ভদ্রমহিলা আজ আবার এলেন। তবে আজকে কথাবার্তা অনেক স্বাভাবিক। পায়ের বুড়ো আঙুলের অবস্থা এখন অনেক ভালো। বার কতক ড্রেসিং দেখে এবং সহ্য করে তাঁর মানসিক অবস্থাও আজ অনেক স্থিত। স্কুলে পড়ান। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়েছেন।
প্রথম যেদিন এসেছিলেন, সেদিন সবেমাত্র দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। কোমরে, ঘাড়ে, হাঁটুতে এবং পায়ের বুড়ো আঙুলে চোট পেয়েছেন তো বটেই – তবে আসল চোট পেয়েছেন মনে। টোটোর ধাক্কায় পায়ের বুড়ো আঙুল ভেঙে, নখটা সম্পূর্ণ উড়ে গিয়ে একেবারে যাচ্ছেতাই কান্ড। গলগল করে রক্ত পড়ছে। ঘটনার অভিঘাত তাঁর মনে তখনও ঠিক বসে উঠতে পারে নি।
রক্তপাত বন্ধ করে, ক্ষত পরিষ্কার করে প্রেসক্রিপশন করছি। ভদ্রমহিলা প্রায় কান্না জড়ানো গলা প্রশ্ন করলেন, ‘নখটা কতদিনে গজাবে?’
‘নখ তো সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে যা দেখছি। সম্ভবত আর গজাবে না।’
ডদ্রমহিলা রক্তবর্ণ চোখে আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘কী-ই? আপনি আমার সাথে কি মজা করছেন?’
‘দেখুন, আমি আপনার চিকিৎসা করছি। আপনার পায়ের অবস্থা বেশ জটিল। এই অবস্থায় আমি মজা করতে যাব কেন?’
‘(নখ) গজাবে না মানে? এই অবস্থাতেই থাকবে? তাহলে আপনি কিসের চিকিৎসা করছেন?’ ভদ্রমহিলা রীতিমতো আক্রণাত্মক
তিনি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন।
আজকে তিনি অনেক শান্ত। বললেন, ‘নখ না থাকলে কি কি অসুবিধা হতে পারে?’
সেসব বিস্তারিত বললাম। উনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেনে নিলেন।
ছোটবেলায় হাতে বড়বড় নখ হলে, মা বলত, ‘নখগুলোক তো কোদালের সাইজের হয়েছে! হাত দে, কেটে দিই।’
মায়ের ধমকের চোটে পকেট থেকে বা পেছন থেকে হাত সামনে এনে আত্মসমর্পণ করতেই হত।
আজকে নখের রোগীর পরের জন নিয়ে এল কোদাল। গ্রাম্য বয়স্ক মানুষ। কোমরের সমস্যা। হাড় সরে গেছে। নার্ভের উপর চাপ পড়ছে। সায়াটিকার ব্যথায় হাঁটতে বেশ কষ্ট।
‘আচ্ছা বলুন তো, আমার এরকম হল কেন? আমার তো কোনো চোট লাগে নি!’
বললাম, ‘চোট না লাগলেও হতে পারে। বয়স জনিত কারণে হাড় দূর্বল হচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বহু বছর ধরে ভারী কাজকর্ম করেছেন। তার একটা এফেক্ট আছে।’
রোগীর স্ত্রী বললেন, ‘বললেও শোনে না। এখন ছেলেরাই মাঠের সব কাজ করে। তবু বুড়ো বয়সে কোদাল নিয়ে গাছের গোড়া কোপাবে।’
রোগী হঠাৎ আমার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বললেন,‘ডাক্তারবাবু, কোদাল দেখেছেন কখনো?’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘মানে?’
‘কোদাল হাতে নিয়েছেন?’
বুঝতে পারলাম না ভদ্রলোক বিদ্রূপ করছেন কি না।
‘দেখব না কেন? আমার পুরনো বাড়িতেই কোদাল আছে। কোদাল ব্যবহার করতেও জানি।’
আজকাল মাউসের এক ক্লিকে বিশ্বব্রহ্মান্ডের যেকোনো ছবি কম্পিউটারের স্ক্রিনে এসে হাজির হয়। সেইভাবে কোদালের ছবি দেখিয়ে বললাম,।‘এইটার কথা বলছেন তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘এটা তো প্রায় সবার বাড়িতেই থাকত একসময়। এখানে চেম্বারে বা ফ্ল্যাটে কোথায় পাব? কিন্তু পুরনো বাড়িতে আছে। ব্যবহারও হয়। কোদাল, শাবল, দা, কাস্তে- সবই।’
রোগী বলল, ‘আমি ভাবলাম, আপনি শহুরে ডাক্তার মানুষ – কোদাল-টোদাল দেখেন নি।’
‘আমি কি জন্মেই ডাক্তার হয়ে গেছি নাকি! তার আগে বড়ির কাজকর্ম করতে হয় নি? এককালে বাড়িতে একটু-আধটু জমি-জিরেত ছিল মশাই। সেখানে ফসল ফলিয়েছি। পুকুরও ছিল। ছিপ ফেলতে পারি, জাল-ও।’
বলতে বলতে মনে পড়ে গেল, বাড়ির জমিতে মাটি কুপিয়ে দুই মণ আলু ফলিয়েছিলাম একবার। চিনে বাদাম-ও চাষ করেছিলাম। কিন্তু কাকপক্ষীতে সব খেয়ে যায়। শাবল দিয়ে গর্ত খুঁড়ে গোলপোষ্ট তো আকছার পুঁততে হত! জমির আল বরাবর হেঁটে যেতে যেতে দেখতাম, আমাদের জমিতে হাল চষছে মজিদ মিঞা।
ডাক্তারির ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় পাড়ার ফুটবল টীমের সবাই মিলে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ঝুড়ি বোঝাই করে, সেই মাটি বয়ে, আধ কিলোমিটার রাস্তা বানিয়ে ফেলেছিলাম। শক্ত কড়া পড়ে গিয়েছিল হাতের তালুতে। অনেকদিন যাবৎ এলিট মেডিক্যাল কলেজের বন্ধুদের থেকে লুকিয়ে রাখতে হত হাত দুটো। সেসব এখন স্মৃতি।










