যদিও বিষয়টা প্রিন্ট মিডিয়ার মধ্যেও কমবেশি ছিল কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিশেষত টিভি এই মাধ্যমটির বিকশিত হওয়ার পথে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক মোড় আছে। আমাদের দূরদর্শনের ইতিহাস একটু ভাবলেই বিষয়টার একটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যাবে। তখন নিউজ মানে নিউজ। খবর। সেটা গড়গড় করে পড়ে যাওয়া। বিশেষ কোনো টিকা টিপন্নি ছাড়াই। বিদেশি সংবাদমাধ্যমে বিশেষত বিবিসি এবং মার্কিন চ্যানেলগুলির শৈশব অবস্থায়ও একই রকম ছিল। তার পরে আসলো ভিউজ, মানে দৃষ্টিভঙ্গি। নিউজের পাশাপাশি এই ভিউজ পরিবেশন এর জন্য নিউজ রিডার উঠে গিয়ে আসলো নিউজ অ্যাঙ্কর। অর্থাৎ টিভির দর্শক শ্রোতাদের সামনে কেবল হার্ড নিউজ নয়, দর্শক শ্রোতাদের মনোভাব তৈরির জন্য ভিউজও উঠে আসতে শুরু করলো। এটা ছিল প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক মোড়।
এর পরের ধাপে টিভি নিউজ স্টুডিওতে যে ব্যক্তিদের আগমন ঘটতে শুরু করলো তাদের নাম দেওয়া হল বিশেষজ্ঞ বা এক্সপার্ট। নিউজ এঙ্কররা এর আগে নিজেদের মতামত এবং রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মতামত হাজির করেই ক্ষান্ত দিতেন। এরপর এর সাথে যুক্ত হল বিশেষজ্ঞদের মতামত। ধরুন প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘু হত্যা। নানা মুনির নানা মতামতের পাশাপাশি আমরা অনায়াসে আজকাল শুনতে পাই কোনো প্রাক্তন সেনাকর্তার মতামত, বা আন্তর্জাতিক সর্ম্পক বিষয়ের কোনো অধ্যাপকের মতামত। অর্থাৎ দর্শক শ্রোতা যে কেবল খবর শুনে নিজের মতামত তৈরি করবেন তার কোনো উপায় নেই। তার মতামতকে প্রভাবিত করার জন্য এঙ্কর হাজির, হাজির রাজনৈতিক দলের নেতা, এবং সর্বোপরি বিশেষজ্ঞ।
টিভির খবর পরিবেশনকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলে আরো জনপ্রিয়, আরো রাজস্ব লাভের উদ্দেশ্যে এসব আয়োজন তো আছেই, বর্তমান কালের বেশ কিছু নামজাদা দার্শনিক এসবের পেছনে আরেকটি কারণও চিহ্নিত করেছেন। সেটাকে বলা হয় সম্মতি উৎপাদন বা কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে যারা জাতি রাষ্ট্র চালাচ্ছেন, যারা বিলক্ষণ জানেন যে কিছু ভালো কাজের পাশাপাশি তারা বিস্তর খারাপ কাজ করছেন, জনসাধারণের জন্য জনহিতকর নয়, ক্ষতিকর এমন সব কাজও। ওই সব কাজকর্ম যাতে জনগণ মুখ বুঁজে মেনে নেয়, প্রতিবাদ না করে তার জন্যই সম্মতি উৎপাদনের খেলা।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। সাধারণ মানুষ প্রায় সবাই জানেন যে দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেলে সবচেয়ে অসুবিধের মধ্যে তারাই পরবেন। অথচ শাসকরা এমন একটা যুদ্ধ উন্মাদনার জন্ম দিতে পারেন এবং তার সপক্ষে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন যে সাধারণ মানুষের তাতে সম্মতি দেয়া ছাড়া আর উপায় থাকছে না। নিউজ, ভিউজ আর এক্সপার্ট ওপিনিয়নের মায়ামন্ত্র জালে সহজ সরল সত্যিটা বলি হচ্ছে এটা আমরা বুঝেও বুঝতে পারছি না। উত্তর সত্য যুগের এটাই সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
