হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের হেড, প্রফেসর চিদানন্দ হাফ-মুন রিডিং গ্লাসের ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, “আহ, ডঃ নালকো, আসুন। বসুন।”
প্রফেসর চিদানন্দ নালকোর চেয়ে অন্তত বিশ বছরের সিনিয়র, তা-ও আপনি বলবেন। ও কেবলমাত্র অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে জুনিয়র, কিন্তু তাতে কী! প্রফেসর অবশ্য সবাইকে সম্মান করে আপনি বলেন। তাই নালিশ করার কিছু নেই।
প্রফেসর বললেন, “চা খাবেন? কফি?”
এটাও প্রফেসরের আর একটা বিশেষত্ব। যত কম কাজই হোক না কেন, ওঁর ঘরে গেলে সব্বাইকে বসতে হবে, চা বা কফির অনুরোধে ‘হ্যাঁ’, বা ‘না’ বলতে হবে — তবেই কাজের কথায় পৌঁছনো যাবে। প্রফেসর কক্ষনও কাউকে দাঁড় করিয়ে রেখে কাজ করান না।
নিজেই ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢেলে ডঃ নালকোকে দিয়ে প্রফেসর নিজের কাপে এক চুমুক দিয়ে জানতে চাইলেন, “বাড়ির সবাই কুশল? আপনার মা?”
“হ্যাঁ, স্যার। থ্যাঙ্ক ইউ। মা ভালো আছেন…”
“জেনে সুখী হলাম।”
এর উত্তরে কি কিছু বলা উচিত? নালকোর জানা নেই। চুপ করে বসে রইল। প্রফেসর বললেন, “আপনাকে যে জন্য ডেকেছি — কালকে আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। আমি ডঃ বসু-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, উনি আপনার নাম রেকমেন্ড করেছেন…”
ঘাড় নাড়ল নালকো। ও জানে। আগের দিনই এস-বি ম্যাম জানিয়ে রেখেছিলেন কেন প্রফেসর আজ নালকোকে ডাকবেন।
“কাল নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর জয়েন করবেন। ডঃ মজুমদার। ভোরের ট্রেনে আসছেন। আপনি পারবেন, স্টেশন থেকে রিসিভ করে আনতে? গেস্ট হাউসে ঘর বুক করা আছে — ওখানে উঠবেন, তবে তারপরে এখানে সঙ্গে নিয়ে এসে জয়েনিং-এর সব কাজ করতে হবে।”
সিসিএন আবার ঘাড় নাড়লেন। এটা ইতিহাস বিভাগের দস্তুর। নতুন শিক্ষক জয়েন করলে তাঁকে কেউ স্টেশন বা বাস স্ট্যান্ড থেকে অভ্যর্থনা জানাতে যায়।
প্রফেসর মোবাইলটা হাতে নিয়ে বললেন, “ওনার নম্বরটা…” প্রফেসর নম্বর বললেন, নালকো সরাসরি মোবাইলেই লিখে নিলেন। প্রফেসর বললেন, “কাল ট্রেন থেকে নিশ্চয়ই একা বাঙালি মেয়ে অনেকে আসবেন না… তাও যদি চিনতে না পারেন, তাহলে…”
নালকো বলল, “হ্যাঁ, স্যার। ফোন করে নেব, স্যার।”
প্রফেসরের ঘর থেকে বেরিয়ে নালকো দৌড়ল বাড়ির দিকে। মাকে বলা আছে — যেতে হবে বাজারে। আজকাল শপিং মল হয়েছে বলে মাকে নিয়ে যাওয়া সহজ। আগে খোলা বাজারে মা’র হুইলচেয়ার নিয়ে চলাফেরায় খুব অসুবিধে ছিল।
*
পরদিন ভোরবেলা নালকো স্টেশন পৌঁছে শুনল, ট্রেন মাত্র দশ মিনিট লেট। যাক, নিশ্চিন্ত। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হবে না। শীতকালে পাহাড়ের গায়ে রাতে কুয়াশা হলে ট্রেন খুব আস্তে চালাতে হয় — অনেক সময় দু তিন ঘণ্টাও লেট হয়ে যায়। আজ এখানেও কুয়াশা হালকা। শিগগিরি তাই দূর থেকেই ট্রেনের হেডলাইট দেখা গেল।
শীতের ভোরের ট্রেন, প্ল্যাটফর্মে ভীড় কম, আর ট্রেন থেকেও বেশি লোক নামল না। নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরকে দেখেই চেনা গেল। হাতে ছোটো সুটকেস আর পিঠে বড়ো ব্যাকপ্যাকটা নিয়ে যে নামল, তাকে দেখে মনে হয় বেশ বলিষ্ঠ আর কর্মঠ। নিয়মিত ব্যয়াম করা চেহারা।
এগিয়ে গিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করে নালকো বলল, “ডঃ মজুমদার? আমি সি সি নালকো। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। উজানগড়ে স্বাগত।”
উত্তরে মেয়েটা হ্যান্ডশেক করার মতো হাত বাড়াতে গিয়েও থেমে গেল। প্রতিনমস্কার করে নিজের পরিচয় দিল। বলল, “কেউ আমাকে নিতে আসবে আশাই করিনি।”
নালকো বলল, “আমাদের হেড প্রফেসর চিদানন্দ বহু বছর ইংল্যান্ডে ছিলেন। এখনও হাবেভাবে সাহেব। তাই অনেক সাহেবিয়ানা পাবেন এখানে। দিন, আপনার সুটকেস আর ব্যাকপ্যাকটা দিন…”
উত্তরে হাসল নবাগতা। হাসিটা যেন খুব চেনা। বলল, “ও মা, তা কেন? এটাও সাহেবিয়ানা?”
নালকো বলল, “না, মানে আমি নিই…”
এবারে মেয়েটা অল্প ঝাঁঝিয়ে বলল, “কেন? মেয়ে বলে? এইটুকু ঠিক নিয়ে যেতে পারব। বলুন, কোনদিকে?”
নালকো একবার ভাবল বলে, “আচ্ছা, সুটকেসটা অন্তত দিন…” কিন্তু কে জানে, কী আবার বলবে… তাই কিছু না বলে বাইরের দিকে রওয়ানা দিল।
গাড়িতে যেতে যেতে ডঃ মজুমদার বলল, “আচ্ছা, এখানে একটা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে — থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট… আমরা কি সেদিকে যাব না?”
