আস্তে আস্তে গভীর হচ্ছে। নাটক শেষ হয়ে গেছে। ভুবন তার প্রিয় মাসির কান কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। অনেক মানুষ আসছেন, বই নাড়াচাড়া করছে। বই নিচ্ছেন। এর মধ্যে আবার নাতিদের হাত ধরে ঠাকুমা এসে হাজির। বললেন, টাকা পেতিস, তাই দিতে এলুম।
দীপকদা বললেন, কাল দিতে পারতে ঠাকুমা। কালও তো মেলা আছে।
ঠাকুমা বললেন, বাপধন, সকালে কী খাইচি, তাই রাতে স্মরণ থাকে নে। ভুলে গেলি তোরা শহরের লোকেরা গিয়ে খামোখা গাঁয়ের লোকের নামে নিন্দা করবি। তার চে বরং দাম আরও পাঁচ টাকা কমাই দে। গাঁয়ের লোকদের ঠকাস নে বাপ আমার।
দীপকদা হেসে বলল, ঠকাচ্ছি, কে বলল তোমায়?
আমরা মুখ্যু সুখ্যু লোক। চিরকাল দেকেচি পড়াশুনা জানা লোকেরা আমাদের ঠকায় লয়। এই নে। যা রাখবি রাখ।
দীপকদা কুড়ি টাকার নোটটা নিয়ে একটা পাঁচ টাকার কয়েন ফেরত দেয়। খুশিতে বুড়ির মুখ ঝলমল করে।
আমি বলি, দীপকদা, প্রায় দশটা বাজে। এবার বই গোছান। যশোর রোডের যা অবস্থা, স্কুটারে বাড়ি ফিরতে অন্তত ঘণ্টা দেড়েক লাগবে। বেরনোর সময় গালি খেয়েছি, ফেরার পরও খাব।
দীপকদা হেসে বলেন, যতই গালি খাও, কাল রবিবার এসো। গ্রামের মেলায় এলে যা সব অভিজ্ঞতা হয়, কলকাতা বইমেলা তার কাছে তুচ্ছ।











খুব আন্তরিক প্রতিবেদন। ধন্যবাদ জানাই লেখককে।