দিপু চন্দ্র দাস খুন হয়েছেন সংখ্যালঘু বলেই। এতে যাদের ভাবাবেগকে উস্কে যারা ফায়দা নিতে চাইছেন তারা অক্লেশে আমাদের ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে আমাদের নিজেদের দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জানমাল রক্ষায় আমাদের ইতিহাসও লজ্জাজনক, দুদিন আগেই বিগ্রেডের মাঠে সাধারণ দরিদ্র এক প্যাটিস বিক্রেতার লাঞ্ছনার কথা আমাদের ভুলে যাওয়ার নয়। স্রেফ বাঙালি বলে যারা আমাদের দেশের ভিনরাজ্যে আক্রান্ত হয়েছেন বাংলাদেশী সন্দেহে তাদের মধ্যে কেবল মুসলিম নয়, হিন্দু বাঙালিও আছেন। বাংলাদেশের কয়েকজন অল্প বুদ্ধি যুদ্ধবাজ আমাদের চিকেন নেক সেভেন সিস্টার দখলের স্লোগান দেওয়াতে উত্তেজিত হয়ে শিলিগুড়ির হোটেলওয়ালারা বাংলাদেশী বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যেটা তাও বোঝা যায়, কিন্তু এটা বোঝা দায় যে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত স্টুডিওতে বসে প্রাক্তন সমর কর্তা বিশেষজ্ঞ সেজে কেমন অনায়াসে বক্তব্য রাখছেন যে বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে দিতে আমাদের সাতদিনের বেশি সময় লাগবে না। ওনার কি ধারণা যে যুদ্ধ লাগলে অন্যান্য দেশগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা নেবে, এটা কি বাংলাদেশ বনাম ভারতের টি টোয়েন্টি ম্যাচের কথা হচ্ছে? আসলে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন বিষয়টাই লোপ পেয়েছে। প্রতিটি চ্যানেল তাদের সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী তাদের সংবাদ পরিবেশন চালিয়ে যাচ্ছে নিজ নিজ এজেন্ডা পূরণ করার লক্ষ্যে। আবারো বলছি কনসেনসাস ম্যানুফ্যাকচারিং এর জন্য আসলে ট্রুথ ম্যানুফ্যাকচারিং চলছে।
আমাদের বোকা বানানোর এই সব চেষ্টা আমরাই রুখতে পারি, সতর্ক সজাগ থেকে, তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের মতামতকে শেষকথা বলে মেনে না নিয়ে প্রশ্ন করার অভ্যাস করতে শিখে। বৃহৎ পুঁজি পরিচালিত এই সংবাদমাধ্যমে মগজ ধোলাই রুখতে না পারলে আমাদের কপালে আরো অনেক দুঃখ অপেক্ষা করছে।










খুব ভালো লেখা। কিন্তু কথা হচ্ছে,খবর এখন কটা মানুষ আর দ্যাখেন। আর প্রশ্ন করার অভ্যেসের থেকেও বড়ো কথা।সে প্রশ্নের উত্তর ওদের দিতে বয়েই গেছে।নিজেরাই তো একগাদা হাউহাউ করে।আর চ্যানেলও এখন গিজগিজ করছে।কথা হচ্ছে ওদের দেখা দিয়ে আমাদের দেখতে হবে।গোটা পৃথিবী জুড়ে এটার-ই এজেন্ডা।ব্যবসা, ম্যানুফ্যাকচারিং।
কিন্তু তার মধ্যেও খুব সকালে ওদেরই গড়ে দেওয়া এই সমাজমাধমে সাংবাদিক পিলার সস্ত্রীক প্রণয় রায়কে হঠাৎ বহুদিন পর দেখে ভারী ভালো লেগে চমকে ওঠায়। কারণ একটা প্রসিদ্ধ সময় সে বা তিনি তাঁরা আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন।
যার জন্য আমরা এখনের ফারাক নিয়ে এতোটা বলতে পারি।
আর বিশেষজ্ঞ দের কে পাত্তা দেয়!
এখনের এই যুগে সবাই বিশেষজ্ঞ।
কোনো মানুষ তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে তার বক্তব্যে র
ধরণেই তো বোঝা যায়, কোনো টা জাহিরিকরণ,আর কোন টা চাপিয়ে দেওয়া র।
মানুষ এতো এখন শোনে বলে তো আমার মনে হয় না।কারণ এইসব বিশেষজ্ঞ দের কোনো ঠিক নেই,খাপে খাপ চলায় তারা অভ্যস্ত।।