গাড়ি চালাতে চালাতে খোলা জানলা দিয়ে দেখিয়ে নালকো বলল, “না। ওটা ওদিকে। আর উজানগড় ওই দিকে।”
অবাক হয়ে ডঃ মজুমদার বলল, “কিন্তু আগে তো ওটাই উজানগড় ছিল?”
মাথা নেড়ে নালকো বুঝিয়ে বলল, “না। ওটা আদত উজানগড় নয়। পাওয়ার প্ল্যান্ট তো বসতি থেকে দূরে করতে হয়, তাই ওটা উজানগড় থেকে কিছু দূরে তৈরি হয়েছিল। তখন অবশ্য উজানগড় বলতে ছিল কেবল ভাঙাচোরা একটা গড়ের দেওয়াল আর কয়েক ঘর আদিবাসী। কোনও হিস্টোরিকাল ইম্পর্ট্যানস-ও ছিল না। পরে পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্যই আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে ওঠে। পরে সরকার পাওয়ার প্ল্যান্টের কলোনিটা উজানগড়ে সরিয়ে দিল, বাজার-টাজার সবই এদিকে চলে এল… তাই শহরটা আরও বড়ো হয়ে গেল…”
“ও মা! কলোনি সরে গেল কেন?”
নালকো বলল, “সরকার ওদিকের জঙ্গলটা অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে। বোরামবুরু অভয়ারণ্য। এখানকার আদিবাসীদের আরাধ্য দেবতা…”
“জানি আমি — বোরামবুরু আদি দেবতা। দেবতাদের বাবা।”
“আপনি জানেন? কী করে? বোরামবুরুর কথা খুব কম লোকে জানে। খুব ছোটো একটা জনগোষ্ঠী পুজো করে…”
“ছোটোবেলায় আমি কিছুদিন পাওয়ার প্ল্যান্টের কলোনিতে থাকতাম। আমাদের বাড়ির পেছনেই ছিল বোরাম পাহাড়… আমি তখন বোরাম পাহাড়ে গিয়ে বোরাম গাছের নিচে বসে থাকতাম… একা একা…”
নালকো হঠাৎ গাড়িটা ঝাঁ করে রাস্তার ধারে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। অবাক হয়ে মজুমদার বলল, “কী হল?”
কিছুক্ষণ হাঁ করে নালকো চেয়ে। অস্বস্তিতে মজুমদার আবার বলতে যাবে, “কী হল-টা কী?” এমন সময় আস্তে আস্তে নালকো বলল, “আপনি… তুমি… পান্তু?”
এবার মজুমদারের অবাক হবার পালা। “আপনি… আমার ডাকনাম…?” তারপরেই নিজেও চমকে বলল, “ছৈনা?”
ছৈনা বলল, “আমি তখন থেকে ভাবছি, এত কেন চেনা লাগছে — হাসিটা তো ভীষণই চেনা। আমি ভাবতেই পারছি না আপনি… তুমি…”
পান্তু বলল, “তুই আবার আমাকে আপনি… তুমি… কী বলছিস?”
ছৈনা লজ্জা পেয়ে বলল, “না, মানে… তুই এখন বড়ো হয়ে গেছিস… একেবারে লেডি।”
পান্তু বলল, “আর তুই বড়ো হোসনি? তুইও তো জেন্টলম্যান! ভাবতে পারিস, আমরা একই স্কুলে পড়তাম, আর এখন একই ইউনিভার্সিটির লেকচারার!”
ছৈনা আবার গাড়িটা চালু করে বলল, “তুই তো বলেইছিলি, ফিরে আসবি আবার।”
পান্তু উত্তেজিত হয়ে বলল, “বলেছিলাম না! দেখলি? ঠিক ফিরে এসেছি। আবার গিয়ে বোরাম গাছের নিচে বসে থাকব, দেখিস।”
ছৈনা বলল, “এখন আর গাছটা নেই, জানিস?”
অবাক হয়ে, মন খারাপ করে পান্তু বলল, “গাছটা নেই? এ বাবা। কী হল? কেউ কেটে ফেলেনি তো?”
ছৈনা মাথা নাড়ল। বলল, “মরে গেছে। কত বুড়ো গাছ ছিল, কেউ জানে না। আমার মা বলত, মা-ও ছোটোবেলায় ওই গাছটাই দেখেছে। মা-র মা-বাবাও নাকি দেখেছে।”
পান্তু বলল, “আর একটা বোরাম গাছ লাগানো যেত না?”
ছৈনা বলল, “লাগাতে হয়নি। ওই গাছটারই ফল, বীজ পড়েছিল নিশ্চয়ই ওখানে — গাছটা মরে যাবার কিছুদিন পরেই দেখা গেল একটা চারা লিকলিক করে গজাতে লেগেছে। বোরাম গাছ খুব আস্তে আস্তে বাড়ে তো, তাই এখনও মাত্র চার, সাড়ে চার হাত উঁচু হয়েছে। চারিদিকে বেড়া দেওয়া হয়েছে — হরিণ বা অন্য কোনও প্রাণী যাতে না খেতে পারে। ওই তখন থেকেই আদিবাসীরা — মানে আমরা দাবী করতে শুরু করি বোরাম পাহাড়কে ঝিরনি ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে নিতে হবে। তারপরে এম-এল-এ হল আমাদের কুচামদা — কুচামদাকে মনে আছে? আমার চেয়ে বড়ো ছিল, তখন ক্লাস নাইনে পড়ত…”
মনে নেই পান্তুর। মাথা নাড়ল। ছৈনা বলল, “এখন এখানে বিরাট লিডার। ও ভোটে জেতার পরেই সরকার বলল, ওদিকটা পুরোটা অভয়ারণ্য হবে। আদিবাসী গ্রাম ছাড়া কোনও বসতি থাকবে না। ওর কিন্তু তোকে মনে আছে। বোরাম গাছটা মরে যাবার পরে আমাকে বলেছিল — তোর বন্ধু এখানে এসে বসে থাকত…”
তা থাকত। পান্তুর আবার মন খারাপ হল। পুরোনো বাড়িতে এমনিতেও থাকতে পারত না, কিন্তু ঘুরতে তো যেতে পারত… বোরাম পাহাড়ে যেতে পারত… জানতে চাইল, “আর আমাদের কোয়ার্টারগুলো? সেগুলো কী হল?”
