মানুষ একেক জায়গায় একেকরকম। যাকে দেখে মনে হবে এর মতো অমায়িক ভদ্র সভ্য মানুষ আর হয়না, সে হয়তো রাতে স্ত্রীর উপর অমানুষিক অত্যাচার করে আনন্দ পায়।
এক মহিলা এসেছেন। তাঁর সারা শরীরে কালসিটে। ওঠা বসা করতেই যন্ত্রণায় চোখমুখ কুঁচকে যাচ্ছে। শুধু বলছেন, পড়ে গেছেন। পড়ে গিয়ে এই অবস্থা।
বললাম, আমাকে কী একেবারে গাধা মনে হয়? কী করে হলো এমন? বর পিটিয়েছে?
অনেক ইতস্তত করে মহিলা বললেন, রাতে মেয়ে ঘুমানোর পর অন্য ঘরে দরজা বন্ধ করে চাবুক দিয়ে তাঁর স্বামী তাকে পেটান। পেটানোর জন্য অনলাইন থেকে চাবুকটি তিনি সখ করে কিনেছেন। কোনো ঝগড়া ঝাটি নয়, এমনিই পেটান। হাসি হাসি মুখ করে পেটান। পেটানোর পর আবার স্বাভাবিক গলায় বলেন, আজ খুব পরিশ্রম হলো, এক গ্লাস সরবত খাওয়াও তো।
আমি হতবাক হয়ে বললাম, আপনি কিছু বলেন না।
মহিলা কেঁদে ফেলে বলেন, কী বলব? প্রতিবাদ করার জোর নেই। বাপের বাড়ির অবস্থা ভালো না। আমার স্বামীর টাকাতেই চলে। আমিও বেশিদূর পড়াশুনো করিনি। বাসন মাজা- রান্নার কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ পাব না। দাঁতে দাঁত চেপে ওই সময়টুকু কাটিয়ে দিতে পারলে বাকি সময় ওর মতো মানুষ হয়না। কাল শুধু একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।
রাগে মাথাটা চিড়বিড় করে উঠল। ভদ্রমহিলা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছেন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের নিরাপত্তার জন্য রোজ স্বামীর কাছে মার খাওয়াটাকেও মেনে নিয়েছেন।
উনি বললেন, ব্যথাটা একটু কমিয়ে দিন ডাক্তারবাবু।
বললাম, ওষুধ দিলে না হয় শরীরের ব্যথা কমবে। কিন্তু মনের ব্যথা? আপনি থানায় যান। একটা জিডি করুন। পুলিশ আপনার স্বামীকে তুলে নিয়ে গিয়ে দুটো চড় থাপ্পড় মারুক।
মহিলা ভয়ার্ত গলায় বললেন, তাহলে আমাকে আর মেয়েকে একেবারে রাস্তায় বের করে দেবে। আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই ডাক্তারবাবু। মেয়ের মুখ চেয়ে মার খেতেই হবে। মেয়েটাকে পড়াশুনো শেখাতেই হবে। ওর ভাগ্য যেন আমার মতো না হয়।
যে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া উচিৎ, সেই সম্পর্ক টিকে যাবে। মেয়েটি কোনোদিনও বিদ্রোহী হবে না। স্বামী স্ত্রী একসাথে বেড়াতে যাবে, পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাবে। হাসি মুখে ছবি তুলবে। একই খাটে পাশাপাশি শোবে। যদিও দুজনের মধ্যে বিন্দুমাত্র ভালোবাসা নেই। শ্রদ্ধা নেই। ভালোবাসাহীন, শ্রদ্ধাহীন এক সম্পর্ক। শুধু ঘৃণা আছে, ভয় আছে, অসহায় আত্মসমার্পণ আছে।
আমি খুপরিজীবি ডাক্তার, কিছুই সারাতে পারি না। পৃথিবীর গভীর… গভীরতম অসুখ এখন। তবু গম্ভীর মুখে রোগী দেখি। এ ছাড়া পেট চালানোর অন্য কোনো উপায় আমার জানা নেই। আসলে আমরা সবাই হেরে গেছি। আমাদের স্বপ্ন, সাধ আহ্লাদ সব হেরে গেছে। প্রাণপনে ওই মহিলার মতো মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।