“ওমনিই পড়ে আছে, এখন ভেঙে ভেঙে পড়ছে। বাগানগুলো জঙ্গল হয়ে গেছে। বাড়ির ভেতরে, ছাদে গাছ গজাচ্ছে — আর দশ বছর পরে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়েই যাবে…”
পান্তু বলল, “তোদের গ্রামটা আছে?”
ছৈনা বলল, “আছে। আদিবাসীদের সব গ্রামই আছে।” তারপরে হাত দিয়ে দেখাল, “ওই দেখ, উজানগড়ে শপিং মল হয়েছে। মনে আছে, তোর মা দুঃখ করত?”
হাসল পান্তু। বলল, “জানিস, এখনও আমি আসব শুনে বলছিল, আর জায়গা পেলি না? উজানগড়েই চাকরি করতে যেতে হবে? কিচ্ছু করার নেই, কোথাও যাবার নেই… বোর হয়ে যাবি।” তারপরে বলল, “হ্যাঁ রে, বুদবুদিয়ার খবর কী? কেমন আছে? কোথায় থাকে? গ্রামেই? আর মংলু? আর নিলু মিস? এখনও স্কুলের হেড মিস?”
এবারে গম্ভীর হয়ে গেল ছৈনা। বলল, “নিলু মিস আর এখানে থাকে না। আক্কা আঙ্কেল ভালো চাকরি নিয়ে চলে গেল, নিলু মিসও চলে গেল। মংলু গ্রামেই থাকে। ও ভালো আছে; তবে মা পুরো ভালো নেই। এখন আর হাঁটতে পারে না। বছর পাঁচেক আগে একটা অসুখ হয়ে পায়ে আর জোর নেই। হুইলচেয়ার লাগে। তবে এমনি ঠিক আছে। আমার সঙ্গেই থাকে। চল, দেখতে পাবি। তোর বাবা মা?”
ওদেরও বয়েস হয়েছে, কিন্তু ভালো আছে। “কোয়ার্টার পাই, শীত কমুক, আসবে। কোয়ার্টার পেতে সময় লাগে?”
মাথা নাড়ল ছৈনা। বলল, “বেশিদিন লাগে না। তোর কোয়ার্টার প্রায় রেডি। কেমিস্ট্রির আপ্পা রেড্ডি রিটায়ার করেছে। চলে যাবে শিগগির। বাক্স বাঁধাছাঁদা হচ্ছে। তারপরে বাড়ি রঙ করিয়েই তোকে দেওয়া হবে। বড়ো জোর দু-সপ্তাহ। ততদিন গেস্ট হাউসে থাকবি।”
শহর পার করে ওরা আবার খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আরও সাত-আট কিলোমিটার গিয়ে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস। মস্তো গেটের ওপরে লেখা — উজানগড় বিশ্ববিদ্যালয়। একবার ঘড়ি দেখে নিয়ে ছৈনা বলল, “অফিস খুলতে এখনও দু-ঘণ্টা। গেস্ট হাউস যাবি… না আগে বাড়ি চল। মা-র সঙ্গে দেখা করে, চা খেয়ে গেস্ট হাউস আসবি।”
পান্তু বলল, “অসুবিধে হবে না?”
মাথা নাড়ল ছৈনা। “না। শুধু চা খাওয়াব। ব্রেকফাস্ট গেস্ট হাউসেই হবে। আমিও খাব। তোকে নিয়েই ডিপার্টমেন্টে যাব। তোকে একটা চলাফেরার কিছু কিনতে হবে। এখানে সব কিছু খুব দূরে দূরে। টু-হুইলার খুব জরুরি। এই যে গেস্ট হাউস ডানদিকে। আর হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট — ও-ও-ও-ই দেখ, ওই টিলার ওপারে — শুধু ছাদের ওপরটা দেখা যাচ্ছে। রোজ এত হাঁটাহাঁটি করতে একেবারে জিভ বেরিয়ে যাবে, সময়ও লাগবে অনেক। টু-হুইলার চালাতে পারিস? তাহলে আমার একটা ইলেক্ট্রিক স্কুটার আছে… মা-র জন্য তো গাড়ি রাখতেই হয়।
পান্তু মাথা নেড়ে বলল, “দরকার নেই। উজানগড়ে সাইকেলের দোকান দেখলাম। বিকেলে আমাকে নিয়ে যাবি, আমি একটা সাইকেল কিনব। রোজের জন্য ও-ই যথেষ্ট। এখন গেস্টহাউসেই তো থাকব। খাওয়াদাওয়া ওখানেই করব। টুকটাক কেনাকাটার জন্য প্রফেসর চিদানন্দ বলেছেন ক্যাম্পাসের কনভিনিয়েন্স স্টোর-ই যথেষ্ট। দু-সপ্তাহ পরে কোয়ার্টার পাই, তারপরে ঠিক করব স্কুটার কিনব, না গাড়ি। মা বাবা এসে যদি থাকে তাহলে একরকম, আর চলে গেলে অন্যরকম।”
ছৈনা গাড়ি থামাল। “এসে গেছি। এই আমার কোয়ার্টার, আর তোরটা ওই সামনের ঝাঁকড়া শিশু গাছটার পরে যে রাস্তাটা ডানদিকে গেছে, সেখানে দিয়ে ঢুকে।”
পান্তু একটু মন-খারাপের সুরে বলল, “এগুলো কোয়ার্টার?”
গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে ছৈনা বলল, “কেন, পছন্দ হল না?”
পান্তুও গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, “তা নয়, তবে আমার কেমন মনে হচ্ছিল, ওইরকম কোয়ার্টার হবে। বাংলো টাইপের বাড়ি, চারিদিকে বাগান… আসলে উজানগড় বলতেই এরকম ছবি মনে পড়ে না?”
মাথা নাড়ল ছৈনা। “না। তোর বাবা বড়োসাহেব ছিল, তোরা বড়োসাহেবদের কটেজ-টাইপ কোয়ার্টারে থাকতি। এখানেও আছে। হেড অফ ডিপার্টমেন্ট, ডিন, ভি-সি — সবার কোয়ার্টার ওরকম। তোদের কলোনিতেও যারা নিচু পোস্টে কাজ করত, তারা এরকম দোতলা বাড়িতে কোয়ার্টার পেত। তবে বাগান চাইলে করতে পারবি — তোর কোয়ার্টার একতলায়। দেখতেই পাচ্ছিস, একতলায় যারা থাকে, তারা ছোটো বাগানও পেয়েছে।”
“তোরটা কোথায়?”
ছৈনা আঙুল দিয়ে দেখাল। “ওই যে। দোতলায়। বারান্দায় মা বসে রোদ পোহাচ্ছে। মাথার ওপরটা দেখা যাচ্ছে। দাঁড়াতে পারে না বলে দেখতে পাচ্ছে না। চল, সারপ্রাইজ দিই।”
দু-জনে দোতলায় উঠে দরজার ঘণ্টি দিল, কাজের লোক দরজা খুলল। ছৈনার মা বুদবুদিয়া বারান্দা থেকে হুইল-চেয়ার নিয়ে আসতে আসতে বলল, “বললি যে গেস্ট হাউসে খাবি…” তারপরেই পান্তুকে দেখে থমকে গেল। ছৈনা সবে বলতে যাবে, “মা, দেখো তো, চিনতে পারো কি না?” কিন্তু ‘দেখো তো…’ পর্যন্ত বলা হল, বুদবুদিয়া চিৎকার করে উঠল, “পান্তু! ছৈনা তুই পান্তুকে আনতে গেছিলি? কই, বলিসনি তো!”
*
পান্তু যখন ছোটোবেলায় উজানগড়ে থাকত, বুদবুদিয়া ওদের বাড়িতে কাজ করত। ও আর ছৈনা একই স্কুলে পড়ত। ওর চেয়ে দু-বছর বড়ো, ক্লাসের ফার্স্ট বয়। সব্বাই মিলে হইচই করে, চা-জলখাবার খেয়ে — হ্যাঁ, বুদবুদিয়া যেন না খাইয়ে পান্তুকে ছাড়বে — অনেক গল্প করে, ওখানেই তৈরি হয়ে ওরা প্রথমে গেল গেস্ট হাউস আর তারপরে ইতিহাস বিভাগে। প্রফেসর চিদানন্দ বললেন, “আসুন, বসুন ডঃ মজুমদার, ডঃ নালকো। যাত্রা কেমন হল? ট্রেনে অসুবিধে হয়নি তো? বাড়ির সবাই কেমন আছেন? কেমন লাগছে, ছোটোবেলার উজানগড়?”
বাকি সব কিছু-তেই ‘ভালো’ বলে পান্তু বলল, “স্যার, এটা আমার ছোটোবেলার উজানগড় নয়। ছোটোবেলার যে উজানগড়ের কথা আপনাকে বলেছিলাম, সেটা আর নেই। ওটা ডঃ নালকোদের বোরামবুরু স্যাংচুয়ারিতে ঢুকে গেছে।”
তারপরে পান্তু আর ছৈনার ছোটোবেলার পরচিতির কথা জেনে সবাই খুব উত্তেজিত — তাহলে আপনারা আগে থেকেই পরস্পরকে চেনেন — কত বছর পরে দেখা হলো? ইত্যাদি।
যে যার কাজে গেল। পান্তুও ল্যাপটপ নিয়ে গেল বিভাগীয় লাইব্রেরিতে। এখানে জুনিয়র টিচারদের নিজের ঘর নেই। অন্তত অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হতে হবে। দু-জন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের একটাই ঘর। তার মানে ও আর ছৈনা। সেটা ভালো। লাইব্রেরিটাও ভালো। আগামীকাল থেকে পান্তুর ক্লাস — তৈরি হতে হতে দুপুর হয়ে গেল। ছৈনা এসে জানতে চাইল দুপুরের খাবার খেতে পান্তু গেস্ট হাউস যাবে কি? তাহলে ছৈনার গাড়িতে যেতে পারে।
“তুইও চল, আমার সঙ্গে খাবি। ব্রেকফাস্ট না হোক, লাঞ্চই খা।”
দু’জনে বেরোল। যেতে যেতে ছৈনা বলল, “ভালো কথা, তোর পি-এইচ-ডি থিসিস দেখলাম ইন্টারনেটে। ‘ভারতীয় ঠগী-ডাকাত: তারা সত্যিই কি ছিল, না সবই মিথ্যা?’”
পান্তু উৎসাহিত হয়ে বলল, “দেখেছিস? জানিস, আমার সাবজেক্টটায় ইন্টারেস্ট কী করে হলো?”
ছৈনা বলল, “সেই আক্কা আঙ্কেল পিকনিকে আমাদের ঠগীর গল্প বলেছিল, বলে?”
পান্তু বলল, “ঠিক বলেছিস। রাত্তিরে রোজ ঠগীদের স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেত। তখন থেকেই ঠগীরা আমার ধ্যান-জ্ঞান বলতে পারিস। তাই রিসার্চও…”
একসময়ে উজানগড়ের আশেপাশের জঙ্গলে নাকি ঠগীদের আনাগোনা ছিল। আঙ্কেল ওদের দূরে পাহাড়ের গায়ে বড়ো বড়ো গুহা দেখিয়ে বলেছিল ওখানে ঠগীদের গোপন আড্ডা ছিল। সে সব জায়গা এখন অভয়ারণ্যের মধ্যে।
ছৈনা বলল, “আমিও খুব ভয় পেয়েছিলাম!”
পান্তু খেতে খেতে হাসল। “তুই ভয় পেয়েছিলি? হাবভাবে তো বোঝা যেত না!”
ছৈনা বলল, “তোকে দেখেও বোঝা যেত না ভয় পেয়েছিলি। আসলে তোর মতো সাহস খুব কম লোকের আছে, জানিস? ওইটুকু বয়সে তোকে নেকড়ে ধরে নিয়ে গেছিল, তাতেও ভয় পাসনি।”
পান্তু চুপ করে রইল। কথাটা সত্যি, কিন্তু যেটা সবাই জানে না, তা হল ওকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল মিরিয়া ডাইনি। মিরিয়া ইচ্ছেমতো নেকড়ে হতে পারত। পান্তুর চোখের সামনে নেকড়ে হয়ে গেছিল বোরাম পাহাড়ের মাথায়। তখন ছৈনাকে সব বলেছিল পান্তু, কিন্তু এখন ছৈনা কি সে কথা মনে রেখেছে, না বিশ্বাস করে? হয়ত ভাবে পান্তুর ভুল হয়েছিল।
ছৈনাকে পরীক্ষা করার জন্যই বলল, “ভয় পাব কেন? বোরামবুরু আমার সঙ্গে ছিল তো…”
ছৈনা কিছু বলল না। পান্তু ঠিকই ভেবেছিল। ছৈনা নিজে বোরামবুরুর পুজো করে, কিন্তু বোরামবুরু এসে পান্তুকে নেকড়েরূপী মিরিয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিল সে কথা মানে না।
খাবার নিয়ে এসেছিল গেস্ট হাউসের কুক মাইনি। হঠাৎ বলল, “আপনিই সেই দিদি, যাকে নেকড়ে নিয়ে গেছিল বোরাম পাহাড়ে?”
চমকে মাইনিকে দেখল পান্তু। ছৈনা বলল, “মাইনি, তোর মনে আছে সে কথা?”
মাইনি বলল, “মনে নাই আবার, আমি তখন ছোটো। সবাই গাঁ থেকে দিদিকে খুঁজতে গেল — আমরা কী ভয় পাইছিলাম! সব বাচ্চারা আর মায়েরা তখন গাঁওবুড়ার বাড়িতে একসঙ্গে…” হঠাৎ মাইনি ঝপ করে নিচু হয়ে পান্তুকে প্রণাম করে চলে গেল। এতই আকস্মিক ঘটনাটা যে পান্তু কিছু বলা তো দূরের কথা, বোঝারই সময় পেল না।
সম্বিৎ ফিরলে ছৈনাকেই বলল, “এটা কী হলো?”
ছৈনা বলল, “তুই জানিস না, এখানে আদিবাসীদের মধ্যে তুই একেবারে লেজেন্ড। কাল্ট্ ফিগার। তোকে ডাইনি ধরেছিল, বোরামবুরু তোকে বাঁচিয়েছে।”
পান্তু হেসে বলল, “কিন্তু তুই বিশ্বাস করিস না…”
ছৈনা হাসল না। গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে পান্তুকেই জিজ্ঞেস করল, “তুই করিস?”
পান্তু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও বিশ্বাস না করে করে কী? ও তো বোরামবুরুকে নিজের চোখে দেখেছিল, ছুঁয়েছিল পর্যন্ত। পাহাড়ের ধার থেকে পান্তু পড়ে যাচ্ছিল, বোরামবুরু — ওর শরীর অর্ধেক বাঘের অর্ধেক মানুষের — থাবা বাড়িয়ে টেনে তুলেছিল। আর তারপরে, মিরিয়া বুড়ি নেকড়ে হয়ে বোরামবুরুর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বোরামবুরুও বিরাট দেহ ধারণ করে নেকড়েটাকে থাবায় ধরে পাহাড় থেকে নেমে গেছিল। পরদিন সকালে জঙ্গলের ভেতর ওর বাড়িতে ডাইনি মরে পড়ে ছিল।
খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ল পান্তু। বলল, “চল, ডিপার্টমেন্টে যাই। তোর ক্লাশ আছে না?”
*
মাস দুয়েক কেটে গেছে। পান্তু কাজে মন দিয়েছে, নতুন কোয়ার্টারে গুছিয়ে বসেছে। বাড়িতে জানিয়েছে, ভালো আছে, কিন্তু এখনই মা-বাবাকে আনতে যাবে না। এখানে এখনও শীত খুব। ঠাণ্ডা কমলে যাবে।
উজানগড়ে বেশ মজা। ছৈনা রোজ কাজ থেকে ওর বাড়িতে কফি খেয়ে বাড়ি যায়। ছৈনার পিসতুতো দাদা মংলুও আসে — ও একরকম পান্তুর প্রথম আদিবাসী বন্ধু, সেই ছোটোবেলায় যখন প্রথম এসেছিল, মংলু ওদের বাগানের আগাছা পরিষ্কার করে দিত। এখনও মংলু বাগানে মালীর কাজ করে, কিন্তু ছৈনার বাগানে আসতে পারে না। কারণ ওর কাজের জায়গা অনেকটা দূরে। উজানগড়ের কোয়ার্টারের মালীই পান্তুর বাগান সামলায়। কিন্তু তিনজনে প্রায় রোজই খুব আড্ডা হয়।
একদিন ছৈনাকে নেমন্তন্ন করল পান্তু। বলল, “আমি রান্না করেছি। তুই এসে রাতে খাবি, আর বুদবুদিয়ার জন্য পাঠিয়ে দেব। সন্ধেবেলাই আসবি, কাজের কথা আছে। ডিপার্টমেন্টে বলব না।”
সন্ধেবেলা ছৈনা এল। পান্তু আগেই বুদবুদিয়ার জন্য খাবার রেখেছিল টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে। ছৈনা মায়ের খাবার বাড়িতে দিয়ে ফিরে এল, পান্তু কফি দিল, তারপরে বলল, “আমার নতুন রিসার্চে তোর সাহায্য চাই।”
ছৈনা বলল, “নতুন রিসার্চ? কী নতুন রিসার্চ?”
পান্তু বলল, “ওই পাহাড়ের খাদের ধারের গুহাগুলো মনে আছে? আক্কা আঙ্কেল বলেছিল ঠগীদের আস্তানা ছিল?”
ছৈনা বলল, “ওখানে কী?”
পান্তু বলল, “যাব। তুই, আমি আর মংলুদা। তা ছাড়া আর একটা ব্যাপার আছে…”
“কী ব্যাপার? যাবি মানে?”
“তোর উইলিয়াম হেনরি স্লীম্যানের কথা মনে আছে? আক্কা আঙ্কেল বলেছিল।”
মাথা নাড়ল ছৈনা। “না। কে সে?”
ওদের ছোটোবেলায় আক্কা আঙ্কেল গল্প বলেছিল, ঠগীরা নিরীহ পথিকদের ভুলিয়ে ভালিয়ে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে এসে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে, সর্বস্ব লুঠ করে, জঙ্গলেই কবর দিয়ে দিত। ব্রিটিশ সাহেব স্লীম্যান দলবল নিয়ে এসে ওই আড্ডা ধ্বংস করে দেন।
“স্লীম্যান ব্রিটিশ সৈনিক — মেজর জেনারেল। পরে পুলিশী করেছিল। ঠগী অ্যান্ড ডেকয়েটি ডিপার্টমেন্টের হেড ছিল ১৮৩৫ থেকে ১৮৩৯ অবধি। ওই সময়েই ঠগীদের শেষ করে দিয়েছিল।”
অবাক হল ছৈনা। “ঠগীরা কয়েকশো বছর ধরে ভারতে ছিল। চার বছরে ওদের উজাড় করে দিয়েছিল?”
পান্তু বলল, “চার বছরের বেশি লেগেছিল। তা ছাড়া অনেক ব্যাপার আছে। সবসুদ্ধ তো সাড়ে চার হাজার ঠগী ধরেছিল ১৮২৬ থেকে ১৮৮৪-এর মধ্যে। আরও অবশ্য অনেক কিছু করেছিল। ঠগী দমনের নামে গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে দিয়েছিল। বলত ঠগীদের একটা সম্প্রদায় আছে। তারপরে অবশ্য আস্তে আস্তে পুলিশি ব্যবস্থার উন্নতি হয়, রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা বাড়ে, রেলগাড়ি আসার পরে লোকে পথে চলা কমিয়ে দেয় — ঠগীরা তো প্রধানত পথিকদের ওপর আক্রমণ করত। ওদিকে জমিদাররা — যারা লাঠিয়াল, ডাকাত, ঠগী, ঠ্যাঙাড়ে পুষত — তাদেরও দমন করা হয়। ফলে সবই থেমে যায়।”
ছৈনা বলল, “বিরাট ব্যাপার ছিল?”
পান্তু বলল, “ঠগীদের নিয়ে অনেক রকম ভাবনাচিন্তা, অনেক থিওরি আছে। থিসিসটা তো পড়েছিস?”
পড়তে শুরু করেছিল ছৈনা। কাজের চাপে এগোয়নি। বলল, “পড়ব। কিন্তু ওই গুহার সঙ্গে স্লীম্যানের কী সম্পর্ক? ওখানে কেন যাবি?”
পান্তু বলল, “আমি কিন্তু ঠগী সম্বন্ধে অনেক খুঁজেও কোথাও ওদের কোনও গোপন ডেরা বা আস্তানার কথা পাইনি। পথের ধারে ফলের বাগানে রাত কাটাত, ওসব জায়গায় মানুষ মেরে কবর দিত — কারও কারও ওরকম প্রিয় ‘বেলে’ ছিল — ওরা যেখানে খুন করত তাকে বলত বেলে, কিন্তু আস্তানা — বিশেষত গোপন আস্তানা, পাহাড়ি এলাকায়, জঙ্গলে — এরকম বিষয়ে কোথাও কেউ কিছু লেখেনি। স্লীম্যান নিজেও লিখেছিল — ওদের আস্তানা হল ওদের বাড়ি… ‘উই মাস্ট সীক দ্য মার্ডারারস অ্যাট দেয়ার হোমস, অ্যান্ড ড্র্যাগ দেম ফ্রম দেয়ার অ্যাসাইলামস।’ ওদের বাড়িতে খুঁজতে যেতে হবে, ওই আশ্রয় থেকেই টেনে বের করে আনতে হবে…”
“তা হলে ঠগীদের আখড়া কোথায় ছিল?”
“কোথাও না। যে যার নিজের আর আশেপাশের গ্রাম থেকে দলবল নিয়ে বেরোত। পথে অনেক সময় অন্য ঠগীদের সঙ্গে দেখা হত। পাঁচ-দশ, বা বিশ-পঁচিশ জনের দল — এদের আলাদা কোনও লুকোনো আড্ডা থাকত না। পথে পথে ঘুরত, পথেই খুন করত, লুঠ করত, কয়েক মাস পরে যাত্রা শেষ করে বাড়ি চলে যেত। শুধু তাই না, আক্কা আঙ্কেলের গল্পে পঞ্চাশজনের একটা ঠগীর দল চল্লিশজন ব্যবসায়ীকে মেরে ফেলেছিল। ঠগীদের দলে অতজন খুনী থাকত না। একজন গলায় ফাঁস লাগাত — তাকে বলত ভুর্তোৎ। তার সঙ্গে দু-তিনজন শমসেরা বা চুমোসীয়া লাগত — কেউ হাত ধরত, কেউ পায়ে লাথি মেরে ফেলে দিত। তা ছাড়া থাকত লুহ্গা — তারা কবর খুঁড়ত। নানা কাজের জন্য আলাদা লোক থাকত — এসব কথা স্লীম্যান লিখে গেছে। ফলে একটা পঞ্চাশজনের ঠগীর দলে জনা কুড়ি তিরিশজন ভুর্তোৎ থাকলে অন্তত আরও তিরিশ-চল্লিশজন লাগত হাত পা চেপে ধরার জন্য — তা তো ছিল না।”
“হয়ত আক্কা আঙ্কেল ভুল বলেছিল? তাও তো হতে পারে। লোকের মুখে মুখে অনেক বদলে যায়।”
পান্তু বলল, “আমিও তাই ভেবেছিলাম। হয়ত তাই। হয়ত আক্কা আঙ্কেল আমাদের যা বলেছিল, সবই ভুল। গল্পকথা। স্লীম্যানের নিজের লেখায় এরকম জঙ্গুলে কোনও জায়গায় কোনও অভিযানের কথা লেখা-ই নেই, অথচ লোকটা যা করেছে, সব লিখে গেছে। বিশাল বিশাল সব লেখা।”
“কিন্তু?” ছৈনা বুঝেছে, এর মধ্যে একটা কিন্তু আছে।
“কিন্তু-টাই কথা। স্লীম্যান দেশে ফেরেনি। এদেশে, জব্বলপুরে থাকতে স্লীম্যানের নিজের, ওর বউ, ছেলে-মেয়ের বার বার এত অসুখ করত, যে বাধ্য হয়ে বাচ্চাদের পাঠিয়ে দিয়েছিল ইংল্যান্ডে। জব্বলপুরের গরম সহ্য হত না বলে বউ আমেলি-কে মাসের পর মাস কাটাতে হত পাহাড়ি অঞ্চলে। তারপরে, খুব অসুস্থতার মধ্যে রিটায়ার করে ফিরে যাচ্ছিলেন ইংল্যান্ডে, কিন্তু জাহাজ শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত যেতে যেতে বাড়াবাড়ি হলো, মারা গেলেন, সমুদ্রেই সমাধি দেওয়া হলো। আমেলি বাকি জীবনটা ইংল্যান্ডে ছিলেন। পোর্টসমাউথে সাউথসী বলে একটা জায়গায়।”
পান্তু কেন ওকে ডেকে এনে এসব বলছে? কারণ কিছু নিশ্চয়ই আছে, ছৈনা তাই চুপ করে শুনতে থাকল। “ইনস্টিটিউট অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চে ফেলোশিপের সময়ে আমি সাউথসী গিয়েছিলাম। জানতাম স্লীম্যান ১৮০৯-এর পরে আর ইংল্যান্ডে ফেরেননি, কিন্তু স্ত্রীর বাড়ি কোথায় ছিল খুঁজতে গেছিলাম।”
ছৈনার এবার উত্তেজনা হতে আরম্ভ হয়েছে। “পেলি?”
“না। তবে আর একটা খবর পেলাম। সেটাই বলতে ডেকেছি। আর একটু কফি দিই?”
আবার কফি নিয়ে দু-জনে বসল। পান্তু বলল, “অ্যামেলিয়া স্লীম্যান কোথায় থাকত কেউ বলতে পারেনি। কিন্তু আমার আসার খবর পেয়ে ফেয়ারহ্যাম বলে কাছাকাছি একটা জায়গা থেকে একজন যোগাযোগ করল। পিটার কনস্ট্যানটিন — বয়স সত্তরের ওপর। বলল, ও নাকি কোন চার্লস কনস্ট্যান্টিনের বংশধর। চার্লস কনস্ট্যান্টিন ওর ঠাকুরদার বাবা। ইন্ডিয়াতে কাজ করত, উইলিয়াম হেনরি স্লীম্যানের সঙ্গে। মাঝে ইন্ডিয়া থেকে ফিরে এসে বিয়ে করে, কিন্তু বউকে নিয়ে যেতে পারেনি। ইন্ডিয়াতেই মারা যায়। লোকটা ইন্ডিয়া থেকে চিঠি লিখত স্ত্রীকে — সেগুলো পিটার কনস্ট্যান্টিনের কাছে রয়েছে। বলল, তুমি চাইলে কিনতে পারো। চার্লস কনস্ট্যান্টিন বলে সত্যিই এক সাহেব স্লীম্যানের সঙ্গে কাজ করত। নানা জায়গায় তার নাম উল্লেখ আছে। বললাম, কত দাম? যা দাম চাইল, শুনে আমি বললাম, এত টাকা আমার নেই। তুমি আমাকে চিঠিগুলো দেখালে আমি লন্ডন গিয়ে আমার ইনস্টিটিউটে বলতে পারি, তাঁরা প্রথমে জেনুইন কি না দেখবেন, তারপরে ইন্টারেস্টিং মনে হলে দরদাম করবেন।
“লোকটা আমাকে চিঠি দেখাল, উলটে পালটে দেখি তাতে সত্যিই বেশ কিছু তথ্য আছে, জেনুইন হলে ভালোই দাম পাওয়া যেতে পারে। বললাম, লন্ডনে গিয়ে কথা বলব। লোকটা বলল, তুমি কত দিতে পারবে এর জন্য? আমি বললাম, আমার কাছে পয়সাকড়ি বেশি নেই। আমি লন্ডনে এসেছি পড়াশোনা করতে। আমার ট্যাঁকের জোর বেশি না। সে বলল, হ্যাং ইট, যা পারো দিয়ে নিয়ে যাও। আমি বুড়ো হয়েছি, যা পাই তা-ই চলবে। বিক্রি করে বড়োলোক হতে হলে কী আর আগে করতাম না?”
ছৈনা বলল, “নিয়ে নিলি?”
ঘাড় নাড়ল পান্তু। “নিলাম। ও বলল, ফর্জারি নয়, রসিদ দিচ্ছি। ফিরে প্রফেসর লিন্ডেনকে দিলাম। যাচাই করে দেখা গেল সত্যিই চিঠিগুলো পুরোনো। আই-এইচ-আর বেশ ভালো দাম দিল আমাকে।”
ছৈনা প্রায় বাচ্চাদের মতো হাততালি দিয়ে উঠল। “অনেক টাকা পেলি?”
“পেলাম। অর্ধেক পাঠিয়ে দিলাম কনস্ট্যানটিনকে।”
অবাক হয়ে ছৈনা বলল, “সে কী! কেন দিলি? তুই তো কিনে নিয়েছিলি ওর কাছ থেকে।”
পান্তু বলল, “দিলাম… তার ‘কেন’ নেই। ব্যবসায়ী নই তো, মনে হল ওর অধিকার আছে। কিন্তু সেটা গল্প না। চিঠিগুলোর ছবি তুলে রেখেছিলাম। একদিন ল্যাপটপে সেগুলো পড়তে পড়তে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলাম।”
উত্তেজনায় সামনে এগিয়ে বসল ছৈনা। “কী?”
“চার্লস কনস্ট্যান্টিন পোস্টেড ছিল কলকাতায়। প্রচুর ঠগী ধরার অভিযানে গেছে, ধরেওছে। বাড়িতে চিঠি লিখে জানাত। অনেক অভিযানের বর্ণনা আছে। সে সব রোমহর্ষক লেখা! একটা চিঠিতে বউকে এরকম একটা অভিযানের কথা লিখেছে। একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী খবর দিয়েছিল যে ওদের চল্লিশজনের যাত্রীদলকে একটা ঠগীর দল মেরে ফেলেছে। তার মধ্যে ছেলেটার বাবা-ও ছিল। ছেলেটা কোনও রকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে কলকাতা পৌঁছেছিল। তারপর সৈন্যদলকে পথ দেখিয়ে একটা পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে গেছিল, যেখানে একটা ছোটো নদীর কাছে, খাদের গায়ে অনেকগুলো ছোটো বড়ো গুহা। গুহার মধ্যে থেকে প্রায় তিনশো ঠগীকে ধরা পড়েছিল। এই কনস্ট্যান্টিনের সঙ্গে যে সৈন্যরা ছিল, তারা সবাই ভারতীয় নুজীব — ঠগী-শিকারী ঘোরসওয়ার সিপাই। কপাল করে প্রায় সবাই হিন্দু। ইউরোপিয়ান আর কেউ ছিল না। হিন্দুরা ঠগীদের দেবী ভবানীর অভিশাপের ভয়ে কনস্ট্যান্টিনের সঙ্গে গুহার ভেতরে ঢোকেনি। বাইরেই ছিল। কনস্ট্যান্টিন কয়েকজন মুসলমান নুজীবকে নিয়ে ঢুকেছিল। ভেতরে অনেক ঠগী ছিল। কেউ ধরা দিয়েছিল, কেউ কেউ পালাবার চেষ্টা করে বাইরে অপেক্ষারত নুজীবদের হাতে পড়েছিল।”
ছৈনা অবাক হয়ে বলল, “তিনশ না কত গুণ্ডা — চুপচাপ ধরা দিল? মারামারি হল না, গোলাগুলি চলল না?”
মাথা নাড়ল পান্তু। “ঠগীরা অত্যন্ত নির্মমভাবে খুন করত, কিন্তু সামনাসামনি লড়াই করত না। সহজে ধরা যেত। একবার একজন ঠগী স্লীম্যানকে খুন করবে বলে ওর বাড়িতে ঢুকে লুকিয়ে ছিল। স্লীম্যানের কেন সন্দেহ হয়েছিল, জানা নেই, কিন্তু স্লীম্যানের এক মেয়ে — তখন ছোটো — পরে লিখেছিল, হঠাৎ একটা পর্দা সরিয়ে বাবা দেখে ছুরি হাতে এক ইন্ডিয়ান। স্লীম্যান আঙুল তুলে বলেছিল, তুমি একটা ঠগী… আর লোকটাও ছুরি ফেলে সেলাম করে বলেছিল, হাঁ, সাহিব। এরকম যাদের সাহস, তারা যে বন্দুকধারী সাহেব দেখে চুপচাপ আত্মসমর্পণ করবে, সেটাও আশ্চর্য না।”
“তারপর?”
“বাইরে যখন ঠগীদের বন্দী করা হচ্ছে, তখন কনস্ট্যান্টিন একা একেবারে ভেতর পর্যন্ত গিয়েছিল। লিখেছে, সেখানে ‘আইডল অফ কালী’ ছিল, আর অজস্র ধনসম্পত্তি। সেগুলো ও নিয়ে আসেনি। চিঠিতে লেখা আছে, অত টাকাকড়ি নিয়ে পাহাড় বেয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না — এবং সেটা ওর কাজও ছিল না। সেই সঙ্গে লিখেছিল — ওর প্ল্যান, পরে একা ফিরে গিয়ে সেই রাশি রাশি ধনসম্পত্তি উদ্ধার করা। সেটা করবে ছুটি নিয়ে, নিজের সময়ে, এবং তাহলে যা পাওয়া যাবে, ওর ধারণা তা দিয়ে বাকি জীবনটা সুখে শান্তিতে কেটে যাবে…”
“অ্যাঁ!” আঁতকে উঠল ছৈনা। “সে তো চুরি।”
“সাহেবরা চোর হত না? শুরুর দিকে যে সব সাহেব ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির হয়ে এসেছিল, তারা তো দু’হাতে লুট করেছে।”
“তা করেছে,” ছৈনা মানল। “আমাদের তো লুটেইছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিকেও লুটেছে মনের আনন্দে।”
“তাহলে কনস্ট্যান্টিন কেন লুটবে না?”
“তাহলে সেই টাকাকড়ি সব কনস্ট্যান্টিনের কাছে?”
“ও যে আর ফিরে গিয়েছিল এমন কথা কোনও চিঠিতে লেখা নেই। কুচকাওয়াজের সময় ঘোড়া পড়ে গিয়েছিল কোনও কারণে। ঘোড়ার নিচে চাপা পড়ে ওর এক পা বিশ্রীভাবে ভেঙে যায়। পরের দিকের চিঠিতে লিখেছে সে সব কথা। শেষ চিঠিতে বউকে লিখেছে, পায়ের ক্ষতে গ্যাংগ্রিন হয়েছে, ডাক্তাররা খুব চিন্তিত। মাই ডার্লিং, এ জীবনে আর তোমার কাছে যেতে পারব কি না জানি না…”
পান্তু থামল, বহু অতীতের এক অচেনা সাহেবের কষ্টকর মৃত্যুর কথা দুই বন্ধু কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবল। তারপরে ছৈনা বলল, “তোর ধারণা ওই সাহেব কনস্ট্যান্টিন এখানকার কথা লিখেছে? আমাদের ঝিরনি নদীর পাশের পাহাড়ি গুহার কথা? না-ও তো হতে পারে?”
পান্তু এবারে নিজের ল্যাপটপটা বাড়িয়ে দিল ছৈনার দিকে। বলল, “পড়ে দেখ। গুহার চিঠিটাই খোলা আছে।”
ছৈনা পড়তে শুরু করল, পান্তু গেল খাবার গরম করতে।
রাতের খাবার খেতে খেতে ছৈনা বলল, “মনে তো হয় এখানকার কথাই লিখেছে। তুই সেইজন্য ওই গুহায় যাবি?”
পান্তু বলল, “ভাব, যদি সত্যি ওখানে ঠগীদের গোপন গুহা পাই, তাহলে বেশ হয়, তাই না? ঠগীদের ইতিহাসে একটা পুরো নতুন চ্যাপটার আবিষ্কার হবে!
ছৈনা বলল, “আর গুপ্তধন?”
পান্তু বলল, “তা হলে তো সোনায় সোহাগা!”
(বাকি অংশ আগামী রবিবার…)









